ব্যভিচারের মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ সন্তানের শরঈ অবস্থান

 

ইসলামে ব্যভিচার (যিনা) জঘন্যতম ও ভয়াবহ অপরাধগুলোর অন্যতম। এটি কেবল একটি কবীরা গুনাহই নয়; বরং বহু অপরাধ ও অনৈতিকতার সমষ্টি। যিনা মানব সভ্যতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি, যা নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই অপরাধ মানুষের আত্মিক, মানসিক, শারীরিক, চারিত্রিক ও সামাজিক জীবনে বহুমুখী বিপর্যয় ডেকে আনে। এর কুফল অনেক সময় ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে পুরো সমাজকে গ্রাস করে ফেলেনৈতিকতা ভেঙে পড়ে, পরিবার ধ্বংস হয়, সমাজে অস্থিরতা ও অবক্ষয় নেমে আসে।

 

এই কারণেই ইসলাম শুধু যিনা করা থেকেই নয়, বরং যিনার দিকে নিয়ে যায়এমন সব পথ, পরিবেশ ও আচরণ থেকেও কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

 

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنٰۤی إِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

 

তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সূরা বনী ইসরাইল (১৭) : ৩২

 

এখানে আল্লাহ তাআলা বলেননি—‘যিনা করো না; বরং বলেছেন—‘এর কাছেও যেও না। এই ভাষাই প্রমাণ করে, যিনা কতটা নিকৃষ্ট, ধ্বংসাত্মক ও ঘৃণ্য অপরাধ।

 

রাসূলুল্লাহ এ অপরাধের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন—“কোনো ব্যক্তি মুমিন থাকা অবস্থায় ব্যভিচার করতে পারে না।”—সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৫৭

 

অর্থাৎ যিনার সময় ঈমান মানুষের অন্তরে পূর্ণতা নিয়ে অবস্থান করে নাএটি ঈমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

অতএব, যিনা থেকে বেঁচে থাকা শুধু ব্যক্তিগত তাকওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি পরিবার, সমাজ ও মানব সভ্যতা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। ইসলাম মানুষকে পবিত্রতা, শালীনতা ও নিরাপদ জীবনের দিকেই আহ্বান জানায়।

 

১. ব্যভিচারের মাধ্যমে ভূমিষ্ট সন্তানের বংশপরিচয়

 

যে নারীর কোনো স্বামী নেই এবং ব্যভিচারের মাধ্যমে তার সন্তান জন্ম নেয়, সে সন্তানকে শরীয়তের পরিভাষায় ওলাদুয-যিনা বা ব্যভিচারজাত সন্তান  বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ওই সন্তানের নসব (বংশপরিচয়) ব্যভিচারী পুরুষের দিকে সাব্যস্ত হবে না; বরং সন্তানের সম্পর্ক তার মায়ের দিকেই নির্ধারিত হবে।

 

আর যদি কোনো বিবাহিত নারী ব্যভিচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন, তবে শরীয়ত অনুযায়ী ওই সন্তানের নসব নারীর স্বামীর দিকেই সাব্যস্ত হবে। তবে ব্যতিক্রম হলোযদি স্বামী আদালতে লিআন পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তানের নসব অস্বীকার করেন, এবং ক্বাযী (শরীয়ত বিচারক) লিআনের শর্তসমূহ পূরণ হওয়া সাপেক্ষে নসব অস্বীকারের ফয়সালা দেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে সন্তানের নসব আর স্বামীর দিকে সাব্যস্ত হবে না; বরং মায়ের দিকেই নির্ধারিত হবে। আর তার ভরণপোষন মাকেই বহন করতে হবে।

 

ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৫৩৬, রাশেদিয়া প্রকাশন। জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নম্বর ১৪৪৪০৫১০১৯৫৪

 

২. ব্যভিচার থেকে গর্ভধারণের পর বিবাহ হলে সন্তানের বংশ পরিচয়

 

ইসলামী শরীয়তে সন্তানের নসব (বংশপরিচয়) একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ব্যভিচারের মাধ্যমে গর্ভধারণের পর যদি সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষ বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, সে ক্ষেত্রে সন্তানের নসব নির্ধারণে শরীয়ত স্পষ্ট ও সূক্ষ্ম নির্দেশনা প্রদান করেছে।

 

যদি কোনো নারী ব্যভিচারের ফলে গর্ভবতী হন এবং পরে সেই ব্যভিচারকারী পুরুষের সঙ্গেই শরীয়ত সম্মতভাবে বিবাহ করেন, অতঃপর নিকাহের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর ঐ গর্ভ থেকে সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে সেই সন্তানের নসব স্বামীর দিকেই সাব্যস্ত হবে। এ অবস্থায় সন্তানটি বৈধভাবে বংশপরিচয়প্রাপ্ত বলে গণ্য হবে।

 

কিন্তু যদি নিকাহের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে শরীয়ত অনুযায়ী সেই সন্তানের নসব ঐ পুরুষের দিকে সাব্যস্ত হবে না। বরং সে সন্তান ব্যভিচারজাত সন্তান (ওলাদুয-যিনা) হিসেবেই পরিচিত হবে।

 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। যদি ঐ পুরুষ সন্তানটির পিতা হওয়ার কথা স্বীকার করে নেন, কিন্তু ব্যভিচারের কোনো উল্লেখ না করেনঅর্থাৎ কেবল পিতৃত্বের স্বীকৃতি দেনতাহলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী সন্তানের নসব তার দিকেই সাব্যস্ত হয়ে যাবে। আর যখন সন্তানের নসব তার দিকে প্রমাণিত হয়ে যায়, তখন তিনি সন্তানের পিতৃপরিচয়ের ঘরে নিজের নাম লিপিবদ্ধ করতে পারবেন, এবং সন্তানের ভরণ-পোষণসহ যাবতীয় দায়িত্ব তার ওপর বর্তাবে।

 

অন্যদিকে, যে ক্ষেত্রে সন্তানের নসব ঐ পুরুষের

দিকে প্রমাণিত হয় না, সে ক্ষেত্রে তার জন্য সন্তানের পিতৃপরিচয়ের স্থানে নিজের নাম লেখা জায়েয নয়।

এখানে আরও একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে স্মরণ রাখা জরুরিসন্তানের নসব ব্যভিচারকারীর দিকে সাব্যস্ত হবে কি না, তা উপরোক্ত বিধান অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু সন্তানের নসব তার মায়ের দিক থেকে সর্বাবস্থায়ই সাব্যস্ত থাকবে। অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই সন্তানের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক অস্বীকার বা বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

 

ফাতাওয়া শামী ৩/৪৯, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নম্বর ১৪৪২০১২০১১০১

 

৩. তালাকপ্রাপ্ত নারীর ক্ষেত্রে দুই বছর পর সন্তান জন্ম হলে বংশপরিচয়

 

যদি কোনো নারীকে এক তালাক অথবা দুই তালাকে রাজঈ প্রদান করা হয়ে থাকেঅর্থাৎ যে তালাকে ইদ্দতের মধ্যে স্বামীর প্রত্যাবর্তনের সুযোগ বিদ্যমানএবং তালাকের পর দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তার সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে ঐ সন্তানের বংশপরিচয় পূর্ববর্তী স্বামীর দিকেই সাব্যস্ত হবে। কারণ রাজঈ তালাকের ক্ষেত্রে দাম্পত্য সম্পর্কের প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় না; বরং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা বহাল থাকে বলে শরীয়ত গণ্য করে।

 

অপরদিকে, যদি নারীকে এক তালাকে বায়েন বা তিন তালাক প্রদান করা হয়ে থাকেযার মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়এবং এ অবস্থায় দুই বছর পর সন্তান জন্ম নেয়, পাশাপাশি পূর্ববর্তী স্বামী যদি স্পষ্টভাবে সন্তানকে নিজের বলে স্বীকারও না করেন, তবে সে ক্ষেত্রে শরীয়ত অনুযায়ী সন্তানের নসব পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে সাব্যস্ত হবে না।

 

আর যখন সন্তানের বংশপরিচয় পূর্ববর্তী স্বামীর দিকে সাব্যস্ত হয় না, এবং একই সময়ে ওই নারী অন্য কোনো বৈধ বিবাহেও আবদ্ধ ছিলেন না, তখন শরীয়তের দৃষ্টিতে ওই নারী গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হবেন। কারণ এই পরিস্থিতি শরীয়তসম্মত বৈধ সম্পর্কের বাইরে সন্তান জন্ম দেওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। এক্ষেত্রে তাকে তার মায়ের দিকে সম্পৃক্ত করা হবে।

 

ফাতাওয়া শামী ৩/৫৪০, সাঈদ প্রকাশন। জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নম্বর ১৪৪৪০৮১০১২০১

 

৪. ব্যভিচারের মাধ্যমে ভূমিষ্ট সন্তানের মিরাস

 

ব্যভিচার বা অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে ভূমিষ্ট সন্তান ব্যভিচারী পুরুষ থেকে মিরাস পাবে না। হাদীস শরীফে আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

 

أَيّمَا رَجُلٍ عَاهَرَ بِحُرّةٍ أَوْ أَمَةٍ فَالوَلَدُ وَلَدُ زِنَا لَا يَرِثُ وَلَا يُورَثُ

 

যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন নারী অথবা বাদীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল (এবং এতে কোনো সন্তান জন্ম নিল) তাহলে সেটা জারজ সন্তান। সে ব্যভিচারী থেকে মিরাস পাবে না এবং ব্যভিচারীও তার থেকে মিরাস পাবে না। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২১১৩)

 

তবে ওই সন্তান তার মা থেকে মিরাস পাবে এবং ওই মায়ের সন্তান হিসাবে ধর্তব্য হবে।

 

আল-মুহীতুল বুরহানী ২৩/৩৬৪; জামেউল মুযমারাত ৫/৬২৮; তাবয়ীনুল হাকায়েক ৭/৪৯১; মাজমাউল আনহুর ৪/৫০৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৭৭৭

 

৫. নসব প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষার শরঈ অবস্থান

 

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নসব (বংশপরিচয়) প্রমাণের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট-কে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত নয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ যা পাওয়া যেতে পারে, তা হলো এক স্তরের সহায়ক প্রমাণ বা সমর্থন; কিন্তু একে কখনোই নসব নির্ধারণের মূল ও চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

 

কারণ শরীয়াহ বংশপরিচয় প্রমাণে বৈধ নিকাহ, দাম্পত্য সম্পর্ক, ইদ্দত, স্বীকৃতি (ইকরার) ও শরঈ নীতিমালাকেই মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এসব শরঈ মানদণ্ডের বিকল্প হতে পারে না।

 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলোআধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও স্বীকার করেছে, ডিএনএ পরীক্ষা সম্পূর্ণ নির্ভুল বা ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। বিভিন্ন কারণে এতে ত্রুটি, বিভ্রান্তি কিংবা ভিন্ন ফলাফলের সম্ভাবনা থেকে যায়। সুতরাং একে নসব প্রমাণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ও অকাট্য মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবেও নিশ্চিত নয়।

 

অতএব, শরীয়তের দৃষ্টিতে ডিএনএ পরীক্ষা

 

নসব প্রমাণের একমাত্র দলিল নয়।

সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে সহায়ক বা আনুষঙ্গিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু শরঈভাবে প্রতিষ্ঠিত নসবকে বাতিল বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না।

 

[জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নম্বর ১৪৩৯০৮২০০০৯৩]

 

    মুহাম্মাদ খাইরুল ইসলাম

 মুফতি হানাফী ফিকহি ও বিশিষ্ট লেখক গবেষক