আইয়ামে জাহেলিয়্যাত ও রাহমাতুল্লিল আলামিন ( সিরাত-২ )
শায়খ উবাইদ উসমান বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক
মুহতারাম মুসল্লিয়ানে কেরাম!আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বের এক ঘোর অমাশার কথা বলছি। পুরো পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল এক ভয়াল ও তমসাচ্ছন্ন অন্ধকার যুগে। সামাজিক অনাচার, নৈতিক অবক্ষয় আর চরম বর্বরতার কালো ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল সমগ্র মানবসভ্যতা।নারীর কোনো সম্মান ও অধিকার ছিল না-কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়াকে ভাবা হতো আত্মমর্যাদার প্রতীক। সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষগুলো প্রতিনিয়ত পিষ্ট হতো সবল ও প্রভাবশালী দেত্যদের পদতলে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলত আত্মঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘাত। মদ, জুয়া, ব্যভিচার আর শত শত মূর্তিপূজায় ডুবে গিয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলেছিল তার সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য। মানুষ পরিণত হয়েছিল মানুষের দাসে, আর মানবতা বন্দি ছিল ঘোর পরাধীনতার শৃঙ্খলে। ইতিহাসে এই বর্বর কালযুগকে আইয়ামে জাহেলিয়াতবা চরম অজ্ঞতার যুগ নামে পরিচিত।
ঠিক এমনি এক অন্ধকার ও অমানবিকতার অতল গহ্বরে যখন মানবজাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখনই রহমতের ফল্গুধারা নিয়ে আবির্ভূত হলো এক নতুন সকাল। পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের স্নিগ্ধ সুবহে সাদেকের শুভক্ষণে আল্লাহ তাআলা ধরণীতে প্রেরণ করলেন তাঁর প্রিয়তম হাবীবকে-যাঁকে তিনি মনোনীত করেছেন সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য একক ও অদ্বিতীয় রহমতহিসেবে।
তাঁর মোবারক আগমনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল অমানবিকতার সকল শিকল, বিলীন হলো অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির অন্ধকার। আর সত্যের এক চিরভাস্বর আলোয় স্নাত হলো সমগ্র পৃথিবী, বইতে শুরু করল পরম শান্তি ও হিদায়াতের সুবাতাস। তিনিই আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসুলে কারীম, রাহমাতুল্লিল আলামীন, যার শানে ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। সুরা আম্বিয়া ২১:১০৭
কুরআনুল কারিমে জাহেলি শব্দ কি কি অর্থে ব্যবহার হয়েছে
১. আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা বা মন্দ ধারণা পোষণ করা।এই আয়াত উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে-
ثُمَّ أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّن بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُّعَاسًا يَغْشَىٰ طَائِفَةً مِّنكُمْ ۖ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ ۖ يَقُولُونَ هَل لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِن شَيْءٍ ۗ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ ۗ
অতঃপর দুঃখ-কষ্টের পর তিনি তোমাদের উপর নাজিল করলেন প্রশান্তি, তন্দ্রারূপে, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিল। আর একদল-যাদের কাছে নিজ স্বার্থই প্রধান হয়ে উঠেছিল, তারা আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার যুগের মতো ‘অন্যায় ধারণা’ পোষণ করছিল। তারা বলছিল, এ ব্যাপারে আমাদের কি কোনো হাত আছে? বলুন, সমস্ত বিষয় তো আল্লাহরই ইখতিয়ারে। সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৪
২.আল্লাহর বিধান ছাড়া মানুষের রচিত যেকোনো অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আইনক ‘জাহেলি ফায়সালা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মদিনার ইহুদিদের মধ্যে দুটি গোত্র ছিল-বনু নাজির ও বনু কুরাইযা। বনু নাজির নিজেদের সামাজিক ও সামরিক দিক থেকে বনু কুরাইযার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত। ফলে বিচারকাজে তারা পক্ষপাতিত্ব করত-বনু নাজিরের কেউ বনু কুরাইযার কাউকে হত্যা করলে তার রক্তপণকম দিতে হতো, কিন্তু বিপরীতটা হলে দ্বিগুণ দিতে হতো।তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে এই বৈষম্যমূলক গোত্রীয় আইন অনুযায়ী বিচার আশা করেছিল। তখন এই আয়াত নাজিল হয়-
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফায়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফায়সালাকারী কে? সুরা আল-মায়িদা ৫:৫০
৩. নারীরাজাহেলি যুগের মতো শরীর প্রদর্শন করাকে জাহেলি কাজ বলা হয়েছে।
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ ۖ وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
তোমরা ( হে নবিজির স্ত্রীগণ) তোমাদের ঘরেই অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের ন্যায় সাজসজ্জা প্রকাশ করো না; নামাজ কায়েম কর, জাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর। সুরা আহযাব ৩৩:৩৩
৪. গোঁড়ামি বা অহংকার অর্থে জাহেলি শব্দ ব্যবহার হয়েছে।হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় কাফেরদের গোত্রীয় জেদ-অহংকারকে কেন্দ্র করে আয়াতটি নাজিল হয়েছে। সুরা ফাতহ ৪৮:২৬
إِذْ جَعَلَ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْحَمِيَّۃَ حَمِيَّۃَ الْجَاهِلِيَّۃِ فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَىٰ وَكَانُوا أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَا
যখন সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা তাদের অন্তরে হঠকারিতা তথা ‘জাহেলি যুগের অন্ধ অহমিকাকে’ প্রশ্রয় দিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাঁর রাসুল ও মুমিনদের ওপর স্বীয় প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাঁদেরকে 'তাকওয়ার কালামে' অবিচল রাখলেন; আর তাঁরাই ছিলেন এর সর্বাধিক হকদার ও উপযুক্ত পাত্র।
বাদশাহ নাজাশির দরবারে জাফর তাইয়ার রাঃ এর ভাষণে আইয়ামে জাহেলিয়াতেরপরিচয়
প্রসঙ্গক্রমে বলে নিই, বিষয়টি বর্তমান সময়ের আলোকে বুঝার জন্য হাবশার অবস্থান সম্বন্ধে জেনে নিই। হাবশা মূলত পূর্ব আফ্রিকার একটি অঞ্চলকে বোঝায়। ইতিহাসে হাবশানামে পরিচিত এ অঞ্চলই বর্তমানে ইথিওপিয়া নামে পরিচিত। তৎকালীন হাবশা বুঝাতে কিছু ইতিহাসবিদগণ ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়ার কিছু অংশ ও সুদানের পূর্বাঞ্চলকেও বুঝিয়ে থাকে। হিজরতের সময় হাবশার যে রাজা নাজাশি ছিলেন, তার রাজধানী ছিল বর্তমান ইথিওপিয়া অঞ্চলে। নাজাশি তার উপাধি। মূল নাম ছিল আসহামা।
মক্কার কাফেরদের জুলুমের কারণে পঞ্চম হিজরীতে প্রায় ১০০ জনের মুসলমানদের দ্বিতীয় একটি কাফেলা হাবশায় হিজরত করেছিল। তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য মক্কার প্রভাবশালী কিছু কাফের হাবশায় যায় এবং হাবশার বাদশার কাছে মুসলমানদেরকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আবেদন করে।
কাফের এই আবেদনের পর বাদশাহ নাজাশি মুসলমানদের তার রাজ দরবারে তলব করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়। তখন জাফর ইবন আবি তালিব রাঃ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার সেই বক্তব্যে জাহেলি যুগের পরিচয় অনেকাংশে ফুটে উঠেছে। জাফর রাদি. বাদশাহ নাজাশিকে বললেন, হে বাদশাহ! আমরা জাহিলিয়াতে নিমজ্জিত ছিলাম। মূর্তি পূজা করতাম, মৃত জন্তু খেতাম, অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর হক নষ্ট করতাম, আমাদের মধ্যে শক্তিশালী দুর্বলকে গ্রাস করত। আমরা যখন ভয়াবহ ধ্বংসস্তুপের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম- এমন সময় আল্লাহ আমাদের নিকট একজন রাসুল প্রেরণ করলেন- যিনি আমাদেরই মধ্য থেকে; আমরা তাঁর বংশ, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও পবিত্রতা সম্বন্ধে ভালো করে জানতাম। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকলেন। যাতে আমরা শুধু তাঁকেই এক বলে মানি ও ইবাদত করি। আমাদের ও আমাদের পিতৃপুরুষেরা আল্লাহ ছাড়া যে পাথর-প্রতিমার উপাসনা করতাম, তিনিতা পরিত্যাগ করতে বললেন। তিনি আমাদের সত্য কথা বলা, আমানত ফেরত দেয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক জোড়া রাখা, প্রতিবেশীর সাথে সুন্দর আচরণ করা, হারাম কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিলেন। অশ্লীলতা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, ইয়াতিমের মাল গ্রাস করা, সতীসাধ্বী নারীদের উপর অপবাদ দেওয়া- এসব থেকে নিষেধ করলেন। তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন- আমরা যেন শুধু আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করি; এবং নামায, জাকাত, রোজা সহ…ইসলামের অন্যান্য বিধান আদায় করি।তিনি আরও বলেন,
فَصَدَّقْنَاهُ وَآمَنَّا بِهِ وَاتَّبَعْنَاهُ عَلَى مَا جَاءَ بِهِ مِنَ اللَّهِ، فَعَبَدْنَا اللَّهَ وَحْدَهُ
অতঃপর আমরা তাঁকে সত্য জ্ঞান করে ঈমান আনলাম এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তাতে তাঁকে অনুসরণ করলাম। তারপর আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে থাকলাম।
কিন্তু আমাদর স্বগোত্রীয়রা আমাদের উপর অত্যাচার করল, আমাদের শাস্তি দিল, আমাদের ধর্ম থেকে ফিরিয়ে আনতে নানাবিধ কষ্ট দিতে লাগলো…ফলে আমরা আপনার দেশে চলে এলাম; আপনাকে অন্যদের উপর বেছে নিলাম; আপনার আশ্রয় কামনা করলাম এবং আশা রাখলাম। হে বাদশাহ! আপনার কাছে আমরা যেন অবিচারের শিকার না হই। নাজাশি বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে তার কিছু কি তোমাদের সাথে আছে?
জাফর রাঃ বললেন, জি আছে। তিনি বললেন, তবে আমাকে শোনাও। তখন তিনি সুরা মারইয়াম থেকে (كهـيـعـص) শুরু অংশ তিলাওয়াত করলেন। নাজাশি তিলাওয়াত শুনে দাড়ি ভিজে যাওয়া পর্যন্ত তিনি কাঁদলেন, তাঁর পাশের খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা কাঁদতে কাঁদতে তাদের পুস্তক ভিজিয়ে দিল। নাজাশি জাফর রাঃ এর ভাষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে বলে উঠলেন, فَوَاللَّهِ لَا أُسْلِمُكُمَا إِلَيْهِمَ
যাও, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কুরাইশদের হাতে সোপর্দ করব না। এই কুরআন আর যা ঈসা আঃ নিয়ে এসেছিলেন- উভয়টি একই স্থান থেকে নাজিল হয়েছে। জাফর রাঃ এর ভাষণে জাহেলি যুগের মৌলিক মন্দ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সিরাতে ইবনে হিশাম ১: ৩৩৬
জাহেলি যুগে রোমান তথা তুরস্ককেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোর ধর্মীয় অবস্থা
তখন রোমানরা বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিল। তারা ঈসা আঃ অনুসরণ করলেও ত্রিত্ববাদের অনুসারী ছিল। তাওহিদ থেকে সরে গিয়েছিল। তবে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস তাদের মধ্যে একতা আনার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হননি। কেউ কেউ সন্নাসী জীবন গ্রহণ করতো। সিরিয়া,ফিলিস্তিন, লেবানন, জর্ডান মিশরের কিছু অংশ রোম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পারস্য তথা ইরানকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোর ধর্মীয় অবস্থা
তখন পারস্য সাম্রাজ্য ছিল একটি বড় সাম্রাজ্য। যা বহু প্রাচীন জাতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। পারস্যের লোকেরা মূলত আগুন পূজা করতো। প্রকৃতি, যেমন আকাশ ও সূর্যের পূজা করত এবং দুই দেবতার পূজার প্রচলন ছিল। একটি ছিল কল্যাণের দেবতা এবং অন্যটি ছিল অকল্যাণের দেবতা।তবে ইসলাম প্রচারের আগে পার্সিয়ানরা আগুন পূজা শুরু করেছিল। তারা বিশ্বাস করতো, আগুন তাদেরকে পরকালে পুড়িয়ে মারতে পারে। ইরাকের পূর্বাঞ্চল, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ, বেলুচিস্তান অঞ্চল, আরব উপদ্বীপ দেশগুলোতের কিছু অংশে পারসিকদের প্রভাব ছিল।
জাহেলি যুগে আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
ইসলাম পূর্ববর্তী আরব সমাজ ছিল মূলত গোত্রভিত্তিক, যেখানে পরিবার ও রক্তের সম্পর্ক ছিল প্রভাবশালী। গোত্রপ্রীতি বা উপজাতিগত সংহতি ছিল সমাজের মূল ভিত্তি। গোত্রের প্রধানই ছিল গোত্রের শাসক এবং তার আদেশ মেনে চলা আবশ্যক ছিল। তারা একে অপরের সাহায্য করতো এবং আত্মীয়তার ভিত্তিতে দলবদ্ধ থাকতো। তারা ছিল অতি প্রতিশোধপরায়ণ। আবার তাদের মাঝে উদারতাও ছিল। ছিল সাহসী ও অতিথিপরায়ণ, শত্রুও তার বাড়িতে মেহমান হলে বা আশ্রয় নিলে তারা কোনো ক্ষতি করতো না।। নিজেরা সাহসের সঙ্গে নিজেদের রক্ষা করত এবং শত্রুদেরও সম্মান করত।
আরব অঞ্চলের ভূগোল ও জলবায়ুর কারণে পশুপালন তাদের প্রধান জীবিকা ছিল । মরুভূমির কাছাকাছি অঞ্চলে খেজুরের বাগান এবং যাযাবরদের কাছে পণ্য সরবরাহও আয়ের উৎস ছিল। এছাড়া কিছু অঞ্চল, বিশেষত ইয়েমেনে কৃষির প্রসার ঘটে। বাণিজ্য এবং উৎপাদনও আরব অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ছিল।
জাহেলি যুগেও আরবদের কিছু ভালো গুণাবলি
১. দান ও অতিথিপরায়ণতা। ২. ওয়াদা রক্ষা। ৩. বীরত্ব ও সাহসিকতা। ৪. সাহিত্যচর্চা। ৫. আতিথেয়তা। যেমন, নবিজিﷺ এর পরদাদা হাশিম কাবা শরীফ জিয়ারতকারীদের পানি পানের ব্যবস্থা করতেন। ৭. মৃত ব্যক্তির প্রতিশোধে একতা।
নবিজির আগমনবার্তা ছড়িয়ে আছে কিতাবের পাতায় পাতায়
যিশাইয় আঃ এর সহিফা থেকে,২৪ তম অধ্যায়, ২৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, চাঁদ অস্থির অশান্ত হবে, সূর্য লজ্জিত হবে, যখন সেনাদলের অধিপতি সায়হুন পর্বত (সিরিয়া ও লেবাননের উত্তরাংশে অবস্থিত) ও জেরুজালেমে বয়স্কদের সম্মুখে শৌর্যবীর্যের সাথে দেশ শাসন করে যাবে।
নবিজি ﷺ বেশ জাঁকজমকের সাথে দেশ শাসন করেছেন, চাঁদ অস্থির হয়ে তার রং বিবর্ণ হয়েছে এবং তা দু টুকরোও হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ
কিয়ামত নিকটবর্তী হল এবং চাঁদ দ্বিখন্ডিত হল। সুরা কামার ৫৪: ১
যিশাইয় আ: এর সহিফা থেকে, ২১নং অধ্যায়, ৬-৭ নং আয়াত।সদাপ্রভূ আমাকে বললেন, যাও তত্ত্বাবধায়ক বসাও, সে যা দেখবে তা বলবে। সে দেখতে পেল দুজন জন্তুর পিঠে আরোহী- গাধার পিঠে, উটের পিঠে।
এই শুভবার্তায় আলয়াসা আঃ দুজন নবির প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। এক. গাধায় আরোহী বলে হজরত ঈসা আঃ এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেহেতু ঈসা আঃ গাধার পিঠে সাওয়ার হয়ে জেরুজালেম এসেছিলেন। দুই, উটের আরোহী বলে নবিজি ﷺপ্রতি ইঙ্গিত করেছেন। প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যেহেতু হিজরতের সময় নবিজি উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে মক্কা থেকে মদিনায় আসেন। অতএব হজরত ঈসা আঃ এর জন্য এ ভবিষ্যদ্বার্তা প্রযোজ্য হবে না। যেহেতু হজরত ঈসা আঃ বা তার সহচরদের হাতে বাবেলের পতন হয়নি।
এরপর ২১ অধ্যায়ের ৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, তার হাতে বাবেল নগরীর পতন হবে। হজরত উমর রাদি. এর যুগে বাবেল নগরীর পতন হয়, তা মুসলমানদের করতলগত হয়। কুরআনে বর্ণিত ‘বাবেল’ দ্বারামেসোপটেমিয়ার প্রাচীন বিশ্ববিখ্যাত শহর ‘ব্যাবিলন’ কেই বোঝানো হয়েছে। এটি বর্তমানে মধ্য-ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে 'হিল্লাহ' শহরের কাছেঅবস্থিত। ফোরাত প্রায় ২,৮০০ কিলোমিটার (১,৭৪০ মাইল) দীর্ঘ, যা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘতম নদী।, ফোরাত (Euphrates ইউফ্রেটিস)
মালাকি আঃ এর নিকট প্রেরিত আসমানি সহিফা,৩য় অধ্যায় ১ম আয়াত
দেখো, আমি আমার একজন প্রতিনিধি পাঠাব। সে আমার পূর্বে এসে আমার পথ পরিস্কার করবে। আর সে সদাশয় তোমরা যাকে অন্বেষণ করছ সে খতনাকারীদের রাসুল, তাকে পেয়ে তোমরা খুশি হবে সে তার আপন আকৃতিতে হঠাৎ তোমাদের মাঝে আসবে। দেখো, সে নিশ্চিতই আসবে। বিভিন্ন দলের রব বলছেন, যেদিন সে আসবে, সেদিন কে তার মোকাবেলা করতে পারবে? যেদিন সে প্রকাশিত হবে সেদিন কে তার সামনে দাঁড়াতে পারবে?
এই শুভবার্তায় এমন এক রাসুলের উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি খতনাকৃত হবেন, খতনাকারী ব্যক্তিবর্গের রাসুল হবেন। এজন্যই নবিজি ﷺএর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ইহুদি ও খ্রিস্টান সমাজ খতনাকৃত রাসুলের অপেক্ষায় ছিল। রোমের শাসক হিরাক্লিয়াসও এই ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে খতনাকৃত রাসুলের আগমনের অপেক্ষায় ছিল। বুখারি শরীফের হাদিসেও হিরাক্লিয়াসের অপেক্ষমান থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বাইবেলের বর্তমান সংস্করণলোতে 'খতনা' শব্দ তুলে দিয়ে 'প্রতিশ্রুত' শব্দ প্রয়োগ করা হচ্ছে। (কিন্তু তাতে উদ্দেশ্যে কোন পরিবর্তন আসবে না) কারণ বাইবেলের 'আদিপুস্তক' অধ্যায় পাঠ করলে বোঝা যায় এখানে প্রতিশ্রুতি দ্বারা 'খতনাই বুঝানো হচ্ছে। সিরাতে মুস্তফা, ইদ্রিস কান্ধলবি রাহিমাহুল্লাহ ৩য় খন্ড।
নবিজি এর বংশ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বংশধারা
হজরত আয়েশা রাদি. থেকে বর্ণিত,
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، عَنْ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالقَلَّبْتُ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا، فَلَمْ أَجِدْ رَجُلًا أَفْضَلَ مِنْ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَمْ أَرَ بَيْتًا أَفْضَلَ مِنْ بَيْتِ بَنِي هَاشِمٍ
হজরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবি কারীম ﷺ সায়্যিদুনা জিবরাইল আ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি পৃথিবীর পূর্বদিগন্ত থেকে পশ্চিমদিগন্ত অর্থাৎ সারা পৃথিবী ঘুরেফিরে দেখেছি তাতে আমি হজরত মুহাম্মাদ থেকে অধিক শ্রেষ্ঠ মানুষ আর কাউকে পাইনি। বনু হাশিমের ঘর থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ ঘর (অর্থাৎ বংশ) আর দেখিনি। আল-মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানি ৬২৮৫, দালায়িলুন নবুওয়াহ ১: ১৭৬, আল আমালি মুতলাকাহ ৭২
রাসুল ﷺ থেকে হজরত আদম আ. পর্যন্ত ধারাবাহিক বংশপরম্পরা
তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক:১/৪৯৭আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি:১৩০৭৩;
مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ هَاشِمِ بْنِ عَبْدِ مَنَافِ بْنِ قُصَيِّ بْنِ كِلَابِ بْنِ مُرَّةَ بْنِ كَعْبِ بْنِ لُؤَيِّ بْنِ غَالِبِ بْنِ فِهْرِ بْنِ مَالِكِ بْنِ النَّضْرِ بْنِ كِنَانَةَ بْنِ خُزَيْمَةَ بْنِ مُدْرِكَةَ بْنِ إِلْيَاسَ بْنِ مُضَرَ بْنِ نِزَارِ بْنِ مَعَدِّ بْنِ عَدْنَانَ بْنِ أُدَدَ (أَوْ أَدَّ) بْنِ الْهَمَيْسَعِ بْنِ سَلَامَانَ بْنِ عَوْصِ بْنِ بَوْزِ بْنِ قَمْوَالَ بْنِ أُبَيِّ بْنِ عَوَّامِ بْنِ نَاشِدِ بْنِ حَزَا بْنِ بَلْدَاسَ بْنِ يَدْلَافَ بْنِ طَابِخِ بْنِ جَاحِمِ بْنِ نَاحِشِ بْنِ مَاخِي بْنِ عَيْضِ بْنِ عَبْقَرَ بْنِ عُبَيْدِ بْنِ الدَّعَا بْنِ حَمْدَانَ بْنِ سَنَّبَرَ بْنِ يَثْرِبِيَّ بْنِ يَحْزَنَ بْنِ يَلْحَنَ بْنِ إِرْعَوَى بْنِ عَيْضِ بْنِ دِيشَانَ بْنِ عَيْصَرَ بْنِ أَفْنَادَ بْنِ أَيْهَامَ بْنِ مُقْصِرٍ بْنِ نَاحِثَ بْنِ زَارِحَ بْنِ سُمَيِّ بْنِ مُزَيِّ بْنِ عِوَضَةَ بْنِ عِرَامَ بْنِ قَيْدَارَ بْنِ إِسْمَاعِيلَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ (عَلَيْهِمَا السَّلَامُ) بْنِ تَارَحَ (وَهُوَ آزَرُ) بْنِ نَاحُورَ بْنِ سَارُوغَ بْنِ رَاعُو (أَوْ فَالِغَ) بْنِ عَابِرَ بْنِ شَالِخَ بْنِ أَرْفَخْشَذَ بْنِ سَامِ بْنِ نُوحٍ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) بْنِ لَامَكَ بْنِ مَتُوشَلَخَ بْنِ أَخْنُوخَ (وَهُوَ إِدْرِيسُ عَلَيْهِ السَّلَامُ) بْنِ يَرِدَ بْنِ مَهْلَائِيلَ بْنِ قَيْنَانَ بْنِ أَنُوشَ بْنِ شِيثَ بْنِ آدَمَ (عَلَيْهِمُ السَّلَام.
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব বিন লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ) বিন মালিক বিন আন-নাযর বিন কিনানাহ বিন খুযায়মাহ বিন মুদরিকা বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মাআদ বিন আদনান বিন উদাদ বা আদ বিন হামায়সা বিন সালামান বিন আউয বিন বাউয বিন কামওয়াল বিন উবাই বিন আউওয়াম বিন নাশিদ বিন হাযা বা হিযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন তাবিখ বিন জাহিম বিন নাহিশ বিন মাখী বিন আইয বিন আবকার বিন উবাইদ বিন আদ-দুআ বিন হামদান বিন সানবার বিন ইয়াসরিপী বিন ইয়াহযান বিন ইয়ালহান বিন ইর'আওয়া বিন আইয বিন দীশান বিন আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুকসির বিন নাহিত বিন যারিহ বিন সুমাই বিন মুযী বিন ইওয়াযাহ বিন ইরাম বিন কাইদার বিন ইসমাইল বিন ইবরাহিম (আলাইহিমাস সালাম) বিন তারাহ (যাঁকে আযর বলা হতো) বিন নাহুর বিন সারুগ বিন রাউ (বা রাগ) বিন ফালিগ বিন আবির বিন শালিখ বিন আরফাখশায বিন সাম বিন নুহ (আলাইহিস সালাম) বিন লামাক বিন মাতুশালাখ বিন আখনুখ ( যিনি ইদরীস আলাইহিস সালাম) বিন ইয়ারিদ বিন মাহলাঈল বিন কায়নান বিন অনুশ বিন শীষ বিন আদম আলাইহিমুস সালাম।
নবিজি ﷺ জন্মের সময় সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলি
যখন কোনো প্রভাবশালী বা মর্যাদাশীল ব্যক্তি কোথাও যাতায়াত করেন, তার আগমনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ উচ্ছ্বাসে অপেক্ষা করে, বিশেষ মর্যাদা দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সময়ও পৃথিবীতে অনেক অলৌকিক চমকপ্রদ ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছিল। যা নবিজি ﷺ এর আগমনের আগাম বার্তা বহন করে।
১. হস্তীবাহিনীর ঘটনা।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া হস্তীবাহিনীর ঘটনা ছিল নবিজি ﷺ এর আগমনের সংবাদ ।
২. জন্মের সময় আলোকচ্ছটা।
ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী দেখা যায়, মা আমেনার ঘরে সুবহে সাদিকের সময় আল্লাহর রাসুলের আগমন ঘটার আগে কয়েকজন মহিলা সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন। হঠাৎ তারা দেখলেন, আকাশ থেকে সরাসরি আগত এক আলো গোটা ঘরকে আচ্ছাদিত করে ফেলল। আলোয় ঝলমল করে উঠল সব। মহিলারা তো অবাক। দুনিয়ার বুকে প্রতিদিন কত শিশুর আগমন ঘটে, ঘরে ঘরে কত নতুন শিশুর জন্ম হয়। কই আমরা এমনটা তো কোনোদিন দেখিনি! হঠাৎ আকাশের দিকে তাদের নজর পড়ল। মনে হলো আকাশের তারাগুলো সব যেন ঝুঁকে পড়েছে আর পুরো ঘর আলোর বন্যায় ভাসছে।
৩. পারস্যের সাম্রাজ্যে নাড়া।
পারস্যের সাম্রাজ্য ছিল বিশাল এক সাম্রাজ্য। একটি পরাশক্তি। তাদের সম্রাটদের থাকার জন্য ছিল এক বিশাল প্রাচীন প্রাসাদ। ঐতিহ্যবাহী একটি ঘর। আল্লাহর নবী যেদিন দুনিয়ার বুকে আসেন পারস্য সম্রাটের প্রাসাদ হঠাৎ করে নড়েচড়ে ওঠল এবং ১২টি পাথর সে প্রাসাদ থেকে খসে পড়ে গেল। তারা অবাক হলো, এত সুরম্য প্রাসাদ হতে হঠাৎ করে ১২টি ইট পড়ে গেল কেন? কারণ কী?
৪. পারস্য সম্রাটের স্বপ্ন ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা।
রাতে পারস্যের সম্রাট স্বপ্নে দেখলেন, আরব মরুভূমি থেকে কিছু উট এবং সামনে একটি ঘোড়া ধেয়ে আসছে। শক্তিশালী একটি ঘোড়া আরবের কিছু উটকে টেনে মরুভূমি থেকে নিয়ে আসছে। ফোরাত নদী পার হয়ে পারস্যের বিভিন্ন সম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তাদের সাম্রাজ্য বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
এই স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে ওঠলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার এবং খ্রিস্টান ধর্মের বড় বড় পাদরিদের ডেকে পাঠালেন। সম্রাট তাদের স্বপ্নটি শুনিয়ে বললেন, ভয়ংকর এই স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে গেছে। আপনাদের কাছে আমি এর ব্যাখ্যা জানতে চাই।তখন আরবজাতি ছিল শতধা বিভক্ত। তাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। সকল গোত্র পৃথকভাবে বাস করত। পুরো আরবজাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্য সাম্রাজ্য দখল করে ফেলবে এটা ছিল তাদের কল্পনাতীত। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলে, সমগ্র আরব ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর আঘাত করার কথা আরবরাও কল্পনা করত না।
সম্রাটের স্বপ্ন শুনে পাদরিরা বলল, আজ রাতে আরবে এক শিশুর জন্ম হচ্ছে। একদিন তার নেতৃত্বে গোটা আরবজাতি ঐক্যবদ্ধ হবে। শুধু আরবজাহান বা আরবদ্বীপ নয়, পারস্যের বিশাল সাম্রাজ্যসহ সারা পৃথিবী তার নেতৃত্বে তারা দখল করে নেবে এবং তাদের আদর্শের পতাকা উড্ডীন করবে। এ হচ্ছে আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা। সীরাতে মুস্তফা
অগ্নিমণ্ডপ নিভে গেল
আল্লাহর নবির আগমনে পারস্য সম্রাটের প্রাসাদ নড়ে ওঠল। পাথরগুলো খসে পড়ল। ইরানের অগ্নিপুজারীদের অনেক দিনের অগ্নিমণ্ডপ ছিল। তারা সেখানে সর্বদা আগুন জ্বালিয়ে রাখত। পূজা করত। দুনিয়ার বুকে আল্লাহর নবির আগমন ঘটার সাথে সাথে অগ্নিপুজারীদের আগুনের মণ্ডপটি নিভে গেল। তারা অবাক হলো, শত শত বছরের আগুনের মণ্ডপ যা একদিনের জন্যও নিভেনি তা হঠাৎ কেন নিভে গেল? গণকরা বলল, এই বিশ্বে কোনো একটি পরিবর্তন হচ্ছে। এক ধরনের বিপ্লব হচ্ছে। নতুন কোনো মহাপুরুষের আগমন হচ্ছে। সে কারণে অগ্নিকুণ্ড নিভে গেছে। একদিনের জন্য পূজা বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে আল্লাহর নবির আগমন প্রাচীন যুগে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। ইহুদি-খ্রিস্টানদের আস্তানায় আঘাত। অগ্নিপুজারীদের আস্তানায় আঘাত। জনগণের ওপর অত্যাচারী পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর আঘাত। বাতিলের বড় বড় শক্তির ওপর আল্লাহর নবির আগমন আঘাত সৃষ্টি করল। আল্লাহর নবী দাওয়াত শুরু করার আগেই কেবল তাঁর আগমনেই সারা পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটে গেল। সবগুলো বাতিল নড়েচড়ে ওঠল। নবিজি ﷺ এর জন্মের সময়ের উপরোক্ত সবগুলো ঘটনার রেফারেন্স, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩:৩৯৬
এক ইহুদির অনুভূতি
এক ইহুদি বলল, আমার মনে হচ্ছে আজকে আরবজগতে কোনো একজন বিশেষ শিশুর জন্ম হয়েছে। লোকজন জিজ্ঞেস করল, আপন কীভাবে বুঝলেন? ইহুদি বলল, আমি রাতের বেলা তারকাগুলোকে ঝুঁকে দেখেছি। আকাশ থেকে আরবের উপর আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছে, আরবে কোনো মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে। সবাই বলল, আমরা তো জানি না। তারা খোঁজ করে দেখতে পেল, সে রাতে মক্কা নগরীতে আবদুল মুত্তালিবের ঘরে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। ইহুদিটি বলল, আমি শিশুটিকে দেখতে চাই। প্রাচীন আসমানি কিতাবসমূহে বর্ণিত সর্বশেষ নবির নিদর্শন সম্পর্কে তার জানা ছিল। সে জানতো, সর্বশেষ নবি যেদিন মদিনায় আসবেন তখন কী কী ঘটনা ঘটবে এবং তার কী চিহ্ন থাকবে।
সে আবদুল মুত্তালিবের ঘরে এসে নবজাতক শিশুর দিকে তাকিয়ে ইহুদি বলল, আমি শিশুটির পিঠ দেখতে চাই। সে তখন রাসুল ﷺএর মোহরে নবুওয়াত যা দুই কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে কবুতর বা ঘুঘুর ডিমের মতো উঁচু, লালচে আভার বরকতময় শারীরিক নিদর্শন দেখতে চাইল।ইহুদি তা দেখে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। অনেকক্ষণ পর যখন হুঁশ ফিরল, লোকজন জিজ্ঞেস করল; কী ব্যাপার! আপনি এই শিশুকে দেখে বেহুঁশ হয়ে গেলেন কেন?
সে বলল, আমি দুই কারণে বেহুঁশ হয়েছি।
প্রথমত, আমি আনন্দিত এ জন্য যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহিলিয়াত প্লাবিত বর্বরতার এই পৃথিবীর বুকে আলোর মশাল নিয়ে সর্বশেষ নবির আগমন ঘটেছে।
দ্বিতীয়ত, আমি অত্যন্ত দুঃখিত এ জন্য যে পৃথিবীর বুকে যত নবি এসেছেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন বনু ইসরাঈল গোত্রের। ইহুদি-খ্রিস্টানদের মাঝে আসা সব নবী ছিলেন হজরত ইয়াকুব আ.এর সন্তান। হজরত মুসা, দাউদ, সুলাইমান, ঈসা আ. সহ নবীদের বিশাল বহর ছিলেন বনু ইসরাঈল গোত্রভুক্ত। আমার প্রত্যাশা ছিল, সর্বশেষ নবির আগমনও বনু ইসরাঈল গোত্রে ঘটবে। কিন্তু আমি বিস্মিত! আরব মরুভূমিতে তার আগমন ঘটল কী করে? সর্বশেষ নবুওয়াতের গৌরব বনু ইসরাঈল পেল না। এ জন্য মনটা খুবই ব্যথিত হয়েছে। আর এই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে আমি বেহুঁশ হয়ে গেলাম। নবিজির জন্মের সময় তাঁর মা যে সমস্ত অলৌকিক ঘটনাবলি অবলোকন করেন
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, আমিনা বিনতে ওয়াহাব নিজে বলতেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺতার গর্ভে থাকাকালে স্বপ্নে কে যেন তাকে বলল, তুমি এই উম্মতের সরদারকে গর্ভে ধারণ করেছ। তিনি ভূমিষ্ঠ হলে তুমি বলবে, তাঁকে আমি সকল হিংসুকের অনিষ্ট ও যাবতীয় বিপদাপদ থেকে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করছি। অতঃপর তার নাম রাখবে ‘মুহাম্মাদ’ অর্থাৎ প্রশংসিত ও মর্যাদাবান। তিনি আরও দেখেন তাঁর থেকে এমন একটি নুর বের হয়ে গেল, যার দরুন তিনি সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ সমূহকে দেখতে পেলেন।আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩:৩৮৪
জাহেলি যুগের কিছু জাহেলিয়াতের বিবরণ
১. শিরক ও মূর্তিপূজা। নবিজি ﷺ এর আগমনের আগে আরব সমাজে সর্বাধিক প্রচলিত ছিল মূর্তিপূজা। তারা কাবার চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা মানলেও ইবাদতে অন্যদের শরিক করতো। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে-
وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ
আর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুর ইবাদত করে, যা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোনো উপকারও করতে পারে না। সুরা ইউনুস ১০:১৮
২. নারীদের প্রতি অবিচার ও কন্যাশিশু হত্যা। আরব সমাজে নারীরা ছিলো অবহেলিত। তারা স্ত্রীদের উত্তরাধিকার বঞ্চিত করত এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত। কুরআনুল কারিমে সেই অবস্থার বর্ণনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে-
وَإِذَابُشِّرَأَحَدُهُمبِالْأُنثَىظَلَّوَجْهُهُمُسْوَدًّاوَهُوَكَظِيمٌ
যখন তাদের কারো কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখভারাক্রান্ত হয়।সুরা নাহল ১৬:৫৮
যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে- কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
এবং যখন জীবন্ত প্রোথিত (কবরে পুতে ফেলা) কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে-কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? সুরা তাকবির ৮১: ৮-৯
৩. সুদ, জুয়া ও মদ্যপান। তারা সুদখোরি, জুয়া ও মদ্যপানকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ করে নিয়েছিল। এসবের কারণে সমাজে অশান্তি, দারিদ্র্য ও অপরাধ বেড়েছিল।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ
হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য নির্ধারণকারী শরগুলো নিছক শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক। সুরা মায়িদা ৫: ৯০
৪. অন্যায়, দাসপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্য। সমাজে ধনী-গরিব, আরব-অনারব, কালো-সাদার মধ্যে বৈষম্য ছিল । দাসপ্রথা চালু ছিল, যেখানে মানুষকে পশুর মতো ব্যবহার করা হতো।
عَنْ أَبِي مَالِكٍ الْأَشْعَرِيِّ أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالِاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ. وَالنَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ
হযরত আবু মালেক আল-আশআরি রাদি. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে জাহিলিয়াতের চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যা তারা ত্যাগ করবে না। বংশমর্যাদা নিয়ে অহংকার করা। অন্যের বংশ তুলে খোটা দেওয়া। নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি চাওয়া। বিলাপ করে কান্নাকাটি করা।
তিনি আরও বলেন, আর বিলাপকারী নারী যদি মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় দাঁড় করানো হবে যে, তার পরনে থাকবে গলিত তামা বা আলকাতরার জামা এবং চুলকানিযুক্ত চর্মরোগের বর্ম।সহিহ মুসলিম ৯৩৪
৫. নগ্ন তাওয়াফ ও বিকৃত ইবাদত। আরবরা কাবা শরীফের চারপাশে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তাওয়াফ করত।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ: كَانَتِ الْمَرْأَةُ تَطُوفُ بِالْبَيْتِ وَهِيَ عُرْيَانَةٌ، فَتَقُولُ: مَنْ يُعِيرُنِي تِطْوَافًا؟ - تَجْعَلُهُ عَلَى فَرْجِهَا - وَتَقُولُ الْيَوْمَ يَبْدُو بَعْضُهُ أَوْ كُلُّهُ ... وَمَا بَدَا مِنْهُ فَلَا أُحِلُّهفَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: ﴿خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জাহেলি যুগে) নারী সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় কাবা ঘর তাওয়াফ করত এবং বলত, আমাকে এমন কোনো কাপড় (বা চাদর) ধার দেওয়ার কেউ আছে কি, যা দিয়ে শরীর ঢাকা যায়? এ কথা বলে সে তা তার লজ্জাস্থানের ওপর রেখে আবৃত করার চেষ্টা করত এবং আবৃত্তি করত, আজ এর কিছু অংশ বা পুরোটাই প্রকাশ পেয়ে যাবে, তবে এর যতটুকু অংশই প্রকাশ পাক, তা আমি কারো জন্য হালাল করছি না।
এরপর আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন,خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ
হে বনু আদম! তোমরা প্রতিটি সালাত ও তাওয়াফের সময় সুন্দর পোশাক পরিধান করো।সুরা আরাফ ৭: ৩১, সহিহ মুসলিম ৩০২৮
৬. কবর পূজা ও কবরে মানত করত। তারা মুরুব্বিদের কবরকে পূজা করত, কবরের সাথে পশু জবাই করত।
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلاَ يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا
তারা বলল, তোমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করো না, এবং ওদ্দ, সুয়া, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নসরকে ছেড়ে দিও না। সুরা নুহ ৭১: ২৩
৭. কুসংস্কার, ভাগ্য নির্ধারণ ও জ্যোতিষচর্চা। তারা তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য নির্ধারণ করত, কুসংস্কার বিশ্বাস করত, জ্যোতিষ ও জাদুবিদ্যা ব্যবহার করত।
وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ذَلِكُمْ فِسْقٌ
তোমরা ভাগ্য নির্ধারণকারী তীর ব্যবহার করো না, এটি তো ফিসক। সুরা মায়িদা ৫:৩
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অপর হাদিসে গণক জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হওয়ার ভয়াবহতা সম্বন্ধে ইরশাদ হয়েছে,
قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
যে কেউ কোনো জ্যোতিষীর কাছে যাবে এবং কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না। মুসলিম:২২৩০
৮. অত্যাচার, এতিমদের হক নষ্ট করা। এতিমদের সম্পদ তারা গ্রাস করত, বিধবা-অসহায় নারীদের উপর অত্যাচার করত।
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا
যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা আসলে তাদের পেটে আগুন ভরছে। সুরা নিসা ৪:১০
৯. দারিদ্র্য-অপমান ও অভাবের কারণে সন্তান হত্যা করা।
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُم مِّنْ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ
তোমরা অভাবের কারণে সন্তান হত্যা করো না, আমি তোমাদের এবং তাদেরকেও রিযিক দিই। সুরা আনআম ৬:১৫১
জাহেলি যুগ ও বর্তমান যুগের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
১. মদপান ও মাদকাসক্তি : জাহেলি যুগে মানুষ মাদকাসক্ত ছিল। সমাজে মদপানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশেও আইন করে মদ আমদানি, বিক্রি বৈধ করা আছে। বার, ক্যাবার, ফাইভ স্টার হোটেলসহ সরকার অনুমোদিত অনেক মদের দোকান আছে।
২. জিনা-ব্যভিচার : জাহেলি যুগে জিনা-ব্যভিচার বেশি ছিল। বর্তমানেও বিশ্বব্যাপী জিনা-ব্যভিচার বেড়ে চলছে। এমনকি ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশ বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি অনুমোদিত।
৩. সুদি কারবার : জাহেলি যুগে সুদের প্রচলন ছিল। বর্তমানেও বিশ্বব্যাপী লেনদেন হয় সুদে। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশেও সুদভিত্তিক ব্যাংক, বীমা, ইনস্যুরেন্স সরকারি আইনে বৈধভাবে চলছে।
৪. উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা : জাহেলি যুগে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা ছিল। কাবাঘর নারী-পুরুষ উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। বর্তমান যুগে বিশ্বব্যাপী উলঙ্গপনা আধুনিক হয়ে দেখা দিয়েছে। একেবারে উলঙ্গ হয়ে চললে দেখতে কিছুটা বিশ্রী লাগে, তাই উলঙ্গপনা আধুনিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সি বিচ তথা সমুদ্র উপকূলে উলঙ্গ নারীদের শুয়ে থাকার দৃশ্য দূষণীয় মনে করা হয় না। মোবাইলের উলঙ্গপনা এখন পকেটে নিয়ে ঘুরতে হয়। পত্রিকা, ম্যাগাজিন অর্ধনগ্ন নারীদের ছবি ছাড়া নেই বললেই চলে।
৫. যুদ্ধ-বিগ্রহ : জাহেলি যুগে সামান্য কারণে যুদ্ধ বাধত। যুদ্ধে অসংখ্য মানুষ নিহত হতো। বর্তমান যুগেও সামান্য কারণে যুদ্ধ ফিলিস্তিনে নিরীহ নারী-শিশুসহ গণহত্যা জাহেলি যুগকে হার মানিয়েছে।
৬. মারামারি-হানাহানি : জাহেলি যুগে সামান্য স্বার্থে গোত্রে গোত্রে মারামারি ছিল। বর্তমানে বিশ্বের কোথাও শান্তি নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পর হানাহানি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নসাৎ করে ক্ষমতা স্থায়ী করতে এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর হামলা-মামলা বর্তমানে স্বাভাবিক বিষয়।
৭. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা : জাহেলি যুগে মুশরিকরা আল্লাহকে স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেব-দেবীর আরাধনা করত। কোনো দেব-দেবী, ধন-সম্পদের দায়িত্বশীল ক্ষমতাপ্রাপ্ত, কোনো দেবী বিদ্যার ক্ষমতাপ্রাপ্ত বলে বিশ্বাস করা হতো। কোনো দেবী বিপদ দূর করার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত, এমন মনে করা হতো। বর্তমান যুগেও মুসলমান নামধারী অনেক লোক কোনো মাজারে বাবার কাছে সন্তান চাইলে, গাছের মধ্যে সুতা বাঁধলে সে গাছের সন্তান দেওয়ার ক্ষমতা আছে মনে করে।
৮. মানুষের রচিত আইনকানুন : জাহেলি যুগে আল্লাহর দেওয়া আইন ও বিধান অমান্য করে গোত্র শাসকরা তাদের সুবিধামতো মনগড়া নিজেদের আইনে গোত্র শাসন করত। আহলে কিতাবরা তাওরাত-ইনজিলের বিধান সুবিধামতো পরিবর্তন করে বিকৃত করেছিল। বর্তমান যুগে আল্লাহর দেওয়া আইন ও রাসুলের সুন্নাহ বাদ দিয়ে মনগড়া আইন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়। ইংরেজ প্রণীত আইন
অনেকাংশে এখনো আছে। দৃষ্টান্ত দিতে গেলে দেখা যাবে জাহেলি যুগের অনেক কিছু বর্তমানে আছে, বরং বর্তমান যুগে তা আরো বিস্তৃত ও আধুনিক হয়ে বিরাজ করছে।
৯. নিরাপত্তাহীনতা : জাহেলি যুগে যেমন সারা বিশ্বে শান্তি-নিরাপত্তা ছিল না, এখনো মানুষের জীবনের শান্তি-নিরাপত্তা নেই।
১০. জাহেলি যুগে ছিল দুর্বলের প্রতি সবলের আধিপত্য। ধনী-গরিব বৈষম্য। সম্মান ও মর্যাদার মানদণ্ড ছিল অর্থ ও ক্ষমতা। ক্ষমতাবান ও ধনীরাই হতো সমাজের নেতৃত্বদানকারী। দুর্বল ও অসচ্ছলরা ছিল নির্যাতিত ও অবহেলিত। বর্তমান সমাজেও জোর যার মুল্লুক তার নীতি বিদ্যমান। অযোগ্য ও অপরাধী হলেও অর্থ ও ক্ষমতার কারণে তারাই হয় নেতৃত্বদানকারী। ফলে রক্ষক হয় ভক্ষক।
জাহেলি সমাজে কন্যা সন্তানদের উপর নির্মম পাশবিকতার কয়েকটি চিত্র
খলিফা ইবনে হুসাইন রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কায়েস ইবনে আসিম রাদি. আল্লাহর রাসুলﷺ এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি জাহিলিয়াতের যুগে আমার বারো-অথবা ১৩-টি কন্যাকে জীবন্ত দাফন করেছিলাম।” রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাদের সংখ্যা অনুযায়ী দাস মুক্ত করে দাও।”
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তাদের সংখ্যা অনুযায়ী দাস মুক্ত করলেন।
পরবর্তী বছর যখন এলো, তিনি ১০০টি উট নিয়ে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি মুসলমানদের সাথে যে আচরণ করেছিলাম, তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ আমার কওমের পক্ষ থেকে এটি সদকা।আলি ইবনে আবি তালিব রাদি. বলেন, আমরা সেগুলোকে চরাতে নিয়ে যেতাম সেগুলোকে ‘আল-কায়সিয়্যাহ’ নামে ডাকতাম।” তাফসিরে ইবনু কাসির ৮: ৩৫
প্রাচীন তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে কুরতবিতে ইমাম কুরতবি রহ. বর্ণনা করেছেন-
নবিজিﷺ এর একজন সাহাবি সর্বদা নবিজির সম্মুখে চিন্তিত অবস্থায় বসে থাকতেন। প্রিয় নবিﷺ একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেন. কী হয়েছে, তুমি এত চিন্তিত থাকো কেন? তখন সাহাবি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল ﷺ! আমি জাহেলি যুগে এমন মারাত্মক গুনাহ করেছি, আমি ভয় করছি যে আল্লাহ আমার এ গুনাহ আমি মুসলমান হলেও ক্ষমা করবেন না!
বিশ্বনবিﷺ তাকে বলেন, তোমার গুনাহর কথা আমাকে বলো। তখন সাহাবি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল ﷺ! আমি এমন পাপী যে জাহেলি যুগে অনেক কন্যাসন্তান হত্যা করেছি। একসময় আমার একটি সন্তান জন্ম হলো, আমার স্ত্রী একে হত্যা না করে রেখে দেওয়ার জোর সুপারিশ করল। অতঃপর আমি রেখে দিলাম। ধীরে ধীরে সে বড় হলো। সে ছিল খুবই সুন্দরী। যুবকরা একে বিয়ের প্রস্তাব দিল। এতে আমার মধ্যে রাগের সঞ্চার হলো, অন্তরে স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, একে বিয়ে দেব; নাকি বিয়ে ছাড়া ঘরে রেখে দেব।
অবশেষে আমার স্ত্রীকে বললাম, আমি আমার বংশের অমুক অমুক লোকদের কাছে বেড়াতে যাব, কন্যাকেও আমার সঙ্গে যেতে দাও। স্ত্রী খুশি হয়ে সুন্দর পোশাক ও অলংকার পরিয়ে তাকে সুসজ্জিত করল। অতঃপর তার কোনো ক্ষতি না করার জন্য প্রতিশ্রুতি নিল। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে একটি নদীর তীরে গেলাম। অতঃপর মেয়েটিকে নদীতে ফেলে দেওয়ার চিন্তা করলাম। মেয়েটি যখন বুঝতে পারল, তখন সে বলল, আব্বা! আপনি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবেন? এতে আমার মধ্যে দয়ার উদ্রেগ হলো। তারপর নদীর দিকে তাকালাম, এতে আমার মধ্যে রাগ ফিরে এলো। আমি তাকে নদীতে ফেলে দিতে চাইলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আব্বা! আমার মায়ের আমানতের খিয়ানত করবেন না। অতঃপর আমার মধ্যে দয়ার উদ্রেগ হলে তাকে ছেড়ে দিই। পরিশেষে শয়তান আমার উপর প্রাধান্য বিস্তার করলে আমি তাকে ধরে নদীতে ফেলে দিলাম। তখন সে চিৎকার করে বলেছিল, হে আমার আব্বা! আপনি আমাকে কেন হত্যা করছেন? তার জবান থেকে আওয়াজ বের হওয়া পর্যন্ত আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অতঃপর সেখান থেকে চলে আসি। তার বর্ণনা শুনে নবিজি ﷺ ও উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম কাঁদতে থাকেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন বলেন, জাহেলি যুগের কোনো অপকর্মের কারণে যদি কাউকে শাস্তি দেওয়ার আদেশ করা হতো, তাহলে আমি তোমাকে শাস্তি দিতাম।তাফসীরে কুরতুবি ৭:৬৮
মাজমাউজ জাওয়াইদ হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত আছে, ইবনু আসিম ছিলেন বনু তামিম গোত্রের নেতা। মুসলমান হওয়ার পর মহানবী ﷺ এর দরবারে হাজির হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি নিজ হাতে আমার আট কন্যাকে জীবন্ত কবর দিয়েছি।
কায়েসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এতগুলো কন্যা হত্যা করতে তোমার মায়া লাগেনি? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ, অবশ্যই লেগেছে। একটি মেয়ের জন্য ব্যথা লেগেছে সবচেয়ে বেশি। কারণ মেয়েটিকে গর্তে ফেলে আমি গর্তটি ভরাট করছিলাম, যখন বুক পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলি, তখন মেয়েটি তার দুই হাত বাড়িয়ে আমার দাড়িগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলেছে, আহা! আব্বাজান, আপনার দাড়িতে ধূলি লেগেছে। তখন মেয়েটিকে গর্তে ফেলতে অন্তরে একটু ব্যথা লেগেছিল। পরে দ্রুত গর্তটি পূর্ণ করে চলে আসি।
কায়েসকে আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন,আর কোনো কন্যার জন্য কি আপনি ব্যথা পেয়েছেন? তিনি তখন বললেন, হ্যাঁ, আমার আরেকটি কন্যার জন্য বড় ব্যথা পেয়েছি। সে ছিল খুবই সুন্দরী। তার মুখের হাসি ছিল মিষ্টি, কথা ছিল হৃদয়গ্রাহী। আমি যখন তাকে গর্তে ফেলে মাটি ফেলতে লাগলাম, তখন অশ্রুজলে তার গণ্ডদেশ প্লাবিত হতে থাকে এবং আমার দিকে তাকিয়ে হৃদয়বিদারক ভাষায় বলতে থাকে, আব্বাজান! আমি আপনার কাছে কী অপরাধ করেছি, কী জন্য আমাকে হত্যা করছেন? তখন আমার কোনো উত্তর ছিল না, আমি দ্রুত মাটি ফেলে গর্ত ভরাট করে চলে আসি।
আরেকজন কন্যা হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,আমার স্ত্রীকে আমি গর্ভাবস্থায় রেখে ব্যবসা নিয়ে সফরে গেলাম।বহুদিন পর ফিরে এলে স্ত্রী জানাল যে একটি মৃত সন্তান হয়েছিল। অতঃপর বছর দুয়েক পর ঘরে ফুটফুটে একটি মেয়ে দেখে জানতে চাইলে স্ত্রী জানাল যে এই মেয়ে আমাদেরই এবং আমি জীবন্ত কবর দেব এই ভয়ে সে তাকে কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে বড় করেছে। আমি তাকে আদর করলাম। কিন্তু আমি যেহেতু ছিলাম গোত্রের সরদার, আমার জাহেলি চিন্তা ছিল ভিন্ন। তাই একদিন তাকে বেড়াতে যাব বলে নিয়ে চললাম, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গর্ত খোঁড়া শুরু করলাম, মেয়েটি গর্ত থেকে মাটি তুলে আমাকে সাহায্য করছিল। হায়, সে তখনো জানতে পারেনি যে নিজের কবর সে নিজেই খুঁড়ছে। মাটি এসে আমার দাড়িতে লাগছিল আর মেয়েটি তা ঝেড়ে দিচ্ছিল। অবশেষে গর্ত খোঁড়া শেষ হলে আমি মেয়েটির হাত-পা বাঁধতে শুরু করলাম। সে তখন বুঝে ফেলেছিল যে তাকে আমি হত্যা করতে যাচ্ছি।
সে কেঁদে কেঁদে বলছিল, আব্বা, আমি আপনাকে আমার বাবা বলে কারো কাছে পরিচয় দেব না, আমাকে মেরে ফেলবেন না আব্বা। আমি তার কথায় কান না দিয়ে তাকে নির্মমভাবে গর্তের মধ্যে ফেলে দিলাম। তারপর তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য একটি বড় পাথর তার বুক বরাবর ছুড়ে মারলাম। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আর মেয়েটির সর্বশেষ যে আর্তনাদটি আমি শুনতে পেলাম তা হলো, হে আব্বা! তার বর্ণনা শুনে দয়াল নবির পবিত্র চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। নবিজিﷺ কায়স ইবন আসিমের কথা শুনে প্রত্যেক কন্যার বিনিময়ে একটি দাস মুক্ত করার কথা বলেন। কায়স বললেন, আমি অনেক উটের মালিক। তখন রাসুল ﷺ বলেন, প্রতিজনের বিনিময়ে একটি উট দান করে দাও। মাজমাউজ জাওয়াইদ ৭: ১৩৪
‘ইসলামের ইতিহাস’গ্রন্থে গ্রন্থকার লিখেন,বনু তামিম এবং কুরাইশদের মধ্যে কন্যা হত্যার সমধিক প্রচলন ছিল। তারা এজন্যে রীতিমত গর্ববোধ করতো এবং তাদের জন্যে সম্মানের প্রতীক বলে বিশ্বাস করতো। কোন কোন পরিবারে এ পাষণ্ডতা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, মেয়েরা যখন বেশ বড় হয়ে যেতো এবং মিষ্টি কথা বলতে শুরু করতো, তখন পাঁচ ছ বছর বয়সে তাকে সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত করে পিতা তাকে লোকালয়ের বাইরে নিয়ে যেতো। পাষণ্ড পিতারা পূর্বেই সেখানে গিয়ে গর্ত খুড়ে আসত এবং পরে মেয়েকে সেখানে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে গর্তে ফেলে দিত। মেয়ে তখন অসহায় অবস্থায় চীৎকার করে করে তার কাছে সাহায্য চাইতো, কিন্তু পাষণ্ড পিতা তার দিকে বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ঢিল ছুড়ে ছুড়ে তাকে হত্যা করতো বা জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে নিজ হাতে কবর সমান করে দিয়ে নির্বিকারে ঘরে ফিরে আসতো। আপন কলিজার টুকরা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার জন্য করার জন্য সে রীতিমত গর্ববোধ করতো। দেখুন: নজিবাদী, আকবর শাহ খান, ইসলামের ইতিহাস, ১৬৮; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আগারগাও, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা, ২য় সংস্করণ, জুন, ২০০৮
লায়স রহ. বলেন, হিশাম তাঁর পিতা সূত্রে তিনি আসমা বিনতে আবু বকর রাদি. হতে বর্ণনা করতে গিয়ে আমার কাছে লিখছেন যে, তিনি (আসমা) বলেন, আমি দেখলাম যায়দ ইবনু আমর ইবনু নুফায়ল কাবা শরীফের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বলছেন, হে কুরাইশ গোত্র, আল্লাহর কসম, আমি ব্যতীত তোমাদের কেউ-ই দ্বীনে
ইবরাহিমের উপর নেই। যেসব কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়ার জন্য নেয়া হত তাদেরকে তিনি বাঁচাবার ব্যবস্থা করতেন। যখন কোন লোক তার কন্যা সন্তানকে হত্যা করার জন্য ইচ্ছা করত, তখন তিনি এসে বলতেন, হত্যা করো না, আমি তার জীবিকার ব্যয়ভার গ্রহণ করবো। এ বলে তিনি শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতেন। শিশুটি বড় হলে তার পিতাকে বলতেন, তুমি যদি তোমার কন্যাকে নিয়ে যেতে চাও, তাহলে আমি দিয়ে দেব। আর তুমি যদি নিতে না চাও, তবে আমিই এর সকল ব্যয় ভার বহন করে যাব। বুখারি ৩৮২৭
দাহিয়াতুল কালবি মুসলমান হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন. তুমি মুসলমান হয়েছ। আল্লাহপাক তোমার সব গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন। সাহাবী দাহিয়াতুল কালবি দুই চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলেন, হে রাসুলুল্লাহ ﷺসব গোনাহ মাফ হতে পারে কিন্ত একটি গোনাহ আমার মাফ হবে না।
দাহিয়াতুল কালবীর স্ত্রী তার অজান্তে একটি কন্যা সন্তান লালন করছিলেন।মেয়েটির রূপ-চেহারায় তিনিও পিতৃস্নেহে অভিভূত হয়ে গেলেন। জাহেলিয়ার নীতি তাকে বারবার তাড়া করতে লাগল এই বলে যে তুমি আরবের বুকে মেয়েসন্তান জীবন্ত কবর দেওয়া দলের সরদার হয়ে পিতৃস্নেহের কাছে হেরে গেলে? পরিশেষে বাধ্য হয়ে মিথ্যা ছলনায় তিনি স্ত্রীকে বললেন, মেয়েকে সুন্দর ও পরিপাটি করে সাজিয়ে দাও। তাকে নিয়ে বেড়াতে যাব। মেয়েটিকে নিয়ে মরুময় পথ ধরে অনেক দূরে চলছি। মরুময় পথে আমি ও আমার সন্তানই যাত্রী। মেয়েটি বলল, আব্বা, আমাকে একটু পানি দিন। বললাম, মা, একটু অপেক্ষা করো। এ সুযোগেই আমার কবর দেওয়ার লুকায়িত যন্ত্রপাতি বের করে মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম। কবর অনেক গভীর করে উপরে উঠে এলাম। মেয়েটি তৃষ্ণার্ত নয়নে আমার পানে তাকিয়ে দেখছিল। মেয়েকে বললাম, দেখো তো মা, পানি উঠেছে কি না? মেয়েটি অধীর আগ্রহে তাকাতেই দুই চোখ বন্ধ করে মেয়েকে কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে মাটি দিতে শুরু করি। হে আল্লাহর রাসুল ﷺ! মেয়েটির সেই কান্না আর আমাকে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকার শব্দ আমার কানে আজও বাজে।
হে আল্লাহর রাসুল ﷺ! কন্যাসন্তানদের জীবিত কবর দেওয়ার যে পাপ আমি করেছি, এমন পাপ নিয়ে ইসলাম কি আমাকে গ্রহণ করবে? দাহিয়াতুল কালবি রাদি. এর কথা শুনে দয়াল নবির দুই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। অহি না আসা পর্যন্ত তিনি কোনো কথা বললেন না।
তিনি চুপ করে থাকলেন, এমন সময় জিবরাইল আ. আগমন করেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসুল ﷺ! আপনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করুন, পবিত্র দ্বীন ইসলাম বিগত জীবনের সব পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়। এ ঘোষণার পর দাহিয়াতুল কালবি রাদি. পবিত্র দ্বীন ইসলামে দাখিল হন।
জাহেলিয়াত সমাজ দূর করার জন্য নবিজি ﷺ এর কর্মসূচি
১. শিরক ও বহুদেবতার প্রথা দূর করা। নবিজি ﷺ তাওহিদ প্রচার করে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জাহেলিয়াত সমাজে মানুষ বিভিন্ন প্রতিমার পূজা করত। নবিজি ﷺ শিক্ষিত ও উদার দৃষ্টিতে মানুষের মন পরিবর্তন করে একমাত্র আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করাতেন। إِنَّالدِّينَعِندَاللَّهِالإِسْلَامُ
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ধর্ম হলো ইসলাম। সুরা আল-ইমরান৩:১৯
২. মদ্যপান ও জুয়া বন্ধ করা। মদ্যপান ও জুয়া সমাজে হিংসা, অপরাধ ও আর্থিক ক্ষতির কারণ। নবিজি ﷺ এই প্রথা দূর করে নৈতিকতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেন। মানুষকে সচেতন করে দিতেন, যাতে তারা ন্যায়পরায়ণ ও স্বচ্ছ জীবন যাপন করে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَالأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ,মদ্যপান, জুয়া, প্রতিমা শয়তানের কাজ। তাই এগুলো পরিহার কর। যাতে তুমি সফল হও। সুরা মায়িদাহ, ৫:৯০
৩. নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জুলুম দূর করা। নবিজি ﷺ নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিলেন। জাহেলিয়াত সমাজে নারীরা সামাজিক ও পারিবারিক অধিকারের থেকে বঞ্চিত ছিল। নবিজি ﷺ শিক্ষা দিতেন, নারীর সঙ্গে সদাচরণ করা ও তাদের সম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
নারীদের সঙ্গে সদাচরণ কর। সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৮
৪. সততা ও প্রতারণা দূর করা।নবিজি ﷺ মানুষকে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি আহ্বান করতেন। মিথ্যা ও প্রতারণা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি করে। তিনি শিক্ষিত করতেন যে সত্য বলাই ঈমানের চাবিকাঠি।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।সুরা আত-তাওবাহ৯:১১৯
৫. দরিদ্র ও অনাথদের সহায়তা। নবিজি ﷺ দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার জন্য দান, জাকাত ও সহায়তা প্রচার করতেন। দরিদ্র ও অনাথদের যত্ন নেওয়া নৈতিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য অংশ। এটি সমাজে সৌহার্দ্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَا أَنْفَقَ أَحَدٌ نَفَقَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا رُدَّتْ عَلَيْهِ
যে কেউ আল্লাহর পথে দান করে, তা অবশ্যই তার জন্য ফেরত আসে। সহিহ বুখারি ১৪০৭
৬. যুদ্ধ ও প্রতিশোধের নিয়ন্ত্রণ। নবিজি ﷺ শান্তি ও সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করতেন। জাহেলিয়াত সমাজে প্রতিশোধ ও খুনখারাবি প্রচলিত ছিল। তিনি ক্ষমা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে সংঘাত কমাতে মানুষকে উৎসাহিত করতেন।
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
ভালো ও মন্দ সমান নয়; মন্দের জবাব দাও যা উত্তম।সুরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪
৭. অশ্লীলতা ও অনৈতিক আচরণ দূর করা। নবিজি ﷺ সমাজে নৈতিকতা, সংযম ও শালীনতা প্রতিষ্ঠা করতেন। জাহেলিয়াত সমাজে অশ্লীলতা, গালি-গালাজ ও অবৈধ সম্পর্ক প্রচলিত ছিল। তিনি শিক্ষা দিতেন শালীন আচরণ ও সংযমই নৈতিক সমাজের ভিত্তি। وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
অশ্লীলতার কাছে যেও না। এটি ভয়ঙ্কর পাপ এবং মন্দ পথ। সুরা ইসলাম, ১৭:৩২
৮. বিচার ব্যবস্থায় সততা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।নবিজি ﷺ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনের সততা প্রচার করতেন। জাহেলিয়াত সমাজে শক্তিশালী ও ক্ষমতাধরদের পক্ষপাত ও অন্যায় বিচার প্রচলিত ছিল। তিনি নিশ্চিত করতেন বিচার সর্বজনীন, নিরপেক্ষ ও আল্লাহর নির্দেশিত। وَأَحْكُم بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ
তাদের মধ্যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিচার কর।সূরা আন-নিসা, ৪:৫৯
৯. সহমর্মিতা ও সামাজিক ঐক্য বৃদ্ধি। নবিজি ﷺ মানুষকে একতা, ভাইভাব ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতেন। জাহেলিয়াত সমাজে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সংঘাত প্রচলিত ছিল। তিনি শিক্ষিত করতেন, একে অপরের প্রতি দয়া ও সমর্থনই সমাজের শক্তি।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: الْمُؤْمِنُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ
ঈমানদারগণ যেন এক দেহের মতো।সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৩৮
১০. অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করা। নবিজি ﷺ শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচার করতেন। জাহেলিয়াত সমাজে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হতো। তিনি মানুষকে পড়াশোনা, চিন্তাশীলতা ও আল্লাহর নির্দেশে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দিতেন।
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
তোমার প্রভুর নামে পড়ো, যিনি সৃষ্টি করেছেন।সূরা আল-আলাক৯:১
১১. সব সৃষ্টির প্রতি দয়া করা। নবিজিﷺ মানুষকে দয়া, সংযম ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার শিখাতেন। জাহেলিয়াত সমাজে পশুপাখি ও পরিবেশের অনিয়মিত ব্যবহার প্রচলিত ছিল। তিনি শিক্ষিত করতেন, দয়া ও সংযম সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ
যে কেউ দয়া করে না, তাকেও দয়া করা হবে না।সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৯০
১২. অহিংসা ও দয়া প্রতিষ্ঠা। নবিজি ﷺ মানুষকে সহিষ্ণু ও শান্তিপ্রিয় হতে শিক্ষা দিতেন। জাহেলিয়াত সমাজে হিংসা, প্রতিশোধ ও সংঘাত প্রচলিত ছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে শান্তি ও ক্ষমা প্রচার করে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা বৃদ্ধি করতেন।
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ
যারা রাগ দমন করে এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে।সুরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নবিজির নির্দেশনা
১. সদাচরণ ও মর্যাদা প্রদর্শন।নবিজি ﷺ নারীর সঙ্গে সদাচরণ ও তাদের মর্যাদা রক্ষা করতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। জাহেলিয়াত সমাজে নারীরা সামাজিকভাবে অবহেলিত ও নিপীড়িত ছিল। নবিজি ﷺ নারীকে পূর্ণ অধিকার প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ন্যায় ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
নারীদের সঙ্গে সদাচরণ কর। সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৮
২. নারীর পারিবারিক ও সম্পত্তি অধিকার রক্ষা।নারীর সম্পত্তি, যৌথ পরিবারের সম্পদ ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাহেলিয়াত সমাজে নারীদের সম্পত্তি ও অধিকার হরণ করা হত। নবিজি ﷺ ইসলামের মাধ্যমে নারীর আইনসম্মত অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন।
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, পুত্রের অংশ হবে কন্যার সমান। সুরা আননিসা, ৪:১১
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা: নারীর অংশাধিকার হরণ করা জাহেলিয়াত সমাজের একটি বড় অন্যায় ছিল। নবিজি ﷺ ইসলামের মাধ্যমে নারীকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রদান করেছে।
৩. শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের অধিকার।নবিজি ﷺ নারীর শিক্ষা অর্জনের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। জাহেলিয়াত সমাজে নারীদের শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। নবিজি ﷺ বলেন, নারীর শিক্ষার অধিকার পুরুষের সমান।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺطَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ وَمُسْلِمَةٍ
জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারী উভয়ের জন্য ফরজ। সহিহ ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২০
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা: নবিজি ﷺ নারীর শিক্ষার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সমাজে জ্ঞান ও নৈতিকতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছেন।
৪. বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে অধিকার। নবিজি ﷺ নারীর বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে সম্মান, সম্মতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জাহেলিয়াত সমাজে নারীর সম্মতি বিয়েতে গুরুত্ব পেত না।
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
নারীদের তাদের অধিকার দাও এবং সম্মানসহ আচরণ কর। সুরা বাকারাহ, ২:২৩৮
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা: নবিজি ﷺ নারীর মতামত ও সম্মতি বিয়েতে অপরিহার্য। এটি নারীকে সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মান দেয়।
৫. শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা।নবিজি ﷺ নারীকে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। জাহেলিয়াত সমাজে নারীকে প্রায়শই নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হতো।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺالْمُسْلِمُونَ كُلُّهُمْ رَاعٍ وَكُلُّهُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
সমস্ত মুসলিম একে অপরের রক্ষক, এবং প্রত্যেকে তার দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করবে। সহিহ বুখারি ৮৯৭
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা: নবিজি ﷺ শিক্ষিত করতেন, পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব।
শেষ কথা: আজ আমরা যদি আবার জাহেলিয়াতের অন্ধকারে না ফিরতে চাই, তবে রাসুল ﷺ এর সুন্নাহ ও নির্দেশনার দিকে ফিরে আসতে হবে। তাহলেই আমরা জাহেলি আচার- আচরণ ও কালচার থেকে বের হয়ে দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতে চির সুখের জান্নাত লাভ করতে পারবো। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জাহালত থেকে হিফাজত করে হিদায়াত ও আলোর পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
الْخُطْبَةُ الْأُولَىٰ: حَقِيقَةُ الْجَاهِلِيَّةِ بَيْنَ الْأَمْسِ وَالْيَوْمِ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِلْإِسْلَامِ، وَأَخْرَجَنَا بِهِ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، بَعَثَهُ اللَّهُ بَشِيرًا وَنَذِيرًا، وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا.
أَمَّا بَعْدُ! فَقَدْ كَانَتِ الْجَاهِلِيَّةُ زَمَانَ الْجَهْلِ وَالضَّلَالِ وَعِبَادَةِ الْأَوْثَانِ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: ﴿أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ﴾
وَكَانَ النَّاسُ فِيهَا يَظْلِمُونَ الضُّعَفَاءَ وَيَأْكُلُونَ الرِّبَا وَيَقْتُلُونَ الْأَوْلَادَ. وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ، مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ
فَجَاءَ الْإِسْلَامُ بِالْعَدْلِ وَالتَّوْحِيدِ، وَأَبْطَلَ مَفَاخِرَ الْجَاهِلِيَّةِ وَعَصَبِيَّتَهَا. فَيَا أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ! اتَّقُوا اللَّهَ وَاحْذَرُوا مِنْ أَخْلَاقِ الْجَاهِلِيَّةِ وَفِتَنِهَا.
أَيُّهَا الْإِخْوَةُ الْكِرَامُ! إِنَّ الْجَاهِلِيَّةَ لَيْسَتْ مُجَرَّدَ حَقْبَةٍ زَمَنِيَّةٍ مَضَتْ وَانْقَضَتْ، بَلْ هِيَ حَالَةٌ فِكْرِيَّةٌ وَأَخْلَاقِيَّةٌ تَعُودُ كُلَّمَا ابْتَعَدَ النَّاسُ عَنْ شَرْعِ اللَّهِ وَهَدْيِ رَسُولِهِ ﷺ. وَإِنَّنَا الْيَوْمَ نَشْهَدُ صُوَرًا كَثِيرَةً مِنْ جَاهِلِيَّةِ الْأَمْسِ قَدْ عَادَتْ بِقَالَبٍ جَدِيدٍ وَمُسَمَّيَاتٍ مُعَاصِرَةٍ؛ فَقَدْ ظَهَرَ الرِّبَا فِي الْمُعَامَلَاتِ الْمَالِيَّةِ، وَفَشَا الظُّلْمُ وَأَكْلُ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُؤْمِنِينَ﴾
كَمَا عَادَتِ الْعَصَبِيَّةُ الْقَوْمِيَّةُ وَالْقَبَلِيَّةُ الَّتِي تُفَرِّقُ الأُمَّةَ، وَانْتَشَرَتِ الْفَوَاحِشُ وَالتَّبَرُّجُ الَّذِي حَذَّرَنَا اللَّهُ مِنْهُ فَقَالَ: ﴿وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ﴾ [الأحزاب. بَلْ إِنَّ الإِجْهَاضَ وَقَتْلَ الْأَطْفَالِ بِدَعْوَى الْفَقْرِ أَوْ الْحُرِّيَّةِ هُوَ عَيْنُ وَأْدِ الْبَنَاتِ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ﴾ [الإسراء
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لاَ يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ فِي الأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ، وَالاِسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ»
وَلِلنَّجَاةِ مِنْ هٰذِهِ الْجَاهِلِيَّةِ الْمُعَاصِرَةِ وَعِلَاجِهَا، يَبْقَى الطَّرِيقُ وَاحِدًا لاَ ثَانِيَ لَهُ:
· الرُّجُوعُ إِلَى الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ: التَّمَسُّكُ الصَّادِقُ بِهَدْيِ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ وَسُنَّةِ النَّبِيِّ ﷺ فِي سَائِرِ شُؤُونِ الْحَيَاةِ، قَالَ ﷺ: «تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
· إِخْلَاصُ التَّوْحِيدِ لِلَّهِ: نَبْذُ جَمِيعِ صُوَرِ الشِّرْكِ وَالتَّبَعِيَّةِ لِلأَهْوَاءِ وَالأَفْكَارِ الْمُنْحَرِفَةِ، وَتَحْكِيمُ شَرَعِ اللَّهِ فِي الْفَرْدِ وَالْمُجْتَمَعِ.
· التَّزْكِيَةُ وَالأَخْلَاقُ: إِحْيَاءُ قِيَمِ الْعَدْلِ، وَالرَّحْمَةِ، وَالأُخُوَّةِ الإِسْلَامِيَّةِ، وَتَرْكُ الْفَخْرِ وَالْعَصَبِيَّةِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: ﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ﴾ [الحجرات: فَاتَّقُوا اللَّهَ عِبَادَ اللَّهِ، وَاحْذَرُوا فِتَنَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَاعْمَلُوا بِهَدْيِ نَبِيِّكُمْ، تَسْعَدُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
بَارَكُ اللَّهُ لِي وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ، وَنَفَعَنِي وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيهِ مِنَ الْآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيمِ. أَقُولُ قَوْلِي هٰذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ لِي وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ، فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
الْخُطْبَةُ الثَّانِيَةُ: النَّبِيُّ ﷺ رَحْمَةٌ لِلْعَالَمِينَ وَعِلَاجُ الْجَاهِلِيَّةِ
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ، وَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَلِيُّ الصَّالِحِينَ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، أَرْسَلَهُ اللَّهُ رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ. اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ.
أَمَّا بَعْدُ! فَيَا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ، اتَّقُوا اللَّهَ تَعَالَىٰ وَأَطِيعُوهُ، وَاعْلَمُوا أَنَّ خَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ ﷺ.
أَيُّهَا الْمُسْلِمُونَ! إِذَا كَانَتِ الْجَاهِلِيَّةُ تَسْعَى إِلَى نَشْرِ الظُّلْمِ وَالْفَسَادِ وَالْعَصَبِيَّةِ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَىٰ قَدْ بَعَثَ نَبِيَّهُ مُحَمَّدًا ﷺ بِالرَّحْمَةِ وَالْعَدْلِ لِيُخْرِجَ النَّاسَ مِنْ تِلْكَ الظُّلُمَاتِ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَىٰ: ﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ﴾.
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «إِنَّمَا أَنَا رَحْمَةٌ مُهْدَاةٌ» [رواه الحاكم وصححه].
فَبِالرَّحْمَةِ النَّبَوِيَّةِ تَقُومُ الْمُجْتَمَعَاتُ، وَتَزُولُ أَمْرَاضُ الْجَاهِلِيَّةِ الْمُعَاصِرَةِ مِنْ قَسْوَةٍ وَظُلْمٍ وَقَطِيعَةٍ. وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمٰنُ، ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ» [رواه الترمذي].
فَاتَّقُوا اللَّهَ عِبَادَ اللَّهِ، وَتَمَسَّكُوا بِأَخْلَاقِ نَبِيِّكُمْ، وَتَخَلَّقُوا بِالرَّحْمَةِ وَالتَّوَاضُعِ، وَانْبِذُوا الْفَخْرَ وَالْكِبْرَ وَمَعَاصِيَ الْجَاهِلِيَّةِ.
ثُمَّ صَلُّوا وَسَلِّمُوا عَلَى الْبَشِيرِ النَّذِيرِ، فَقَدْ أَمَرَكُمُ اللَّهُ بِذٰلِكَ فَقَالَ: ﴿إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا﴾
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، الْأَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالْأَمْوَاتِ. اللَّهُمَّ أَعِزَّ الْإِسْلَامَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَأَذِلَّ الشِّرْكَ وَالْمُشْرِكِينَ. اللَّهُمَّ اهْدِنَا لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ لَا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلَّا أَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنَّا سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنَّا سَيِّئَهَا إِلَّا أَنْتَ.
عِبَادَ اللَّهِ! ﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ﴾ النحل: فَاذْكُرُوا اللَّهَ الْعَظِيمَ يَذْكُرْكُمْ، وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ. وَأَقِمِ الصَّلَاةَ.