নবিজির জীবন ও আমাদের জীবন;আনুগত্যের উদাসীনতা ( প্রথম জুমা : সিরাত-১)
শায়খ উবাইদ উসমান
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক
মুহতারাম হাজিরীন! পৃথিবীর শাশ্বত নিয়ম হলো-মানুষ যাকে মন থেকে ভালোবাসে, তার জীবনের ছোট ছোট পছন্দ-অপছন্দ, সুখ-দুঃখ আর স্মৃতির গল্পগুলো সে পরম মমতায় হৃদয়ে আগলে রাখে। মুহাব্বতের প্রথম শর্তই হলো প্রিয় মানুষটিকে জানা, তাকে বোঝা এবং তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলা। কারও সম্বন্ধে ভালোভাবে চেনাজানা ছাড়া তাকে ভালোবাসা অসম্ভব; অজানা কোনো মানুষের প্রতি মুখে ভালোবাসার শত কথা বললেও, অন্তরে তার জন্য সত্যিকারের টান তৈরি হয় না।
ভালোবাসার এই চিরন্তন সত্যটি স্মরণ করার পেছনে আজকের একটি বিশেষ পটভূমি রয়েছে। দেখতে দেখতে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসছে বরকতময় রবিউল আউয়াল মাস-যে মাসে এই ধরায় আগমন করেছিলেন আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। স্বাভাবিকভাবেই এ মাস এলেই চারদিকে সভা-সমাবেশ ও নানা আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ, রবিউল আউয়ালকে ঘিরে আমাদের আবেগ ও উৎসাহের কোনো কমতি থাকে না। কিন্তু বাহ্যিক এই উদ্দীপনা আর প্রথাগত রসম-রেওয়াজের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের একটু থামতে হবে; ভালোবাসার সেই আসল শর্তের মুখোমুখি হতে হবে।
আজ নিজেদের মনের গভীরে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা বড্ড প্রয়োজন- যা আমাদের আলোচনার মূল বিষয়:এক এত বাহ্যিক আয়োজন, উদযাপনের বাহারি রকমের নতুন নতুন চিন্তার সংযোজনের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন, নবিজির জীবনের সাথে আমাদের সম্পর্ক কতটুকু?
উৎসবে মেতে ওঠার আগে, আসুন আজ আমরা কোনো অন্ধ আবেগে নয়, বরং অন্তরের গভীর সততা দিয়ে নিজেদের বিবেকের সামনে একটি হিসাব মেলাই। যে মহান দরদী রাসুল ঘিরে আমাদের এত আয়োজন, তাঁর জীবনের সাথে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সংযোগ-সম্পর্ক কতটুকু? আমাদের এই ভালোবাসার দাবি কি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ, নাকি আমাদের সকাল-সংক্রান্তির পথচলায়, আমাদের পরিবারে, লেনদেনে ও চালচলনে সত্যিই সেই করুণার নবীর কোনো প্রভাব আছে? চলুন আজ আমরা নিজেদের জীবনের আয়নায়, নবিজির সাথে আমাদের এই সম্পর্কের আসল রূপটি বোঝার চেষ্টা করি।
নবিজিকে ভালোবাসা আবশ্যক কেন
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা নিছক কোনো আবেগীয় অনুভূতি বা আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; বরং তা মুমিনের ঈমানের মূল চালিকাশক্তি, জীবনের সেরা অর্জন এবং পরকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্বল। এই ইশক ও মুহাব্বত ছাড়া না ঈমানের পূর্ণতা আসে, আর না এর আসল মিষ্টতা আস্বাদন করা যায়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পার্থিব সমস্ত কিছুর উপর এই ভালোবাসাকে স্থান দেওয়া এবং তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তোলাই একজন মুমিনের প্রধান ঈমানি দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর ভালোবাসা ও ক্ষমা পেতে হলে এর অনুসরণ ও ভালোবাসা আবশ্যক-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ
বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর- যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী, দয়ালু। সুরা আলে ইমরান ৩:৩১
ঈমানের পূর্ণতার জন্য নবীজিকে নিজের পিতা-মাতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসা আবশ্যক। হজরত আনাস রাদি. থেকে বর্ণিত, বলেছেন-
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَأَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হব।সহিহুল বুখারি ১৫
সবকিছুর উপর, এমনকি নিজের জানের উপরও প্রাধান্য দেওয়ার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় হজরত উমর রাদি. এর ঘটনায়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম রাদি. বলেন:
كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ آخِذٌ بِيَدِ عُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِلَّا مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، حَتَّى أَكُونَ أَأَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ، فَقَالَ لَهُ عُمَرُ: فَإِنَّهُ الآنَ، وَاللهِ، لَأَنْتَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الآنَ يَا عُمَرُ!
একদিন আমরা নবিজি ﷺ এর সাথে ছিলাম। নবিজি ﷺ উমর রাদি. এর হাত ধরে ছিলেন। উমর রাদি. বলে উঠলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে সবকিছু থেকে প্রিয়, তবে আমার জান ছাড়া।তখন নবিজি ﷺ বললেন, না উমর, এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জান তাঁর কসম! যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হই।পরক্ষণেই উমর রাদি. বললেন, 'হাঁ এখন তা হয়েছে; আল্লাহর কসম! (এখন থেকে) আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও প্রিয়।তখন নবিজি ﷺ বললেন, হাঁ উমর! এখন হয়েছে।সহিহুল বুখারি ৬৬৩২
হজরত আনাস রাদি. হতে বর্ণিত,
ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا
তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তন্মধ্যে প্রথম হলো, যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সবচেয়ে প্রিয় হবে। সহিহ মুসলিম ৬৭
ঈমানের স্বাদ আস্বাদনের নগদ ও সবচেয়ে বড় ফায়দা হলো ইবাদত ও আনুগত্যে আগ্রহ লাভ হওয়া। বরং ইবাদতই তখন প্রশান্তির কারণ হয়ে যায়। যেমন প্রবচনে রয়েছে-
إِذَا حَلَّتِ الْحَلاَوَةُ قَلْبًا نَشِطَتْ فِي الْعِبَادَةِ الأَعْضَاءُ
হৃদয়ে যখন ঈমানের মিষ্টতা সঞ্চারিত হয়, তখন ইবাদতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উদ্যমী হয়ে ওঠে।
প্রত্যেক মুমিনের কাঙ্ক্ষিত সে সাফল্য হলো আখিরাতে রাসুলুল্লাহ এর সঙ্গলাভ। স্বয়ং নবিজি ﷺ বলেছেন-
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
মানুষ যাকে ভালোবাসবে, তার সাথেই থাকবে।সহিহুল বুখারি ৬১৬৮; সহিহ মুসলিম ২৬৪০
হজরত আনাস রাদি. এ সম্পর্কে বড়ই শিক্ষণীয় ও চমৎকার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: وَمَا أَعْدَدْتَ لِلسَّاعَةِ؟ قَالَ: حُبَّ اللهِ وَرَسُولِهِ، قَالَ: فَإِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا، بَعْدَ الْإِسْلَامِ فَرَحًا أَشَدَّ مِنْ قَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَإِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. قَالَ أَنَسٌ: فَأَنَا أُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهُ، وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ، وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِأَعْمَالِهِمْ.
এক ব্যক্তি রাসুলে কারীম ﷺ কে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কিয়ামত কবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কিয়ামতের কী প্রস্তুতি নিয়েছ? সে জবাব দিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা।তখন নবিজি বললেন, নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালোবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে। হজরত আনাস রাদি. বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর আমাদের কাছে সবচেয়ে খুশির বিষয় ছিল নবী কারীম ﷺ এর এই কথা- নিশ্চয়ই যাকে তুমি ভালোবাস, (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে।
আনাস রাদি. বলেন, আর আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি। আবু বকর ও উমরকেও। তাই আশা রাখি, আখেরাতে আমি তাঁদের সাথেই থাকব, যদিও তাঁদের মতো আমল আমি করতে পারিনি।সহিহ মুসলিম ২৬৩৯
মানুষ মানুষকে ভালোবাসার চার কারণ
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা কেবল ইসলামের একটি নির্দেশ নয়; বরং তা মানব হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি এবং ঈমানের প্রাণ। বিশ্বখ্যাত আলেমে দীন হযরত মাওলানা সালমান মনসুরপুরী রহ. নবীপ্রেমের এই মহিমান্বিত পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন, নবিজির মুহাব্বত হৃদয়ের শক্তি, রুহের খোরাক, চোখের শীতলতা, দেহের সজীবতা, অন্তরের জীবন, জীবনের সাফল্য, সাফল্যের প্রাণ। মোটকথা মুহাব্বতই সবকিছু। ইশকে রাসুল, পৃষ্ঠা-৫
মনস্তাত্ত্বিক ও স্বাভাবিক বিচারে মানুষ কাউকে ভালোবাসার পেছনে মূলত চারটি মৌলিক কারণ বিদ্যমান থাকে-জামাল- সৌন্দর্য, কামাল- যোগ্যতা, নাওয়াল- দান ও অনুগ্রহ এবং কারাবাত- আত্মীয়তা বা ঘনিষ্ঠতা।
যদি এই চার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যের আধার, যোগ্যতার শীর্ষবিন্দু, মহত্তম দান এবং গভীরতম সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলেন আমাদের প্রিয় নবী ﷺ।
১. জামাল বা সৌন্দর্য। মানুষ চিরকাল সুন্দরের অনুরাগী। সৃষ্টির সৌন্দর্য মানুষকে আকুল করে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সৃষ্টির সেরা রূপ-লাবণ্যের নিখুঁত সমাহার। নবীভক্ত সাহাবি কবি হযরত হাসান বিন সাবিত রাদি. তাঁর অবিস্মরণীয় পংক্তিতে প্রিয় নবীর অপার্থিব সৌন্দর্যের চিত্র এঁকেছেন-
وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي + وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ
خُلِقْتَ مُبَرَّأً مِنْ كُلِّ عَيْبٍ + كَأَنَّكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ
আমার আঁখিযুগল আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে কখনো দর্শন করেনি। আপনার চেয়ে সুদর্শন কাউকে কোনো নারী জন্মও দেয়নি।
আপনাকে সকল প্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত করে সৃষ্টি করা হয়েছে; যেন আপনি আপন চাহিদা মোতাবেক সৃজিত হয়েছেন। রুহুল মাআনিখণ্ড-১১, পৃষ্ঠা-৬১
হযরত আলী রাদি. রাসুলুল্লাহ ﷺপ্রত্যক্ষ অবয়ব ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে চমৎকার কথা বলেছেন-
مَنْ رَآهُ بَدِيهَةً هَابَهُ، وَمَنْ خَالَطَهُ مَعْرِفَةً أَحَبَّهُ، يَقُولُ نَاعِتُهُ: لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ
কেউ হঠাৎ তাঁকে দেখলে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ত, আর ক্ষণিক পরিচয়ে তাঁর ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে যেত। তাঁর অবয়ব-আকৃতির বর্ণনাকারী এ কথা বলতে বাধ্য, আমি তাঁর মতো আর কাউকে দেখিনি; পূর্বেও না, পরেও না। সুনানুত তিরমিজি ৩৬৩৮
২. কামাল বা যোগ্যতা। মানুষ মহৎ গুণ ও যোগ্যতার প্রতি সহজাতভাবেই শ্রদ্ধাশীল ও দুর্বল থাকে। আমরা আমাদের সমাজ ও যুগে বড় বড় মুহাদ্দিস, মুফাসসির, পীর-মাশায়েখ কিংবা প্রজ্ঞাবান খতীবদের ভালোবাসি তাঁদের চারিত্রিক উৎকর্ষ ও পাণ্ডিত্যের কারণে। আর যোগ্যতা ও কামালিয়াতের নিখুঁত পূর্ণতার প্রশ্নে রাসুলুল্লাহ ﷺহলেন সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ ۚ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
আর আপনি যা জানতেন না, তিনি (আল্লাহ) তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার অসীম করুণা রয়েছে। সুরা নিসা ৪: ১১৩
৩. নাওয়াল বা দান ও অনুগ্রহ। যে ব্যক্তি কষ্ট লাঘব করে এবং অকৃপণভাবে দান করে, মানুষের অন্তর তার দিকে ধাবিত হয়। সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রিয় নবী ﷺ হলেন সবচেয়ে বড় মহসিন ও দয়াবান ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তায়ালা সুরা আত-তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে উম্মতের প্রতি নবীর এই অপরিসীম স্নেহের কথা তুলে ধরেছেন-
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকেই এমন একজন রাসূল আগমন করেছেন, যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয়াদি নিতান্ত কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্ক্ষী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুণাপরায়ণ। সুরা তাওবা ৯: ১২৮
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বিশ্ববাসীর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম বণ্টন ও দয়ার ভূমিকা প্রকাশ করে বলেছেন-
إِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ وَاللَّهُ يُعْطِي
আমি হলাম বণ্টনকারী, আর মূল দানকারী হলেন আল্লাহ তায়ালা। সহিহ বুখারি ৭১
৪. কারাবাত বা আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠতা। পিতা-মাতা, সন্তান ও স্বজনদের প্রতি ভালোবাসার মূল ভিত্তি হলো রক্তের বন্ধন ও আপনত্ব। কিন্তু একজন মুমিনের কাছে প্রিয় নবী ﷺরক্ত ও বংশের চেয়েও বেশি আপন এবং ঘনিষ্ঠ। তিনি আমাদের রুহানি পিতা ও অন্তরের আশ্রয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
নবী মুমিনদের কাছে তাদের আপন সত্তার চেয়েও বেশি প্রিয়, আর নবীর স্ত্রীগণ হচ্ছেন তাদের মা। সুরা আহযাব ৩৩:৬.
ভালোবাসার এই চার মহিমান্বিত কারণ-জামাল, কামাল, নাওয়াল ও কারাবাত-পৃথিবীতে বিচ্ছিন্নভাবে ভিন্ন মানুষের মাঝে পাওয়া গেলেও নবিজি ﷺ এর মাঝে এই গুণগুলোপূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁতভাবে একত্রিত হয়েছে। তাই তাঁকে ভালোবাসা কেবল ঈমানি দায়িত্বই নয়, বরং তা মানব হৃদয়ের এক স্বতঃস্ফূর্ত পরম সত্য।
নবিজির সুন্নাহ ও আমাদের জীবন
আজ আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো-আমরা মুখে অত্যন্ত আবেগে নবিজিকে ভালোবাসার দাবি করি, মিলাদ-মাহফিলে চোখের পানি ফেলি, কিন্তু মাহফিল শেষে বাস্তব জীবনে পা রাখলেই আমাদের ঘরদোর, ব্যবসা-বাণিজ্য আর সামাজিক আচরণে প্রিয় নবিজির সুন্নাহর দূরত্ব ফুটে ওঠে।
সামাজিক ও আর্থিক লেনদেনে আমাদের অধঃপতনের চিত্রটি চরম করুণ। ‘আল-আমীন’ নবিজির উম্মত হয়েও আজ আমরা বাজারে ভেজাল মেশানো, মাছে-ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক দেওয়া, ওজনে কম দেওয়া, মিথ্যা কসম খাওয়া এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষকে জিম্মি করাকে অভ্যাসে পরিণত করেছি। সুদের সয়লাব, ঘুষের আধিপত্য এবং প্রতারণার মাধ্যমে অপরের রক্তঘাম করা উপার্জনকে কেড়ে নেওয়ার মানসিকতা সমাজকে গ্রাস করেছে। ওজনে কম দেওয়া, ফাঁকি দেওয়া আর খাবারে বিষ মেশানো উম্মত কীভাবে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে নবিজির হাত থেকে পানি পানের আশা করে?
সাধারণ মানবিক আচরণ ও সুচরিত্রের দেউলিয়াত্ব আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো, অনাথ-ইয়াতিমের মাথায় হাত রাখা কিংবা কথা দিয়ে কথা রাখার মতো চরিত্র আজ দূরবীনের কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়। ফ্ল্যাট কালচারে পাশের বাসার অভুক্ত মানুষের খবর আমরা রাখি না; তুচ্ছ কারণে আদালতে মামলা-মোকদ্দমায় জড়াই, হিংসা-বিদ্বেষে নিজের ভাইয়ের রক্তচক্ষু দেখি, আর ওয়াদা খেলাফ করাকে যেন নিজেদের অধিকার মনে করি। অহংকার, আত্মম্ভরিতা আর ক্ষমতার অপব্যবহার আজ সমাজের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই সার্বিক অবক্ষয়ের এক ব্যথাতুর প্রকাশ চোখে পড়ে আমাদের পরিবার ও নারীসমাজের বেহাল দশায়। বিশ্বনবি ﷺ বিদায় হজ্জের ভাষণে নারীদের আল্লাহর আমানত আখ্যা দিয়ে তাদের ইজ্জত ও অধিকার রক্ষার তাকিদ দিয়েছিলেন। অথচ আজ একদিকে স্বাধীনতার মুখরোচক স্লোগানে নারীকে সস্তা বাণিজ্যের বোগাস প্রদর্শনীতে রূপান্তর করে তাদের ঈমান-সম্ভ্রম লুণ্ঠন করা হচ্ছে; নারীরা বেহায়াপনায় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।অন্যদিকে দ্বীনি শিক্ষার অভাবে বহু নারী আজ গীবত, পরশ্রীকাতরতা, স্বামীর প্রতি অকৃজ্ঞতা এবং সিরিয়াল ও টিকটকের মতো অনর্থক আসক্তিতে বুঁদ হয়ে আছেন। সন্তানকে জিপিএ-৫ কিংবা বিজাতীয় সংস্কৃতির মোহে গড়ে তোলার ফিকির থাকলেও রাসুল ﷺ এর পবিত্র চরিত্র শেখানোর কোনো তোয়াক্কা নেই। তদুপরি, কন্যাসন্তান ও বোনদের প্রাপ্য মিরাস বা সম্পদের অংশ থেকে বঞ্চিত করার মতো হীন মানসিকতা ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিবাহশাদী ও দাম্পত্য জীবনের হাল আজ আরও ভয়াবহ। যেখানে নবিজি ﷺ বলেছেন, সবচেয়ে কম খরচের ও সহজ বিবাহই সবচেয়ে বরকতময়; সেখানে আজ বিয়েকে বানানো হয়েছে এক কঠিন ও পাপাচারের প্রদর্শনী। যৌতুকের পরোক্ষ দাবি, অহংকারের কোটি টাকার অপচয়, ডিজে গান, বেপর্দা মেলামেশা আর ছবি তোলার অসংযমী প্রতিযোগিতায় বিয়েকে হারাম অনুষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। ফলে সহনশীলতার অভাবে ক্ষণে ক্ষণে ঘর ভাঙছে, পরকীয়া ও মানসিক বিষাদ সমাজকে গ্রাস করছে। ঘরের ভেতরে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার ও সহযোগিতার যে সুন্নাত, তা হারিয়ে গিয়ে আমরা ঘরের ভেতর এক একজন উগ্র ও অত্যাচারী অভিভাবকে পরিণত হয়েছি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ কি এমন এক উম্মত রেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন? আমরা যদি আজই আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, ঘরদোর, ব্যবসা-বাণিজ্য আর সামাজিক আচরণকে নবিজির ছাঁচে না ঢালি, তবে কীভাবে কাল কিয়ামতের ময়দানে তাঁর শাফাআতের আশা করব? আসুন, মুখের দাবি ছেড়ে প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রিয় নবীর সুন্নাতকে জিন্দা করি। কারণ, সুন্নাহর বাস্তব অনুকরণ ছাড়া সমাজে কখনো শান্তি আসবে না, আর আখিরাতেও মুক্তির কোনো পথ খোলা থাকবে না।
সামাজিক ও আর্থিক লেনদেনে আমাদের অবস্থান তো আরও করুণ। নবিজি পণ্যের সামান্য দোষ থাকলেও ক্রেতাকে আগে দেখিয়ে দিতেন এবং তিনি স্পষ্ট বলেছেন, যে ধোঁকা দেয় সে তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু আজকের বাজারে ভেজাল মেশানো, মাছে-ফলে বিষাক্ত কেমিক্যাল দেওয়া, ওজনে কম দেওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রি করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ওজনে কম দেওয়া আর খাবারে বিষ মেশানো উম্মত কীভাবে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে নবিজির হাত থেকে পানি পানের আশা করে?
তদুপরি, সাধারণ সামাজিক আচরণ ও আখলাকে নবিজির সুন্নাত আজ দূরবীনের কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, সময়মতো কথা রাখা বা ওয়াদা পূরণ করা ছিল নবিজির দৈনন্দিন চরিত্র। ট্রাফিক জ্যামে বা সামান্য দ্বন্দ্বে গালাগালি ও মারামারিতে লিপ্ত হতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না।
হারাম যখন সমাজের চালিকাশক্তি
আজ আমাদের সমাজের করুণ চিত্রটি এখানেই থেমে নেই; বরং তা আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো-গুনাহ ও পাপাচারের এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা আজ সমাজে এত গভীরভাবে বাসা বেঁধেছে এবং সাধারণ বিষয় হিসেবে রূপ নিয়েছে যে, এখন যদি কেউ সেগুলোকে পাপ বা হারাম বলে চিহ্নিত করে, তবে মানুষ তাকে উল্টো বোকা, যুগ পিছিয়ে পড়া কিংবা গোঁড়া মনে করে। হারামকে হারাম মনে করার এই ন্যূনতম অনুভূতিটুকু বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি ঈমানি জাতি হিসেবে আমাদের ধ্বংসের চরম ও অশনি সংকেত।
আজ যদি কোনো ব্যক্তি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সুদী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে গড়ে ওঠা পতিতাবৃত্তি, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল নাচ-গান আর সিনেমা-বিনোদন-এগুলো নিছক কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং এগুলো স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ ﷺ বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ও বিদ্রোহের শামিল-তবে সমাজ আজ থমকে দাঁড়ায় না! মানুষ অবাক হয়ে বলবে, এগুলো আবার কেমন কথা? এ যুগে সুদী ব্যাংক ছাড়া আবার অর্থনীতি চলে নাকি? নাচ-গান আর সিনেমা ছাড়া আধুনিক জীবন সম্ভব নাকি? সুদের মতো মহা-পাপকে আজ স্মার্ট ব্যাংকিংআর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখরোচক নামে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছে, যা পবিত্র কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী সরাসরি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করার নামান্তর।
একইভাবে সামাজিক উদযাপনগুলোতেও পাপাচার এখন এমনই স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যদি কোনো বিয়ের আসরে গিয়ে বিনয়ের সাথে বলেন, ভাই, বিয়েতে গান-বাজনা বা ডিজে সাউন্ড বক্স বাজানো হারাম, নারী-পুরুষের বেপর্দা নাচ-গান বন্ধ করুন, তবে আসরে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুরা হেসেই উড়িয়ে দেবে, মসজিদে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তে আসা লোকটিও অনেক সময় তারা বিষ্ময় প্রকাশ করে বলবে, গান ছাড়া আবার বিয়ে হয় নাকি? জীবনের এই একটা দিনে একটু আনন্দ না করলে কেমন দেখায়! সুন্নাহসম্মত উপায়ে বরকতপূর্ণ আকদ সম্পন্ন করার চেয়ে শয়তানী বিনোদন আর নগ্নতার মহোৎসব আজ বিয়ের অনিবার্য শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাপাচার যখন সমাজে এমনভাবে সার্বজনীন হয়ে যায় যে, হারামকে আর হারাম মনে হয় না, তখন তা কেবল ব্যক্তিজীবনকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো জাতির ওপর আল্লাহর গজব ও অভিশাপ ডেকে আনে। কারণ গুনাহ করে অনুতপ্ত হওয়া এক জিনিস, আর গুনাহকে আধুনিকতা বা সমাজের স্বাভাবিক নিয়মবানিয়ে হারামকে হালাল মনে করা ঈমান বিধ্বংসী আরেক জিনিস।
রাসুলুল্লাহ ﷺ কি এমন এক উম্মত রেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন? আমরা যদি আজই আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, ঘরদোর, ব্যবসা-বাণিজ্য আর সামাজিক আচরণকে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ছাঁচে না ঢালি, তবে কীভাবে কাল কিয়ামতের ময়দানে তাঁর শাফায়াতের আশা করব? কোথায় মুহাম্মাদ ﷺ কোথায় আমাদের জীবন!
যে গল্প অশ্রুর হরফে লিখা
১. মুগিরা ইবনে শুবা রাদি. নবিজির কবরে দ্বিতীয়বার নামা। নবি কারীম ﷺ কে যখন দাফন করা হচ্ছিল এবং কবরের ওপর মাটি সমান করা হচ্ছিল, তখন সাহাবি হযরত মুগিরা ইবনে শুবা রাদি. প্রিয় নবিজিকে শেষবারের মতো স্পর্শ করার এবং তাঁর সান্নিধ্যধন্য শেষ মানুষ হওয়ার এক অপূর্ব অজুহাত উদ্ভাবন করেন। তিনি ইচ্ছা করে তাঁর আংটিটি কবরের ভেতর ফেলে দেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমার আংটিটি কবরে পড়ে গেছে!
হযরত আলী রাদি. তাঁকে কবরে নামার অনুমতি দেন। তিনি কবরে নেমে আংটিটি উঠান এবং প্রিয় নবিজির দেহ মোবারক স্পর্শ করেন ও চুমু খেয়ে শেষ বিদায় নেন। পরবর্তীতে তিনি গর্ব করে বলতেন, তোমাদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ ﷺ সবচেয়ে নিকটতম ও শেষ স্পর্শ লাভকারী ব্যক্তি হলাম আমি। সিয়ারু আলামিন নুবালা ২:৪৮২, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ লি ইবনু হিশাম২: ৬৬৫
২. হযরত আয়েশা রাদি. এর জন্য দোয়া ও প্রতি সালাতে উম্মতের চিন্তা। একদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত আনন্দিত ও উৎফুল্ল দেখে হযরত আয়েশা রাদি. বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
তখন নবিজি দুহাত তুলে এভাবে দোয়া করলেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِعَائِشَةَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهَا وَمَا تَأَخَّرَ، وَمَا أَسَرَّتْ وَمَا أَعْلَنَتْ
হে আল্লাহ! আপনি আয়েশার পূর্বের ও পরের, গোপন ও প্রকাশ্য- সকল গুনাহ মাফ করে দিন।
এই মহামূল্যবান দোয়া শুনে হযরত আয়েশা রাদি. আনন্দে এতটাই হেসে উঠলেন যে তাঁর মাথা মোবারক কোলে হেলে পড়ল। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, আমার এই দোয়া কি তোমাকে আনন্দিত করেছে? তিনি বললেন, আপনার এই দোয়া কাকে না আনন্দিত করবে!
তখন নবিজি বললেন,
وَاللهِ إِنَّهَا لَدَعْوَتِي لِأُمَّتِي فِي كُلِّ صَلَاةٍ
আল্লাহর কসম! এটিই তো আমার উম্মতের জন্য আমার প্রতিনিয়ত প্রতিটি সালাতের দোয়া!সহিহ ইবনে হিব্বান৭১১১, আস সিলসিলাতুস সহিহা ২২৫৪
৩. না-দেখা উম্মতকে “আমার ভাই” বলে রোদন ও দেখার ব্যাকুলতা। একদিন চলার পথে হঠাৎ প্রিয় নবিজির দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। সাহাবায়ে কেরাম চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ!আপনার কান্নার কারণ কী? তিনি বললেন, আমি আমার ভাইদের দেখার জন্য আকুল হয়ে কাঁদছি।
সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসুলুল্লাহ ﷺ জবাব দিলেন,
أَنْتُمْ أَصْحَابِي، وَإِخْوَانِي الَّذِينَ يَأْتُونَ مِنْ بَعْدِي، يُؤْمِنُونَ بِي وَلَمْ يَرَوْنِي
তোমরা তো আমার সুহৃদ সাহাবি (সাথী)। আমার ভাই তো তারা, যারা আমার পর আসবে এবং আমাকে না দেখেও আমার ওপর ঈমান আনবে। আত তামহিদ ২০:২৪৫
৪. খেজুর গাছের গুঁড়ির শিশুর মতো কান্না (হান্নানা)। মিম্বার তৈরি হওয়ার আগে নবিজি খেজুর গাছের একটি শুকনো গুঁড়িতে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। পরবর্তীতে একজন আনসারি নারী একটি কাঠের মিম্বার তৈরি করে দিলে, জুমার দিনে নবিজি মিম্বারে খুতবা দেওয়া শুরু করলেঅমনি পুরো মসজিদ কেঁপে উঠল! সেই শুকনো কাঠের গুঁড়িটি বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় অবুঝ শিশুর ন্যায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। সাহাবাগণ বলেন, কান্নায় গুঁড়িটি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নবিজি ﷺ মিম্বার থেকে নেমে এসে সেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিলেন, তখন গিয়ে সেটি শান্ত হয়।সহিহুল বুখারি ৩৫৮৪
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى شَجَرَةٍ أَوْ نَخْلَةٍ، فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ الأَنْصَارِ أَوْ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَلاَ نَجْعَلُ لَكَ مِنْبَرًا؟ قَالَ: إِنْ شِئْتُمْ، فَجَعَلُوا لَهُ مِنْبَرًا، فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ دُفِعَ إِلَى المِنْبَرِ، فَصَاحَتِ النَّخْلَةُ صِيَاحَ الصَّبِيِّ، ثُمَّ نَزَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضَمَّهَا إِلَيْهِ، تَئِنُّ أَنِينَ الصَّبِيِّ الَّذِي يُسَكَّتُ، قَالَ: بَكَتْ عَلَى مَا كَانَتْ تَسْمَعُ مِنَ الذِّكْرِ
৫. হযরত বিলাল (রাঃ)-এর আযান ও মদীনা জুড়ে কান্নার রোল। রাসুলুল্লাহ ﷺ ওফাতের পর হযরত বিলাল রাদি. বিচ্ছেদের ব্যথায় এতই কাতর হয়ে পড়েন যে, তিনি আর আজান দিতে পারছিলেন না। তিনি মদিনা ছেড়ে সিরিয়ার সীমান্তে চলে যান।
দীর্ঘ ৬ বছর পর একদিন তিনি স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ ﷺ দেখলেন। নবিজি বলছেন, হে বিলাল! এ কেমন বিচ্ছেদ? আমার রওজায়ে আতহারে আসার সময় কি এখনো তোমার হয়নি?
বিলাল রাদি. ব্যাকুল হয়ে মদীনায় ছুটে এলেন। হাসান ও হুসাইন রাদি. এবং হযরত উমর রাদি. তাঁকে আজান দেওয়ার জন্য আকুল অনুরোধ করলেন। বিলাল রাদি. মসজিদের ছাদে উঠে আজান শুরু করলেন।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ বলতেই মদীনায় প্রিয় নবির সময়ের স্মৃতি জেগে উঠল। যখন তিনি বললেন:
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ
তখন পর্দানশীন নারীরাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আর যখন তিনি এই বাক্যে পৌঁছালেন,
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
তখন বিলাল রাদি. নিজেই হু-হু করে কেঁদে মাটিতে পড়ে গেলেন এবং আযান পূর্ণ করতে পারলেন না। পুরো মদিনা শহর সেদিন কান্নার রোলে কেঁপে উঠেছিল, এমন দৃশ্য নবিজির ওফাতের দিনের পর আর কখনো দেখা যায়নি।তারিখে দিমাশক ৭:১৩৭, উসদুল গাবাহ লি ইবনিল আসির ১:২০৭
৬. তায়েফের রক্তক্ষরণ ও অসীম ক্ষমা। তায়েফের অধিবাসীদের কাছে দাওয়াত নিয়ে গেলে তারা নবিজিকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে দেয়। তাঁর জুতো মোজা রক্তে জমাট বেঁধে যায়। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা এসে অনুমতি চাইলেন যে, ‘আপনি নির্দেশ দিলে দুটি পাহাড় একসাথে চেপে ধরে ওদের পিষে ধ্বংস করে দিই!’
কিন্তু দয়ার নবিজি বদদোয়া না দিয়ে বললেন,
بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللهُ مِنْ أَصْلَابِهِمْ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ وَحْدَهُ لَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
না; বরং আমি আশা রাখি আল্লাহ তায়ালা এদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। সহিহুল বুখারি ৩২৩১
৭. উহুদের কুরবানি। উহুদের যুদ্ধে কাফেরদের আক্রমণে প্রিয় নবিজির দাঁত শহীদ হয়, হেলমেটের কড়া কপালে ঢুকে চেহারা মোবারক রক্তাক্ত হয়। রক্ত মোছাতে মোছাতেও তিনি উম্মতের হেদায়েতের জন্য দোয়া করছিলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لاَ يَعْلَمُونَ
হে আল্লাহ! আমার কওমকে ক্ষমা করে দিন, কেননা তারা জানে না। সহিহুল বুখারি ৩৪৭৭; সহিহ মুসলিম ১৭৯২
৮. সেজদায় পা ফুলিয়ে কান্না ও উম্মাতি, উম্মাতি রোদন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পূর্বের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি রজনীর শেষ প্রহরে সেজদায় পড়ে অনবরত কাঁদতে থাকতেন।
اللَّهُمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي
হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত!
আল্লাহ তায়ালা জিবরিল আ. কে পাঠিয়ে অভয় দিয়ে বললেন,
يَا جِبْرِيلُ، اذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ، فَقُلْ: إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمَّتِكَ، وَلَا نَسُوءُكَ
হে জিবরীল! মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে বলো, আমি অচিরেই তোমার উম্মতের ব্যাপারে তোমাকে সন্তুষ্ট করব, ব্যথিত করব না। সহিহ মুসলিম ২০২
৯. মৃত্যুর কঠিন প্রহরে শেষ নিঃশ্বাস ও অসিয়ত। মৃত্যুর যন্ত্রণাময় শেষ প্রহরেও তাঁর মুখে নিজের কষ্ট ছিল না, বরং উম্মতের দুর্বলদের চিন্তা ও সালাতের অসিয়ত ছিল। ওফাতের পূর্বে তাঁর শেষ বাণী ছিল-
الصَّلاَةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
সালাতের খেয়াল রেখো এবং তোমাদের অধীনস্থদের (অধিকারের) ব্যাপারে যত্নবান হয়ো।সুনান ইবনু মাজাহ ২৬৯৭; মুসনাদে আহমাদ ৫৮৫
১০. আগুন থেকে বাঁচাতে কোমর ধরে টানার দৃষ্টান্ত। নবিজি কত দরদের সাথে বলছেন,
مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا، فَجَعَلَ الْجَنَادِبُ وَالْفَرَاشُ يَقَعْنَ فِيهَا، وَهُوَ يَذُبُّهُنَّ عَنْهَا، وَأَنَا آخِذٌ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ، وَأَنْتُمْ تَفَلَّتُونَ مِنْ يَدِي
আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির দৃষ্টান্তের মত, যে আগুন জ্বালালো, ফলে ফড়িং ও পতঙ্গরা তাতে পড়তে লাগল আর সে তাদের তা থেকে তাড়াতে লাগল। অনুরূপ আমিও আগুন থেকে রক্ষার জন্য তোমাদের কোমর ধরে টানছি, আর তোমরা আমার হাত থেকে ছুটে ছুটে আগুনে পড়তে চাচ্ছ। সহিহ মুসলিম ২২৮৫
১১. উম্মতের চিন্তায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন,
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا
মনে হয় যেন আপনি ওদের পিছনে পরিতাপ করতে করতে স্বীয় প্রাণ নাশ করে ফেলবেন, যদি ওরা এই বাণীর প্রতি ঈমান না আনে। সুরা কাহফ ১৮:৬
১২. বিশেষ দোয়াকে কিয়ামতের শাফাআতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ يَدْعُو بِهَا فَيُسْتَجَابُ لَهُ، فَيُؤْتَاهَا، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
প্রত্যেক নবীকে এমন একটি বিশেষ দোয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে যা কবুল করা হবে। তারা দুনিয়াতে সে দোয়া করেছেন এবং তা কবুলও করা হয়েছে। আর আমি আমার বিশেষ দোয়াটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের উদ্দেশ্যে সঞ্চিত রেখে দিয়েছি। সহিহ মুসলিম ১৯৯
ইমাম নববি রাহি. এর ব্যখ্যা
فِي هَذَا الْحَدِيثِ بَيَانُ كَمَالِ شَفَقَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أُمَّتِهِ، وَرَأْفَتِهِ بِهِمْ، وَاعْتِنَائِهِ بِالنَّظَرِ فِي مَصَالِحِهِمُ الْمُهِمَّةِ، فَأَخَّرَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْوَتَهُ لِأُمَّتِهِ إِلَى أَهَمِّ أَوْقَاتِ حَاجَاتِهِمْ
এই হাদীসে উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ মায়া-মমতা ও দরদের কথা ফুটে উঠেছে। তাইতো তিনি তাঁর উম্মতের পরম প্রয়োজনের চরম মুহূর্তের (কিয়ামতের) জন্য সেই বিশেষ দোয়াটি তুলে রেখেছেন। শরহু সহিহি মুসলিম লিন নববি ৩:৭৫
১৩. মাটির দেয়ালে আঁকা এক মহিমান্বিত জীবনের স্মৃতি।আজ আমরা যে মসজিদে নববির বিশাল সৌন্দর্য দেখি, একসময় সেই স্থানটি ছিল অত্যন্ত সরল। রাসুলুল্লাহ ﷺএর মসজিদের পাশে ছিল তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের ছোট ছোট হুজরা। সেগুলো কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না। ছিল না মার্বেল, সোনা কিংবা মূল্যবান পাথরের চাকচিক্য। কোনো কোনো ঘর ছিল কাঁচা ইটের, কোনোটি খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি, বাইরে ঝুলত চুলের তৈরি কালো পর্দা।
ইবনু নাজ্জার ও পরবর্তী মদিনার ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের জন্য নয়টি হুজরা নির্মাণ করেছিলেন। এগুলো মসজিদের আশপাশে ছিল এবং তাদের দরজাগুলো মসজিদের দিকে খোলা ছিল।
ভাবুন তো!যে ঘরের দেয়াল ছিল মাটির, যে ঘরের ছাদ ছিল খেজুরের ডাল, সেই ঘরের ভেতরেই বসবাস করতেন আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ﷺএর পরিবার। যিনি দারিদ্রতাকে স্বেচ্ছায় বরণ করেছিলেন। সেই ঘরেই অবতীর্ণ হয়েছে অহির স্মৃতি। সেই ঘরেই উচ্চারিত হয়েছে কুরআনের আয়াত। সেই ঘরেই রাতের নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়েছেন আল্লাহর রাসুল ﷺ। সেই ঘরেই কেটেছে উম্মাহাতুল মুমিনীনদের জীবনের অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদি. হুজরাই পরবর্তীকালে সেই পবিত্র স্থান হয়ে ওঠে, যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর দুই প্রিয় সাহাবি আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা শায়িত আছেন। মদিনার ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে সেই হুজরার অবস্থান ও দরজার বিভিন্ন বিবরণও সংরক্ষিত হয়েছে।
কিন্তু সময়ের স্রোত থেমে থাকে না।উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সময়ে মসজিদে নববির সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তখন উম্মাহাতুল মুমিনীনদের সেই পবিত্র হুজরাগুলোও মসজিদের সম্প্রসারিত অংশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আর তখনই ঘটল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
তাবেয়ি আতাউল খুরাসানি রহ. বলেন, তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনদের ঘরগুলো দেখেছিলেন খেজুরের ডাল দিয়ে তৈরি। এরপর তিনি ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সেই নির্দেশনামা পাঠ করতে শুনলেন, যাতে রাসুলুল্লাহ ﷺএর স্ত্রীদের হুজরাগুলো মসজিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ ছিল।
তারপর তিনি বললেন:
فَمَا رَأَيْتُ يَوْمًا كَانَ أَكْثَرَ بَاكِيًا مِنْ ذَلِكَ الْيَوْمِ
আমি এমন কোনো দিন দেখিনি, যেদিন সেই দিনের চেয়ে বেশি মানুষ কেঁদেছে।
এই বর্ণনাটি ইবনু সাদেরআত-তাবাকাতুল কুবরা-তেও এসেছে।
মদিনাবাসীর কান্না শুধু কয়েকটি পুরোনো ঘর ভেঙে ফেলার জন্য ছিল না।তারা কাঁদছিল স্মৃতির জন্য।
তারা কাঁদছিল সেই সরল জীবনের সাক্ষ্যগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণে।তারা কাঁদছিল এমন কিছু দেয়াল হারানোর জন্য, যেগুলো হয়তো দেখতে সাধারণ ছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের ﷺ জীবন।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রহ. সেদিন বলেছিলেন,
وَاللَّهِ لَوَدِدْتُ أَنَّهُمْ يَتْرُكُونَهَا عَلَى حَالِهَا
আল্লাহর কসম! আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল, তারা যেন এগুলোকে তাদের অবস্থাতেই রেখে দিত।
এরপর তিনি এমন এক গভীর কথা বলেছিলেন, যা আজও আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তিনি চেয়েছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ মদিনায় এসে যেন দেখতে পায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ দুনিয়ায় কী সামান্যতেই জীবন কাটিয়ে গেছেন। সেই দৃশ্য যেন মানুষকে দুনিয়ার চাকচিক্য, প্রতিযোগিতা ও অহংকার থেকে বিমুখ করে।
কী অসাধারণ শিক্ষা!
আজ আমরা বড় বাড়িকে সফলতার প্রতীক মনে করি। উঁচু ভবন, দামি আসবাব, সাজসজ্জা ও বাহ্যিক জাঁকজমককে জীবনের সৌন্দর্য মনে করি। অথচ যার জন্য আল্লাহ তায়ালা সমগ্র জগত সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ﷺ ঘরগুলো ছিল এতই সাধারণ!সেই ঘরগুলো যেন নীরবে বলত, সম্মান বড় ঘরে নয়, বড় হৃদয়ে।মর্যাদা সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, আল্লাহর নৈকট্যে। সাফল্য দুনিয়ার জাঁকজমকে নয়, রবের সন্তুষ্টিতে।রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরগুলো হয়তো ছিল ছোট, কিন্তু সেখান থেকেই ছড়িয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলো।
সেখানে ছিল নবুয়তের আলো।সেখানে ছিল ওহির আলো।সেখানে ছিল ইবাদতের আলো।সেখানে ছিল ভালোবাসার আলো।সেখানে ছিল এমন এক জীবনদর্শন, যা মানুষকে শিখিয়েছিল: দুনিয়া হাতে থাকবে, কিন্তু হৃদয়ে নয়।তাই মদিনাবাসীর সেই কান্না আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা।তারা শুধু একটি স্থাপনা হারানোর জন্য কাঁদেনি। তারা কেঁদেছিল এমন এক যুগের স্মৃতির জন্য, যে যুগে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ﷺ নিজের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করেননি; বরং একটি সাধারণ ঘরেই সন্তুষ্ট থেকেছেন।
আর আজ, যখন আমরা রওজা মুবারকের কথা স্মরণ করি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত, এটি শুধু একটি স্থাপত্যের অংশ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উম্মাহর সবচেয়ে প্রিয় নবী ﷺএর পারিবারিক জীবনের স্মৃতি, তাঁর ইবাদতের স্মৃতি, তাঁর অশ্রুর স্মৃতি এবং তাঁর সরল জীবনের স্মৃতি।
প্রিয় হাজিরীন ও শ্রদ্ধেয় দ্বীনি ভাইয়েরা আমার,
আমরা এতক্ষণ পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় নবিজি ﷺ এর অপূর্ব সৌন্দর্য, তাঁর সুমহান চরিত্র, অফুরন্ত দয়া এবং আমাদের প্রতি তাঁর সীমাহীন অনুভূতির কথা শুনলাম।কিন্তু আজ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাদের একটি প্রশ্ন নিজেদের বুকের ভেতর ছুঁড়ে দিতে হবে-শুধু নবিজির প্রশংসায় আবেগাপ্লুত হওয়া আর দু-ফোটা চোখের জল ফেলাই কি আমাদের শেষ দায়িত্ব?
যে রাসুল উম্মতের হেদায়েতের জন্য তায়েফের পাথুরে রাস্তায় রক্তাক্ত হয়েছেন, যাঁর মোবারক জুতায় রক্ত জমে গিয়েছিল; উহুদের ময়দানে যাঁর দাঁত মোবারক শহিদ হয়েছিল; পেটে পাথর বেঁধে যিনি দিন-রাত দ্বীন প্রচার করেছেন; আর রাতের পর রাত সেজদায় পড়ে ‘উম্মতি, উম্মতি’ বলে কেঁদেছেন-সেই নবিজিকে সত্যিকার অর্থে জানার জন্য এবং তাঁর ভালোবাসার দাবি পূরণ করার জন্যএখনইআমাদের জাগ্রত হতে হবে।
আমরা কি কেবল রবিউল আউয়াল মাসে নবিজির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হব, আর মাহফিল বা আলোচনা শেষ হলেই নবিজির সুন্নাহগুলোকে পেছনে ফেলে আগের মতো গাফিলতির জীবনে ফিরে যাব? না, আল্লাহর কসম! এটি ভালোবাসার পূর্ণ দাবি হতে পারে না।ভালোবাসার আসল প্রমাণ শুধু মুখে প্রকাশ পায় না; ভালোবাসা রূপ নেয় অনুসরণে, অনুকরণে এবং আত্মত্যাগে।
কাল কেয়ামতের ময়দানে যখন প্রদীপ্ত সূর্যের তাপে মানুষ হাহাকার করবে, সবাই ‘ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি’করবে, তখন কেবল একজন মহান সত্তাই বলবেন- ইয়া রব্বি উম্মতি, ইয়া রব্বি উম্মতি। সেই হাশরের ময়দানে নবিজি যদি আমাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন- হে আমার উম্মত! আমি তো তোমার জন্য সব সহ্য করেছিলাম, তুমি আমার জন্য, আমার সুন্নাহর জন্য জীবনে কী ত্যাগ স্বীকার করেছিলে?
তখন আমরা কী জবাব দেব?
তাই আসুন, শুধু মুখে নয়, বাস্তবে নিজের মধ্যে এবং নিজের পরিবারের মধ্যে সিরাত তথা নবিজির আদর্শ ছড়িয়ে দিই। সিরাতের আলোয় সমাজ আলোকিত করি। এমন যেন না দুনিয়ার অনেক কিছু আমি করলাম, কিন্তু নবিজিক জানার জন্য একটি বই পড়তে পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। নবির জন্মের মাসে আমরা কিছু আয়োজন বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব।
রবিউল আউয়াল উপলক্ষে মাসব্যাপী উদ্যোগ
১. সীরাত প্রতিযোগিতা।
রচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা:শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য সীরাতের বিভিন্ন বিষয়ের উপর রচনা প্রতিযোগিতা ও কুইজের আয়োজন করা।
বক্তৃতা ও ক্যালিগ্রাফি:শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সীরাত নির্ভর বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি ও ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।
সিরাত পাঠচক্র ও সেমিনার:মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাব বা অধ্যয়ন চক্রে সিরাতের প্রামাণিক গ্রন্থসমূহথেকে নিয়মিত পাঠ ও আলোচনার আয়োজন।
পেশাজীবী ও সর্বসাধারণের জন্য বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ( যেমন: ব্যবসায় নবিজির আদর্শ, পারিবারিক জীবনে সুন্নাহর প্রয়োগ) করা।
দেয়াল পত্রিকা, বিশেষ স্মারক বা সীরাত সাময়িকী প্রকাশ করা।
৩. ইবাদত ও সুন্নাহ চর্চার প্রসার
সুন্নাহ বাস্তবায়ন সপ্তাহ/মাস উদযাপন:
প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট কিছু সুন্নাহ ( যেমন: মিসওয়াক করা, সালামের প্রসার, পরিচ্ছন্নতা, ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান করা) চর্চার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা।
দরুদ চর্চা ও সীরাত মাহফিল:
রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশি বেশি দরূদ পাঠের মাহফিল এবং কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সহিহ তথ্যনির্ভরসিরাতুন্নবী ﷺ মাহফিলআয়োজন করা।
৪. সামাজিক ও মানবিক সেবা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানবতার প্রতীক। তাই তাঁর স্মরণে মানবিক কাজ করা অত্যন্ত বরকতময় উদ্যোগ:
খাদ্য ও পোশাক বিতরণ:এতিম, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাবার ও প্রয়োজনীয় বস্ত্র বিতরণ করা।
বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প:দরিদ্রদের জন্য ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, রক্তদান কর্মসূচি বা ঔষধ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া।
পরিচ্ছন্নতা অভিযান:পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ- এই সুন্নাহকে সামনে রেখে নিজ নিজ এলাকা, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
শেষ কথা
প্রিয় ভাইয়েরা আমার…
মাইকের আওয়াজ একসময় বন্ধ হয়ে যাবে, প্যান্ডেলের বাতিগুলো নিভে যাবে, আমরাও যে যার ঘরে ফিরে যাব। কিন্তু একটাবার নিরিবিলিতে চোখের পানি ফেলে বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করুন তো-যদি আজ রাতেই আমাদের জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটি ঝরে পড়ে? আর কাল হাশরের ময়দানে যদি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাই সেই দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের?
যিনি তায়েফে রক্তের সাগরে ভেসেও আমাদের অভিশাপ দেননি, উহুদের ময়দানে দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ার পরেও রক্ত মুছে মুছে রব্বুল আলামিনের দরবারে আমাদের হেদায়েতের জন্য আকুতি জানিয়েছেন... সেই নবিজি যদি কাল আমায় চিনেও না চেনার ভান করেন? যদি বলেন-তুমি তো আমার সুন্নাহগুলোকে অবহেলা করেছিলে, আমার জীবনের আদর্শকে পেছনে ফেলে দুনিয়ার পেছনে ছুটেছিলে!- তখন আমরা কোন মুখে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াব, ভাইয়েরা আমার?
আমরা তো নবিজিকে দেখিনি! মক্কার অলিগলিতে তাঁর সাথে হাঁটার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি, মদিনার মসজিদে নববীতে তাঁর পেছনে সেজদা দেওয়ার নসিব আমাদের হয়নি। কিন্তু না দেখেও আমরা তাঁকে ভালোবেসেছি।
আর কেয়ামতের সেই কঠিন ও বিভীষিকাময় দিনে, যখন কেউ কারো থাকবে না-তখন প্রিয় নবিজির মোবারক হাত থেকে হাউজে কাউসারের এক পেয়ালা ঠান্ডা পানি আমাদের নসিব করো, রব্বুল আলামীন! জান্নাতুল ফেরদাউসে আমাদের প্রিয় নবীর প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের কবুল করে নাও।
الخُطْبَةُ الأُولَى
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ، وَجَعَلَهُ لِلْعَالَمِينَ رَحْمَةً، وَبِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفًا رَحِيمًا. أَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ عَلَى نِعْمَةِ الإِسْلَامِ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، القَائِلُ فِي كِتَابِهِ المَجِيدِ:
﴿لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَحِيمٌ﴾ [التوبة: ].
وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَنَبِيَّنَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، حَبِيبُ الرَّحْمَنِ، وَشَفِيعُ الأُمَّةِ، الَّذِي بَكَى شَوْقًا إِلَيْنَا وَخَبَأَ دَعْوَتَهُ شَفَاعَةً لَنَا، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا.
أَمَّا بَعْدُ: فَيَا عِبَادَ اللَّهِ! اِتَّقُوا اللَّهَ تَعَالَى، وَتَأَمَّلُوا فِي عِظَمِ شَفَقَةِ نَبِيِّكُمْ ﷺ عَلَى أُمَّتِهِ!
فَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ تَلَا قَوْلَ اللَّهِ تَعَالَى فِي إِبْرَاهِيمَ: رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي﴾، وَقَالَ عِيسَى: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾، فَرَفَعَ يَدَيْهِ وَقَالَ: اللَّهُمَّ أُمَّتِي أُمَّتِي! ، وَبَكَى. فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: يَا جِبْرِيلُ، اِذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ فَسَلْهُ مَا يُبْكِيكَ؟» فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ فَأَخْبَرَهُ النَّبِيُّ ﷺ، فَقَالَ اللَّهُ
يَا جِبْرِيلُ، اِذْهَبْ إِلَى مُحَمَّدٍ فَقُلْ: إِنَّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمَّتِكَ وَلَا نَسُوءُك. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
لَقَدْ جَاهَدَ ﷺ حَتَّى دَمِيَتْ قَدَمَاهُ فِي الطَّائِفِ، وَشُجَّ وَجْهُهُ فِي أُحُدٍ، ثُمَّ اخْتَبَأَ دَعْوَتَهُ الْمُسْتَجَابَةَ لأَجْلِنَا! فَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ وَمُسْلِمٌ.
فَيَا لَلْعَجَبِ، وَيَا لَلْحَسْرَةِ! أَيْنَ نَحْنُ الْيَوْمَ مِنْ هَذَا النَّبِيِّ الرَّحِيمِ؟ وَمَا هِيَ الْمَسَافَةُ الْشَاسِعَةُ بَيْنَ حَيَاتِهِ وَحَيَاتِنَا؟إِنَّ الْوَاقِعَ الَّذِي نَعِيشُهُ لَوَاقِعٌ مُؤْلِمٌ؛ لَقَدْ اتَّسَعَتِ الْفَجْوَةُ بَيْنَ سُنَّتِهِ وَبَيْنَ أَعْمَالِنَا! ادَّعَيْنَا حُبَّهُ بِالأَلْسِنَةِ، وَهَجَرْنَا هَدْيَهُ فِي الأَفْعَالِ! كَانَتْ حَيَاتُهُ ﷺ طَاعَةً وَزُهْدًا وَصَلَاةً، وَحَيَاتُنَا غَفْلَةٌ وَتَفْرِيطٌ وَاتِّبَاعٌ لِلشَّهَوَاتِ! صَارَتْ سُنَّتُهُ مَهْجُورَةً فِي بُيُوتِنَا وَأَسْوَاقِنَا، ثُمَّ نَتَسَاءَلُ: لِمَاذَا حَلَّ بِنَا الذُّلُّ وَالْهَوَانُ؟
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى مُحَذِّرًا لَنَا: ﴿فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: وَجُعِلَ الذِّلَّةُ وَالصَّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي. رَوَاهُ أَحْمَدُ.
فَاتَّقُوا اللَّهَ أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ، وَارْجِعُوا إِلَى سُنَّةِ نَبِيِّكُمْ، وَأَحْيُوا هَدْيَهُ فِي أَنْفُسِكُمْ وَأَهْلِيكُمْ قَبْلَ أَنْ يَنْتَهِيَ الأَجَلُ.
بَارَكَ اللَّهُ لِي وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ، وَنَفَعَنِي وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيهِ مِنَ الآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيمِ. أَقُولُ قَوْلِي هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ لِي وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ، فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
الخُطْبَةُ الثَّانِيَةُ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي جَعَلَ اتِّبَاعَ نَبِيِّهِ دَلِيلًا عَلَى مَحَبَّتِهِ، وَسَبَبًا لِنَيْلِ رَحْمَتِهِ وَمَغْفِرَتِهِ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا.
أَمَّا بَعْدُ:فَيَا عِبَادَ اللَّهِ! اتَّقُوا اللَّهَ وَحَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ، وَاعْلَمُوا أَنَّ ادِّعَاءَ الْمَحَبَّةِ لا يُقْبَلُ إِلا بِالِاتِّبَاعِ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: ﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ﴾ آل عمران: ٣١.
تَذَكَّرُوا الوُقُوفَ بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ، وَتَذَكَّرُوا يَوْمَ نُقَادُ إِلَى الْحَوْضِ، فَيُذَادُ عَنْهُ أَقْوَامٌ غَيَّرُوا وَبَدَّلُوا وَابْتَعَدُوا عَنْ سُنَّتِهِ!
فَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ:إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الحَوْضِ، مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ، وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونَنِي، ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ، فَأَقُولُ: إِنَّهُمْ مِنِّي! فَيُقَالُ: إِنَّكَ لا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ: سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي.
فَاتَّقُوا اللَّهَ عِبَادَ اللَّهِ، وَالْزَمُوا سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ ﷺ فِي أَقْوَالِكُمْ وَأَفْعَالِكُمْ وَأَخْلَاقِكُمْ، وَاعْمَلُوا لِيَوْمٍ تَرْجِعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ.
ثُمَّ صَلُّوا وَسَلِّمُوا -رَحِمَكُمُ اللَّهُ- عَلَى الهَادِي الْبَشِيرِ، وَالسِّرَاجِ الْمُنِيرِ، كَمَا أَمَرَكُمْ رَبُّكُمْ فَقَالَ: ﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾ الأحزاب: ٥٦
الدُّعَاءُ
اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى سَيِّدِنَا وَنَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ، وَعَنِ التَّابِعِينَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّينِ.
اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَأَذِلَّ الشِّرْكَ وَالْمُشْرِكِينَ، وَانْصُرْ عِبَادَكَ الْمُوَحِّدِينَ.
اللَّهُمَّ اهْدِنَا لِاتِّبَاعِ سُنَّةِ نَبِيِّكَ ظَاهِرًا وَبَاطِنًا، وَاحْشُرْنَا فِي زُمْرَتِهِ، وَاسْقِنَا مِنْ حَوْضِهِ الشَّرِيفِ شَرْبَةً هَنِيئَةً لَا نَظْمَأُ بَعْدَهَا أَبَدًا.
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، الْأَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالْأَمْوَاتِ.اللَّهُمَّ آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
عِبَادَ اللَّهِ:إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ.
فَاذْكُرُوا اللَّهَ الْعَظِيمَ يَذْكُرْكُمْ، وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ... وَأَقِمِ الصَّلَاةَ.