প্রবন্ধ নিবন্ধ

বিবাহ কেন্দ্রিক কিছু প্রথা ও সুন্নতি মহর: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়

আমাদের সমাজে বিবাহ নিয়ে অনেক প্রথা চালু আছে যা শরীয়ত অনুমোদিত নয়

(১) ক্যারিয়ার গড়ার আগে বিয়ে না করা অথচ ইসলাম এমন প্রথা  থেকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি উপযুক্ত সময়ে বিবাহ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে কিন্তু ক্যারিয়ারের নামে দেরিতে বিয়ে করার বাহানায় সমাজে অবৈধ প্রেম জিনা ইত্যাদি ব্যাপক  হচ্ছে যার দ্বারা সমাজ কলুষিত হচ্ছে

ইসলাম বলছে অভাব থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যক্তি যদি গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করে তাহলে আল্লাহ তার অভাব দূর করে দিবেন  আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন সূরাতুন নূরে ইরশাদ করেন

وانكحوا الايامى منكم الصالحين من عبادكم وامائكم ان يكونوا فقراء يغنهم الله من فضله

তবে বিবাহের মাধ্যমে সেই ব্যক্তি ধনী হবে যে ব্যক্তি বিবাহের মাধ্যমে গুনাহ থেকে বিরত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় 

صفوة التفاسير (٢/٣٢٠/دار الحديث القاهرة)

قال القرطبي هذا وعد بالغني للمتزوجين طلبا لرضا الله واعتصاما من معاصيه قال ابن مسعود رضي الله عنه التمسوا الغناء في النكاح وتلى هذه الاية

وفي الحديث ثلاثة حق على الله عونهم الناكح الذي يريد العفاف

قال البيضاوي تخصيص الصالحين لان احصان دينهم والاهتمام بشانهم اهم

ابن كثير (٣/٣٥٢/دار الحديث)

عن ابي بكر رضي الله عنه قال اطيعوا الله فيما امركم به من النكاح يخز لكم ما وعدكم من الغنى

বর্ণিত দলিল দ্বারা এটাই প্রতিমান হয় যে ছেলে মেয়ে উভয় ক্ষেত্রেই ধার্মিকতা  প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যেই আল্লাহর রাসূলের সন্তুষ্টি রয়েছে|  একজন দ্বীনদার ছেলে গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য যদি বিবাহ করে এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে যায় আল্লাহ তাআলা তার ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন

 

এমনকি অভাবের কারণে যদি বিবাহ করতে না পারে এবং ঋণ নিয়ে বিবাহ করে আর অভাবের কারণে চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সেই ঋণ আদায়  করতে না পারা অবস্থায় যদি মারা যায় তাহলে এমন পাওনা কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলাই আদায় করবেন যেমনটা হাদিসে রয়েছে

وفي مرقات المفاتيح  / باب الافلاس

.....ورجل خاف على نفسه فينكح خشية على دينه فان الله يقضي عن هؤلاء يوم القيامة

 

(২)

এমনিভাবে আমাদের সমাজের অন্যতম শরীয়ত গর্হিত প্রচলন হলো   সামর্থ্যের অতিরিক্ত মহর নির্ধারণ করে পরবর্তীতে তা আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগী না হওয়াএ ব্যাপারে প্রথম কথা হল মহর বেশি হতে হবে এমন ধারণা নিছক পাগলামি আর এমন নিয়ম করে ফেলা নিষিদ্ধ ও বটে

কারণ মহর বেশি নির্ধারণ করার মধ্যে যদি অধিক মর্যাদা নিহিত থাকতো তাহলে অবশ্যই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তার উপর আমল করতেনবরং মোহরের ক্ষেত্রে শরীয়তের চাহিদা হল মহর হবে ¯^ামীর সামর্থের উপর নির্ভর করে এবং যথা সম্ভব তা আদায় করার চেষ্টা করা অন্ততপক্ষে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার আগে পরিশোধ করে নেওয়া

কেননা মহর অন্যান্য সাধারণ ঋণের মত আদায়যোগ্য একটি ঋণ যা আদায় না করলে আখেরাতে স্ত্রীর আদায় করে নেওয়ার অধিকার থাকবে ।মহরের ক্ষেত্রে প্রচলিত বাসর রাতে মোহর মাফ চাওয়া এবং মাফ করার যে প্রচলন আমাদের সমাজে রয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়

প্রথমত অনেক সময় মেয়েরা বিবাহের পূর্বে মহরের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জানে না

দ্বিতীয়তঃ বাসর রাতে কনে এক ধরনের পেরেশানিতে থাকে বিধায়স্বামীর মনোভাব  বুঝতে পেরে  মোহর মাফ করার কথা মুখে উচ্চারণ করে এটা আসলে  প্রকৃতপক্ষে মাফ করা নয়  বরং  পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া মাত্র কেননা মেয়েরা পরবর্তী দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় কারণে অকারণে মহর নিয়ে খোটা দেয় আবার কোন সময় মহর আদায়ের দাবি করে ও বসে এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে উল্লেখিত বাসর রাত্রে সে মহর মাফ করে দেয় নাই বরং ছলনা করেছে মাত্র তাই বাসর রাতের মহর মাফ করার  বিষয়টা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়তবে কোন মেয়ে যদি স্বচ্ছায়  স্বামীকে মহর মাফ করে দেয় তাহলে সেটা উত্তম কাজ হবে এবং স্বামীর জন্য উক্ত সম্পদ সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ হিসেবে বিবেচিত  হবেআল্লাহপাক রব্বুল আলামীন সূরাতুন নিসাতে বর্ণনা করেন।

فان طبن لكم عن شيء منه نفسا فكلوه هنيئا مريئا

سنن  ابي داود  رقم الحديث ٢١٠٦

عن العجفاء السلامى قال خطبنا عمر رضي الله عنهم فقال  الا لا تغالوا بصدق النساء فانها لو كانت مكرمة في الدنيا او تقوى عند الله  اولاكم بها النبي صلى الله عليه وسلم ما اصدق رسول الله صلى الله عليه وسلم امراة من نسائه ولا اصدقت امرة من بناته اكثر من سنتي عشرة اوقية

مشكاةالمصابيح (باب الافلاس /٢٥٣)

عن ابي موسى رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال  ان اعظم الذنوب عند الله ان يلقاه بها عبد بعد الكبائر التي نهي عنها ان يموت رجل وعليه دين

 

(৩)

এমনিভাবে আমাদের সমাজে সুন্নতি মহর বলতে ফাতেমী মহরকেই বুঝানো হয় অথচ এটি একটি ভুল প্রচলন মাত্র বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়েদের ও স্ত্রীগণের মহরই সুন্নতি মহর হিসেবে গণ্য হবে তবে যেহেতু আমাদের সমাজে মহরে ফাতেমীর বেশি প্রচলন আছে তাই সুন্নতি মহর হিসেবে এটাকে সবাই জানে।

 

، اس لئے اصل سنت تو یہ ہے کہ حسب استطاعت حضور صلی اللہ علیہ وسلم کی بیویوں اور صاحب زادیوں کا مہر متعین کیا جائے ، اور اگر زیادہ ہی مہر باندھنے کی بات ہے تو ہر شخص اپنی حیثیت کے مطابق اتنی مقدار متعین کرے جس کو بآسانی ادا بھی کر سکے؛ کیوں کہ مہر عورت کا اہم ترین حق ہے۔ حدیث شریف میں ہے کہ کبائر کے بعد بدترین گناہ یہ ہے کہ آدمی اللہ سے اس حال میں ملاقات کرے کہ اس پر کسی کا قرضہ ( حق ) ہو ؟ اس لئے اتنا مہر متعین کریں کہ جو بآسانی ادا کر سکیں ،

 

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়েদের মহর কত ছিল পৃথক পৃথকভাবে কোন  গ্রহণযোগ্য বর্ণনা  পাওয়া যায় না তবে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন মেয়ের মহর পাঁচশত দিরহামের অতিরিক্ত ছিল না| যা বর্তমান হিসেবে অনুযায়ী ১৩১ ভরি রুপার সমতুল্য মূল্যের কম ছিল না

আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মহর যথাক্রমে উল্লেখ করা হলো

১/  হযরত খাদিজা পাঁচ শত দিরহাম

২/ হযরত সাওদা চারশত দিলাম

৩/ হযরত আয়েশা চার শত দিরহাম

৪/ হযরত হাফসা চার শত দিরহাম

৫/ হযরত জয়নব বিনতে খুযাইমা পাচশত দিরহাম

৬/ হযরত উম্মে সালমা দশ দিরহাম

৭/ হযরত জয়নাব বিনতে জাহাশ দশ দিরহাম

৮/ হযরত জুয়াইরিয়া চারশত দিরহাম

৯/ হযরত মায়মুনা পাঁচশত দেরহাম

১০/হযরত উম্মে হাবিবা চারশত দিনার

১১/ হযরত সাফিয়া একজন বাদি ছিলেন

فتاوى قاسميه (١٣/٦٣٧/اشرفي بوك)

 

الجواب وبالله التوفيق جملہ بنات رسول کے مہروں کی تفصیل الگ الگ کسی معتبر و صحیح روایت میں نظر سے نہیں گذری، البتہ اتنا ملتا ہے کہ تمام صاحبزادیوں کے مہر ساڑھے بارہ اوقیہ ہے اور ایک اوقیہ چالیس درہم کا ہوتا ہے تو کل پانچ سو درہم ہولکھیں ۔

 

كتاب النوازل (٨/٤٠٠/اشرفي بوك)

الجواب وبالله التوفیق: بہشتی زیور میں معتبر کتب سیر و تاریخ کے حوالہ سے لکھا ہے کہ ازواج مطہرات میں سے حضرت خدیجتہ الکبری رضی اللہ عنہا کا مہر پانچ سو درہم یا اُس کی قیمت کے اُونٹ تھے جو حضرت ابو طالب نے اپنے ذمہ رکھے ۔ حضرت ام سلمہ رضی اللہ عنہا کا مہر ۱۰ درہم کا کوئی سامان تھا۔ حضرت جویریہ رضی اللہ عنہا کا مہر ۴۰۰ درہم تھے ۔ اور حضرت ام حبیبہ رضی اللہ عنہا کا مہر سب سے زیادہ یعنی چار سو دینار تھا، جو بادشاہ نجاشی نے اپنے ذمہ رکھا ۔ اور حضرت سودہ رضی اللہ عنہا کا مہر ۴۰۰ رور ہم تھا ۔ ( بہشتی زیور ۴۳۰/۶)

 

دیگر ازواج مطہرات کے بارے میں خاص طور پر صراحت نہیں ملی؛ البتہ مشکوۃ شریف میں حضرت عمر رضی اللہ عنہ کی ایک روایت سے معلوم ہوتا ہے کہ آپ صلی اللہ علیہ وسلم نے ساڑھے باره اوقیه ( تقریباً ۱۵۰۰ درہم ) سے زیادہ مہر پر نہ خود نکاح کیا اور نہ اپنی صاحبزادیوں کا کرایا ۔

 

সমাজের প্রচলিত সুন্নতি মহর এর পরিমাণ কত

 

মৌলিকভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়েদের এবং স্ত্রীগণের মহর সুন্নতি মহর হিসেবে গণ্য হয় কিন্তু যেহেতু সমাজে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা এর মহরকে সুন্নতি মহর হিসাবে প্রচলিত হয়ে গেছে তাই সাধারণত বিবাহে সেই মহরের পরিমাণকেই সুন্নতি মহর হিসাবে নির্ধারণ করা হয়

 

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা এর জন্য যে মহর নির্ধারণ করেছিলেন তাকে মহরে ফাতেমি বলে আর তা ছিল ৪০০ মিসকাল রুপা

৪০০ মিসকাল রুপার সমপরিমাণ ১৫০ তোলা রুপা,  এই ১৫০ তোলা  রুপার বাজার মূল্যই মহরে ফাতিমি

ফোকাহাদের মতামত

(১)

মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন ৪০০ মিসকাল আমাদের হিসাব অনুযায়ী ১৫০ তুলা রুপা  হয় সেই হিসেবে ১৫০ তোলা  রুপার বাজার মূল্যই মহরে ফাতেমী হিসেবে ধর্তব্য হবে

(২)

মাওলানা সাঈদ আহমদ রেজা বিজনূরী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন মহরে ফাতেমির পরিমাণ হাদীস শরীফে চার শত মিসকাল এসেছে  আর এক মিসকাল  সমপরিমাণ সাড়ে চার মাশা অতএব চারশত মিসকালে ১৫০ তুলা রুপা হয় আর এর বাজার মূল্যই মহরে ফাতিমি হিসেবে গণ্য হবে

(৩)

মাওলানা সিদ্দিক আহমদ বান্ধবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা এর মহরের সমপরিমাণ হল ১৫০ তুলা রুপা

(৪)

নাদুয়াতুল উলামার উস্তাজ বোরহানউদ্দিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন অগ্রগণ্য মত হল হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা এর মহর ৪০০ মিসকাল রুপা নির্ধারণ করা হয়েছিল যা ওজনে প্রায় ১৫০ তোলা রুপার পরিমাণ হয়| এছাড়া অন্যান্য মতামত রয়েছে

(৫)

মুফতি শফি রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন মহরে ফাতেমীর পরিমাণ ৫০০ দিরহাম  তুলা হিসেবে তার পরিমাণ ১৩১ তোলা  তিন মাশা| তার বাজার মূল্যই বর্তমানে মহরে ফাতেমি হিসেবে গণ্য হবে|

মুফতি শফি রাহিমাহুল্লাহ অন্য এক ফতোয়াতে লিখেছেন মহরে ফাতিমির পরিমাণ ৫০০ দিরহাম প্রচলিত ওজনে ১৪৫ তোলা ১০ মাসা রুপা

মোট কথা ১৫০, ১৪৫, ১৩১, তোলা রুপার যেকোনো একটির বাজার মূল্য মহরে ফাতেমী হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে

 

সুতরাং  উত্তম  ও সতর্কতা হল ১৫০ তোলা রুপার বাজার মূল্য  নির্ধারণ করা|  তবে সর্বনিম্ন  ১৩১ তুলা রুপার বাজার  মূল্য হিসেবে যদি মহরে ফাতেমী  নির্ধারণ করা হয় তাহলে আদায় হয়ে যাবে

ফতোয়ায়ে রহিমিয়া( ৮/২৩১/আশরাফিয়া দেওবন্দ)

উত্তর প্রদান

মুফতি মুঈনুল ইসলাম  

মুফতিফাতাওয়া ও মাসায়েল

মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মাহাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ

মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদদক্ষিণখানঢাকা

১৬ জুন ২০২৬