সামাজিক প্রচলন (উরফ (عرف) : কখন শরীয়তের দলিল, কখন নয়?—কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা
লেখক: মুফতি মুঈনুল ইসলাম সিলেটি::
উরফ (عرف) ও সামাজিক প্রচলন: শরীয়তের দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার নীতিমালা
উরফ মানে সামাজিক প্রচলন আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন জিনিসকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় সেটাকে ঐ সমাজের উরফ বা সামাজিক প্রচলন বলে
উরফের সজ্ঞাঃ- عرفপ্রত্যেক ঐ সামাজিক প্রচলন কে বলা হয় যা সুস্থ বিবেক সহজে গ্রহন করে নেয়, আর তা দুই প্রকার
عرف خاص (২(৷ عرف عام (১)
উরফে আমের সংজ্ঞা :উরফে আম বলা হয় ঐ সামাজিক প্রচলনকে যা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে যায় যেমন একটা বিষয় পুরা দেশে প্রচলিত হয়ে গেছে। যেহেতু এটা ব্যাপক হয়ে গেছে ফলে এর নাম উরফে আম (ব্যাপক সামাজিক প্রচলন)
উরফে আম দ্বারা প্রমাণিত বিধানের উপমা :
বর্তমানে আমাদের সমাজে শ্রমের মজুরি শ্রমলব্ধ সম্পদ থেকে দেওয়া হয় যা ব্যাপক হয়ে গেছে যেমন কাউকে দিয়ে ধান কাটিয়ে উক্ত ধান দ্বারাই তার শ্রমের বিনিময় দেওয়া এমনিভাবে ধান মাড়াই করে মজুরি বাড়াইকৃত ধান থেকে দেওয়া , সুপারি গাছ থেকে সুপারি পাড়িয়ে সুপারি দ্বারা মজুরি আদায় করা ইত্যাদি বিভিন্নভাবে শ্রমলব্ধ বস্তু থেকে শ্রমিকের বিনিময় দেওয়ার নীতি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে, অথচ হাদীস শরীফে এটাকে নিষেধ করা হয়েছে যা আমাদের ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে ব্যাপকভাবে উল্লেখিত রয়েছে এবং উক্ত মাসআলার একটি ফিকহি পরিভাষা রয়েছে যা ফিকহ শাস্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিবর্গের নিকট পরিচিত আর তা হল قفيز طحانএর মাসআলা।
যেহেতু হাদিসের বিপরীতে সামাজিক প্রচলন ব্যাপক হয়ে গেছে তাই ফিকহ বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বলেন যেহেতু শ্রম থেকে মজুরির বিনিময় দেওয়ার প্রচলন আম হয়ে গেছে ফলে তা عرف عامএর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে তাই এমন ব্যাপক প্রচলনের কারণে قفيز طحانএর মাসআলায় تخصيص করা হবে। এবং শ্রম থেকে মজুরির বিনিময় দোয়া বৈধ হবে।
উরফে খাসে সংজ্ঞা :
উরফে খাস বলা হয় যা একটা নির্ধারিত এলাকাতে সীমাবদ্ধ আছে যেমন আমাদের সিলেটের সামাজিক প্রচলনে মাছের শুটকির নাম হুকইন যা সাধারণত অন্য অঞ্চলে চলেনা বিধায় এর নাম উরফে খাস বা বিশেষ অঞ্চল ভিত্তিক প্রচলন।
উরফে দ্বারা প্রমাণিত বিধানের উপমা
سورةبني اسرائيل (٢٣)
وقضى ربك الا تعبدوا الا اياه وبالوالدين احسانا اما يبلغن عندك الكبر احدكما او كلاهما فلا تقل لهما اف ولا تنهرهما وقل لهما قولا كريما
উক্ত আয়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে মাতা পিতার সাথে এমন কোন ব্যবহার করা যাবে না যার কারণে তারা কষ্ট পায়।
কিন্তু উসুলে ফিকহের বহু গ্রন্থে একথা লিপিবদ্ধ রয়েছে যে কোন এলাকায় যদি মাতাকে সম্বোধন করে উফ শব্দটি বলা অসম্মানের কারন না হয় তাহলে সে অঞ্চলে সেটা বলা বৈধ আছে
উক্ত মূলনীতি থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে যদি কোন অঞ্চলে মাতাকে এমন শব্দ বলে আহবান করা যা এক অঞ্চলে মাতার জন্য সম্মানজনক হলেও অন্য অঞ্চলে মাতার জন্য কষ্টের কারণ বা বেয়াদবি আচরণ এর অন্তর্ভুক্ত হয় সুতরাং তখন যে অঞ্চলে ওই নির্ধারিত শব্দ চয়ন করে মাকে ডাকা অপমানজনক নয় সেটা ওই এলাকার লোকদের জন্য ব্যবহার করা জায়েজ আছে ।
যেমন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মাতাকে তুই বলে সম্বোধন করা সেই এলাকার সামাজিক প্রচলনে অসম্মানজনক নয় বিধায় ওই অঞ্চলে মাতাকে সম্মোধন করার ক্ষেত্রে তুই ব্যবহার করা অবৈধ নয় কিন্তু বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে এমন কথা যদি ব্যবহার করা হয় তাহলে তাহলে এমন কথা মাতা পিতার জন্য অসম্মানজনক এবং বেয়াদবি মূলক আচরণের অন্তর্ভুক্ত হয় যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণনা করা হয় বিধায় সেই পূর্বাঞ্চলে মাথাকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে তুই শব্দ ব্যবহার করা বৈধ হবে না।
উরফ বা সামাজিক প্রচলন গ্রহনযোগ্য হওয়ার জন্য শর্তগুলো নিম্নরূপ
(১)
উরফের কারনে কোনো نص তথা কোরআন হাদিসের দলিল পরিত্যাগ করা যাবে না যেমন সুদের লেনদেনের عرفদ্বারা نص পরিত্যাগ করার সুযোগ নেই।
বর্তমান সমাজে প্রায় প্রত্যেকটা পরিবারে পরোক্ষভাবে বা প্রত্যক্কভাবে সুদি লেনদেন প্রবেশ করেছে এজন্য সেটাকে উরফে আম বা ব্যাপক প্রচলন বলা হয় কিন্তু এর কারণে সুদি লেনদেন বৈধ হওয়ার প্রশ্ন আসেনা কেননা আল্লাহপাক রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে সুদি লেনদেন হারাম করেছেন আল্লাহ তাহলে পবিত্র কুরআনের সুরাতুল বাকারায় ইরশাদ করেন ।
سورة البقرة (٢٧٥)
واحل الله البيع وحرم الربا
এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিস শরীফে স্পষ্টভাবে সুদকে হারাম করেছেন ।
صحيح المسلم (رقم الحديث ١٥٩٨)
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَكِلَ الرِّبَا وَمُو كِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
সুতরাং উক্ত সামাজিক প্রচলনের কারণে সুদ বৈধ হবে না। কেননা তা স্পষ্ট কুরআন দ্বারা প্রমাণিত বিধানের লঙ্ঘন এবং বিশুদ্ধ হাদীস শরীফের বিরোধী।
(২)
উরফ গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হলো
, তা উসুলে শরীয়তের বিপরীত না হওয়া যদি হয় তাহলে এমন উরফ বা সামাজিক প্রচলন গ্রহণযোগ্য হবে না।
তবে উরফে আম দ্বারা نصবা قياسএর মধ্যে تخصيصকরা যেতে পারে যেমনটা হয়েছে قفيز طحانএর মাসআলার ক্ষেত্রে আর তা এভাবে যে ,বর্তমানে আমাদের সমাজে শ্রমের মজুরি শ্রমলব্ধ সম্পদ থেকে দেওয়া হয় যা ব্যাপক হয়ে গেছে যেমন কাউকে দিয়ে ধান কাটিয়ে উক্ত ধান দ্বারাই তার শ্রমের বিনিময় দেওয়া এমনিভাবে ধান মাড়াই করে মজুরি বাড়াইকৃত ধান থেকে দেওয়া , সুপারি গাছ থেকে সুপারি পাড়িয়ে সুপারি দ্বারা মজুরি আদায় করা ইত্যাদি বিভিন্নভাবে শ্রমলব্ধ বস্তু থেকে শ্রমিকের বিনিময় দেওয়ার নীতি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে, অথচ হাদীস শরীফে এটাকে নিষেধ করা হয়েছে যা আমাদের ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবে ব্যাপকভাবে উল্লেখিত রয়েছে এবং উক্ত মাসআলার একটি ফিকহি পরিভাষা রয়েছে যা ফিকহ শাস্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিবর্গের নিকট পরিচিত আর তা হল قفيز طحانএর মাসআলা।
যেহেতু হাদিসের বিপরীতে সামাজিক প্রচলন ব্যাপক হয়ে গেছে তাই ফিকহ বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বলেন ,যেহেতু শ্রম থেকে মজুরির বিনিময় দেওয়ার প্রচলন আম হয়ে গেছে ফলে তা عرف عامএর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে তাই এমন ব্যাপক প্রচলনের কারণে قفيز طحانএর মাসআলায় تخصيص করা হবে। এবং শ্রম থেকে মজুরির বিনিময় দোয়া বৈধ হবে।
তবে عرف عامদ্বারা কোনো نصতথা কুরআন হাদিসের দলিলকে বাতিল করা বৈধ নয় এজন্যই বিজ্ঞ ফিকহবীদগণ বলেন যে শ্রম থেকে মজুরির বিনিময়ে হিসেবে দেওয়া অবৈধ হওয়ার বিষয়টি শুধু قفيز طحانএরমধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তথা যদি কোন ব্যক্তি পশু দ্বারা গম মাড়াই করে তাহলে এমন পরিশ্রমের বিনিময় মাড়াই করা ঘম থেকে দেওয়া বৈধ হবে না এটাই قفيز طحان এর ব্যাখ্যা।
তবে عرف যদি عرف خاصহয় এবং এমন বিশেষ সামাজিক প্রচলনের উপর আমল করার কারণে নছ তথা কুরআন হাদিসের দলিল পরিত্যাগ করা আবশ্যক না হওয়ার পাশাপাশি تخصيصও আবশ্যক না হয় তখন কেমন عرف خاصবা বিশেষ সামাজিক প্রচলন দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।
(৩)
উরফ বা সামাজিক প্রচলন গ্রহণযোগ্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত
উরফ تصريح (সুস্পষ্ট বক্তব্য) এর বিপরীত না হওয়া যদি হয় তাহলে তখন এমন সামাজিক প্রচলন গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন কোন এলাকায় যদি এমন প্রচলন থাকে যে কোন দোকান থেকে কোন কিছু ক্রয় করার পর দোকানের মালিক উক্ত পণ্য ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিবে এমন সামাজিক প্রচলন ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে শুদ্ধ আছে তবে পণ্য ক্রয় করার সময় বিক্রেতা যদি স্পষ্টভাবে এ কথা বলে দেয় যে পণ্য আমি আপনার বাড়িতে পৌঁছে দিতে পারবো না বরং আপনি নিতে হবে তাহলে সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে এবং শুধুমাত্র সামাজিক প্রচলনের দোহাই দিয়ে বিক্রেতাকে মাল বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা যাবে না কেননা উক্ত সামাজিক প্রচলন এর বিপরীতে বিক্রেতার تصريح ( সুস্পষ্ট বক্তব্য) এর বিপরীত হয়ে গেছে তথা বিক্রেতার সুস্পষ্ট বক্তব্যের কারণে ক্রয় কৃত পণ্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন সামাজিক প্রচলন রহিত হয়ে যাবে।
(৪)
সামাজিক প্রচলন গ্রহণযোগ্য হওয়ার চতুর্থ শর্ত
লেনদেনের সময় উক্ত সামাজিক প্রচলন বিদ্যমান থাকা সুতরাং ক্রয় বিক্রয়ের সময় যদি এমন প্রচলন বিদ্যমান না থাকে বরং রহিত হয়ে যায় তাহলে এমন সামাজিক প্রচলন ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তার প্রভাব লেনদেনের উপর ও পড়বে না। যেমন কোন এলাকায় পণ্য ক্রয়ের পর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রচলন এক সময় ছিল কিন্তু বর্তমানে তা যদি বিদ্যমান না থাকে তাহলে পূর্বের প্রচলনের উপর ভিত্তি করে বিক্রেতাকে পণ্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে বাধ্য করা যাবে না কেননা উক্ত প্রচলন একসময় ছিল কিন্তু বর্তমানে লেনদেনের সময় তা বিদ্যমান না থাকার কারণে এর উপর ভিত্তি করে মাল বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার বিধান আরোপ করারও সুযোগ নেই।
জ্ঞাতব্য : সামাজিক প্রচলন সে ব্যাপারেই গ্রহণযোগ্য হবে যে বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বিদ্যমান নয় সুতরাং যে ক্ষেত্রে শরীয়তের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে উক্ত বিষয়ে উরফ বা সামাজিক প্রচলন গ্রহণযোগ্য হবে না।
قواعد الفقه ٥٩
الفوائد البهية ٥٩-٦٢
ফতোয়া নাওয়াছি কে রাহনুমা উসুল ১৪৫
সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার ভিত্তি (حجية العرف)
অনেকে বলেছেন সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার অন্যতম ভিত্তি হলো কুরআনে কারীমের সূরা আরাফের ১৯৯ নম্বর আয়াত
আল্লাহ বলেন خذ العفو وامر بالعرف
মূলত এ দলিল অনেক দুর্বল কেননা উক্ত আয়াতে عرفদ্বারা معروفউদ্দেশ্য তথা উক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন ভালো কাজের আদেশের কথা বলেছেন। আবার কেউ কেউ সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদিস টি বর্ণনা করে থাকেন
ما راى المسلمون حسنا فهو عند الله حسن
অর্থাৎ মুসলমানদের সামাজিক প্রচলনে যেটা কল্যাণকর মনে হয় সেটা আল্লার কাছে ও কল্যাণকর মনে হয়।
এটাও দুর্বল দলিল কেননা মূলত উক্ত হাদিসে ইজমা এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার মূল ভিত্তি
(১) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের সামাজিক প্রচলনকে গ্রহণ করেছেন যেমন بيع المضاربه ও بيع المشاركهবিশেষত بيع السلمযে লেনদেনে مبيع অনুপস্থিত তবুও তা প্রয়োজনের খাতিরে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের সামাজিক প্রচলন অনুযায়ী বৈধ বলে অনুমোদন করেছেন সুতরাং এখান থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
(২)احتجاج الفقهاء بالعرف
উরফ বা সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হওয়ার জন্য অন্যতম প্রমাণ হলো এই যে উম্মতের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ যাদের মাধ্যমে ফিকহে ইসলামীর ব্যাপক খেদমত হয়েছে যার কারণে আজ পর্যন্ত শরীয়তের ছোটখাটো বিষয়ে ও তাদের পক্ষ থেকে বর্ণিত সমাধানের উপর এ উম্মত আমল করে যাচ্ছে তারাই উরফ বা সামাজিক প্রচলন শরীয়তের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের কর্মের মাধ্যমে এমনকি তাদের থেকে বর্ণিত বহুবিদ মাসালার ভিত্তি সামাজিক প্রচলনের উপর রয়েছে।
বলাবাহুল্য যে মুজতাহিদিনে কেরাম তাদের ইজতেহাদে সামাজিক প্রচলনের মাধ্যমে দলিল দিয়েছেন যা এক ধরনের ইজমার নামান্তর প্রকৃতপক্ষে সামাজিক প্রচলনের মাধ্যমে দলিল উপস্থাপন اجماع سكوتيএর ন্যায় গ্রহণযোগ্য। কেননা সমকালীন ফিকহবিদ থেকে শুরু করে পরবর্তী কোন ফকিহ তাদের এ কর্মের বিরোধিতা করেননি আর এটা ইজমায়ে ছুকুতির আলামত।
তাও শেষ নয় নীতিগতভাবে মুজতাহিদিনে কেরাম সামাজিক প্রচলনের ব্যাপারে মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন যেমন
العاده محكمة، انما تعتبر العاده اذا طردت او غلبت ،الثابت بالعرف كالثابت بالنص
قواعد الفقه (٤٦-٥٢-٦١)
الوجيز في اصول الفقه (فصل في حجية العرف) ٧٩
ফতোয়া নাওয়াছি কে রাহনুমা উসুল ১৫৮
ইত্যাদি বহুবিধ নিয়ম নীতি প্রণয়ন করেছেন , সামাজিক প্রচলনকে শরীয়তের দলিল হিসেবে কার্যকর প্রমানের জন্য। এমনকি ফিকহবীদগন থেকে নীতিগতভাবে এ কথা বর্ণিত হয়েছে من جهل باهل زمانه فهو جاهل সুতরাং পূর্ববর্তী মুজদাহিদিনের এমন প্রচেষ্টা একথার উপরই প্রমাণ বহন করে যে সামাজিক প্রচলন ফিকহে ইসলামির অন্যতম অংশ।
ইমাম মোহাম্মদ রাহিমাহুল্লাহর ঘটনা বর্ণিত আছে যে ইমাম মুহাম্মাদ (র:) অনেক সময় চলে যেতেন রংকারকদের কাছে তাদের মধ্যে প্রচলিত লেনদেন সম্পর্কে জানার জন্য ,এমনিভাবে বিচারকার্যের ব্যাপারে ইমাম আবু ইউসুফ র: এর মতের উপর ফাতওয়া। এর মূল কারন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে বিচারকার্য সম্বন্ধে ইমাম আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহর অভিজ্ঞতা বেশি কেননা তিনি মানুষের পরস্পর হালত, সামাজিক প্রচলন সম্পর্কে ভালো অবগত আছেন তাই বিচারকার্য সম্পর্কে তার মতের উপরই ফতোয়া দেওয়া হবে ।এমনিভাবে عرف বা জামানার পরিবর্তনের কারণে ফাতাওয়ার রূপও পরিবর্তন হতে পারে যেমন হয়েছে যেমনটা পরিলক্ষিত হয়েছে রোজার অনেক মাসালার ক্ষেত্রে। ফিকহের কেতাবাদিতে বর্ণিত হয়েছে যা কানে মাথায় ওষুধ দিলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু বর্তমান সায়েন্স বলছে মাথার সাথে খাদ্যনালীর কোন সম্পর্ক নাই বিধায় মাথায় কানে ঔষধ দিলে সেটা সরাসরি খাদ্যনালীতে আসে না এজন্য সমকালীন বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম সিদ্ধান্তের উপর উপনীত হয়েছেন যে কানে অথবা মাথায় ওষুধ দিলে রোজা নষ্ট হবে না।
নিম্নে বর্ণিত গুনে উত্তীর্ণ মুফতি সামাজিক প্রচলনের উপর ভিত্তি করে ফতোয়া দিতে পারবে
(১) مسائلএর সকল قيودওشرائطসহকারে যিনি মাসআলা ভালো জানেন এবং قواعدওاصولসম্পর্কে যার ভালো জ্ঞান আছে।
(২) বর্তমান জামানার সামাজিক প্রচলন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরী।
(৩) যোগ্য কোন ওস্তাদের অধীনে থেকে ফেকাহ শাস্ত্র সম্পর্কে ভালো জ্ঞান অর্জন করার পাশাপাশি ( فقهى ذوق) ফেকহি মনন তৈরি করা।
(ফতোওয়া নাওয়াছি কে রাহনুমা উসুল ১৬৫)
এমনকি منية المصليকিতাবের শেষ দিকে একথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে কোন ব্যক্তি যদি আমাদের মাযহাবের মূল কিতাবাদী মুখস্ত করে ফেলে তবুও তার জন্য যোগ্য মুফতির অধীনে থেকে ফিকহি যোগ্যতা অর্জন করা অবশ্যক।
কারণ এমন অনেক মাসআলা আছে যার ভিত্তি সামাজিক প্রচলন এর উপর যা যোগ্য ওস্তাদ থেকেই জেনে নিতে হয় এবং এটাই হলো বিশুদ্ধ তরিকা।
منية المصلي في اخر الفصل
আল- আশবাহ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে যে মুফতির জন্য مسائل عرفيهতথা এমন মাসআলা যার ভিত্তি সামাজিক প্রচলন এর উপর এ ধরনের বিষয়ের ক্ষেত্রে যুগের চাহিদ সামনে রেখে ফতোয়া দিবে
কারণ সামাজিক প্রচলনের কারণে ফতোয়াতেও পরিবর্তন আসে ।
الاشباه والنظائر ١٤
যেমন ফিকহ ও ফতওয়ার অন্যতম গ্রন্থ রদ্দুল মুহতারে রয়েছে যে কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে انت علي حرامবলে তাহলে এর দ্বারা বাইন তালাক হবে কেনায়া হবেনা সেটা সামাজিক প্রচলন এর উপর ভিত্তি করেই বলা হয়েছে।
رد المحتار (٤/٤٥١) افتى المتاخرون في انت علي حرام بانه طالق بائن للعرف بلانية
উপসংহার
ইসলামী শরীয়তে উরফ (عرف) বা সামাজিক প্রচলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক দলিল। তবে এটি স্বতন্ত্র ও সর্বময় দলিল নয়; বরং কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের অধীনস্থ একটি প্রমাণ। যে সকল বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট নস বিদ্যমান নেই, সেখানে মানুষের কল্যাণ, লেনদেনের সহজতা এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে গ্রহণযোগ্য উরফের ভিত্তিতে শরয়ী বিধান নির্ধারণ করা হয়। এজন্যই ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেনالعادة محكمةএবং الثابت بالعرف كالثابت بالنص;অর্থাৎ শরীয়তের নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে প্রচলিত রীতি-নীতিরও আইনগত মূল্য রয়েছে।
তবে উরফ গ্রহণের মৌলিক শর্ত হলো—তা যেন কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিরোধী না হয়, শরীয়তের মূলনীতিকে লঙ্ঘন না করে, পক্ষদ্বয়ের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধিতা না করে এবং লেনদেনের সময় বাস্তবে প্রচলিত থাকে। তাই সুদ, জুয়া, অশ্লীলতা কিংবা অন্য কোনো হারাম বিষয় সমাজে ব্যাপক প্রচলিত হলেও তা কখনো বৈধ হয়ে যায় না। অপরদিকে, শরীয়তের নীরব ক্ষেত্রসমূহে মানুষের কল্যাণকর ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক রীতিনীতি শরয়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অতএব, সময়, স্থান ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উরফের পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং সে অনুযায়ী কিছু ফতোয়ার প্রয়োগেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এই পরিবর্তন কখনো শরীয়তের চিরস্থায়ী বিধানকে পরিবর্তন করে না; বরং শরীয়তের উদ্দেশ্য, ন্যায়বিচার, সহজতা ও জনকল্যাণ বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবেই উরফ কার্যকর হয়। এ কারণেই একজন মুফতির জন্য কেবল কিতাবী জ্ঞান নয়; বরং যুগের বাস্তবতা, মানুষের সামাজিক রীতি-নীতি এবং ফিকহি মননের সমন্বয় সাধন অপরিহার্য।
ফাযেল ,জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মোহাম্মদপুর বিয়ানীবাজার সিলেট
মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ,শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মা’হাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল