ফিকহ তালাক

"পারিবারিক চাপে কোর্টে তিন তালাক: স্ত্রীকে ফেরানোর হুকুম কী?"

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।হুজুর, আমি আমার পারিবারিক জীবনের পুরো ঘটনাটি সংক্ষেপে ও সত্যতার সাথে তুলে ধরছি। অনুগ্রহ করে শরীয়তের আলোকে আমাকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।আমার প্রথম বিয়ের প্রায় ৫ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে (আগামী মাসে)। বিয়ের শুরু থেকেই আমাদের দাম্পত্য জীবনে সমস্যা ছিল। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায় ২ থেকে আড়াই বছর পর্যন্ত অনেক দূরত্ব ছিল। এ কারণে আমি মানসিকভাবে খুব কষ্ট পেতাম এবং অনেক রাত কান্নাকাটি করে কাটিয়েছি।বিয়ের প্রায় ৬ মাস পর আমার স্ত্রী গর্ভবতী হন। কিন্তু তিনি তাঁর পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে তাঁর বাবা-মা, ভাই, বোন ও দুলাভাইয়ের পরামর্শে সেই সন্তান নষ্ট করে দেন। এরপরও আমাদের স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কের দূরত্ব কমেনি। ধীরে ধীরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি এবং আমার মেজাজ খুব রুক্ষ হয়ে যায়।এক পর্যায়ে আমি অন্য একজন মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। প্রায় ৬–৭ মাস পরে আমার প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জানতে পারেন। তখন আমি সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু তখন আবার আমার প্রথম স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন এবং আমাদের মধ্যে আগের মতোই দূরত্ব ছিল। এ অবস্থায় দ্বিতীয় মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এরপর প্রায় দুই মাস পরে আমি তাকে বিয়ে করি।

দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি কিছুদিন গোপন ছিল। পরে বিষয়টি সবাই জেনে যায়। এর মধ্যে আমার প্রথম স্ত্রীর একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়।এরপর থেকে আমার প্রথম স্ত্রী নিয়মিত আমাকে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। মানসিক অশান্তি চলতেই থাকে। পরে আমার পরিবারের সবাই বিষয়টি জেনে যায় এবং তারাও আমাকে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন।আমি সবসময় বলেছি, আমি যেহেতু তাকে বিয়ে করেছি, তাই শুধুমাত্র অন্য কারও চাপে তাকে তালাক দিতে চাই না। আমি প্রথম স্ত্রীকেও বলেছি যে, দ্বিতীয় বিয়ে করার পরও আমি তাঁর ভরণ-পোষণ, সময় বা কোনো অধিকারে অবহেলা করিনি। বরং আমি তাঁর সাথেই বেশি সময় কাটাতাম এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে খুব সীমিত যোগাযোগ রাখতাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "আমি কি তোমার কোনো অধিকার নষ্ট করেছি?" তিনি উত্তরে বলতেন, "তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী কাগজে-কলমে আছে, এটাই আমার সমস্যা।"একাধিকবার দুই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসা হয়। এক পর্যায়ে আমি রাগ ও মানসিক চাপে বলেছিলাম, "হয় দুইজনকেই রাখব, না হলে দুইজনকেই তালাক দেব।" কিন্তু এরপরও আমার ওপর মানসিক চাপ ও অশান্তি চলতে থাকে।সবশেষে, গত কুরবানির ঈদের সময় আমার বাবা এবং আমার শ্বশুর আমাকে কোর্টে নিয়ে যান দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য। আমি আমার বাবার কথা সাধারণত অমান্য করতে পারি না। পারিবারিক চাপে আমি তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করি।এরপর একজন উকিল আমাকে যেভাবে বলতে বলেন, আমি সেভাবেই বলি। তিনি আমাকে এই ধরনের কথা বলিয়েছেন:

 

"আমি অমুক, আমার স্ত্রী অমুককে তালাক দিলাম।" তিনি একই ধরনের বাক্য আমাকে মোট তিনবার বলিয়েছেন, এবং আমি তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তা উচ্চারণ করেছি।

 

এখন আমার প্রশ্ন হলো:

১. এই পরিস্থিতিতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটি তালাক সংঘটিত হয়েছে?

২. যেহেতু আমি পারিবারিক চাপে এ কাজ করেছি এবং অন্তর থেকে স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইনি, এতে শরয়ী হুকুমের কোনো পার্থক্য হবে কি?

৩. যদি তিন তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে কি আমার জন্য তাকে পুনরায় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার কোনো শরয়ী সুযোগ আছে?

৪. যদি এক তালাক বা রজঈ তালাক হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?

৫. কোর্টের কাগজে স্বাক্ষর করা এবং উকিলের কথামতো তিনবার উচ্চারণ করার শরয়ী হুকুম কী?

 

আমি সত্যিই মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছি। তালাকের পর থেকে আমি স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারছি না, প্রায়ই বুকে ব্যথা অনুভব করি এবং তাকে ভুলতে পারছি না। আমি জানতে চাই, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তাকে পুনরায় আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার কোনো বৈধ উপায় আছে কি না।আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।আমিন

 

الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب

     ইসলামী বিধান মতে তালাক একটি নিকৃষ্ট গর্হিত বৈধ কাজ অতি প্রয়োজন ব্যতীত শরীয়ত তালাক দেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করে তথাপি কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কারণে-অকারণে একসাথে বা পৃথকভাবে স্ত্রীকে  তিন তালাক দিয়ে দেয় তাহলে সংখ্যা অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যায় আর সরীহ তথা তালাকের জন্য গঠিত শব্দ দ্বারা নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়ে যায়

প্রথম প্রশ্নের জবাব :সুতরাং আপনার বর্ণনা অনুযায়ী  যেহেতু স্পষ্টভাবে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছেন বিধায়   তিন তালাকই পতিত হয়েছে তাই আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে একজন অপরজনের জন্য হারাম হয়ে গেছেন  এবং   তালাকের পর থেকে একসাথে সংসার করা আপনাদের জন্য বৈধ নয় 

প্রসঙ্গত :যদিও উকিল সাহেব আপনাকে উচ্চারণ করতে বলেছেন তথাপি আপনি যেহেতু নিজের মুখ দ্বারা উচ্চারণ করেছেন বিধায় তালাকের হুকুম কার্যকর হতে উকিল সাহেবের শিখিয়ে দেওয়া প্রতিবন্ধক হবে না ।

দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব :-স্ত্রীর সম্পর্ক বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট অর্থ বাহক শব্দ হল তালাক সুতরাং স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে উক্ত শব্দ ব্যবহার করলে নিয়ত না থাকলেও তালাক পতিত হয়ে যাবে এটাই ইসলামের স্পষ্ট বিধান এর বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

তৃতীয় প্রশ্নের জবাব  :তবে উক্ত তালাকপ্রাপ্তা ইদ্দত পালনের পর স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার পর উক্ত স্বামী মারা গেলে বা তালাক দিলে ইদ্দত পালন পরবর্তী চাইলে আপনার সাথে বিবাহে আবদ্ধ হতে পারবেন অন্যথায় নয়

 চতুর্থ প্রশ্নের জবাব : আপনার বর্ণনা অনুযায়ী  যেহেতু স্পষ্টভাবে স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছেন বিধায়   তিন তালাকই পতিত হয়েছে। রাজয়ী তালাকের এখানে কোন প্রসঙ্গ নেই।

পঞ্চম প্রশ্নের জবাব : ডিভোর্স লেটারে স্বাক্ষর করার দ্বারা সেটা কার্যকর হয়ে যাবে। এবং উকিল সাহেবের শিখিয়ে দেওয়ার  পর আপনি যেহেতু মৌখিকভাবে উচ্চারণ  করেছেন  বিধায় সেটাও তালাকে পরিণত হয়েছে ।

الادلة الشرعية

سورة البقرة (٢٣٠)

    فان طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره

الهداية (٢/١٣٢)

    وان كان الطلاق ثلاثا في الحرة او ثنتين في الامة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا ويدخل بها ثم يطلقها او يموت عنها 

  السنن الكبرى للبيهقي (١٤٤٩٢)

    قال حسن : لولا اني سمعت ابي يحدث عن جدي النبي صلى الله عليه وسلم : من طلق امراته ثلاثا لم تحل له  حتى تنكح زوجا غيره

المصنف لابن ابى شيبة(١٨٠٨٧)

    عن واقع بن سحبان قال سئل عمران بن حصين رضي الله عنه عن رجل طلق امراته  ثلاثا في مجلس  قال اثم بربه  و حرمت عليه امراته


মুফতি মুঈনুল ইসলাম  সিলেটি

মুফতিফাতাওয়া ও মাসায়েল 

মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মা’হাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ

মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদদক্ষিণখানঢাকা


📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

অনুমোদিত ফতোয়া দ্বারা: fatwamasail.com ফতোয়া board ও উপদেষ্টা প্যানেল

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

১১ জুলাই ২০২৬