জুমার বয়ান রবিউল আউয়াল

দেখতে যেমন ছিলেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  (তৃতীয় জুমা - সিরাত- ৩)


শায়খ উবাইদ উসমান 

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক 

মুহতারাম মুসল্লিয়ানে কেরাম!এই ধূলি-ধূসরিত পৃথিবীতে অতিবাহিত হয়েছে হাজারো-কোটি দিবস-রজনী। যুগে যুগে অগণন মানুষের কল্লোলে মুখরিত হয়েছে পৃথিবীর আলো-বাতাস। আবার পার্থিব জীবনের নির্ধারিত হায়াত শেষে মানুষ শুরু করে পরকালের অনন্ত সফর। পৃথিবীর সূচনা থেকে আজ অবধি দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ আখিরাতের অনন্ত জীবনের মুসাফির হয়েছেন, সেই সংখ্যা নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে দুরূহ ও অসম্ভব ব্যাপারআসা-যাওয়ার এই মিছিলে শত- কোটি মানুষের মধ্যে যারা মহত কাজের মাধ্যমে নিজেদের পদচিহ্ন পৃথিবীতে রেখে গিয়েছেন, বিভিন্ন মানবহিতৈষী ও কল্যাণমূলক কর্ম দ্বারা ধরণীকে ঋদ্ধ করে গেছেন, কেবল তাদের জীবনী বইপত্রে বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুগল, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, ব্রিটানিকা, মুসলিম স্কলার্স কিংবা ইন্টারনেট আর্কাইভের মতো মাধ্যমে সংরক্ষিত আছেতবে পৃথিবীর সচরাচর বিখ্যাত মনীষীদের নিয়ে চর্চা ও আলোচনা তাঁদের তিরোধানের পর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত চালু থাকে; এরপরপঞ্চাশ বছর বা শতাব্দীকাল পর মানুষের হৃদয় থেকে তাঁদের চর্চা ধীরে ধীরে গলে যাওয়া মোমবাতির মতো শেষ হয়ে যায়।  

কিন্তু একজন মহামানব, যাঁর সীরাত রচনা, অনুপম জীবন নিয়ে আলোচনা এবং যাঁর আদর্শ অনুসরণকারীর সংখ্যা দিন দিন কেবল জ্যামিতিক হারেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এমন কোনো দিন বা মুহূর্ত নেই, যেদিন কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে পরম শ্রদ্ধায় যাঁর নাম উচ্চারিত হয় না। প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্তে যাঁর স্তুতিগাঁথায় উচ্চকিত হয় ধরণীর আকাশ-বাতাস। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে যে বিপুল পরিমাণ গবেষণা ও আলোচনা হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো মনীষীকে নিয়ে এর সিকিভাগও আলোচনা হয়নি- হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

মানুষ একজনই, মক্কার ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশে জন্ম, বাল্যকালেই আল-আমীনউপাধিতে ভূষিত হওয়া, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন, হেরা গুহার নিভৃত ধ্যানমগ্নতা, মক্কার তাওহিদি দাওয়াত, তায়েফের রক্তস্নাত ত্যাগ, মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত, বদরের প্রান্তর, বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বজগতে মিরাজ সফর, পুনরায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন এবং পরিশেষে বিদায় হজ। একই প্রিয় ইতিহাস বহু মুখে, বহুজনে, বহু শতাব্দী ধরে বাতাসের তরঙ্গে তরঙ্গে ধ্বনিত হচ্ছে; তবু যেন তা সদা নতুন, কেবলই সিরাতের বলা শুরু; মনে হয় কেবল খানিকটা লেখা হলো, আর অলেখিত থেকে গেল অগণিত অধ্যায়; কিছু বলা হলো, অথচ অনুচ্চারিত রয়ে গেল বহুকিছু! প্রাণপ্রিয় নবীজি এর আলোকিত জীবন বিশ্ব-উম্মাহর মাঝে এভাবেই বিপুল প্রাচুর্যতায় চর্চিত হয়ে আসছে তাঁর ওফাতের পর থেকে, আর ইনশাআল্লাহ তা অব্যাহত থাকবে কিয়ামত অবধি।

নবীজি এর জীবনী আলোচনার প্রধানত দুটি দিক রয়েছে।

সিরাত:সিরাতশব্দের অর্থ জীবনচরিত। রাসুলুল্লাহ এর জীবনকালের ধারাবাহিক ঘটনাবলি, অর্থাৎ জন্ম থেকে নিয়ে ওফাত পর্যন্ত ঐতিহাসিক জীবনের যে সাধারণ বিবরণ আমরা দেখি, তা-ই মূলত সিরাতনামে পরিচিত। এ সংক্রান্ত গ্রন্থাবলিকে সিরাতগ্রন্থ বলা হয়

শামায়েল:নবী জীবনের অপর একটি অনুপম দিক হলো শামায়েলসহজ কথায়, নবীজি এর দৈহিক গঠন, বাহ্যিক অবয়ব এবং শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাকে শামায়েল' বলা হয়

আজকে আমরা প্রিয় নবীজি এর সেই মোবারক শামায়েলবা অবয়ব-সৌন্দর্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

সম্মানিত মুসল্লিয়ান!নবীজি যেমন মনোহরী চরিত্রমাধুর্যে অতুলনীয় ছিলেন, তেমনি দৈহিক অবয়বের দিক দিয়েও ছিলেন এক অতলস্পর্শী ও অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী। ভাগ্যবান সাহাবায়ে কেরাম প্রিয় নবীজিকে নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তবে যাঁরা তাঁকে সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি, সেই অতৃপ্ত উম্মাহর হৃদয়ে নবীজির রূপ-অবয়ব ফুটিয়ে তোলার জন্য এবং কল্পনার ক্যানভাসে তাঁর নুরানি আকৃতি অনুভব করার উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত নিখুঁত ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিবরণ সংরক্ষণ করে গেছেন।

ভূমিকা আর দীর্ঘায়িত না করেআসুন- প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবায়ে কেরামের ভাষ্যে আমরা নবীজি এর দৈহিক গঠন ও রূপ-সৌন্দর্যের গভীরতায় প্রবেশ করি।

নবীজির উচ্চতা, মুখ ও চুলের বর্ণনা

রাসুল উচ্চতা, মুখ ও চুলের বর্ণনা প্রসঙ্গে হজরত আলি রাদি. বলেন,

عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَكَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَيْسَ بِالطَّوِيلِ الْمُمَغْطِ، وَلَا بِالْقَصِيرِ، وَكَانَ رَبْعَةً مِنَ الْقَوْمِ، لَمْ يَكُنْ بِالْجَعْدِ وَلَا السَّبْطِ، كَانَ جَعْدًا رَجِلًا، وَلَمْ يَكُنْ بِالْمُطَّهَمِ وَلَا بِالْمُكَلْثَمِ، وَكَانَ فِي وَجْهِهِ تَدْوِيرٌ

রাসুলুল্লাহ অতিরিক্ত লম্বা ছিলেন না, খাটোও ছিলেন না। তিনি ছিলেন মধ্যম দেহ কাঠামোর। তাঁর চুল একেবারে কোঁকড়া ছিল না, একেবারে সোজাও নয়-বরং মাঝারি। তিনি অতি মোটা বা গাল ফোলা ছিলেন না। তাঁর মুখমণ্ডলে ছিল গোলাকার ভাবসুনানুত তিরমিজি ৩৬৩৮

নবীজির শরীরের রঙের বর্ণনা

হজরত আনাস রাদি. নবীজির শরীরের রঙের বর্ণনায় বলেন,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلا بِالأَبْيَضِ الأَمْهَقِ وَلا بِالآدَمِ

তিনি ধবধবে ফ্যাকাশে সাদাও ছিলেন না, আবার একদম তামাটে বা শ্যামলাও ছিলেন না।সহিহুল বুখারি ৩৫৪৮, সহিহ মুসলিম ২৩৪৭

নবীজি লালচে ফর্সা ছিলেন,

عَنْ عَلِيٍّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبْيَضَ مُشْرَبًا بِحُمْرَةٍ

হজরত আলি রাদি. বলেন, নবীজি এর গায়ের রং ছিল লালচে-ফর্সা। অর্থাৎ এমন ফর্সা রং যার মধ্যে হালকা গোলাপি বা লালচে ভাব ছিল।শামায়েলে তিরমিজি ৪, সুনানে তিরমিজি ৩৬৩৮

রাসুলুল্লাহ এর কপাল ও ভ্রূ মোবারকের বৈশিষ্ট্য

রাসুলুল্লাহ এর কপাল ছিল সুপ্রশস্ত, উজ্জ্বল ও আলোকময়হজরত হিন্দ ইবনে আবি হালা রাদি. বলেন,

عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ... وَاسِعَ الْجَبِينِ

রাসুলুল্লাহ  সুপ্রশস্ত কপাল বিশিষ্ট ছিলেনতাবারানি ২২: ১৫৫

রাসুলুল্লাহ এর ভ্রূ জোড়া ছিল কুচকুচে কালো, সুন্দর বাঁকানো ও সুবিন্যস্ত ছিলহিন্দ ইবনে আবি হালা রাদি. এর বর্ণনায় এসেছে,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ... أَزَجَّ الْحَوَاجِبِ، سَوَابِغَ فِي غَيْرِ قَرَنٍ، بَيْنَهُمَا عِرْقٌ يُدِرُّهُ الْغَضَبُ

রাসুলুল্লাহ   এর ভ্রূ জোড়া ছিল সরু, সুদীর্ঘ ও ধনুকের মতো চমৎকার বাঁকানো। তবে তা আপসে সংলগ্ন বা জোড়া লাগানো ছিল নাআর দুই ভ্রূর মাঝখানে একটি সূক্ষ্ম রগ ছিল, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাগ প্রকাশ করলে ফুলে উঠত। আশ শামায়িলুল মুহাম্মাদিয়্যাহ ৮

উম্মে মাবাদ রাদি. থেকে বর্ণিত অপর একটি রেওয়ায়েতে ভ্রূ সংযুক্ত হওয়ার বর্ণনা এসেছে,

أزَجُّ أقرَنُ

ধনুকের মতো বাকানো সুবিন্যস্ত, সরু ও ঘন জোড়া ভ্রূবিশিষ্ট। শরহুস সুন্নাহ ৩৭০৪

মুহাদ্দিস ও সিরাত বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসুলুল্লাহ এর দুই ভ্রূর মাঝখানে কোনো চুল ছিল না, অর্থাৎ বাস্তবে ভ্রূ দুটি পৃথক ছিল। তবে ভ্রূ মোবারক অত্যন্ত ঘন, দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত হওয়ায় দূর থেকে এক নজরে দেখলে জোড়া মনে হতো। তাই উভয় বর্ণনা আপন স্থানে সঠিক, দুই হাদিসের বর্ণনায় কোনো বিরোধ নেই।

নবীজি এর দাড়ি-গোঁফ কেমন ছিল

সাহাবি হজরত বারা ইবনু আযিব রাদি. বলেন,

عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَثَّ اللِّحْيَةِ

রাসুলুল্লাহ এর দাড়ি ঘন ছিল । মুসনাদু আহমাদ ৬৮৪

নবীজির দাড়ি বড় ছিল,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ، وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদি. বলেন, নবীজি বলেছেন, মুশরিকদের বিরোধিতা করো; গোঁফ ছোট করো আর দাড়ি বড় রাখো। সহিহুল বুখারি ৫৮৯২

কয়েকটি দাড়ি সাদা হয়েছিল,

حَدَّثَنَا حَرِيزُ بْنُ عُثْمَانَ، أَنَّهُ سَأَلَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بُسْرٍ صَاحِبَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: أَرَأَيْتَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ شَيْخًا؟ قَالَ: كَانَ فِي عَنْفَقَتِهِ شَعَرَاتٌ بِيضٌ‏

হারিয ইবনে উসমান রাহি. থেকে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রাদি. কে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেছেন? তিনি বললেন, তাঁরআনফাকাহ-তে (নিচের ঠোঁট ও থুতনির মধ্যবর্তী স্থানের দাড়িতে) কয়েকটি সাদা চুল ছিল। সহিহুল বুখারি ৩৫৪৬

মধ্যম শারীরিক গঠন ও কাঁধ প্রশস্ত ছিল

عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ مَرْبُوعًا، بَعِيدَ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ

হজরত বারা ইবনে আযিব রাদি. বলেন, রাসুলুল্লাহ ছিলেন মধ্যম দেহ কাঠামো বিশিষ্ট, প্রশস্ত কাঁধওয়ালা। সহিহুল বুখারি ৩৫৫১

 

কেশরাশির সৌন্দর্য

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কেশরাশি ছিল অতুলনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক। তাঁর চুল পুরোপুরি সোজা ছিল না, আবার কোকড়ানোও ছিল না; বরং ছিল মাঝামাঝি ঢেউখেলানোছিল চুল ছিল ঘন ও দীপ্তিময়, যেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর দেহ কাঠামোর প্রতিটি অঙ্গের মতো কেশকেও পূর্ণতা দিয়েছেন।

হজরত কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ হজরত আনাস রাদি. কে নবীজি এর কেশরাশি সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন, কেশ হালকা কোকড়ানো ছিল,

عَنْ قَتَادَةَ ، قَالَ : قُلْتُ لأَنَسٍ : كَيْفَ كَانَ شَعْرُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ قَالَ : لَمْ يَكُنْ بِالْجَعْدِ , وَلا بِالسَّبْطِ

কাতাদা রাহি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ এর কেশ কেমন ছিল সে সম্পর্কে আমি আনাস রাদি. এর নিকট জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, তিনি অত্যাধিক কোকড়ানো কিংবা একেবারে সোজা কেশবিশিষ্ট ছিলেন না। সহিহ মুসলিম ৬২১৩

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন পদ্ধতিতে চুল রাখতেন

আসুন, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের বর্ণনা থেকেই তা জেনে নিই। নবীজি এর দশ বৎসরের সোহবতপ্রাপ্ত সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদি. বলেন,

عَنْ أنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : كَانَ شَعْرُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى نِصْفِ أُذُنَيْهِ

নবীজি এর চুলগুলো কানের মাঝখান পর্যন্ত লম্বা ছিল। নাসায়ি শরিফ ৫২৩৪

আনাস ইবনে মালিক রাদি. থেকে অপর বর্ণনায় আছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ شَعَرُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى شَحْمَةِ أُذُنَيْهِ

আল্লাহর রাসুএর চুল মোবারক তাঁর দুই কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছাত। সুনানু আবি দাউদ ৪১৮৫

অপর হাদিসে হজরত বারা ইবনে আযেব রাদি. বলেন,

لَهُ شَعْرٌ يَضْرِبُ مَنْكِبَيْهِ

নবীজি এর কেশগুচ্ছ কাঁধ বরাবর ছিল। সহিহ মুসলিম ৬২১১

প্রলম্বিত কেশগুচ্ছ নবীজি পরিপাটি করে রাখতেন।

হজরত আবু রিমসা রাদি. থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি এর খেজাব ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বলেন,

وَرَأَيْتُ الشَّيْبَ أَحْمَرَ

তখন আমি তার কেশ লাল দেখলাম।শামায়েলে তিরমিজি ৩৮

নবীজি চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি করে রাখতেন, আয়েশা রাদি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: إِنْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُحِبُّ التَّيَمُّنَ فِي طُهُورِهِ إِذَا تَطَهَّر ، وَفِي تَرَجُّلِهِ إِذَا تَرَجَّلَ ، وَفِي انْتِعَالِهِ إِذَا انْتَعَلَ

রাসুলুল্লাহ যখন অজু করতেন তখন ডান দিক থেকে শুরু করতেন, কেশ বিন্যাস ও জুতা পরিধানের কাজও ডান দিক থেকে আরম্ভ করতেন। সহিহ মুসলিম ৬৩৯

বারবার চুল আঁচড়াতেন না,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ ، قَالَ : نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عنِ التَّرَجُّلِ , إِلا غِبًّا

আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রাদি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ প্রত্যেহ (বারবার) কেশ বিন্যাস করতে নিষেধ করেছেন। আবু দাউদ ৪১৬১

কিছু চুল সাদা হয়েছিল

কাতাদা রাহি. হজরত আনাস রাদি. এর কাছে নবীজির খেজাব ব্যবহার করা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলেন,

عَنْ قَتَادَةَ ، قَالَ : قُلْتُ لأَنَسِ بْنِ مَالِكٍ : هَلْ خَضَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ قَالَ لَمْ يَبْلُغْ ذَلِكَ ، إِنَّمَا كَانَ شَيْبًا فِي صُدْغَيْهِوَلَكِنْ أَبُو بَكْرٍ ، خَضَبَ بِالْحِنَّاءِ وَالْكَتَمِ

কাতাদা রাহি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনে মালিক রাদি. কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুলুল্লাহ কি খেজাব ব্যবহার করতেন? তিনি বললেন, তিনি ঐ পর্যন্ত পৌঁছেননি। (তাঁর দাঁড়ি ও চুল এতদূর সাদা হয়নি, যাতে খেযাবের প্রয়োজন হয়)। কেবলমাত্র তাঁর চোখ ও দুকানের মধ্যবর্তী অংশের কিছু চুল সাদা হয়েছিল। তবে আবু বকর রাদি. মেহেদি পাতা ও কাতাম দ্বারা খেজাব লাগাতেন। সহিহ মুসলিম ৬২১৯

চুল-দাড়ি মিলিয়ে কয়টি চুল সাদা হয়েছিল সাহাবায়ে কেরাম তাও গণনা করেছিলেন। হজরত আনাস রাদি. থেকে বর্ণিত ,

فأقامَ بمَكَّةَ عَشْرَ سِنِينَ، وبِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ، فَتَوَفّاهُ اللَّهُ وليسَ في رَأْسِهِ ولِحْيَتِهِ عِشْرُونَ شَعْرَةً بَيْضاءَ

অতঃপর তিনি মক্কায় দশ বছর এবং মদিনায় দশ বছর অবস্থান করেন। তারপর আল্লাহ তাঁর ওফাত দান করেন, আর তখন তাঁর মাথা ও দাড়িতে বিশটিও সাদা চুল ছিল না। সহিহুল বুখারি ৩৫৪৮

আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, চুল-দাড়ি-পরিচর্যা সবকিছুতেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং মার্জিত সৌন্দর্য বজায় রাখা সুন্নাহ। বাহ্যিক সৌন্দর্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো অন্তরের পবিত্রতা। নবীজি উভয় সৌন্দর্যের ব্যাপারে সজাগ ছিলেন। ভণ্ড মাজার পুজারি যারা মাথার চুল জটলা পাকিয়ে মাথাকে মাসের পর মাস চুল ধৌত না করে দুর্গন্ধযুক্ত করে রাখে দুয়েক কথায় তাদের ভণ্ডামি সম্বন্ধে আলোকপাত করা।

হাত-পা, হাত-পায়ের গিঁট, আঙ্গুল, মাথার বর্ণনা, পশমহীন বুক, বুক থেকে নাভি পর্যন্ত সরু রেখা

যখন কেউ নবীজিকে দেখত, তার চোখ অন্য কারও দিকে ফিরতে চাইত না। তাঁর শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য ছিল না। তাঁর আঙ্গুলগুলো ছিল পরিপূর্ণ, যেখানে সৌন্দর্য ও শক্তির ছাপ একসাথে ফুটে উঠত। মাথা ছিল কিছুটা বড়, যা ব্যক্তিত্বের মহিমাকে আরো উজ্জ্বল করে তুলত। হাত-পায়ের গিঁটগুলো ছিল মোটা, যেন একজন পূর্ণাঙ্গ ও দৃঢ়চেতা পুরুষের প্রতিচ্ছবি। তাঁর বুকে ঘন পশম ছিল না, বরং বুক থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সরু রেখা নেমে গিয়েছিল- যেন পরিমিত সৌন্দর্যের স্বাক্ষর। 

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু। আহ্ সৌভাগ্য! জীবনে কতশত বার নবীজির স্পর্শে ধন্য হয়েছেন, নবীজিকে দেখে দেখে চোখ শীতল করেছেন, নবীজির দেহ মোবারক তার কাছে চিরচেনা। তিনি রাসুলুল্লাহ এর দৈহিক গঠনের কথা বলেছেন হৃদয় বিগলিত পরম ভালোবাসায়, এভাবে বলছেন যেন নবীজি সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন, আর তিনি দেখে দেখে বলছেন,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالطَّوِيلِ وَلَا بِالْقَصِيرِ، شَثْنُ الْكَفَّيْنِ وَالْقَدَمَيْنِ، ضَخْمُ الرَّأْسِ، ضَخْمُ الْكَرَادِيسِ، طَوِيلُ الْمَسْرُبَةِ، إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ تَكَفُّؤًا كَأَنَّمَا يَنْحَطُّ مِنْ صَبَبٍ، لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ

হযরত আলি ইবনে আবি তালিব রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম অতিরিক্ত দীর্ঘকায় (অত্যন্ত লম্বা) ছিলেন না এবং একদম বেঁটেও ছিলেন না। তাঁর দুই হাতের তালু ও দুই পা ছিল মাংসলতাঁর মাথা মোবারক ছিল সুগঠিত ও বড়, এবং শরীরের প্রধান জোড়া বা অস্থি সন্ধিগুলো ছিল মজবুত ও প্রসারিত।  

তাঁর বুক থেকে নাভি পর্যন্ত চুলের একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘ রেখা বিস্তৃত ছিল। তিনি যখন হাঁটতেন, তখন সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে সতেজ ও দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটতেন; যেন তিনি কোনো উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে নামছেন। আমি তাঁর পূর্বে কিংবা পরে তাঁর মতো সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কাউকে দেখিনি।মুসনাদু আহমাদ ৭৪৬

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশেষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন হজরত আবু তোফায়েল রাদি. হজরত আবু সাঈদ জুরাইরি রাহি. তার থেকে বর্ণনা করেন,

عَنْ سَعِيدٍ الْجُرَيْرِيِّ قَالَ : سَمِعْتُ أَبَا الطُّفَيْلِيَقُولُ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَا بَقِيَ عَلَى وَجْهِ الأَرْضِ أَحَدٌ رَآهُ غَيْرِي ، قُلْتُ : صِفْهُ لِي ، قَالَ : كَانَ أَبْيَضَ , مَلِيحًا , مُقَصَّدًا

হজরত সাইদ আল-জুরাইরিরাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু তুফাইল রাদি. কে বলতে শুনেছি, আমি নবীজিকে দেখেছি এবং বর্তমানে ভূ-পৃষ্ঠে আমি ছাড়া আর এমন কেউ জীবিত নেই যিনি তাঁকে দেখেছেন। (বর্ণনাকারী সাইদ বলেন) আমি বললাম, আমার কাছে তাঁর সৌন্দর্য ও অবয়বের বিবরণ দিন।তিনি বললেন, তিনি ছিলেন ফর্সা রঙের, অত্যন্ত সুদর্শন ও মাঝারি গড়নের ছিলেনসহিহ মুসলিম ৬২১৮

বুক থেকে নাভি পর্যন্ত লোমের রেখা

عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: … أَجْرَدُ، ذُو مَسْرُبَةٍ

হজরত আলি রাদি. বলেন, নবীজি এর শরীরে অতিরিক্ত লোম ছিল না। বুক থেকে নাভি পর্যন্ত সরল একটি লোমের রেখা ছিল।তিরমিজি৩৬৩৮

পেট ছিল সমান, ঝুলন্ত বা মোটা নয়

হিন্দ ইবনে আবি হালা রাদি. থেকে বর্ণিত,

وَصَفَ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَقَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ فَخْمًا مُفَخَّمًا، يَتَلَأْلَأُ وَجْهُهُ تَلَأْلُؤَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ … بَادِنٌ مُتَمَاسِكٌ

 রাসুলুল্লাহ ছিলেন মর্যাদাসম্পন্ন, তাঁর মুখ ছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিময়তিনি ছিলেন মাংসল দেহের, কিন্তু শরীর দৃঢ় (অর্থাৎ পেট বড় বা ঝুলন্ত ছিল না)।শরহুসসুন্নাহ৩৭০৫; আলমুজামুলকাবির২২: ১৫৫

নবীজিএরবাচনভঙ্গি

রাসুলুল্লাহ এর বাচনভঙ্গি ছিল অপরূপ, হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল। তাঁর মুখ থেকে যে শব্দ বের হতো, তা ছিল স্পষ্ট, পরিমিত এবং হৃদয়কে ছুঁয়ে যেত। তিনি কখনো দ্রুত, গুছানো ছাড়া কথা বলতেন না; আবার অতিরিক্ত ধীরভাবে কথা বলতেন না, বরং তিনি এমনভাবে বলতেন যে, প্রতিটি শব্দ যেন শ্রোতার অন্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করে। তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল অথচ দৃপ্ত, শান্ত অথচ শক্তিশালী। মানুষ যখন তাঁর কথা শুনত, মনে হতো এই কথা কোনো সাধারণ মানুষের নয়- বরং হিদায়াতের আলোতে পরিপূর্ণ এক ভাষণ। তাঁর প্রতিটি বাণীতে থাকতো আবেগের প্রয়োজন ছাড়াই হৃদয়কে আন্দোলিত করার ক্ষমতা। এ জন্য সাহাবায়ে কেরাম বলতেন, রাসুল এর প্রতিটি শব্দ আমরা গণনা করতে পারতাম, কারণ তা ছিল স্পষ্ট, পরিশুদ্ধ ও প্রভাবশালী।

আয়েশা রাদি. ইরশাদ করেন,

عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْرُدُ سرْدَكُمْ هَذَا ، وَلَكِنَّهُ كَانَ يَتَكَلَّمُ بِكَلامٍ بَيِّنٍ فَصْلٍ ، يَحْفَظُهُ مَنْ جَلَسَ إِلَيْهِ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের ন্যায় চটপটে তথা অস্পষ্টভাবে তাড়াতাড়ি কথা বলতেন না, বরং তাঁর প্রতিটি কথা ছিল সুস্পষ্ট। আর শ্রোতারা খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারত। মুসনাদু আহমাদ ২৬২৫২

গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার বলতেন

আনাস ইবনে মালিক রাদি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , يُعِيدُ الْكَلِمَةَ ثَلاثًا لِتُعْقَلَ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কথা তিনবার বলতেন, যাতে ( শ্রোতারা) ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। মুজামুস সগির ৯১২১

নবীজি এমনভাবে কথা বলতেন যে, প্রতিটি শব্দ পরিষ্কার বোঝা যেত। এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা হলো,অযথা দ্রুত বা অস্পষ্টভাবে কথা না বলামানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় স্পষ্টভাবে, পরিমিতভাবে এবং মার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলা উচিত। উত্তেজনা বা বিরক্তির পরিবর্তে ধৈর্য, মাধুর্য এবং সত্যকে তুলে ধরা উচিত।

নবীজি যেভাবে হাঁটতেন

নবীজির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল পরিমিত, প্রতিটি চলন ছিল দৃঢ়তা, বিনয় এবং মহত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। তিনি অহংকারভরে মাথা উঁচু করে হাঁটতেন না, আবার দুর্বল ও অসহায় ভঙ্গিতে পা টেনে হাঁটতেন না। বরং তাঁর হাঁটাচলা ছিল এমন যে, মনে হতো যেন তিনি ঢালু পথ বেয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।

তাঁর পদক্ষেপ ছিল লম্বা ও সুসংহত, কিন্তু তাড়াহুড়ো নয়; ছিল দৃঢ়, কিন্তু গর্ব নয়হজরতআলি রাদি. বলেন,

عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ تَكَفُّؤًا، كَأَنَّمَا يَنْحَطُّ مِنْ صَبَبٍ

রাসুলুল্লাহ যখন হাঁটতেন তখন সামান্য ঝুঁকে দৃঢ়ভাবে হাঁটতেন। মনে হতো যেন তিনি ঢালু পথ বেয়ে নামছেন। মুসনাদু আহমাদ ৭৪৬

দ্রুত হাঁটতেন, কিন্তু তাতে তাড়াহুড়ো ছিল না, আবু হুরাইরা রাদি. বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَسْرَعَ فِي مَشْيَتِهِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، كَأَنَّمَا الأَرْضُ تُطْوَى لَهُ، وَإِنَّا لَنُجْهِدُ أَنْفُسَنَا وَإِنَّهُ لَغَيْرُ مُكْتَرِثٍ

আমি রাসুলুল্লাহ এর মতো দ্রুত চলতে কাউকে দেখিনি। মনে হতো জমিন যেন তাঁর জন্য গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতাম তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে, অথচ তিনি পরম স্বাভাবিক ও ভাবলেশহীনভাবে হাঁটতেন। সুনানুততিরমিজি৩৬৪৮

উপরোক্ত হাদিস থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলো গ্রহণ করতে পারি

১. হাঁটার ভঙ্গিও একজন মানুষের চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে।

২. রাসুল আমাদের শিখিয়েছেন- চলার সময় অহংকার কিংবা দুর্বলতার ভঙ্গি না দেখিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

৩. মানুষের সামনে নিজেদের আচরণ এমন হতে হবে, যাতে তা বিনয় ও শক্তি- দুটিরই নিদর্শন হয়

৪. ঢালু পথ বেয়ে নামার মতো হাঁটাঅর্থাৎ, সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটা।

যেমন পোশাক পরিধান করতেন

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমল সৌন্দর্য সম্বন্ধে হজরত জাবের ইবনে সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ ، قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فِي لَيْلَةٍ إِضْحِيَانٍ ، وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ ، فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ ، فَلَهُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنَ الْقَمَرِ

আমি একবার পূর্ণিমা রাত্রির স্নিগ্ধ আলোতে রাসূলুল্লাহ কে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। তখন আমি একবার তাঁর দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম। মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে অধিকতর সুন্দর। মুস্তাদরাকে হাকেম ৭৩৮৩

পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে নবীজি কামিসসর্বাধিক পছন্দ করতেন। হজরত উম্মু সালামা রাদি. বলেন,

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ ، قَالَتْ : كَانَ أَحَبَّ الثِّيَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقَمِيصُ

রাসুলুল্লাহ পোশাক হিসেবে  কামিস বা জামা সর্বাধিক পছন্দ করতেন। সহিহুল বুখারি ৩৬৬৫, শামায়েলে তিরমিজি ৪৪

এই হাদিস সহ অন্যান্য হাদিসের আলোকে এখানে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যামূলক কিছু কথা বলা জরুরি মনে করছি। রাসুলুল্লাহ বিভিন্ন ধরনের জামা পরিধান করতেন। তার কোনটির দৈর্ঘ্য ছিল টাখনু অবধি। কোনটি কিছুটা ছোট, যা হাঁটুর নিম্নভাগ পর্যন্ত ছিল। আবার কোনটির হাতা ছিল হাতের আঙ্গুলের প্রান্ত পর্যন্ত লম্বা। কোনটির হাতা কিছুটা ছোট, যা কব্জি পর্যন্ত ছিল।

পুরুষের পোশাক পরিধানের ব্যাপারে  একটি বিশেষ দিক অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছেনতিনি পুরুষের পোশাকের নিচের অংশ পায়ের গোড়ালি থেকে উপরে রাখার আদেশ করেছেন এবং গোড়ালির নিচে পাজামা, লুঙ্গি, জামা বা কোন পোশাক পরিধান করতে হারাম ঘোষণা করেছেন।

নবীজি এর লুঙ্গি-পায়জামা ও জামা টাখনুর উপরে থাকত। সাধারণত তিনি পোশাকের নিচের অংশ হাঁটু ও গোড়ালির বরাবর বা নিসফে সাক পর্যন্ত পরিধান করতেন। বিভিন্ন হাদিসে তিনি মুসলিম উম্মাহর পুরুষগণকে এভাবে পোশাক পরিধান করতে আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং মুসলিম পুরুষের জন্য স্বেচ্ছায় টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করা হারাম। আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও অন্যান্য সাহাবি কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ যে ব্যাক্তি দাম্ভিকতার সাথে নিজের পোশাক ঝুলিয়ে পরিধান করবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। সহিহুল বুখারি ৩৬৬৫

আমাদের প্রিয় নবীজি এর পোশাক ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও সাদাসিধে। তিনি ইচ্ছা করলেই রাজকীয় পোশাক পরিধান করতে পারতেন, কিন্তু দামি পোশাক কোনো হাদিয়া এলে তা অন্যদের বিলিয়ে দিতেন এবং নিজে সাধারণ পোশাকে সন্তুষ্ট থাকতেন।

 

পরিচ্ছন্নতা:পোশাক সাধারণ হলেও তা সর্বদা ধোয়া, পরিষ্কার ও পরিপাটি থাকত। প্রয়োজন হলে তিনি নিজ হাতে তালি দেওয়া কাপড়ও পরিধান করেছেন। তিনি পশমি পোশাকও পরিধান করতেন।

পরিবেশ ও সুবিধা অনুযায়ী পোশাকের বৈচিত্র্য

রাসুলুল্লাহ  সবসময় এক ধরনের পোশাক পরতেন না; বরং আবহাওয়া, সফর ও স্থানভেদে বিভিন্ন পোশাক পরিধান করেছেন।

লাল চাদর, শামদেশের জুব্বা, চাদর, সুতি কাপড়ের কবজি পর্যন্ত হাতাবিশিষ্ট ঢিলেঢালা কামিস, লুঙ্গি, পায়জামা, পাগড়ি-মাথার সাথে মিশে থাকা টুপি, চামড়ার মোজা পরিধান করতেন। সাদা কালার বেশি পছন্দ করতেন। ডান দিক থেকে পরিধান করতেন।

যেমন ছিল মোহরে নবুওয়াত

আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে একটি বিশেষ নিদর্শন দান করেছিলেন, যা পৃথিবীর আর কোনো মানুষের ছিল না। তাঁর দুই কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে ছিল সেই অলৌকিক চিহ্ন- মোহরে নবুওয়াত। এটি ছিল তাঁর সত্য নবুওয়াতের প্রমাণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ স্বাক্ষর। সাহাবায়ে কেরাম যখন নবীজিকে দেখতেন, তখন কেবল তাঁর মুখমণ্ডল নয়, শরীরের প্রতিটি অংশেই প্রশান্তি ও অলৌকিকতার ছাপ অনুভব করতেন। আর সেই মোহরে নবুওয়াত যেন তাদের অন্তরে নিশ্চিত করে দিত যে, এই মহান ব্যক্তি নিছক একজন মানুষ নন; তিনি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল। এটি ছিল ছোট একটি মাংসপিণ্ড, চারপাশে কিছু লোম ছিল, যেটা তাঁকে আলাদা বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করত। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহে মোহরে নবুওয়াতের কথা বর্ণিত হয়েছে।

সায়িব ইবনে ইয়াযিদ রাদি. হতে বর্ণিত,

عَنِ الْجَعْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ، قَالَ : سَمِعْتُ السَّائِبَ بْنَ يَزِيدَ , يَقُولُ : ذَهَبَتْ بِي خَالَتِي إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فَقَالَتْ  يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ ابْنَ أُخْتِي وَجِعٌ . فَمَسَحَ رَأْسِي وَدَعَا لِي بِالْبَرَكَةِ ، وَتَوَضَّأَ ، فَشَرِبْتُ مِنْ وَضُوئِهِ ، وَقُمْتُ خَلْفَ ظَهْرِهِ ، فَنَظَرْتُ إِلَى الْخَاتَمِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ ، فَإِذَا هُوَ مثل زِرِّ الْحَجَلَةِ 

হজরত সায়িব ইবনে ইয়াজিদ রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমার খালা আমাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ এর কাছে গেলেন। এরপর তিনি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল ! আমার ভাগ্নে অসুস্থ। তখন তিনি আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন। তারপর তিনি অজু করলেন। আমি তাঁর অজুর অবশিষ্ট পানি পান করলাম এবং তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সহসা তাঁর দুকাঁধের মধ্যস্থ মোহরে নবুওয়াতের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে, যা দেখতে পাখির (কবুতরের) ডিমের মতোসহিহুলবুখারি ১৯০; মুসলিম ৬২৩৩

রাসুল এরজুতা মোবারক

নবীজি দুই ফিতাবিশিষ্ট জুতা পরিধান করতেন। হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍقَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قِبَالانِ , مَثْنِيٌّ شِرَاكُهُمَا

রাসুলুল্লাহ এর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। ইবনে মাজাহ ৩৬১৪ শামায়েলে তিরমিজি৫৯

এক পায়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। হয়তো দুই জুতা পরবে, নয়তো উভয় জুতা খোলে ফেলবে।

কেন নিষেধ করেছেন?

১. অসমতা ও অশোভন ভঙ্গি থেকে রক্ষা- এক পায়ে জুতা পরে হাঁটা মানুষের চলনকে অসম ও বেখাপ্পা করে ফেলে, যা শালীনতা ও সৌন্দর্যের পরিপন্থী।

২. শরীরের ক্ষতি ও ভারসাম্যহীনতা এড়ানো-চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে এক পায়ে জুতা পরলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়, মেরুদণ্ড, কোমর বা হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে। নবীজি আমাদের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেও দূরে রেখেছেন।

ইসলাম শুধু বড় ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার দিকেই নজর দেয়নি, বরং মানুষের ছোট ছোট দৈনন্দিন অভ্যাসকেও সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। রাসুল আমাদের শিখিয়েছেন যে, একজন মুসলমানের চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ-সবকিছুতেই সৌন্দর্য, শালীনতা ও ভারসাম্য থাকা উচিত।

প্রতিদিন রাতে সুরমা ব্যবহার করতেন

 চোখের যত্নে প্রতিদিন রাতে সুরমা ব্যবহার করতেন। ইবনে আব্বাস রাদি. বলেন,রাসুল

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : اكْتَحِلُوا بِالإِثْمِدِ , فَإِنَّهُ يَجْلُو الْبَصَرَ ، وَيُنْبِتُ الشَّعْرَ وَزَعَمَ  أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , كَانَتْ لَهُ مُكْحُلَةٌ يَكْتَحِلُ مِنْهَا كُلَّ لَيْلَةٍ , ثَلاثَةً فِي هَذِهِ ، وَثَلاثَةً فِي هَذِهِ

নবীজি বলেছেন, তোমরা ইছমিদ সুরমা ব্যবহার করো। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে ও পরিষ্কার রাখে এবং অধিক ভ্রু উৎপন্ন করে

ইবনে আব্বাস রাদি. আরো বলেন, নবীজি এর একটি সুরমাদানী ছিল। প্রত্যেক রাত্রে (ঘুমানোর পূর্বে)ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন।সুনানুল কুবরা লিল ইমাম বাইহাকি: ৮৫১,শামায়েলে তিরমিজি  ৪১

কি আংটি পরতেন এবং কিভাবে পরতেন

 রাসুল রুপার আংটি পরিধান করতেন। স্বর্ণের আংটি পুরুষদের জন্য হারাম করেছেন। সবসময় আংটি পরতেন না। ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আংটি পরতেন। কখনো বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলেও পরতেন। আংটির পাথর হাতের তালুর দিকে থাকতো। মধ্যম ও শাহাদাত আঙ্গুলে আংটি পরতে নিষেধ করেছেন। 

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : كَانَ خَاتَمُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ وَرِقٍ ، وَكَانَ فَصُّهُ حَبَشِيًّا

আনাস ইবনে মালিক রাদি. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি রাসুল  রূপার আংটি ব্যবহার করতেন। আর তাঁর আংটিতে আবিসিনীয় পাথর বসানো ছিল। আবু দাউদ ৪২১৮  

নবীজি ডান হাতে আংটি পরিধান করতেন। হজরত আলি রাদি. বলেন,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَيَلْبَسُ خَاتَمَهُ فِي يَمِينِهِ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাতে আংটি পরিধান করতেন। আবু দাউদ ৪২২৮ শামায়েলে তিরমিজি ৭৫

ঘাম ওশরীরের সুবাস

হজরত আনাস রাদি. বলেন,

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: مَا مَسَسْتُ حَرِيرًا وَلا دِيبَاجًا أَلْيَنَ مِنْ كَفِّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلا شَمَمْتُ رِيحًا قَطُّ أَوْ عَرْفًا قَطُّ أَطْيَبَ مِنْ رِيحِ أَوْ عَرْفِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

আমি রাসুলুল্লাহ এর হাতের তালুর চেয়ে বেশি মোলায়েম ও নরম কোনো রেশম বা রেশমি কাপড় স্পর্শ করিনি। আর আমি নবীজির শরীরের সুবাসের চেয়ে সুন্দর ও মিষ্টি কোনো সুগন্ধি বা ঘ্রাণ কখনো নিইনি। সহিহ বুখারি ৩৫৬১, সহিহ মুসলিম ২৩৩০

নবজির ঘাম মুক্তোর মতো উজ্জ্বল ও সুবাস মেশকের চেয়ে তীব্র ছিল, হজরত আলি রাদি. থেকে বর্ণিত,

كَأَنَّمَا عَرَقٌ فِي وَجْهِهِ اللُّؤْلُؤُ، لَرِيحُ عَرَقِهِ أَطْيَبُ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ

তাঁর চেহারার ঘাম যেন মুক্তাদানার মতো চকমক করত, আর তাঁর শরীরের ঘামের সুবাস ছিল মেশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক চমৎকার। সুনানুত তিরমিজি ৩৬৩৭

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লজ্জাশীলতা

নবীজি পর্দানশীল লজ্জাশীলা কুমারী মেয়ের চেয়েও বেশী লজ্জাবোধ করতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদি. বলেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَشدَّ حَيَاءً مِنَ الْعَذرَاءِ فِي خِدْرِهَا ، وَكَانَ إِذَا كَرِهَ شَيْئًا عَرَفْنَاهُ فِي وَجْهِهِ

রাসুলুল্লাহ পর্দানশীল কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোন কিছু তাঁর অপছন্দ হলে তাঁর চেহারা দেখেই আমরা তা বুঝতে পারতাম। সহিহুল বুখারি ৬১০২ শামায়েলে তিরমিজি ২৭৫  

নবীজি এর শানে হাসসান বিন সাবেত রাদি. এর প্রসিদ্ধ কবিতা

নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্দর্য অনুপম। কলমের আঁচড়ে সেই সৌন্দর্যের চিত্র আঁকা কখনো সম্ভব নয়। তাইতো নবীজিএর ব্যক্তিগত কবি হাসসান ইবনে সাবিত রাদি. নবীজির স্তুতিগাথায় শত শত লাইন লিখার পর সর্বশেষ বলেছেন,

وأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي  وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ

 خُلِقْتَ مُبَرَّءًا مِنْ كُلِّ عَيْبٍ        كَأَنَّكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ

আমার চোখ কখনোই আপনার চেয়ে উত্তম কাউকে দেখেনি, আর আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে কোনো নারী জন্ম দেয়নি।

 আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সমস্ত দোষত্রুটি থেকে মুক্ত করে, মনে হয় যেন আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আপনারই ইচ্ছেমতো।

মুহতারাম মুসল্লিয়ান; বিশ্বনবী আদর্শ ও জীবনাচার যেমন সারা বিশ্বের জন্য আদর্শ ও সার্বজনীন করে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, তেমনি দৈহিক গঠন ও অবয়বের দিক থেকেও চিত্তাকর্ষক, আকর্ষণীয় ও মোহনীয় করে  পাঠিয়েছিলেন। হরফ ও শব্দের জোড়াতালি দিয়ে আমাদের দ্বারা সেই মহামানবের সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় নবীজিকে না দেখার অতৃপ্ত বাসনা কিছুটা লাঘব করার জন্য সাহাবায়ে  কেরাম নবীজির দেহ কাঠামোর যে বর্ণনা দিয়েছেন তা পড়ে তৃষ্ণা নিবারণ করার চেষ্টা করি। এই নশ্বর পৃথিবীতে নবীজিকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। রব্বে কারীমের কাছে ফরিয়াদ, তিনি যেন স্বপ্নযোগে হলেও পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় নবীজিকে দেখার তাওফিক দান করুন এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনে নবীজির প্রতিবেশী হয়ে থাকার সৌভাগ্য নসিব করুন।

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

 

الخُطْبَةُ الأُولَى

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ الَّذِي جَمَّلَ نَبِيَّهُ بِأَكْمَلِ الصِّفَاتِ، وَحَلَّاهُ بِأَبْهَى الْخِلَالِ وَالْمَكْرُمَاتِ، وَأَفَاضَ عَلَيْهِ مِنْ سَنَا الْجَلَالِ وَالْكَمَالِ مَا بَهَرَ الْعُقُولَ وَالأَبْصَارَ، نَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ المَتَفَرِّدُ بِالْجَمَالِ وَالْكَمَالِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، الْأَكْمَلُ خَلْقًا وَخُلُقًا، وَأَشْرَفُ الْخَلْقِ ذَاتًا وَقَدْرًا، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ الأَطْهَارِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا.

أَمَّا بَعْدُ: فَيَا عِبَادَ اللَّهِ! أُوصِيكُمْ وَنَفْسِي بِتَقْوَى اللَّهِ، فَقَدْ فَازَ الْمُتَّقُونَ، وَقَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا.

عِبَادَ اللَّهِ! إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدْ جَعَلَ نَبِيَّنَا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِرَاجًا مُنِيرًا، وَخَلَقَهُ فِي أَحْسَنِ صُورَةٍ وَأَبْهَى جَمَالٍ، وَعَصَمَهُ مِنْ كُلِّ عَيْبٍ وَشَيْنٍ، وَجَمَعَ لَهُ بَيْنَ جَمَالِ الظَّاهِرِ وَكَمَالِ الْبَاطِنِ. قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ،

وَقَالَ سُبْحَانَهُ: لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا.

وَمِنْ بَهِيِّ شَمَائِلِهِ الشَّرِيفَةِ مَا وَصَفَهُ بِهِ أَصْحَابُهُ الْكِرَامُ؛ فَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا مَرْبُوعًا، بَعِيدَ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ، عِظِيمَ الْجُمَّةِ إِلَى شَحْمَةِ أُذُنَيْهِ، عَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ، مَا رَأَيْتُ شَيْئًا قَطُّ أَحْسَنَ مِنْهُ.

وَعَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةٍ إِضْحِيَانٍ، فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ وَإِلَى الْقَمَرِ، وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ، فَهُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنَ الْقَمَرِ.

وَكَانَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَأَشْجَعَ النَّاسِ، وَأَرْحَمَ النَّاسِ بِالأُمَّةِ. عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: خَدَمْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ قَطُّ، وَلا قَالَ لِشَيْءٍ فَعَلْتُهُ: لِمَ فَعَلْتَهُ؟ وَلا لِشَيْءٍ لَمْ أَفْعَلْهُ: أَلَا فَعَلْتَهُ.

فَاتَّقُوا اللَّهَ عِبَادَ اللَّهِ، وَتَأَسَّوْا بِشَمَائِلِ نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَخَلَّقُوا بِأَخْلَاقِهِ الزَّكِيَّةِ، فَقَدْ قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الأَخْلَاقِ.

أَقُولُ قَوْلِي هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ لِي وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ، فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.

الخُطْبَةُ الثَّانِيَةُ

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَا أَوْلِيَاءَهُ بِحُلَّةِ الِاتِّبَاعِ لِسَيِّدِ الْأَنَامِ، وَشَرَّفَهُمْ بِالْمَحَبَّةِ لِمَنْ فاقَ الْخَلْقَ فِي الْكَمَالِ وَالتَّمَامِ، وَأَنْوَرَ قُلُوبَهُمْ بِمَعْرِفَةِ مَحَاسِنِ ذَاتِهِ وَشَمَائِلِهِ الْعِظَامِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى المَبْعُوثِ بِأَكْمَلِ الشَّرَائِعِ وَأَشْرَفِ الشَّمَائِلِ، نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ الأَطْهَارِ الأَفَاضِلِ.

أَمَّا بَعْدُ: فَاعْلَمُوا عِبَادَ اللَّهِ أَنَّ التَّأَسِّيَ بِشَمَائِلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالتَّخَلُّقَ بِأَخْلَاقِهِ الطَّاهِرَةِ، مِنْ أَعْظَمِ الدَّلَائِلِ عَلَى صِدْقِ الْمَحَبَّةِ وَكَمَالِ الإِيمَانِ. قَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا وَلا مُتَفَحِّشًا، وَكَانَ يَقُولُ: إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقًا. وَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا.

أَلا وَصَلُّوا وَسَلِّمُوا عَلَى مَنْ أُمِرْتُمْ بِالصَّلَاةِ وَالسَّلَامِ عَلَيْهِ، فَقَدْ قَالَ اللَّهُ جَلَّ جَلَالُهُ: إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.

اللَّهُمَّ ارْضَ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ: أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ وَعَلِيٍّ، وَعَنْ سَائِرِ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ، وَعَنَّا مَعَهُمْ بِجُودِكَ وَكَرَمِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ.

اللَّهُمَّ اهْدِنَا لِأَحْسَنِ الأَخْلَاقِ لا يَهْدِي لِأَحْسَنِهَا إِلا أَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنَّا سَيِّئَهَا لا يَصْرِفُ عَنَّا سَيِّئَهَا إِلا أَنْتَ. اللَّهُمَّ احْشُرْنَا فِي زُمْرَةِ نَبِيِّنَا، وَأَوْرِدْنَا حَوْضَهُ، وَاسْقِنَا مِنْ يَدِهِ الشَّرِيفَةِ شَرْبَةً لا نَظْمَأُ بَعْدَهَا أَبَدًا.

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، الأَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالأَمْوَاتِ. رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

عِبَادَ اللَّهِ! إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. فَاذْكُرُوا اللَّهَ الْعَظِيمَ يَذْكُرْكُمْ، وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ.

 

📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

২৭ আগস্ট ২০২৬