প্রসঙ্গ: সাহাবায়ে কিরাম রা.-এর সমালোচনা ও তাঁদের ত্রুটিবিচ্যুতি বর্ণনা!              



...

সাহাবা কিরাম রা.-এর মধ্যে প্রত্যেকেই সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সকলেই এ মত পোষণ করেন।

তবে এ কথাও সকলেই স্বীকার করেন যে, সাহাবীগণ রা. মা‘সূম নন যেমন ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁদের কারো কারো থেকে ছোট-বড় পাপ ও ভুল-ত্রুটিও সংঘটিত হয়েছে।

কিন্তু তাই বলে তাঁদের সমালোচনা করা, তাঁদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও তাঁদেরকে গালমন্দ করা মোটেই সঙ্গত নয়; এটা হারাম ও কবীরা গুনাহ এবং অবস্থাভেদে তা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।


 আরও পড়ুন: রবের সান্নিধ্যে মুমিনের প্রশান্তি: হৃদয়ের শান্তি লাভের ইসলামী উপায়

কেননা-

প্রথমত, ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে তাঁদের মহান কীর্তি এবং তাঁদের অসংখ্য নেক আমলের প্রতি তাকিয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের হাতেগনা ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলনসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁদের ওপর নিজের সন্তুষ্ট হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, যদিও তাঁদের কারো কারো থেকে কিছু পাপ ও ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু তা ইকামতে দীনের কাজে তাঁদের বড় বড় খিদমত এবং সারা জীবনের অসংখ্য নেক আমলের তুলনায় অতি নগণ্য ও তুচ্ছ। তা ছাড়া তাঁদের প্রত্যেকের পুণ্য এতো অধিক ছিল যে, সেগুলো তাঁদের গুনাহের কাফফারা হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, সাহাবা কিরাম রা.-এর মধ্যে প্রত্যেকেই ছিলেন অসাধারণ আল্লাহভীরু। সামান্য পাপের কারণেও তাঁদের অন্তরাত্মা ভীষণভাবে কেঁপে ওঠতো। তাই তাঁদের কেউ যখনই কোনো না কোনো পাপে লিপ্ত হয়েছেন, তিনি তাৎক্ষণিক পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে তাওবা করতেন  এবং নিজের ওপর পাপের শাস্তি প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হতেন। এভাবে তিনি পাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যেতেন।

চতুর্থত, অনেক সাহাবী থেকে প্রকাশিত কোনো কোনো ভুল-ত্রুটিকে কোনোক্রমেই পাপের আওতাভুক্ত করা যায় না। কেননা, তা তাঁদের সম্পূর্ণভাবে অনিচ্ছাকৃত ছিল। তদুপরি তাতে তাঁদের আল্লাহর অবাধ্যতা করার ইচ্ছা লেশমাত্রও ছিল না।

কাজেই কোনো পাপ বা ভুলের কারণে তাঁদের সমালোচনা করা ও গালমন্দ করা তাঁদের প্রতি অবিচার বৈ নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন,

اللهَ اللهَ فِي أَصْحَابِي، اللهَ اللهَ فِي أَصْحَابِي، لَا تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا مِنْ بَعْدِي، مَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّي أَحَبَّهُمْ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِي أَبْغَضَهُمْ وَمَنْ آذَاهُمْ ، فَقَدْ آذَانِي

‘‘তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! তোমরা আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! তোমরা আমার মৃত্যুর পর তাঁদেরকে আলোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করো না। যে ব্যক্তি তাঁদেরকে ভালোবাসলো, প্রকারান্তরে সে আমার ভালোবাসার কারণেই তাঁদেরকে ভালবাসলো। আর যে ব্যক্তি তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ রাখলো, প্রকারান্তরে সে আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণেই তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলো। আর যে তাঁদেরকে কষ্ট দিলো, সে প্রকারান্তরে আমাকেই কষ্ট দিলো।’’


আরও পড়ুন: মুসলিম পরিবারে তালাকের অপব্যবহার: শরীয়তের বিধান


অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন,

لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى لاَ تَسُبُّوا أَصْحَابِى فَوَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلاَ نَصِيفَهُ.

‘‘তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ করো না! তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ করো না! সে যাতের কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি তোমাদের কেউ উহুদ পর্বত পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও সে তাদের কারো একজনের অবদানের এক মুদ কিংবা তার অর্ধেকেও পৌঁছতে পারবে না।’’

এ হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, সাহাবা কিরাম রা. কে আলোচনা-সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এবং তাঁদেরকে গালমন্দ করা, হেয় ও ছোট করে কথা বলা জায়িয নয়; বরং হারাম। এ কাজ একদিকে ইসলামের প্রতি তাঁদের খিদমতকে ছোট করে দেখার শামিল। অপরদিকে তা প্রকারান্তরে রাসূলুল্লাহ সা. -এর সমালোচনা এবং তাঁকে গালমন্দ করা ও কষ্ট দেয়ার শামিল।

বলাই বাহুল্য, সঙ্গীসাথীদের আচরণের মাধ্যমে বস্তুতপক্ষে মূল ব্যক্তির মান-মর্যাদা ও অভিরুচির পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের আচরণ যদি সুন্দর ও ভালো হয়, তবে মূল ব্যক্তি- তারা যার অনুসরণ করে সে-ও নিঃসন্দেহে ভালো হবে। আর যদি তাদের আচরণ অসুন্দর ও অমানবিক হয়, তাহলে মূল ব্যক্তির চরিত্র নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠবে।

সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘উদ রা. বলেন, اعتبروا الناس بأخدانهم- “তোমরা লোকদেরকে তাদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বিবেচনা করো।” তদুপরি সাহাবা কিরাম রা.-এর সমালোচনা রাসূলুল্লাহ সা. -এর পুরো শরীয়তকেও অবিশ্বাস্য ও নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিতে পারে।

বর্ণিত রয়েছে,  আব্বাসীয় খলীফা হারুনুর রাশীদ (১৪৯-১৯৩ হি.) একবার ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করার পূর্বে জিজ্ঞেস করে যে, সাহাবা কিরাম রা. কেন তোমাদের সমালোচনার প্রথম লক্ষ্যবস্তু? তখন সে জবাব দেয়, যদি আমরা তাঁদের চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপন করতে সক্ষম হই, তাহলে তো আমরা শরীয়ত বর্ণনাকারীদেরকেই নষ্ট করে দিতে পারলাম। এভাবে যদি আমরা তাঁদের চরিত্র নষ্ট করে দিতে পারি, তবে পুরো শরীয়তই নষ্ট হয়ে যাবে কিংবা সংন্দেহের আবর্তে  ঘূর্ণিভূত হতে থাকবে। 

কাজেই রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ঈমান ও ভালোবাসার একটি প্রধান দাবি হলো, তাঁর সাহাবীগণকেও ভালোবাসা, যথাযথ সম্মান করা ও তাঁদের প্রশংসা করা এবং তাদের যে কোনোরূপ সমালোচনা থেকে বিরত থাকা।

ইমাম আবূ যুর‘আহ আর-রাযী [২০০-২৬৪ হি.] রাহ. বলেন,

‘‘যদি তুমি দেখতে পাও যে, কেউ রাসূলুল্লাহ সা.-এর কোনো সাহাবীকে ছোট ও হেয় করে কথা বলছে, তা হলে জেনে রাখবে যে, সে যিন্দীক (খোদাদ্রোহী)। কেননা, রাসূলুল্লাহ সা. সত্য, কুর’আনও সত্য এবং তাঁর আনীত শরীয়তও সত্য। আর এসব কিছু আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন সাহাবীগণই। এ সকল যিন্দীকেরা কামনা করে যে, তাঁরা আমাদের সাক্ষী (অর্থাৎ সাহাবী)গণকে ক্ষতবিক্ষত করে কুর’আন ও সুন্নাহকে অসার ও বাতিল প্রমাণ করতে।”

তবে এতে কারো দ্বিমত নেই যে,

সাহাবীগণের ভুলত্রুটি ও পাপগুলো যদি সীমিত পরিসরে কেবল নিজেদের শিক্ষা লাভের জন্য কিংবা ইসলামের সুমহান ও নিখুঁত আদর্শকে তোলে ধরার প্রয়োজনে বর্ণনা করা হয়, তাতে দোষের কিছু নেই, যদি এ বিবরণে তাঁদের মর্যাদা ছোট ও হেয় প্রতিপন্ন করার কুমনোবৃত্তি না থাকে।

   আরও পড়ুন:চেহারা কি পর্দার অন্তর্ভুক্ত?


মূলত এ উদ্দেশ্যেই বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ তাঁদের হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে সাহাবীগণের বিভিন্ন ভুলত্রুটি ও পাপের কথা আলোচনা করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে উম্মতের জন্য অনেক শিক্ষা ও উপদেশ নিহিত রয়েছে।

তদুপরি যদি ইসলামবিদ্বেষীরা এবং অমুসলিম পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকগণ ইসলামের ইতিহাসের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও সমালোচনায় মেতে ওঠে, নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত করতে চেষ্টা করে, 

তবে সেই অবস্থায় ইসলামের সৌন্দর্য ও শাশ্বত আদর্শকে সঠিকভাবে তুলে ধরার একান্ত প্রয়োজনে বিজ্ঞ আলিমগণ  সাহাবীগণের ভুলত্রুটিগুলো বর্ণনা করেন, ব্যাখ্যা করেন, তাতে কোনো অসুবিধা নেই; বরং পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তা কখনো অতি প্রয়োজনীয় হয়েও দেখা দেয়। 

স্মতর্ব্য যে,

এরূপ আলোচনাও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে করতে হবে, যাতে এ আলোচনার ফলে তাদের শান ও মর্যাদায় সামান্যতম আঁচড়ও না লাগে।  তবে সর্বসাধারণের পক্ষে এ আলোচনায় প্রবেশ করা কোনোক্রমেই উচিত নয়; এতে ফিতনা তৈরি হবার বিরাট আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে উম্মতের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ পারতপক্ষে তাঁদের ভুল-ত্রুটি ও পাপের আলোচনা থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করতেন।

রাসূলুল্লাহ সা. নিজেও তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়_এরূপ কোনো আলোচনা করতে উম্মতকে নিষেধ করেছেন।

সাইয়িদুনা ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘উদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, إذا ذكر أصحابي فأمسكوا  ‘‘যখন আমাদের সাহাবীগণের আলোচনা ওঠে, তখন তোমরা সংযত হও।”

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তাবি‘ঈ সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব রাহ. বলেন,

 

‘‘এমন কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি কিংবা আলিম অথবা ক্ষমতাধর ব্যক্তি নেই, যাঁর মধ্যে অবশ্যই কোনো না কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি। তবে লোকদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁদের ত্রুটিগুলো আলোচনার উপজীব্য বানানো সমীচীন নয়। কারণ, তাঁদের ত্রুটির চাইতে তাঁদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য অনেক বেশি। তদুপরি তাঁদের এ ত্রুটিগুলো তাঁদের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের নিকট গণনা করার মতো নয়।’’

اللهم ارزقنا حب الصحابة الكرام -رضي الله عنهم-، وخلقنا بأخلاقهم، وارزقنا قبسا من علمهم.

ড. আহমদ আলী

প্রফেসর : চট্টগ্রাম ভার্সিটি

📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

অনুমোদিত ফতোয়া দ্বারা: fatwamasail.com ফতোয়া board ও উপদেষ্টা প্যানেল

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

০৪ জুলাই ২০২৬