ইসলামের আলোকে সন্তানের চেহারার অমিলের কারণে স্ত্রীকে সন্দেহ করা: একটি মারাত্মক অন্যায়
মুফতী লোকমান হুসাইন
ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
বর্তমান সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, কোনো সন্তান যদি তার পিতা বা মাতার চেহারা, গায়ের রং কিংবা শারীরিক গঠনের সাথে পুরোপুরি মিল না রাখে, তাহলে অনেকেই অজ্ঞতাবশত স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। এমনকি কেউ কেউ সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করতেও অনীহা প্রকাশ করেন। অথচ ইসলাম এ ধরনের সন্দেহ, অপবাদ এবং কু-ধারণাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
বাস্তবতা হলো, সন্তানের চেহারা, রং বা আকৃতি সবসময় পিতা-মাতার সাথে হুবহু মিলবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় সন্তান তার দাদা-দাদী, নানা-নানী বা আরও পূর্ববর্তী পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে। এটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিগত একটি স্বাভাবিক নিয়ম।
আরও পড়ুন:বিবাহ কেন্দ্রিক কিছু প্রথা ও সুন্নতি মহর: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়
সন্তান বংশগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে
মানুষের শরীরে অসংখ্য বংশগত বৈশিষ্ট্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো সন্তান তার বাবার চেয়ে দাদার মতো দেখতে হয়েছে কিংবা মায়ের চেয়ে নানীর মতো হয়েছে। আবার কখনো গায়ের রং, চোখের আকৃতি, চুলের ধরন বা শারীরিক গঠন কয়েক প্রজন্ম পরেও প্রকাশ পেতে পারে।
এ কারণে কেবল সন্তানের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা দেখে তার বংশ নিয়ে সন্দেহ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, জেনেটিক বা বংশগত বৈশিষ্ট্য বহু প্রজন্ম পরেও প্রকাশিত হতে পারে।
রাসূলুল্লাহ এর যুগের একটি ঘটনা
এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বনি ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এসে বলল, “আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে।” সে সন্তানের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করছিল।তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি উট আছে?”সে বলল, “হ্যাঁ।”
তিনি বললেন, “তাদের রং কী?”সে বলল, “লাল।”তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“সেগুলোর মধ্যে কি ধূসর বা মেটে রঙের কোনো উট আছে?”সে বলল, “হ্যাঁ, আছে।”রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,“তাহলে তা কোথা থেকে এলো?”লোকটি বলল,“সম্ভবত বংশগত কারণে এমন হয়েছে।”তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
وَهَذَا عَسَى أَنْ يَكُونَ نَزَعَهُ عِرْقٌ
অর্থাৎ, “তোমার এ সন্তানও হয়তো বংশগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে এমন হয়েছে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫০০)
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সন্তানের রং বা আকৃতির ভিন্নতা কোনো অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ নয়; বরং তা বংশগত বৈশিষ্ট্যের ফল হতে পারে।
ইমাম নববী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, যদি কোনো সন্তান গায়ের রং বা চেহারায় পিতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না-ও হয়, তবুও সে স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য হবে।
কেবল বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের অমিলের কারণে সন্তানকে অস্বীকার করা বা তার বংশ নিয়ে সন্দেহ করা বৈধ নয়। কারণ পূর্বপুরুষদের কোনো বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রকাশ পেতে পারে।
(শারহুন নববী আলা সহিহ মুসলিম, ১০/১৩৪)
আরও পড়ুন:তাফবীজে তালাক বিষয়ে সম্পর্ক (তালাকের অধিকার বিষয়ক)
ইসলামে সন্দেহের ভয়াবহতা
ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
কোনো প্রমাণ ছাড়া স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করা শুধু পারিবারিক অশান্তির কারণই নয়; বরং এটি বড় ধরনের গুনাহও হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ।”
(সূরা হুজুরাত: ১২)
অতএব, শুধুমাত্র সন্তানের চেহারা দেখে স্ত্রী সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
অপবাদের ভয়াবহ গুনাহ
কোনো মুসলিম নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া অত্যন্ত বড় অপরাধ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
“যারা সতী-সাধ্বী, নিরপরাধ ও ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত।”
(সূরা নূর: ২৩)
বর্তমানে অনেক স্বামী শুধুমাত্র সন্তানের গায়ের রং বা চেহারার কারণে স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। অথচ এটি মারাত্মক গুনাহ এবং আল্লাহর নিকট জবাবদিহির কারণ।
আরও পড়ুন: কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত নারী-পুরুষ? ইসলামী বিশ্লেষণ
পারিবারিক জীবনে সন্দেহের ক্ষতিকর প্রভাব
সন্দেহ একটি সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যখন স্বামী স্ত্রীর প্রতি অকারণ সন্দেহ পোষণ করে, তখন দাম্পত্য জীবনের শান্তি নষ্ট হয়ে যায়।
এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, সন্তান মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো পরিবার অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যায়।
- অনেক সময় এই অমূলক সন্দেহ তালাক পর্যন্ত গড়ায়, যা পরবর্তীতে অনুশোচনার কারণ হয়।
সন্তানের চেহারা অমিল হলে করণীয়
যদি কোনো সন্তানের চেহারা বা রং পিতার সাথে না মিলে, তাহলে প্রথমেই আল্লাহর সৃষ্টিগত নিয়মের কথা স্মরণ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে যে, সন্তানের মধ্যে পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিষয়।
এ অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে, কু-ধারণা থেকে বাঁচতে হবে এবং পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে হবে।
আরও পড়ুন: নারীর গৃহে অবস্থান : পরাধীনতা নয়, মৌলিক অধিকার
শুধু চেহারার কারণে তালাক দেওয়া কি বৈধ?
শরিয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র সন্তানের চেহারা বা গায়ের রং ভিন্ন হওয়ার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া বৈধ নয়।
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) বলেন:
أما الطلاق فإن الأصل فيه الحظر، بمعنى أنه محظور إلا لعارض يبيحه
অর্থাৎ,
“তালাকের মূল বিধান হলো নিষিদ্ধতা; তবে কোনো বৈধ কারণ থাকলে তা বৈধ হয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, ৩/২২৮)
সুতরাং চেহারার অমিল কোনো শরয়ী কারণ নয় যার ভিত্তিতে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে।
আধুনিক বিজ্ঞানের সাক্ষ্য
আধুনিক জেনেটিক বিজ্ঞানও নিশ্চিত করেছে যে, মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য বহু প্রজন্ম ধরে বহন হতে পারে।
কোনো শিশুর চোখ, চুল, ত্বকের রং কিংবা মুখমণ্ডলের গঠন তার দাদা-দাদী বা আরও পূর্ববর্তী পূর্বপুরুষদের মতো হতে পারে।
এ কারণে বাহ্যিক সাদৃশ্য না থাকাকে অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে ধরা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
উপসংহার
ইসলাম মানুষের সম্মান, বংশ ও পারিবারিক সম্পর্ক সংরক্ষণের ধর্ম। সন্তানের চেহারা, গায়ের রং বা আকৃতি পিতা-মাতার থেকে ভিন্ন হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং বহু সময় বংশগত বৈশিষ্ট্যের ফল।
তাই কেবল এ কারণে স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করা, তাকে অপবাদ দেওয়া, সন্তানকে অস্বীকার করা বা তালাক দেওয়া কোনোভাবেই জায়েয নয়। একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত না করা, কু-ধারণা থেকে বেঁচে থাকা এবং পারিবারিক সম্পর্ককে বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভিত্তিতে গড়ে তোলা।
যে পরিবারে বিশ্বাস থাকে, সেখানে শান্তি থাকে। আর যেখানে অমূলক সন্দেহ প্রবেশ করে, সেখানে অশান্তি ও ধ্বংস নেমে আসে।
মুফতী: মাহাদুল ফিকহিল ইসলামি।
ফাযেল: জামিয়া এমদাদিয়া সৈয়দপুর,
মুতাখাসসিস: জামিয়াতুশ শায়েখ আ: মজিদ, ঢাকা।
মুফতী ,দারুল ইফতা আল-ইসলামী, মগবাজার, ঢাকা।