মুহাররম ও আশুরা নিয়ে প্রচলিত ভিত্তিহীন বর্ণনা: সত্যতা, বিশ্লেষণ ও ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
মুহাররম ও আশুরা কেন্দ্রিক ভিত্তিহীন কিছু বর্ণনা
মুহাররম ও আশুরা কেন্দ্রিক ভিত্তিহীন বিভিন্ন ঘটনা আমাদের সমাজে প্রচলিত। সে বিষয়ে মাসিক আলকাউসারে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। এ বিভাগেও কিছু বিষয় এসেছে। আজ বার চান্দের ফযীলত জাতীয় পুস্তকের মাধ্যমে সমাজে ছড়ানো মুহাররমের প্রথম দশকের আমল এবং আশুরা কেন্দ্রিক আবিষ্কৃত নামায ও তার ফযীলত বিষয়ক ভিত্তিহীন কিছু বর্র্ণনা তুলে ধরা হচ্ছে।
ক. মুহাররমের প্রথম দশক রোযা রাখার ভিত্তিহীন ফযীলত
‘বার চান্দের ঘটনা ও আমল’ শিরোনামের একটি বইয়ে লেখা হয়েছে-‘যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোযা রাখে, সে দশ হাজার বছর যাবৎ দিনে রোযা ও রাত্রে ইবাদতের নেকী পাবে।’
এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা পাওয়া যায় না। এ বর্ণনার ‘দশ দিন রোযা রাখা এবং দশ হাজার বছরের নেকী’ সম্ভবত এ বাংলা বইয়ের সংকলকের পক্ষ থেকে বানানো কথা। কারণ, জাল হাদীস বিষয়ক কিতাবে একেন্দ্রিক যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে রয়েছে ‘নয় দিন রোযা’র কথা। জালকারীরা সম্ভবত যিলহজে¦র নয় দিন রোযা রাখার বর্ণনার সাথে মিল রেখে এটা বানিয়েছে। কিন্তু বাংলা পুস্তিকার এ লেখক নিজে থেকে ‘দশে দশ’ আবিষ্কার করেছে।
যাইহোক, জাল হাদীসের কিতাবে একেন্দ্রিক যে জাল বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে তা হল-
مَنْ صَامَ تِسْعَةَ أَيَّامٍ مِنْ أَوَّلِ الْمُحَرَّمِ بَنَى اللهُ لَهُ قُبَّةً فِي الْهَوَى مِيلا فِي مِيلٍ لَهَا أَرْبَعَةُ أَبْوَابٍ.
যে ব্যক্তি মুহাররমের প্রথম নয় দিন রোযা রাখবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য শূন্যে এক মাইল দৈর্ঘ্য-প্রস্থের একটি ‘কুব্বা’ (গম্বুজ সাদৃশ্য প্রাসাদ) প্রস্তুত করবেন, যার চারটি ফটক থাকবে।
ইবনুল জাওযী রাহ. তাঁর জাল হাদীস বিষয়ক কিতাব ‘আলমাউযূআত’-এ বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর বলেন-
هَذَا حَدِيثٌ مَوْضُوعٌ عَلَى رَسُولِ الله صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ.قَالَ ابْنُ حِبَّانَ: مُوسَى الطَّوِيل يروي عَن أنس أَشْيَاء مَوْضُوعَة لَا يحل كتبهَا إِلّا عَلَى التَّعَجُّب.
অর্থাৎ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে জালকৃত একটি বর্ণনা। এতে মূসা আততাবীল নামক একজন জাল বর্ণনাকারী রয়েছে। -আলমাউযূআত, ইবনুল জাওযী, মুহাররমের প্রথম নয় দিন রোযা রাখা বিষয়ক অধ্যায়, খ. ২, পৃ. ১৯৯
আরো দেখুন : আললাআলিল মাসনূআহ, সুয়ূতী, খ. ২, পৃ. ৯২; তানযীহুশ শরীআহ, ইবনে আররাক, খ. ২, পৃ. ১৪৮; তাযকিরাতুল মাউযূআত, তাহের পাটনী, পৃ. ১১৮; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ, শাওকানী, পৃ. ৯৪
খ. আশুরার বিশেষ পদ্ধতির নামায ও তার ফযীলত
‘বার চান্দের ফজিলত ঘটনা ও আমলিয়াত’ শিরোনামের একটি বইয়ে আশুরা কেন্দ্রিক আবিষ্কৃত বিভিন্ন পদ্ধতির নামায ও তার ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে :
১. যদি কোনো ব্যক্তি আশুরার রাতে সোবহে সাদেকের পূর্বক্ষণে বার রাকআত নফল নামায আদায় করবে আল্লাহ পাক তার সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তাকে বহু ছাওয়াব দান করা হবে এবং সে ব্যক্তি বেহেশতের নেয়ামতের পূর্ণ হকদার হবে।এ নামায আদায় করার নিয়ম হল : প্রতি রাকআতে সূরা ফাতিহার সাথে একবার আয়াতুল কুরসী ও তিনবার সূরা ইখলাস এবং নামায শেষ করে একশত বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে।
২. যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে দুই দুই রাকআত করে চার রাকআত নফল নামায আদায় করবে এবং নামাযের প্রতি রাকআতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা যিলযাল, সূরা কাফেরূন... আল্লাহ পাক হাসরের মাঠে কঠিন বিপদের সময় তাকে বিপদমুক্ত করবেন।
৩. যে ব্যক্তি আশুরার রাতে একশত রাকআত নফল নামায আদায় করবে এবং প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহার সাথে... জীবনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন।এভাবে আরো নামাযের উল্লেখ রয়েছে এবং সেগুলোর বিশাল বিশাল ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে।এগুলো সবই ভিত্তিহীন বর্ণনা। ইবনুল জাওযী রাহ. ‘আলমাউযূআত’ কিতাবে আশুরার বিশেষ পদ্ধতির নামাযের একটি বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেন-
هَذَا حَدِيث مَوْضُوع. وكلمات الرَّسُول عَلَيْهِ السَّلامُ منزهة عَنْ مثل هَذَا التَّخْلِيط.
এটি একটি জাল বর্ণনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী এজাতীয় উদ্ভট কথাবার্তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। -আলমাউযূআত, ইবনুল জাওযী, ২/১২২
আরো দেখুন : আললাআলিল মাসনূআহ, সুয়ূতী, খ. ২, পৃ. ৪৬; তানযীহুশ শরীআহ, ইবনে আররাক, খ. ২, পৃ. ৮৯; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ, শাওকানী, পৃ. ৪৭
মোটকথা, আশুরা কেন্দ্রিক এজাতীয় বিশেষ পদ্ধতির নামায ও তার ফযীলত সবই জাল। লখনবী রাহ. জাল হাদীস বিষয়ক তাঁর কিতাব ‘আলআসারুল মারফূআ’তে বলেন-
فَائِدَة مفيدة: قد وجدت فِي كتب الأوراد والوظائف أَحَادِيث فِي أَعمال خَاصّة يَوْم عَاشُورَاء أَكْثَرهَا مَوْضُوعَة... فَاعْلَم أَن أَحَادِيث الصَّلَوَات الْمَخْصُوصَة فِي يَوْم عَاشُورَاء مِمَّا ذكرهَا بعض المشايخ فِي دفاترهم كلهَا مَوْضُوعَة...
জরুরি ফায়েদা : আওরাদ ও ওযিফার বিভিন্ন কিতাবে আশুরার দিনের বিশেষ আমল কেন্দ্রিক বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়।... জেনে রাখা দরকার, আশুরা কেন্দ্রিক বিশেষ নামাযের সকল বর্ণনাই জাল ও বানোয়াট। -আলআসারুল মারফূআহ ফিল আখবারিল মাওযূআহ, লখনবী, পৃ. ৯২
এটি হাদীস নয় : আশুরার রোযা: ষাট বছর ইবাদতের সওয়াব
.
গত ১৪ নভেম্বর (২০১৩) দৈনিক ইনকিলাবে ধর্ম-দর্শন পাতায় ‘পথ নির্দেশ: মুহররম ও শহীদানে কারবালা’ শিরোনামে একটি লেখা পড়লাম। সেখানে আশুরার রোযার ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোযা রাখে সে ষাট বছর দিনে রোযা রাতে ইবাদত করার সওয়াব লাভ করে।’ হাদীস হিসেবে লেখা হলেও এটি হাদীস নয়। এটি একটি জাল বর্ণনা যা হাবীব ইবনে আবী হাবীব নামক এক হাদীস জালকারী থেকে বর্ণিত। ইবনুল জাওযী রাহ. বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে মওযূ বর্ণনা।’ (আলমাউযূআত ২:২০৩) আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন, এটি একটি বাতিল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা। এটা হাবীব ইবনে আবী হাবীব বর্ণনা করে। আর সে হাদীস জাল করত। (আলমানারুল মুনীফ ১:৪৭, বর্ণনা নং ৪৪) হাফেয সুয়ূতী রাহ. ও আল্লামা ইবনু আররাক রাহ. এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়েছেন। আল্লামা আবদুল হাই লখনবী রাহ. আশুরার রোযার ফযীলত বিষয়ে জাল বর্ণনার আলোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই এই বর্ণনাটি এনেছেন। (আললাআলিল মাসনূআ ১:১৩৫; তানযীহুশ শরীআহ ২:১৪৮; আলআসারুল মারফূআ ১:৯৪)
আশুরার রোযার ফযীলত তো সহীহ হাদীসেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু কাতাদা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরাহ) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম ১:৩৬৭; জামে তিরমিযী ১:১৫৮) সুতরাং সহীহ হাদীসে যে ফযীলত বর্ণিত হয়েছে শুধু তা-ই বলা উচিত।
এটি হাদীস নয় : আশুরার দিন কিয়ামত হওয়া প্রসঙ্গে
আশুরা দিবসের গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে অনেকে বলে থাকেন যে, ‘হাদীস শরীফে এসেছে, এই দিনে কিয়ামত সংগঠিত হবে। এই কথাটা ঠিক নয়। যে বর্ণনায় আশুরার দিন কিয়ামত হওয়ার কথা এসেছে তা হাদীস বিশারদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভিত্তিহীন, জাল।আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী ওই বর্ণনা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এটা নিঃসন্দেহে মওযূ বর্ণনা ...। হাফেয সুয়ূতী রাহ. ও আল্লামা ইবনুল আররাক রাহ.ও তাঁর ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছেন।
(কিতাবুল মওযূআত ২/২০২; আল লাআলিল মাসনূআ ২/১০৯; তানযীহুশ শরীআতিল মরফূআ ২/১৪৯)তবে জুমআর দিন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা সহীহ হাদীসে এসেছে। দেখুন-তিরমিযী ২/৩৬২; আবু দাউদ ১/৬৩৪; সুনানে নাসায়ী ৩/১১৩-১১৪
{ মারকাযুদ দাওয়াহ থেকে সংগৃহীত }
লেখক: মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল