মুহাররম ও আশুরা: গুরুত্ব, ফজিলত, আশুরার রোজা, তওবা ও করণীয় | কুরআন-হাদিসের আলোকে

মুহাররম ও আশুরা: গুরুত্ব, ফযীলত ও করণীয় কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি দালিলিক পর্যালোচনা

লেখক: মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ,

মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল

 

ভূমিকা: নতুন বছর, নতুন হিসাব  মাহে যিলহজ্জের বিদায়ের পর শুরু হয় হিজরী বছরের প্রথম মাস—মুহাররম। একটি বছরের সমাপ্তি এবং আরেকটি বছরের সূচনার মধ্য দিয়ে মানুষ প্রবেশ করে জীবনের নতুন অধ্যায়ে। পশ্চিমাকাশে মুহাররমের নতুন চাঁদ উদিত হয়ে যেন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবনের একটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। এখন সময় অতীতের হিসাব-নিকাশ করার, ভুল-ত্রুটির জন্য তওবা করার এবং নতুন উদ্যমে আল্লাহর পথে চলার অঙ্গীকার করার।

দিন যায়, রাত আসে; সপ্তাহ পেরিয়ে মাস আসে; মাসের পর মাস অতিক্রম করে একটি বছর শেষ হয়ে যায়। এভাবেই মানুষের জীবন ধীরে ধীরে তার শেষ গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়। বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে প্রতিটি নতুন দিন, নতুন মাস ও নতুন বছরকে আত্মশুদ্ধি এবং আখিরাতের প্রস্তুতির উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন

إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الأَلْبَابِ

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। সূরা আলে ইমরান : ১৯০ অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে

إِنَّ فِي اخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ

নিশ্চয়ই রাত-দিনের আবর্তন এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মুত্তাকীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।সূরা ইউনুস : ৬

কিন্তু সবাই এ নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। কেউ সময়কে কাজে লাগিয়ে আখিরাতের সফলতা অর্জন করে, আর কেউ সময় নষ্ট করে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন

كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا

প্রতিটি মানুষ সকাল যাপন করে; অতঃপর সে নিজেকে বিক্রি করে। কেউ নিজেকে মুক্ত করে, আর কেউ নিজেকে ধ্বংস করে। সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২২৩  সুতরাং একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নতুন সূচনাকে কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।


আরও পড়ুন:  হিন্দু মেয়ের ইসলাম গ্রহণের পর তার সাথে মুসলমানের বিবাহ করা কি জায়েজ?


মুহাররম: আল্লাহর নির্ধারিত সম্মানিত মাস

 

হিজরী বছরের প্রথম মাস হলো মুহাররম। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ

আল্লাহ যেদিন আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই তাঁর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। সূরা তাওবা : ৩৬     রাসূলুল্লাহ  এ চারটি মাসের ব্যাখ্যা করে বলেন

السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ: ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ

সহীহ বুখারী, হাদীস : ৪৬৬২  অর্থাৎ যিলকদ, যিলহজ্জ, মুহাররম এবং রজব এই চারটি মাস আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এই মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, ইবাদতে অধিক মনোযোগী হওয়া এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।


আরও পড়ুন:  জ্বিন বা পরীর সাথে বিবাহ করা কি জায়েজ?


শাহরুল্লাহ আল-মুহাররম: আল্লাহর মাস

 

মুহাররম মাসের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, হাদীসে একে শাহরুল্লাহ” বা “আল্লাহর মাস” বলা হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ، وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ

রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ  সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬৩  অন্য এক বর্ণনায় এসেছে

وَأَفْضَلُ الْأَشْهُرِ شَهْرُ اللَّهِ الَّذِي تَدْعُونَهُ الْمُحَرَّمُ

রমযানের পর সর্বোত্তম মাস হলো আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মুহাররম বলে থাক।” সুনানে কুবরা, নাসায়ী : ৪২১৬  সকল মাসই তো আল্লাহর সৃষ্টি। তবুও বিশেষ মর্যাদা বোঝানোর জন্য মুহাররমকে “আল্লাহর মাস” বলা হয়েছে। যেমন সব মসজিদই আল্লাহর ঘর, কিন্তু কাবা শরীফকে বিশেষভাবে “বাইতুল্লাহ” বলা হয়।


আরও পড়ুন:কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত নারী-পুরুষ? ইসলামী বিশ্লেষণ


হিজরী নববর্ষ: একজন মুমিনের করণীয়

 

আজ দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক মুসলমান ইংরেজি নববর্ষকে গুরুত্ব দিলেও হিজরী নববর্ষ সম্পর্কে উদাসীন। অথচ ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান—রোযা, হজ, যাকাত, ইদ্দত ইত্যাদি—হিজরী মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ

লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন, এটি মানুষের সময় নির্ধারণ এবং হজের সময় নির্ধারণের জন্য। সূরা বাকারা : ১৮৯  অতএব হিজরী মাস ও বছরের হিসাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া মুসলমানের দ্বীনি দায়িত্বের অংশ।



নতুন চাঁদ, নতুন প্রত্যয় এবং সুন্নতি দোয়া

 

রাসূলুল্লাহ  নতুন চাঁদ দেখে এই দোয়া পাঠ করতেন

اَللّٰهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالْإِيمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللَّهُ

জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩৪৫১

অর্থাৎ হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের ওপর বরকত, ঈমান, নিরাপত্তা ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। আমার ও তোমার রব আল্লাহ। এ দোয়া শুধু মুহাররমের জন্য নয়; বরং প্রত্যেক নতুন মাসের চাঁদ দেখার সময় পড়া সুন্নত।

একই সঙ্গে নতুন বছরকে সামনে রেখে একজন মুমিনের উচিত—

  • অতীত জীবনের হিসাব নেওয়া,
  • গুনাহ থেকে তওবা করা,
  • নামাজ ও ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া,
  • নতুন বছরে বেশি বেশি নেক আমলের পরিকল্পনা করা,
  • আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।

কারণ প্রকৃত সফলতা নতুন বছর উদযাপনের মধ্যে নয়; বরং নতুন বছরকে আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যম বানানোর মধ্যে নিহিত।

আরও পড়ুন:  মুসলিম মেয়ের সাথে অমুসলিম ছেলে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ


মুহাররম মাসে রোযার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব

 

মুহাররম মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নফল রোযা রাখা। রাসূলুল্লাহ এ মাসে রোযা রাখার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করেছেন। পূর্বে উল্লেখিত হাদীসে তিনি ইরশাদ করেছেন

أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ

রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা। সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬৩

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রমযানের ফরজ রোযার পর নফল রোযার মধ্যে মুহাররম মাসের রোযার মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। তাই একজন মুমিনের উচিত এ মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোযা রাখার চেষ্টা করা। তবে মুহাররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোযা হলো আশুরার রোযা, যা দশ মুহাররমে পালন করা হয়। এ রোযার ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে বিশেষ সুসংবাদ এসেছে, যা পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।


আরও পড়ুন:  আপন চাচার চাচাত শ্বশুরের মেয়ের সাথে বিবাহ করা কি জায়েজ?


মুহাররম: তওবা ও আত্মশুদ্ধির মাস

 

মুহাররম শুধু রোযার মাস নয়; এটি তওবা, ইস্তিগফার এবং আত্মশুদ্ধিরও মাস। আল্লাহ তাআলার রহমত লাভের জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় অবলম্বন হলো তওবা। মানুষ ভুল করবে, গুনাহ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ কে জিজ্ঞাসা করলেন

يَا رَسُولَ اللهِ، أَيُّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ؟

ইয়া রাসূলাল্লাহ! রমযানের পর কোন মাসে রোযা রাখতে আপনি আমাকে নির্দেশ দেনরাসূলুল্লাহ উত্তরে বলেন

إِنْ كُنْتَ صَائِمًا بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ فَصُمْ الْمُحَرَّمَ، فَإِنَّهُ شَهْرُ اللهِ، فِيهِ يَوْمٌ تَابَ اللهُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ، وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى آخَرِينَ

তুমি যদি রমযানের পর রোযা রাখতে চাও, তবে মুহাররমে রোযা রাখো। কেননা এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যেদিন আল্লাহ এক সম্প্রদায়ের তওবা কবুল করেছিলেন এবং ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন। জামে তিরমিযী, হাদীস : ৭৪১ মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এখানে আশুরার দিনের কথাই বোঝানো হয়েছে।

তাই মুহাররম, বিশেষত আশুরার দিন, তওবা-ইস্তিগফারের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ।


আরও পড়ুন:  মোবাইল/মেসেজ/পত্র বা টেলিফোনের /মাধ্যমে কিভাবে বিবাহ করবে?



সায়্যিদুল ইস্তিগফার: ক্ষমা লাভের শ্রেষ্ঠ দোয়া

 

তওবা ও ইস্তিগফারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ যে দোয়াকে সর্বোত্তম বলেছেন, তা হলো “সায়্যিদুল ইস্তিগফার

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৩০৬ একজন মুমিনের উচিত মুহাররম মাসে এ দোয়াকে নিয়মিত ওযীফা বানানো এবং গভীর অনুভূতির সঙ্গে পাঠ করা।


দশ মুহাররম: ইয়াওমে আশুরার ইতিহাস ও গুরুত্ব

 

মুহাররম মাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো দশ মুহাররম, যা “ইয়াওমে আশুরা” নামে পরিচিত। এই দিনটি শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়; বরং পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাসেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন

كَانُوا يَصُومُونَ عَاشُورَاءَ قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ رَمَضَانُ

রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার আগেও লোকেরা আশুরার রোযা রাখত। সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫৯২ জাহেলী যুগের আরবরাও এ দিনের মর্যাদা জানত। এমনকি এ দিনে কাবা শরীফে নতুন গিলাফ পরানো হতো। পরে যখন রমযানের রোযা ফরজ হলো, তখন আশুরার রোযা ফরজ থেকে মুস্তাহাবে পরিণত হয়।


 আরও পড়ুন:তাফবীজে তালাক বিষয়ে সম্পর্ক (তালাকের অধিকার বিষয়ক)



মূসা (আ.)-এর মুক্তি এবং ফেরাউনের ধ্বংস

 

রাসূলুল্লাহ যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে ইহুদিরা আশুরার দিনে রোযা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন

مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي تَصُومُونَهُ؟

তোমরা কেন এ দিনে রোযা রাখছ? তারা বলল

هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ، أَنْجَى اللهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ، وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ

এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন

فَنَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ

মূসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। এরপর তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। সহীহ বুখারী, হাদীস : ২০০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৩০

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আশুরা হলো আল্লাহর সাহায্য, মুক্তি এবং সত্যের বিজয়ের দিন।


আরও পড়ুন: নারীর গৃহে অবস্থান : পরাধীনতা নয়, মৌলিক অধিকার


আশুরার দিন: গুনাহ মাফের সুসংবাদ

আশুরার রোযার সবচেয়ে বড় ফযীলত হলো এটি পূর্ববর্তী এক বছরের সগীরা গুনাহ মাফের কারণ হয়। রাসূলুল্লাহ  ইরশাদ করেন

صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ

আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোযা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হবে। সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২ .সুবহানাল্লাহ! মাত্র একটি দিনের রোযার বিনিময়ে এক বছরের গুনাহ মাফের এ সুসংবাদ একজন মুমিনকে আশুরার রোযার প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে।

 

আশুরার রোযা যেভাবে পালন করবেন

আশুরার রোযা একটি মহান সুন্নত এবং অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। তবে রাসূলুল্লাহ  শুধু ১০ মুহাররমের রোযার ওপর সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি; বরং ইহুদিদের সাদৃশ্য পরিহার করার জন্য এর সঙ্গে আরও একটি দিন মিলিয়ে রোযা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, যখন রাসূলুল্লাহ  আশুরার রোযা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও রোযা রাখতে বললেন, তখন সাহাবীগণ আরজ করলেন

يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى

ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ দিনকে তো ইহুদি ও নাসারারা বিশেষভাবে সম্মান করে। তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন

فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ 

আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমরা নবম তারিখেও রোযা রাখব।কিন্তু পরবর্তী বছর আসার আগেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৩৪ .এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম ও ফুকাহায়ে উম্মত আশুরার রোযার সঙ্গে আরেকটি দিন মিলিয়ে রোযা রাখাকে উত্তম বলেছেন।


আশুরার রোযার সর্বোত্তম পদ্ধতি

 

ফুকাহায়ে কেরামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আশুরার রোযা রাখার কয়েকটি স্তর রয়েছে—

প্রথম স্তর (সর্বোত্তম)

, ১০ ও ১১ মুহাররম—তিন দিন রোযা রাখা। এতে আশুরার রোযাও আদায় হবে এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা যাবে।

দ্বিতীয় স্তর

৯ ও ১০ মুহাররম—দুই দিন রোযা রাখা। এটাই হাদীস দ্বারা সবচেয়ে বেশি সমর্থিত পদ্ধতি।

তৃতীয় স্তর

১০ ও ১১ মুহাররম দুই দিন রোযা রাখা। যারা ৯ তারিখে রোযা রাখতে না পারেন, তারা ১০ ও ১১ তারিখ রোযা রাখতে পারেন।

সর্বনিম্ন স্তর

শুধু ১০ মুহাররম রোযা রাখা। এটিও বৈধ ও ফযীলতপূর্ণ; তবে উত্তম হলো এর সঙ্গে আগে বা পরে আরেকটি রোযা যুক্ত করা।হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত

صُومُوا التَّاسِعَ وَالْعَاشِرَ وَخَالِفُوا الْيَهُودَ

তোমরা নবম ও দশম তারিখে রোযা রাখ এবং ইহুদিদের বিরোধিতা কর। মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক : ৭৮৩৯; আলবাইহাকী : ৮১৮৯


সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আশুরার গুরুত্ব

 

আশুরার রোযার গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের সন্তানদেরও ছোটবেলা থেকেই এ রোযার প্রতি অভ্যস্ত করতেন। হযরত রুবাইয়্যি বিনতে মুআওয়িয (রা.) বলেন আমরা আশুরার দিন নিজেরাও রোযা রাখতাম এবং আমাদের শিশু সন্তানদেরও রোযা রাখাতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে রাখতাম। যখন তারা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করত, তখন খেলনা দিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখতাম। এভাবেই ইফতারের সময় পর্যন্ত তারা রোযা পূর্ণ করত।সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৩৬

এ থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরাম সন্তানদের ঈমানী তারবিয়াত এবং নেক আমলের প্রতি অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার ব্যাপারে কতটা সচেতন ছিলেন।


আরও পড়ুন:    হিল্লা বিয়ের পর প্রথম স্বামী কি হালাল হয়?


কারবালার ঘটনা ও আমাদের করণীয়

 

মুহাররম মাসের আলোচনা এলেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কথা সামনে আসে। ৬১ হিজরির ১০ মুহাররমে রাসূলুল্লাহ এর দৌহিত্র, জান্নাতি যুবকদের নেতা, হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন।

নিঃসন্দেহে এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত আমাদের হৃদয়কে ব্যথিত করে। আমরা তাঁকে ভালোবাসি, তাঁর জন্য দোয়া করি এবং তাঁর আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে—কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামে কোনো বার্ষিক শোকানুষ্ঠান, মাতম, বুক পেটানো, রক্ত ঝরানো কিংবা তাযিয়া নির্মাণের বিধান নেই। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রকৃত অনুসরণ হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা সত্যের ওপর অটল থাকা, জুলুমের সামনে মাথা নত না করা এবং দ্বীনের জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকা।


আরও পড়ুন:উলঙ্গ হয়ে গোসল করা কি জায়েয?


মুহাররমকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিদআত ও কুসংস্কার

 

আফসোসের বিষয়, মুহাররম ও আশুরাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ ও বিদআত প্রচলিত হয়েছে। যেমন

  • তাযিয়া নির্মাণ করা।
  • তাযিয়ার সামনে মানত করা।
  • বুক পেটানো ও মাতম করা।
  • শরীর রক্তাক্ত করা।
  • বিশেষ শোক মিছিল বের করা।
  • আশুরাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করা।
  • শরীয়তে প্রমাণিত নয় এমন বিশেষ নামাজ ও আমল আবিষ্কার করা।

এসব কাজ কুরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়।


আরও পড়ুন: গুপ্তাঙ্গে তরল পদার্থ জমা থাকলে উযু ভাঙ্গবে কি-না?


মাতম সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান

 

রাসূলুল্লাহ  মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিলাপ, চিৎকার-চেঁচামেচি এবং মাতম করাকে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ

সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলী যুগের মতো বিলাপ করে। সহীহ বুখারী, হাদীস : ১২৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১০৩ .অতএব হায় হুসাইন বলে মাতম করা, বুক পেটানো বা শরীর ক্ষতবিক্ষত করা ইসলামের শিক্ষা নয়।


মুহাররম মাসে একজন মুসলমানের করণীয়

 

মুহাররম মাসকে কেন্দ্র করে একজন মুমিনের উচিত  বেশি বেশি নফল রোযা রাখা। বিশেষভাবে ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোযা রাখা।তওবা ও ইস্তিগফারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা। তাহাজ্জুদের প্রতি যত্নবান হওয়া।দান-সদকা ও নেক আমল বৃদ্ধি করা।বিদআত, কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে থাকা।নতুন বছরে নিজের ঈমান ও আমলের মান উন্নত করার অঙ্গীকার করা।


আরো পড়ুন: হায়েজ অবস্থায় এক বৈঠকে তিন তালাকের বিধান


উপসংহার

মুহাররম ইসলামের একটি সম্মানিত মাস। এটি তওবা, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক সুবর্ণ সুযোগ। আর আশুরা হলো এমন এক মহিমান্বিত দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের মুক্তি দান করেছিলেন এবং যার রোযার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই এ মাসকে কেন্দ্র করে বিদআত, কুসংস্কার ও আবেগপ্রবণতার পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত আমলগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রোযা, তওবা, ইস্তিগফার, দান-সদকা এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা যেন মুহাররমের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মুহাররম ও আশুরার ফযীলত থেকে যথাযথভাবে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।


📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

২৫ জুন ২০২৬