রবের সান্নিধ্যে মুমিনের প্রশান্তি: হৃদয়ের শান্তি লাভের ইসলামী উপায়
রবের সান্নিধ্যে মুমিনের প্রশান্তি
ভূমিকা
আমরা প্রতিনিয়ত জাগতিক সাফল্যের পেছনে ছুটে চলেছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং বস্তুমুখী প্রাচুর্যের এ যুগেও অস্থিরতা, উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদ আমাদের জীবনকে ঘিরে রেখেছে। কৃত্রিম কোলাহল ও ভোগবাদী সংস্কৃতির এই স্রোতে মানুষ তার রবের কাছ থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছে, ততই তার অন্তরে জন্ম নিচ্ছে গভীর শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা ও অশান্তি। ফলে বাহ্যিক প্রাপ্তির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত প্রশান্তি অধরাই থেকে যাচ্ছে।
অথচ হৃদয়ের প্রকৃত শান্তি কোনো ক্ষণস্থায়ী অর্জনে নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে। যখন একজন মানুষ তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহকে স্থান দেয়, তখন জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহে পরিণত হয় এবং প্রতিটি কষ্টের মধ্যেও সে কল্যাণের আভাস খুঁজে পায়। এই উপলব্ধি মানুষকে এমন এক আত্মিক জীবনের স্বাদ দেয়, যেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে তার হৃদয় পরিপূর্ণ তৃপ্তি খুঁজে পায় না।
আলোচ্য প্রবন্ধে হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি অর্জনে আল্লাহর সান্নিধ্যের গুরুত্ব ও তার বিভিন্ন দিক নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
আরও পড়ুন:বিবাহ কেন্দ্রিক কিছু প্রথা ও সুন্নতি মহর: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়
আমাদের ভেতরের লুকানো শত্রু
মানুষের নফসের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু আত্মিক ব্যাধি। কখনো সেখানে ইবলীসের অহংকার, কাবিলের হিংসা, আদ জাতির অবাধ্যতা এবং সামূদ জাতির সীমালঙ্ঘন প্রকাশ পায়। কখনো নমরুদের দুঃসাহস, ফেরাউনের ঔদ্ধত্য, কারূনের সম্পদের অহমিকা কিংবা আবু জাহেলের জ্ঞানভিত্তিক গোঁড়ামি মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়।
শুধু তাই নয়, অনেক সময় মানুষের স্বভাবে বিভিন্ন প্রাণীর বৈশিষ্ট্যও প্রকাশ পায়। কাকের মতো লোভ, কুকুরের মতো লালসা, গুবরে পোকার মতো নীচতা, গুইসাপের মতো অবাধ্যতা, উটের মতো প্রতিহিংসা কিংবা সিংহের মতো হিংস্রতা মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কখনো ইঁদুরের মতো ধ্বংসাত্মক প্রবণতা, সাপের মতো বিষাক্ত আচরণ, বানরের মতো চপলতা, পিঁপড়ার মতো সীমাহীন সঞ্চয়লিপ্সা অথবা শিয়ালের মতো ধূর্ততা তার চরিত্রে স্থান করে নেয়।
এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে মানুষের কিছু স্বভাবগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মানুষকে কখনো অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ, কখনো অজ্ঞ, কখনো ভীরু ও কৃপণ, আবার কখনো এমন মানুষদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন, যারা সত্যকে জেনেও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
তবে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা এবং আত্মশুদ্ধির নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির পথ। যখন কোনো বান্দা আন্তরিকভাবে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার সংকল্প করে, তখন আল্লাহর রহমতে ধীরে ধীরে হৃদয়ের অন্ধকার দূর হতে থাকে এবং সেখানে নূরের আলো উদ্ভাসিত হয়।
আরও পড়ুন:তাফবীজে তালাক বিষয়ে সম্পর্ক (তালাকের অধিকার বিষয়ক)
বিষাক্ত হৃদয়ের উপমা
অন্তরের ব্যাধিতে আক্রান্ত হৃদয়ের উদাহরণ হলো পুঁজে ভরা একটি বিষফোঁড়ার মতো। শরীরের বিষফোঁড়া যেমন ভেতরের পুঁজ বের না করা পর্যন্ত মানুষকে যন্ত্রণা দেয় এবং শান্তি কেড়ে নেয়, তেমনি হৃদয়ের হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, রিয়া, মুনাফেকি এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা ও আসক্তি মানুষকে অবিরাম অস্থিরতার মধ্যে রাখে।
যতক্ষণ পর্যন্ত এসব ব্যাধি হৃদয় থেকে দূর না করা হবে, ততক্ষণ প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত দ্রুত এসব আত্মিক রোগ থেকে মুক্তির চেষ্টা করা। যখন হৃদয় এসব অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়, তখন মানুষ ঈমানের প্রকৃত স্বাদ, অন্তরের আনন্দ, মনের প্রশান্তি এবং পবিত্র জীবনের মাধুর্য অনুভব করতে পারে। বাস্তবে যে ব্যক্তি এসব ব্যাধি বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকে, তার চেয়ে সংকীর্ণ ও কষ্টময় জীবন আর কারও নয়।
আরও পড়ুন: কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত নারী-পুরুষ? ইসলামী বিশ্লেষণ
হৃদয়ের প্রশান্তির পথ
যে ব্যক্তি চায় আল্লাহ তা‘আলা তার হৃদয়কে প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ করে দিন, তার প্রথম কর্তব্য হলো অন্তর থেকে সেই সব ব্যাধি দূর করা, যা আল্লাহর সান্নিধ্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে। কারণ হৃদয়ের অপবিত্রতা দূর না করে কখনো হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জন করা যায় না।
এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম (আ.)-এর অন্তরের নিষ্কলুষতার বিশেষ প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন,
وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
“নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন তাঁর (নূহের) অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তিনি তাঁর প্রতিপালকের নিকট বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।” (সূরা সাফফাত : ৮৩-৮৪)
অন্যত্র ইবরাহীম (আ.)-এর ভাষায় আল্লাহ বলেন,
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
“সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কেবল সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে।” (সূরা শু‘আরা : ৮৮-৮৯)
আরও পড়ুন: নারীর গৃহে অবস্থান : পরাধীনতা নয়, মৌলিক অধিকার
আল্লাহর সান্নিধ্যের ধাপসমূহ
যেমন কোনো মূল্যবান বস্তু রাখার আগে পাত্রকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হয়, তেমনি হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা স্থাপনের পূর্বে অন্তরকে আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে হয়। অন্তর পরিশুদ্ধ হওয়ার পর তাকে আল্লাহর আনুগত্য, যিকির এবং তাকওয়ার দ্বারা সুসজ্জিত করতে হয়।
আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো সর্বাবস্থায় তাঁকে স্মরণ করা। যখন মানুষ সৃষ্টির মোহ ত্যাগ করে স্রষ্টার দিকে মনোনিবেশ করে, তখনই সে আল্লাহর নৈকট্যের স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে। এ কারণেই একজন মুমিনের কাছে সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত হলো সেই সময়, যখন সে তার রবের সামনে সিজদাবনত অবস্থায় থাকে।
অতএব, আল্লাহর সান্নিধ্য ও হৃদয়ের প্রশান্তি কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ আত্মিক সফরের ফল। এই সফরের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে, যা ধীরে ধীরে একজন বান্দাকে তার প্রতিপালকের আরও নিকটবর্তী করে তোলে।
আরও পড়ুন: হিল্লা বিয়ের পর প্রথম স্বামী কি হালাল হয়?
প্রথম ধাপ : আত্মশুদ্ধিতা
অন্তরের কঠিন ব্যাধি ও অপবিত্রতাগুলো দূর করার জন্য নিরন্তর সাধনা করলে অবশ্যই মুক্তি সম্ভব। এই প্রচেষ্টাই হৃদয়ের বিষাক্ত ক্ষতগুলো মুছে দেয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের স্বভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং নফসের সংশোধনে উদাসীন থাকে, তার আত্মা কলুষিত হয়ে যায়। সাথে সাথে সে যাবতীয় অকল্যাণের আধার হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও অন্তরের পরিচর্যায় অবহেলার কারণে সে বড় হওয়ার সাথে সাথে হৃদয়ের কোনো না কোনো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে, যা পরবর্তীতে তার আচার-ব্যবহার ও কর্মকান্ডে তা প্রকটভাবে ফুটে উঠবে।
আত্মশুদ্ধির জন্য জ্ঞান : কারো ইলম বা জ্ঞানের গভীরতা অনেক বেশি হওয়া কিংবা বড় আলেম হিসাবে গণ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তিনি অন্তরের রোগ থেকে মুক্ত। অনেক সময় দেখা যায় একজন ইলম অন্বেষণকারী, একজন জগৎবিখ্যাত আলেম কিংবা বড় কোনো দাঈর মধ্যেও লুকিয়ে আছে সুখ্যাতির মোহ, আত্মমুগ্ধতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ কিংবা অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করার মতো ব্যাধি। অনেক সময় তাদের মাঝে প্রকাশ পায় প্রচন্ড ক্রোধ কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতি রূঢ়তা। এমনকি গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ না করার মতো সংকীর্ণতাও।
যারা পরকালের যাত্রী এবং হৃদয়ের পবিত্রতা অন্বেষণকারী, তারা সর্বদা নিজেদের অন্তরের গহীনে অনুসন্ধান চালান এবং প্রতিমুহূর্তে নিজেদের কাজের চুলচেরা হিসাব গ্রহণ করেন। তাই সর্বাবস্থায় আপনি আপনার হৃদয়ের সংশোধনে সচেষ্ট হোন। একে কেবল সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা কিংবা পরিবেশ থেকে আড়ালে রাখাই যথেষ্ট নয়। বরং এদের মূল উৎপাটন করতে হবে এবং নিজের ওপর জয়ী হ’তে হবে।
আত্মশুদ্ধির বাধা নিরুপণ করা : নিজের প্রতি শুভাকাংখী প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য হ’ল ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস হৃদয়ে প্রবেশের পথে যে পর্দা বা অন্তরায়গুলো বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো খুঁজে বের করা। কেননা নবী করীম (ছাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, কারো যদি প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ থাকে, তবে সে যেন ছালাত দাঁড়ানোর আগেই তা সেরে নেয়। এমনকি খাবারের উপস্থিতিতে যদি ছালাত শুরুও হয়ে যায়, তবুও তিনি আগে খাবার শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এসব সতর্কতার মূল উদ্দেশ্য একটাই। তাহ’ল ছালাতের সময় যেন মুমিনের অন্তর সম্পূর্ণ একাগ্র থাকে এবং কোনো পার্থিব দুশ্চিন্তা বা শারীরিক অস্বস্তি যেন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) এক চমৎকার উপমা দিয়ে বলেছেন, রহমতের ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করে না, যেখানে কুকুর বা ছবি থাকে। ঠিক তেমনি মহান আল্লাহর পরিচয়, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর যিকিরের মিষ্টতা এবং তাঁর সান্নিধ্যের প্রশান্তি সেই হৃদয়ে কীভাবে প্রবেশ করবে, যা লালসার কামনারূপী কুকুর এবং হাযারো দুনিয়াবি ছবিতে ভরপুর হয়ে আছে?
সামান্য কিছু জাগতিক প্রয়োজন যদি আল্লাহর সাথে কথোপকথনের মাধুর্য, খুশু-খুযু এবং মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেয়, তবে আমরা কীভাবে আশা করি যে আমাদের হৃদয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে। যখন সেই হৃদয় হিংসা, বিদ্বেষ, সম্পর্কচ্ছেদ, আত্মমুগ্ধতা, অহংকার আর প্রবৃত্তির লালসায় ঠাসা হয়ে আছে? চোখে দেখা যায় এমন কোনো ছবি বা প্রতিকৃতি তো আমরা হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে বা মুছে ফেলতে পারি। কিন্তু আমাদের উচিত তার চেয়েও দ্রুতবেগে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মঅহংকার, আর যশের আকাংখারূপী ব্যাধিগুলো নিরাময়ে সচেষ্ট হওয়া। তবেই আসবে আল্লাহর সান্নিধ্যে হৃদয়ের প্রশান্তি।
এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা : ভাবুন তো, ওহোদ যুদ্ধের দিন মাত্র একটি বা দু’টি ভুলের কারণে মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম দল ছাহাবায়ে কেরামকে সাময়িক পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছিলেন! পবিত্র কুরআনে সেই দৃশ্যপটের বর্ণনায় আল্লাহ বলেছেন, أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْأَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْأَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ، ‘যদি (ওহোদের দিন) তোমাদের উপর বিপদ এসে থাকে, তবে তোমরাও (বদরের দিন তাদের উপর) দ্বিগুণ বিপদ চাপিয়েছিলে। তোমরা বললে, কোত্থেকে এ বিপদ এলো? তুমি বল, এটা তোমাদের পক্ষ থেকেই এসেছে (তীরন্দাযদের অবাধ্যতার কারণে) (আলে ইমরান ৩/১৬৫)।
ছাহাবাদের সাথে স্বয়ং বিশ্বনবী (ছাঃ) থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ভুলের কারণে যদি এমনটা হয়। তবে আমাদের অবস্থা কী? সুতরাং আমাদের অবশ্যই জয়ী হ’তে হবে আমাদের ভেতরে থাকা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য লালসার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে। আমাদের জয়ী হ’তে হবে সেই শয়তানদের বিরুদ্ধে, যারা আমাদের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার শপথ নিয়েছে। তাদের নেতা ইবলীস তো দম্ভভরে বলেই দিয়েছে,فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ-আপনার ইয্যতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব’ (ছোয়াদ ৩৮/৮২)।
সুস্থ হৃদয়ের পথে : একটি সুস্থ ও পবিত্র অন্তর তথা কালবে সালিম হল মুমিনের সেই অমূল্য আধ্যাত্মিক সম্পদ, যা জান্নাতের পথে যাত্রার একমাত্র পাথেয়। আমাদের দেহ যদি একটি বাহন হয়, তবে অন্তর হল তার ইঞ্জিন। আর ইঞ্জিন বিকল থাকলে দামি বডি যেমন গাড়িকে গন্তব্যে নিতে পারে না। তেমনি কলুষিত হৃদয় নিয়ে জান্নাতের পথে হাঁটা অসম্ভব। শরীরের অসুস্থতায় আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটলেও মনের বিষাক্ত ব্যাধিগুলোকে অবহেলা করি। অথচ লোহায় মরিচা পড়লে যেমন পালিশ লাগে। তেমনি হৃদয়ে পাপের মরিচা পড়লেও তা ধুয়ে ফেলা যরূরী। তাই হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা ধ্বংসাত্মক বিষগুলো খুঁজে বের করা ও তা ধুয়ে পরিষ্কার যরূরী। নিম্নে হৃদয়কে নষ্ট করার ৮টি ব্যাধি উল্লেখ করা হল। যেখান থেকে আমাদের বেঁচে থাকা আবশ্যক।-
আরও পড়ুন:উলঙ্গ হয়ে গোসল করা কি জায়েয?
(১) শিরক : শিরক হ’ল ভালোবাসা, আশা, ভয়, ভরসা, ভীতি বা আকাংখার ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সাথে হৃদয়ের টান বা আসক্তি তৈরি হওয়া। বান্দা যখনই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে মুখ ফেরায় বা অন্য কারো ওপর ভরসা করে, অমনি সেই পরনির্ভরশীলতা তার হৃদয়ের একটি অংশ দখল করে নেয়। ফলে তার অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। সেখানে ভীরুতা বাসা বাঁধে এবং তার মানসিক শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। এজন্য শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, যখন হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসা জন্মে, তখন আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার ভালোবাসা অন্তর থেকে মুছে যায়। আল্লাহর প্রতি আশা তৈরি হলে অন্য সবার প্রতি আশা দূর হয়ে যায়। যখন কোনো কিছু চাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করা হয়, তখন অন্যের কাছে হাত পাতার হীনম্মন্যতা দূর হয়। যখন সকল কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তখন অন্যকে দেখানোর প্রবৃত্তি বিলীন হয়। আর যখন সাহায্য চাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল তাঁরই শরণাপন্ন হওয়া হয়, তখন অন্য কোনো শক্তির মুখাপেক্ষিতা আর থাকে না।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) আরও বলেছেন, জেনে রাখুন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ‘-এর তেজস্ক্রিয় রশ্মি গুনাহের কুয়াশা ও মেঘমালাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই রশ্মি কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির ঈমানের গভীরতার ওপর। এই কালেমার একটি নিজস্ব নূর রয়েছে। আর মানুষের অন্তরে এই নূরের তীব্রতা কতটা কম-বেশি হবে, তা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারবে না।
আরও পড়ুন: গুপ্তাঙ্গে তরল পদার্থ জমা থাকলে উযু ভাঙ্গবে কি-না?
২) বিদ্বেষ : বিদ্বেষ হ’ল দুনিয়াবী কোনো শত্রুতা বা মনোমালিন্যের কারণে অন্য কোনো মুসলিমের প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের অন্যতম নে’মত হিসাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে যাবতীয় বিদ্বেষ ও মলিনতা দূর করে দিবেন। কারণ, অন্তরের এই ঘৃণা মানুষের জীবনে কেবল অশান্তি, দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা বয়ে আনে। যা এক প্রকার ভয়াবহ আযাব। যার হৃদয়ে বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা জমা থাকে, সে এক নিরন্তর যন্ত্রণার মাঝে বসবাস করে। সে কখনো প্রকৃত সুখ এবং ঈমানের মিষ্টতা আস্বাদন করতে পারে না।
ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, যিনি আল্লাহর সৃষ্টির সেরা এবং তাঁর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই রাসূল কখনো নিজের ব্যক্তিগত কারণে কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। অথচ তাঁকে কষ্ট দেওয়া মানে স্বয়ং আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া। তাঁর সাথে দ্বীনের স্বার্থ জড়িত ছিল এবং তাঁর পবিত্র আত্মা ছিল জগতের সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ও সকল সুন্দর চরিত্রের আধার। এত উচ্চ মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের নফসের জন্য কোনো প্রতিশোধ নিতেন না। তাহ’লে আমাদের মতো মানুষ যারা নিজেদের ভেতরের মন্দ স্বভাব ও ত্রুটিগুলো সম্পর্কে ভালো করেই অবগত তারা কীভাবে নিজের (অহংকারের) জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করতে পারে? বরং একজন প্রকৃত আল্লাহ ওয়ালা মানুষের কাছে তার নিজের অহংকারের বা নফস এতটুকু মূল্যও রাখে না যে, তার জন্য তাকে প্রতিশোধ নিতে হবে।
আরো পড়ুন: হায়েজ অবস্থায় এক বৈঠকে তিন তালাকের বিধান
ক্ষমা ও সহনশীলতা : মুমিনের মহৎ গুণ
ক্ষমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন নবী ইউসুফ (আ.)। তাঁর আপন ভাইয়েরাই তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। এর ফলে তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর—মতান্তরে তারও কম-বেশি সময়—পিতা ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দাসত্বের গ্লানি, কারাগারের অন্ধকার এবং নানা ধরনের অবিচার ও নিপীড়ন সহ্য করেছেন।
কিন্তু আল্লাহ যখন তাঁর মর্যাদা সমুন্নত করলেন এবং তাঁকে মিশরের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করলেন, তখন সেই ভাইয়েরাই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে বলল,
تَاللّٰهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللّٰهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَخَاطِئِينَ
“আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে আমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং আমরা অবশ্যই অপরাধী ছিলাম।
এ অবস্থায় ইউসুফ (আ.) কী করলেন? তিনি কি তাদের অতীতের নিষ্ঠুর আচরণ স্মরণ করিয়ে দিলেন? তাদের তিরস্কার করলেন? না, বরং তিনি মহানুভবতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বললেন,
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللّٰهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি তো সর্বাধিক দয়ালু।” (ইউসুফ ১২/৯২)
তিনি শুধু তাদের ক্ষমাই করেননি; বরং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের দোআও করেছেন।
একইভাবে ক্ষমা ও সহনশীলতার আরেক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর জীবনে। কুরআন মাজীদের একটি আকীদাগত মাসআলাকে কেন্দ্র করে খলীফা মামূন, মু‘তাসিম ও ওয়াসিকের আমলে তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। দীর্ঘ আটাশ মাস তাঁকে কারারুদ্ধ রাখা হয় এবং নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হয়। বলা হয়, তাঁকে ত্রিশটিরও অধিক দোররা মারা হয়েছিল। আঘাতের তীব্রতায় তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।
তবুও তিনি বিদআতের প্রচারকদের ব্যতীত তাঁর ওপর অত্যাচারকারী অধিকাংশ মানুষকে অন্তর থেকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এর পেছনে তাঁর অনুপ্রেরণা ছিল আল্লাহর এই বাণী
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللّٰهُ لَكُمْ وَاللّٰهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তারা যেন ক্ষমা করে এবং দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (নূর ২৪/২২)
তিনি বলতেন, “তোমার এক মুসলিম ভাইকে তোমার কারণে শাস্তি দেওয়া হলে তাতে তোমার কী লাভ?” আবার তিনি প্রায়ই এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন
فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللّٰهِ
“যে ক্ষমা করে এবং সংশোধনের পথ অবলম্বন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে।” (শূরা ৪২/৪০)
প্রকৃতপক্ষে একজন মুমিনের জন্য অনর্থক বিবাদ, বিদ্বেষ, পাল্টা জবাব এবং অভিযোগ-অনুযোগে সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এসব নেতিবাচক চিন্তা ও কর্মকাণ্ড মানুষের অন্তরকে এমন বিষয়ে ব্যস্ত রাখে, যা কেবল কষ্ট, অশান্তি ও মানসিক ভারাক্রান্ততা বৃদ্ধি করে। কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি নিজেকে এ ধরনের ক্ষতির মধ্যে ফেলতে পারে না।
মুমিন এই পৃথিবীতে এসেছে নেক আমলের বীজ বপন করতে, যাতে কিয়ামতের দিন জান্নাতের ফসল ঘরে তুলতে পারে। কিন্তু যদি সে বিবাদ-বিসম্বাদ ও বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার সেই আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন সচেতন মুমিনের কাছে এসব তুচ্ছ বিষয়ে সময় নষ্ট করার অবকাশ নেই। সে তো আখিরাতের পথে এক অবিরাম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
একজন দৌড়বিদ যেমন প্রতিযোগিতার মাঠে দাঁড়িয়ে দর্শকদের কটুক্তি বা উপহাসের দিকে মনোযোগ দেয় না; বরং বিজয়ের লক্ষ্যে সামনের দিকে ছুটে চলে, তেমনি একজন মুমিনও তার লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরায় না। কারণ সে জানে, পথের বাধা-বিপত্তির দিকে বেশি তাকালে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
ইমাম ইবনুল আরাবী (রহ.) একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। বিখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ শায়খ আবু মুহাম্মাদ ইবন আবি যায়েদের স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত দুর্ব্যবহারকারী। তিনি প্রায়ই স্বামীর অধিকারের ব্যাপারে অবহেলা করতেন এবং কথার মাধ্যমে তাঁকে কষ্ট দিতেন। মানুষ যখন শায়খকে জিজ্ঞেস করত, “আপনি এত ধৈর্য ধারণ করছেন কেন?” তখন তিনি বলতেন,
“আল্লাহ আমাকে সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান এবং সম্পদ দান করেছেন। হতে পারে, আমার কোনো গুনাহের কারণে আল্লাহ এই স্ত্রীর মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আমি আশঙ্কা করি, যদি আজ তাকে তালাক দিয়ে দিই, তবে হয়তো এর চেয়েও কঠিন কোনো বিপদ আমার ওপর নেমে আসবে।”
তবে সহনশীলতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে, একজন মানুষ যালেমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত বা শরয়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না। নিজের অধিকার রক্ষা করা এবং অত্যাচার প্রতিহত করা প্রত্যেকের বৈধ অধিকার।
তবে সে ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অন্যায় প্রতিরোধ করা, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়। গালিগালাজ, চিৎকার-চেঁচামেচি কিংবা অহংবোধের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা মুমিনের চরিত্র নয়। বরং তার লক্ষ্য হবে যুলুম প্রতিরোধ করা এবং অন্যায়কারীকেও মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখা।
৩. হিংসা
হিংসা এমন একটি নিকৃষ্ট আত্মিক ব্যাধি, যার অর্থ হলো—কোনো মুসলিমের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি নেয়ামত বিলুপ্ত হয়ে যাক, যা সে বৈধ ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করছে এমন কামনা করা।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, হিংসার মধ্যে মূলত দুটি মারাত্মক দোষ বিদ্যমান থাকে কৃপণতা এবং যুলুম। এটি কৃপণতা এ কারণে যে, হিংসুক ব্যক্তি অন্যের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানকে সহ্য করতে পারে না। আর এটি যুলুম এ কারণে যে, সে চায় সেই নেয়ামত অন্যের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হোক।
এ কারণেই ইসলাম হিংসাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে এবং তার বিপরীতে মুমিনদের মধ্যে পারস্পরিক কল্যাণকামিতা ও ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺইরশাদ করেছেন,
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩)
এই হাদিসের তাৎপর্য হলো, একজন পরিপূর্ণ মুমিন মানুষের কল্যাণকামী হয়। সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, অন্যের জন্যও তা-ই ভালোবাসে এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা-ই অপছন্দ করে। এমনকি এই মহান গুণের মধ্যে অন্যকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বভাবতই মানুষ চায় সে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ অবস্থানে থাকুক। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্যও নিজের মতো কল্যাণ কামনা করে, তখন সে প্রকৃতপক্ষে এটিই কামনা করে যে, তার ভাইও তার মতো কিংবা তার চেয়েও উত্তম অবস্থানে পৌঁছাক।
তবে কেবল মুখে কল্যাণকামিতার দাবি করলেই তা প্রমাণিত হয় না। প্রতিটি দাবিরই প্রমাণ প্রয়োজন। আপনি সত্যিই কারও মঙ্গল কামনা করেন কি না, তার অন্যতম বড় প্রমাণ হলো—কেউ কোনো প্রশংসনীয় কাজ করলে আপনি আন্তরিকভাবে তার প্রশংসা করবেন, তাকে উৎসাহিত করবেন এবং তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেবেন।
অন্যরা যখন তার গুণাবলি ও সফলতার কথা আলোচনা করবে, তখন আপনি তাতে অস্বস্তি বোধ করবেন না; বরং আনন্দিত হবেন। আপনার ছাত্র, সহকর্মী কিংবা বন্ধুরা যেন উন্নতি করতে পারে এবং উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য আপনি আন্তরিক সহযোগিতা করবেন। তাদের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উপদেশ গোপন করবেন না।
একইভাবে আল্লাহ যদি আপনাকে কোনো দ্বীনি বা দুনিয়াবি কল্যাণ দান করেন, তাহলে তা অর্জনের পথ ও উপায় অন্যদেরও জানাতে আগ্রহী হবেন। কারণ একজন সত্যিকার কল্যাণকামী মানুষ চায়, অন্যরাও তার মতো কিংবা তার চেয়েও বেশি সফলতা ও কল্যাণ লাভ করুক।
এটাই মুমিনের হৃদয়ের পরিচয়। সে মানুষের উন্নতিতে আনন্দিত হয়, তাদের সফলতায় খুশি হয় এবং অন্যের নেয়ামত দেখে কষ্ট পাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।
লেখক : মুফতী লোকমান হোসাইন, মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল