নামাযের সুন্নত কিরাত : কিছু মৌলিক কথা
লেখক:মুফতী মুহিউদ্দীন কাসেমী
........................................................................
সূরা হুজুরাত থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সূরাসমূহকে ‘মুফাসসাল’ বলা হয়। মুফাসসাল তিন প্রকার- তিওয়ালে মুফাসসাল, আওসাতে মুফাসসাল ও কিসারে মুফাসসাল। সূরা হুজুরাত থেকে সূরা ইনশিকাক পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’। সূরা বুরূজ থেকে সূরা কাদর পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ এবং সূরা বায়্যিনাহ থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘কিসারে মুফাসসাল’।
ফরজ নামাযের জামাতে কিরাত পড়ার ক্ষেত্রে মুসুল্লিদের অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
“যে ব্যক্তি কোনো জামাতের ইমামতি করবে সে উপস্থিত সবচে দুর্বল মুসল্লীর প্রতি খেয়াল রেখে নামায আদায় করবে। কেননা তাদের কেউ অসুস্থ থাকতে পারে। কোনো শিশু, কোনো বৃদ্ধ, কোনো প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তি (অর্থাৎ কোনো তাড়া থাকার দরুন যার জলদি জলদি নামায থেকে ফারেগ হওয়া প্রয়োজন) এমন কেউ সেখানে থাকতে পারে। (কিতাবুল আছল, খ. ১ পৃ. ১৩৭; কিতাবুল আছার, নুসখায়ে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. পৃষ্ঠা ৩৮; কিতাবুল আছার, নুসখায়ে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. পৃষ্ঠা ২৭)
আরও পড়ুন: রবের সান্নিধ্যে মুমিনের প্রশান্তি: হৃদয়ের শান্তি লাভের ইসলামী উপায়
তবে সবসময় মুসুল্লিদের অবস্থা বিবেচনা করতে গিয়ে সুন্নত কিরাত ছেড়ে দেওয়াও উচিত নয়। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন নামাযে যে পরিমাণ কিরাত পড়েছেন আমাদের উচিত সে পরিমাণ এবং সেসব সূরা তেলাওয়াত করা।
ফজরের কেরাত
ইমাম মুহাম্মাদ রহ. লিখেন, নামাযে সূরা ফাতিহা তো পড়তেই হবে। সূরা ফাতিহার পর ফজরের দুই রাকাতে চল্লিশ আয়াত পড়বে। জোহরের প্রথম দুই রাকাতে (মোটামুটি) এ পরিমাণ কিংবা এরচে কিছু কম পড়বে।
আছর এবং ইশার প্রথম দুই রাকাতে বিশ আয়াত পড়বে। আর মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতের প্রতি রাকাতে ছোটো কোনো সূরা পড়বে পাঁচ-ছয় আয়াতের। (কিতাবুল আছল, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানী, খ. ১ পৃ. ১৩৭)
ইমাম মুহাম্মাদ রহ. ‘আল জামিউস সাগীর’-এ ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন-
মুকীম অবস্থায় ফজরের উভয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ব্যতীত মোট চল্লিশ অথবা পঞ্চাশ (অথবা ষাট) আয়াত পড়বে। জোহরেও সে পরিমাণ পড়বে। আর আসর ও ইশার কিরাত বরাবর। আর মাগরিবের কেরাত এরচে কম। (আল জামিউস সাগীর, পৃষ্ঠা ৭২)
ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, প্রথম দুই রাকাতে এত এত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে। এর অর্থ হল, দুই রাকাতে সর্বমোট এত আয়াত তিলাওয়াত করবে। প্রতি রাকাতেই এ পরিমাণ তিলাওয়াত করবে- এমনটি উদেশ্য নয়। (আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৮৮; ফাতহুল কাদীর ১/৩৩৪)
আরও পড়ুন: বিবাহিত নারী-পুরুষ যে কারণে পরকীয়ায় জড়ায়
আল্লামা ফখরুদ্দীন যায়লায়ী রহ. বলেছেন- যেমন, প্রথম রাকাতে পড়বে পঁচিশ আয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে পড়বে পনের আয়াত। (তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৩৩৪)
ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মুস্তাহাব হল, ফজর ও জোহরে তিওয়ালে মুফাসসাল থেকে পড়া, আছর ও ইশাতে আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়া এবং মাগরিবে কিসারে মুফাসসাল থেকে পড়া। তবে ইমাম কুদূরী রহ.-সহ অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরাম এও বলেছেন যে, জোহরেও আসর ও ইশার মতো আওসাতে মুফাসসালই পড়বে।
বিশেষ কারণে ফজরসহ অন্যান্য নামাযে কেরাত সংক্ষিপ্ত করা
স্বাভাবিক অবস্থায় তো ফজরের নামায ও অন্যান্য নামাযে মাসনুন কেরাত রয়েছে। তবে বিশেষ কোনো কারণে নাস, ফালাক, ইখলাছ ও কাফিরূনের মতো ছোট ছোট সূরা যেকোনো নামাযে তিলাওয়াত করায় অসুবিধা নেই। এমনকি বিশেষ অবস্থায় এমন করা হলে তা সুন্নাহর মধ্যে শামিল হবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অবস্থায় সূরা নাস ও সূরা ফালাক দিয়ে ফজরের নামায আদায় করেছেন- এমন একটি চমৎকার বর্ণনা হাদিস শরীফে রয়েছে। হাদিসটি নিম্নে তুলে ধরছি-
হযরত উকবা বিন আমের রা. বলেন, আমি সফরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উট চালাচ্ছিলাম। একসময় তিনি আমাকে বললেন, হে উকবা! লোকেরা যেসকল সূরা তিলাওয়াত করে আমি কি তোমাকে এর মধ্য থেকে সর্বোত্তম দুটি সূরা শিক্ষা দিব না? এরপর তিনি আমাকে قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ (সূরা ফালাক) এবং قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ (সূরা নাস) শেখালেন। কিন্তু এতে আমি তেমন খুশি হয়েছি বলে তিনি মনে করলেন না। পরবর্তীতে তিনি যখন ফজরের নামাযের জন্য অবতরণ করলেন, তখন এই দুইটি সূরা দ্বারাই নামায পড়ালেন। যখন তিনি নামায শেষ করলেন, আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, কেমন দেখলে, হে উকবা! (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৭৩৫০; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৫৪৩৬)
আরও পড়ুন: নারীর গৃহে অবস্থান : পরাধীনতা নয়, মৌলিক অধিকার
বর্ণিত হাদিসে প্রথমত- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের হালতে ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত- হযরত উকবা রা.-কে সূরা ফালাক ও সূরা নাস শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য ছিল। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা দুটি পাঠ করেছেন।
সাহাবায়ে কেরামও সফর বা অন্য কোনো ওজরের কারণে নামাযে সংক্ষিপ্ত কেরাত পড়তেন।
জোহর ও আসরের কেরাত
কোনো কোনো হাদিস থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোহরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়েছেন বলে জানা যায়। আবার কোনো কোনো হাদিসে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ থেকে পড়ার কথাও পাওয়া যায়।
সাহাবায়ে কেরাম কখনো কখনো জোহরের নামাযে ‘মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকেও দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন।
সারকথা, জোহরের নামাযে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ ও ‘আওসাতে মুফাসসাল’ উভয় অংশ থেকেই তিলাওয়াত করেছেন। সাহাবায়ে কেরামও জোহরের নামাযে উভয় অংশ থেকেই তিলাওয়াত করেছেন।
তাই অনেক ফকীহের মতে জোহরের নামাযে আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়লেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। ফিকহে হানাফীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব কিতাবুল আছল (আলমাবসূত)-এ ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন- জোহরে ফজরের কেরাতের কাছাকাছি বা এর চেয়ে কম পড়বে। (কিতাবুল আছল, খ. ১ পৃ. ১৩৭)
আরও পড়ুন: ভিত্তিহীন ঘটনা : ওয়ায়েস করনীর দাঁত ভাঙার গল্প
আসরের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’
১. আবু বকর ইবনে খালেদ ইবনে উরফুতা রহ. বলেন-
সাহাবি খাব্বাব রা. আসরের নামাযে কখনো সূরা إذَا زُلْزِلَتِ -ও (সূরা যিলযাল) পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৬০)
২. যিয়াদ ইবনে ফাইয়ায রহ. বলেন-
তামীম ইবনে সালামা রহ. ইবরাহীম নাখাঈ রহ.-কে আসরের কেরাত স¤পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আর আমি তাদের কথোপকথন শুনছিলাম। তো ইবরাহীম নাখাঈ রহ. বললেন, আসরের কেরাত হল মাগরিবের কেরাতের মতো। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯০; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬০৩)
৩. ইবরাহীম নাখাঈ রহ. বলেন-
তারা জোহরকে ইশার সমান গণ্য করতেন এবং আসরকে মাগরিবের সমান গণ্য করতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬০৫)
সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, খাইরুল কুরূনে আছরের নামাযে কখনো কখনো কিসারে মুফাসসালের বড় কোনো সূরাও পড়া হয়েছে। তবে সাধারণ নিয়ম ছিল আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়ার।
আরও পড়ুন: চেহারা কি পর্দার অন্তর্ভুক্ত?
মাগরিবের কেরাত
স্বাভাবিকভাবে মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ সুন্নত- তা আমরা জেনেছি। কিন্তু মাগরিবের নামাযে দীর্ঘ কেরাতও যে জায়েয আছে, তাও জানা থাকা দরকার। নি¤েœর হাদিসগুলো লক্ষ্য করুন :
১. উম্মুল ফাযল রা. থেকে বর্ণিত-
অন্তিম অসুস্থতার সময়ে রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মাগরিবের নামায পড়ানোর জন্য আগমন করলেন। মাথা ব্যথার কারণে তখন তাঁর মাথা মুবারক পট্টি দিয়ে বাঁধা ছিল। সেদিন তিনি মাগরিবের নামাযে সূরা ‘মুরসালাত’ তিলাওয়াত করলেন। এটিই ছিল তাঁর শেষ মাগরিব নামায। -(সুনানে তিরমিযি, হাদিস ৩০৮
২. হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা. বলেন-
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের নামাযে সূরা ‘তূর’ পড়তে শুনেছি। (সহিহ বুখারী, হাদিস ৭৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৬৩)
সাহাবিগণও মাগরিবের নামাযে কখনো কখনো দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন।
এসব বর্ণনা সামনে রাখলে বুঝা যায় যে, মাগরিবের নামাযে দীর্ঘ কিরাত পড়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো মসজিদে দেখা যায় ইমাম সাহেব মাগরিবের নামাযে কিসারে মুফাসসালের বাইরে কোনো সূরা পড়লেই কেউ কেউ আপত্তি করে বসে। এমন করা আদৌ ঠিক নয়। তবে সাধারণ নিয়ম হল, মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ থেকে পড়াই উত্তম।
আরও পড়ুন: ব্যভিচারের মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ সন্তানের শরঈ অবস্থান
ইশার কেরাত
ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়া সুন্নত। অবশ্য অবস্থা ভেদে বেশ-কম করাতেও কোনো ক্ষতি নেই। এক্ষেত্রে হাদিস শরীফে কখনো কখনো ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ এবং ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়ার বর্ণনাও রয়েছে। যেমন :
১. হযরত বুরাইদা রা. বলেন-
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামাযে وَالشَّمْسِ وَضُحهَا (সূরা শাম্স) এবং তার অনুরূপ সূরা পড়তেন। (সুনানে তিরমিযি, হাদিস ৩০৯; সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৯৯৯)
২. হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন-
এক আনসারী যুবক তার পানি সিঞ্চনের উটকে খাওয়াচ্ছিল। তখন হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল রা. ইশার নামায শুরু করলেন। সে তার উটকে খাওয়ানো রেখে অজু করে নামাযে হাযির হল। হযরত মু‘আয রা. সূরা ‘বাক্বারা’ শুরু করলেন। তো ঐ যুবক হযরত মু‘আয রা.-কে ছেড়ে একাকী নামায পড়ে ফেলল এবং গিয়ে তার উটকে খাওয়াল।
মুআয রা. নামায শেষ করার পর সে (আবার) আসল। মুআয রা. তাকে মন্দ বললেন এবং তিরস্কার করলেন। এরপর বললেন, আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তোমার বিষয়ে জানাব।
পরের দিন তারা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একত্র হলেন। মুআয রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ যুবকের বিষয়ে বললেন। তখন যুবক বলল, আমরা কর্ম করে রোজগার করি আর ব্যস্ত জীবন কাটাই। আর তিনি আমাদের নিয়ে দীর্ঘ নামায পড়েছেন। সূরা বাকারা পড়া শুরু করেছেন।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মুআয! তুমি কি ফিতনাকারী হতে চাও? যখন তুমি লোকদের ইমামতি করবে, তখন তুমি পড়বে সূরা আ‘লা, সূরা লাইল, সূরা ‘আলাক এবং সূরা দুহা। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদিস ৩৭২৫)
এই হাদিসের অন্যান্য বর্ণনায় সূরা ‘শাম্স’-এর উল্লেখ রয়েছে।
কোনো কোনো বর্ণনায় সূরা ‘বুরূজ’ ও সূরা ‘ত্বারিক’-এর উল্লেখ রয়েছে। এক বর্ণনায় সূরা ‘ইনফিতার’-এর কথাও এসেছে।
হাদিসে উল্লিখিত সূরা ইনফিতার ‘তিওয়ালে মুফাসসালের’ অন্তর্ভুক্ত আর বাকি সূরাগুলি ‘আওসাতে মুফাসসালের’ অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এই হাদিস থেকে ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ এবং ‘তিওয়ালে মুফাসসালের’ সংক্ষিপ্ত সূরাসমূহ তিলাওয়াতের নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে।
ইশার নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ বা তার বাইরে থেকে দীর্ঘ কেরাতের বর্ণনাও পাওয়া যায়।
১. আলকামা ইবনে আবু ওয়াক্কাস রহ. বলেন-
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ইশার নামাযে সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করতেন। ‘আলক্বামা বলেন, আমি ছিলাম কাতারের পিছন দিকে। হযরত উমর রা. যখন হযরত ইউসুফ আ.-এর আলোচনা সম্বলিত আয়াত পড়লেন, আমি পিছনের কাতার থেকেই তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭০৩)
২. মাসরূক রহ. বলেন-
হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. ইশার নামাযে সূরা নাজম তিলাওয়াত করলেন। এরপর তিনি সিজদা দিলেন। এরপর আবার দাঁড়িয়ে وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ (সূরা তীন) তিলাওয়াত করলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩২, ৪২৮২, ৪৪২৬)
মোটকথা হল, ইশার নামাযে মূলত আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়া হবে। তবে কখনো কিসারের কোনো বড় সূরা পড়া হলে তাকে খেলাফে সুন্নত বলা ঠিক নয়। তেমনিভাবে তিওয়ালে মুফাসসাল থেকে কিংবা কুরআন কারীমের অন্য কোনো স্থান থেকে আওসাত পরিমাণ অংশ তিলাওয়াত করা হলে তাতেও কোনো আপত্তি নেই। তবে স্মর্তব্য হল, দীর্ঘ কেরাত পড়তে হলে কিংবা বড় কোনো সূরা পড়তে হলে মুসল্লীদের হালত বিবেচনা করা জরুরি। আর আজকালকার হালত যেহেতু জানাই আছে, তাই একথা বলা যেতে পারে যে, ইমাম সাহেবদের জন্য মাসনুন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে বেশি লম্বা না করা চাই। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম সাহেবগণকে নামায সংক্ষিপ্ত করার ব্যাপারে তাকিদের সাথে যে হুকুম করেছেন- এর প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।
আরও পড়ুন: সামাজিক প্রচলন (উরফ (عرف) : কখন শরীয়তের দলিল, কখন নয়?
জুমার দিন ফজর নামাযে মাসনুন কেরাত
হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন ফজরের নামাযে প্রথম রাকাতে الم تَنْزِيلُ السَّجْدَةَ (সূরা আলিফ লাম মীম সাজদাহ) এবং দ্বিতীয় রাকাতে هَلْ أَتَى عَلَى الإِنْسَانِ (সূরা দাহর) পড়তেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস ৮৯১, ১০৬৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৭৯)
উল্লেখ্য যে, সূরা সাজদাহ ত্রিশ আয়াত-বিশিষ্ট এবং তিন পৃষ্ঠাব্যাপী আর ‘দাহর’ সূরাটি একত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট এবং দুই পৃষ্ঠার সামান্য বেশি।
বিশিষ্ট হানাফী ফকীহ আল্লামা শুরুম্বুলালী রহ. বলেছেন, এ আমলটি কেউ একেবারেই করে না আর কেউ কখনো ছাড়ে না। তা না করে মাঝেমধ্যে বাদ দিয়ে আমলটি করা উচিত। (মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা ২৬৪)
দুই ঈদ এবং জুমায় মাসনুন কেরাত
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো জুমার প্রথম রাকাতে সূরা ‘জুমু‘আ’ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ‘মুনাফিকূন’ তিলাওয়াত করতেন। এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আবী রাফে রহ. বর্ণনা করেন-
মারওয়ান হযরত আবু হুরায়রা রা.-কে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত বানাল এবং সে মক্কার উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। তখন আবু হুরায়রা রা. জুমার নামাযে ইমামতি করলেন। তিনি প্রথম রাকাতে সূরা ‘জুমু‘আ’ পড়লেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ‘মুনাফিকুন’ পড়লেন।
ইবনে আবী রাফি বলেন, আমি হযরত আবু হুরায়রা রা.-কে বললাম, আপনি (জুমার নামাযে) যে সূরা দুটি তিলাওয়াত করলেন, হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. কুফায় (জুমার নামাযে) ঐ দুই সূরা তিলাওয়াত করতেন। তখন হযরত আবু হুরায়রা রা. বললেন, আমি জুমার নামাযে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই দুই সূরা পড়তে শুনেছি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৭৭)
আরও পড়ুন: প্রচলিত বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা ও জিমের শরয়ী হুকুম:
কখনো তিনি জুমায় ‘সূরা আ‘লা’ এবং ‘গাশিয়াহ’ও পড়তেন। এ প্রসঙ্গে হযরত নুমান বিন বাশীর রা. থেকে বর্ণিত-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামাযে এবং জুমার নামাযে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা) এবং هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ (সূরা গাশিয়াহ) পড়তেন। তিনি এও বর্ণনা করেন যে, একই দিনে ঈদ ও জুমা হলে উভয় নামাযেই এই দুই সূরা তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৭৮)
অবশ্য দুই ঈদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা কাফ এবং সূরা কামার পড়েছেন বলেও বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রহ. থেকে বর্ণিত-
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হযরত আবু ওয়াক্বিদ লাইসী রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযহা ও ফিতরের ঈদের নামাযে কী কিরাত পড়তেন? তিনি জবাব দিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামাযে সূরা ক্বাফ ও সূরা ক্বামার পড়তেন। -সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৯১
আরও পড়ুন: মুহাররম ও আশুরা নিয়ে প্রচলিত ভিত্তিহীন বর্ণনা:
ফজরের সুন্নতে নবীজীর কেরাত
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সুন্নতে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাস পড়তেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
আমি এক মাস পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে থেকে খেয়াল করে বুঝার চেষ্টা করেছি, তিনি ফজরের সুন্নত নামাযে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করতেন। (সুনানে তিরমিযি, হাদিস ৪১৭)
হযরত আবু হুরায়রা রা.-ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ফজরের সুন্নত নামাযে এই দুই সূরা পড়ার কথা বর্ণনা করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭২৬)
আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। (সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস ১১১৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদিস ৬৩৯৫)
২. আবার অনেক সময় সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান থেকে এক এক আয়াত করে তিলাওয়াত করতেন, যার বিবরণ এই হাদিসে রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশির ভাগ সময় ফজরের (সুন্নত) দুই রাকাতের (প্রথম রাকাতে) قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَআয়াতের শেষ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় রাকাতে قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْআয়াতটি اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَপর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস ১১১৫)
আরও পড়ুন: ইসলামের আলোকে সন্তানের চেহারার অমিলের কারণে স্ত্রীকে সন্দেহ করা
বিতরের নামাযের কেরাত
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবযা রা. বলেন-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামাযে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা), قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ (সূরা কাফিরূন) এবং قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ (সূরা ইখলাছ) তিলাওয়াত করতেন। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস ১৭৩১; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৫৩৫৪)
জ্ঞাতব্য, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু কিছু নামাযে বিশেষ বিশেষ সূরা পড়তেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি জুমা ও দুই ঈদের নামাযে সূরা আ‘লা এবং সূরা গাশিয়াহ পড়তেন। আবার কখনো সূরা জুমুআ ও সূরা মুনাফিকুন পড়তেন। বিতরের নামাযে সূরা আ‘লা ও সূরা কাফিরূন এবং সূরা ইখলাছ পড়তেন। ফজর ও মাগরিবের সুন্নতে قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُون (সূরা কাফিরূন) ও قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد (সূরা ইখলাছ) পড়তেন। তাই বর্ণিত এসকল সূরা উল্লিখিত নামাযসমূহে পড়া মুস্তাহাব। তবে ওয়াজিব বা সুন্নতে মুআক্কাদাহর মতো নয়। মাঝেমধ্যে অন্য সূরাও পড়া চাই। [আলহাবিল কুদসী ১/১৭৫; ফাতহুল কাদীর, খ. ১ পৃ. ৩৩৭
আরও পড়ুন: পরিবার: সুখী জীবনের ভিত্তি —
সারসংক্ষেপ কথা
সারসংক্ষেপ কখা হল, মাসনুন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ ফজরের নামাযে তিওয়ালে মুফাসসালের ছোট সূরাগুলো (যেমন সূরা তাকবীর যার আয়াত সংখ্যা ২৯। সূরা ইনফিতার যার আয়াত সংখ্যা ১৯ এবং আয়াতগুলো ছোটো ছোটো।) বা তার সমপরিমাণ। জোহরের নামাযে তিওয়ালে মুফাসসালের ছোটো সূরাগুলো অথবা আওসাতে মুফাসসালের বড় সূরাগুলো বা তার সমপরিমাণ। আসর এবং ইশায় আওসাতে মুফাসসালের যেকোনো সূরা বা তার সমপরিমাণ। আর মাগরিবে কিসারে মুফাসসালের ছোটো সূরাগুলো বা তার সমপরিমাণ। এই হল মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ। এরচে বেশি পড়া হলে তাও ভালো। কিন্তু ইমামের জন্য শর্ত হল এক্ষেত্রে মুসল্লীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখা।
কিরাতের মৌলিক মাসআলা
এক. উত্তম হল, এক রাকাতে পূর্ণ সূরাই তিলাওয়াত করা। তবে এক সূরাকে দুই রাকাতে ভাগ করে পড়া জায়েয, এমন করা মাকরূহ নয়। হাদিস ও আছার থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, সূরা যদি এই পরিমাণ ছোট হয় যে, তা দুই রাকাতে ভাগ করে পড়লে মুস্তাহাব কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়েও কম হয়ে যাবে, তাহলে এমনটি না করা চাই। আর এরকম পড়ার অভ্যাস করা তো মোটেই সমীচীন নয়।
পক্ষান্তরে ইমাম সাহেব যদি এমন কোনো দীর্ঘ সূরা পড়তে চান, যা মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে এত বেশি, যা মুসল্লীদের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে, সেক্ষেত্রে ঐ সূরাকে দুই রাকাতে ভাগ করে পড়াই উত্তম হবে। ফরজ নামাযে দীর্ঘ সূরাকে দু’রাকাতে ভাগ করে পড়ার প্রমাণও হাদিস ও আছারে রয়েছে।
দুই. কোনো বড় সূরার শেষ থেকে যদি মুস্তাহাব পরিমাণ তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে তাও ঠিক আছে; মাকরূহ নয়।
তিন. প্রথম রাকাতে এক সূরার শেষ থেকে পড়লে এবং দ্বিতীয় রাকাতে অন্য সূরার শেষ থেকে পড়লে তাও জায়েয আছে। সহিহ বক্তব্য অনুসারে এভাবে পড়া মাকরূহ নয়।
চার. প্রথম রাকাতে কোনো দীর্ঘ সূরার অংশবিশেষ তিলাওয়াত করা আর দ্বিতীয় রাকাতে কোনো পূর্ণ সূরা তিলাওয়াত করা- এটাও বৈধ আছে, মাকরূহ নয়। সাহাবায়ে কেরামের আমলে এর নজির পাওয়া যায়।
পাঁচ. প্রথম রাকাতে কোনো দীর্ঘ সূরার মাঝখান থেকে অংশবিশেষ তিলাওয়াত করা এবং দ্বিতীয় রাকাতে অন্য কোনো দীর্ঘ সূরার মাঝখান থেকে অথবা শেষ থেকে অংশবিশেষ তিলাওয়াত করাও বৈধ, মাকরূহ নয়।
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক