তাফবীজে তালাক: স্বামীর স্বাক্ষরের পর কাজী কাবিন নামার ১৮ নম্বর কলামে ‘হ্যাঁ’ পূরণ করলে তাফওয়ীযে তালাক কার্যকর হবে কি?
প্রশ্ন : কাবিননামার ১৮ নম্বর শর্তে স্ত্রী নিজে তালাক দিলে তা কার্যকর হবে কি? ইসলামী শরিয়তের বিধান
আসসালামু আলাইকুম, একজন মেয়ের তার স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়, মেয়ের অভিযোগ সে অন্যত্র পরোকীয়া করেছে কিন্তু অন্য সূত্রে জানা যায় সে আসলে আরেকটা বিয়ে করেছে। বিষয়টা মেয়ের বাপের বাড়িতে জানানো হলে তার বাবা এবং দুলাভাই ওই মেয়ের শ্বশুর বাড়ি আসে এবং মেয়েকে বাপের বাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর বেশ কিছু দিন স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ ছিল না প্রায় ১ বছর। মেয়ের শ্বশুর প্রায় ১ বছর পর তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য মেয়ের বাপের বাড়িতে আসে। কিন্তু তারা তাদের মেয়েকে দেয় না। এরপর স্বামী ওই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করে সংসার করার জন্য তাকে বুঝিয়ে বলে, এমনকি এক পর্যায়ে তার কাছে ক্ষমা ও চায়, এবং ভরণপোষণও দিতে চায়। উল্লেখ্য, তাদের দুটো সন্তানও আছে। কিন্তু মেয়ে বিষয়টা তার বোনকে জানায়। তার বোন তার স্বামী অর্থাৎ মেয়ের দুলাভাইকে জানালে সে মানা করে দেয়। তাদের দুজনের নির্দেশে মেয়ে তাকে ক্ষমা করে না এবং ভরণপোষণ নিতে অস্বীকার করে। এভাবে তার স্বামী আবারও তার কাছে ক্ষমা চায় কিন্তু সে ক্ষমা না করে তার সাথে যোগাযোগের নাম্বার পরিবর্তন করে ফেলে এবং সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় মেয়ের দুলাভাইয়ের নির্দেশে। ওই সময় মেয়ের শ্বশুর জীবিত ছিলেন না এবং স্বামী তখন বিদেশে ছিলেন। ওই মেয়ের কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে ছিল ছেলে যদি ভরণপোষণ না দেয় তাহলে সে তালাক নিতে পারবে। এই শর্ত ব্যবহার করে তার দুলাভাইয়ের নির্দেশে সে নিজের পরিবারের মা এবং বোনকে সাক্ষী রেখে সে ডিভোর্সের মাধ্যমে তালাক প্রদান করে, যা কিনা মেয়ের পিতার কাছ থেকেও গোপন করা হয় কারণ তিনি সংসার ভাঙতে চাচ্ছিলেন না। মেয়ের স্বামী বিষয়টি তখনও জানে না কারণ সে বিদেশে ছিল। এই কথাগুলো মেয়ে নিজে বলেছে। উপরের বিবরণে মেয়ে যে কথাগুলো বলেছে তার কল রেকর্ডও আছে।
মেয়ের দুলাভাই একবার স্বাভাবিক আলোচনায় একথা বলেছে যে কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামটি খালি ছিল, বিয়ের পরবর্তীতে ওটা কাজী নিজে লিখে দিয়েছে। আবার যখন আমার সাথে মনোমালিন্য হয় তখনও ফোনে আমাকে বলেছে, কাবিননামায় ১৮ নম্বর কলামটি খালি ছিল, বিয়ের পরবর্তীতে ১৮ নম্বর কলামটি কাজী নিজে লিখে দিয়েছে। ১৮ নম্বর কলামের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়ের দুলাভাইয়ের দাবি হচ্ছে, সেখানে তো স্বামীর স্বাক্ষর আছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে
১) কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে তো লেখা ছেলে যদি নিজ ইচ্ছায় ভরণপোষণ না দেয় কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে মেয়ে নিজেই বাপের বাড়ি চলে এসেছে, ছেলের সাথে সংসার করতে অস্বীকার করে এবং নিজেই সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাহলে ওই শর্ত ব্যবহার করে এই এক পাক্ষিক তালাক হলো কিনা?
২) মেয়ের দুলাভাইয়ের কথা অনুযায়ী এটা বোঝা যায় ছেলে মেয়েকে তাফওয়ীযে তালাকের অধিকার সজ্ঞানে দেয়নি, ওটা কাজী নিজ ইচ্ছায় লিখে দিয়েছে। তাহলে তাফওয়ীযে তালাকের ক্ষমতা ব্যবহার করে যে সে তালাক দিল, এটা তালাক হলো কিনা?
৩) এর প্রায় ৩ মাস পর মেয়ের দুলাভাই ওই মেয়ের সাথে আমার বিবাহ দেন। আমার বিয়েটা জায়েজ হলো কিনা?
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় যদি প্রকৃতপক্ষে এ মর্মে ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে যে, স্বামী নিজ ইচ্ছায় ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করতে পারবে, তাহলে সেই ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষ। সেই শর্ত পাওয়া গেলে তালাক গ্রহণের অধিকার পাবে অন্যথায় নয়। আর (শরয়ি কারণ ছাড়া স্বামীর আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া) হয়ে থাকে, তাহলে তার ভরণপোষণ স্বামীর ওপর আবশ্যক থাকে না।
সুতরাং প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহিত সাংসারিক জীবনে যথাযথ ভরণপোষণ পাওয়ায় এমনিভাবে স্ত্রী নিজেই স্বামীর অনুমতি ছাড়া পিত্রালয়ে চলে গেছে, স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে অস্বীকার করেছে এবং যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় সে নাশিজা (শরয়ি কারণ ছাড়া স্বামীর আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া) হয়ে যাওয়ায়, তার ভরণপোষণ স্বামীর ওপর আবশ্যক নয়। অতএব, যে কারণের ওপর তালাক গ্রহণের ক্ষমতা নির্ভরশীল ছিল—অর্থাৎ স্বামীর পক্ষ থেকে ভরণপোষণ না দেওয়া—তা এখানে পাওয়া যায়নি।
অতএব এখানে প্রমাণিত হয় যে ১৮ নম্বর ধারার ক্ষমতা ছিল “স্বামী ভরণপোষণ না দিলে স্ত্রী তালাক গ্রহণ করতে পারবে”, আর স্বামী ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেননি; বরং স্ত্রী নিজেই স্বামীর সঙ্গে থাকা ও যোগাযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে—তাহলে উক্ত শর্ত বিদ্যমান হয়নি। বিধায় সে তালাক গ্রহণের অধিকার না পাওয়ার কারণে তার ডিভোর্স কার্যকর হয়নি। বরং তার প্রথম বিবাহ বহাল আছে। উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ শরিয়তিভাবে বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহ হয়নি।
উল্লেখ্য: নিকাহনামায় স্বামীর দস্তখতের সময় ১৮ নম্বর কলামে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ লেখা না থাকলেও আমাদের প্রচলিত উরফ অনুযায়ী এভাবে খালি রেখে দস্তখত করার অর্থ হলো, স্বামীর পক্ষ থেকে তা পূরণ করার দায়িত্ব নিকাহ রেজিস্ট্রারের ওপর ন্যস্ত করা। স্বামীর পক্ষ থেকে নিকাহ রেজিস্ট্রার তা পরবর্তীতে পূরণ করবেন। সাধারণত এ জন্যই তা খালি রাখা হয়। সুতরাং এ উরফ বা প্রচলনের কারণে নিকাহ রেজিস্ট্রার পরবর্তীতে সেখানে ‘হ্যাঁ’ হিসেবে তা স্বামীর দিকেই সম্পাদিত করেন এবং স্ত্রী তালাকের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। যেহেতু উপরে বর্ণিত শর্ত পাওয়া যায়নি, তাই সেটার আলোকে তালাকের অধিকারও পায়নি।
الادلة الشرعية
البناية في شرح الهداية،٥/٤٩٨
( وإن نشزت فلا نفقة لها حتى تعود إلى منزله لأن فوت الاحتباس منها ) تفسيرالناشرة والناشصة هي المانعة نفسها عن زوجها بغير حق. وقيل لشريح هل للناشزة من نفقة، فقال نعم ، فقيل كم ، فقال جواب من تراب معناه لا نفقة لها وإذا كان الرجل يسكن في الأرض المغصوبة ، فخرجت المرأة لأجل أنه يسكن في الغصوبة لا تكون ناشزة لأنها محقةونقل في خلاصة الفتاوى عن فتاوي النسفي لو كان الزوج بسمر قند وامرأته بنسف فيبعث إليها أجنبيا ليحملها إلى سمرقند فلم تذهب لعدم المحرم يفرض لها النفقة
الفتاوى الهندية (١/٤٢٠)
واذا اضافه الى شرط وقع عقيب الشرط مثل ان يقول لامراته ان دخلت الدار فانت طالق هذا بالاتفاق لان الملك قائم في الحال والظاهر بقائه الى وقت وجود الشرط لان الاصل بقاء الشيء على ما كان وهو استصحاب الحال
الهداية (١/٣٨٥)
واذا اضافه الى الشرط وقع عقيب الشرط اتفاقا مثل ان يقول لامراته ان دخلت الدار فانت طالق
الموسوعة الفقهية (١٢/٣٠٠)
يكون التعليق بكل ما يدل على ربط حصول مضمون جملة بحصول مضمون جملة اخرى فقول الزوج لزوجته ان دخلت الدار فانت طالق فقد رتب وقوع الطلاق على دخولها الدار فان دخلت وقع الطلاق والا فلا
و الله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে
মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা