ইসলামে খিলওয়াত (নির্জনবাস) এর বিধান, পরনারীর সঙ্গে নির্জনতা: কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে
মুফতি মুঈনুল ইসলাম সিলেটি:
.......................................................................................
(১)
সঠিক নির্জনবাস (الخلوة الصحيحة) এর বিধান
এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ নামক কিতাবে ,যে নির্জন অবস্থান (খিলওয়াত)-এর কারণে শরয়ি বিধান তথা যেমন পূর্ণ মোহর, ইদ্দত ইত্যাদি প্রযোজ্য হয়, হানাফি ফকীহদের মতে সেটি হলো সহীহ খিলওয়াত বা সঠিক নির্জনবাস।
হানাফিদের মতে, সহীহ খিলওয়াত বলতে এমন নির্জন অবস্থানকে বোঝায়, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে কোনো বাস্তব, শরয়ি বা স্বাভাবিক বাধা বিদ্যমান থাকে না।
(ক) বাস্তব বাধা (المانع الحقيقى)
বাস্তব বাধা হলো— স্বামী বা স্ত্রীর কারও এমন রোগ থাকা, যার কারণে সহবাস সম্ভব নয়; অথবা স্বামী এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, যার পক্ষে সহবাস করা সম্ভব নয়; কিংবা স্ত্রী এমন অল্পবয়সী হওয়া, যার সঙ্গে সহবাস করা যায় না। আবার স্ত্রী যদি রতকা তথা যোনিপথ সম্পূর্ণ বন্ধ বা কারনা তথা যোনিপথে জন্মগত প্রতিবন্ধকতার অধিকারী হন, তবেও তা বাস্তব বাধা হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এসব অবস্থায় সহবাস করা সম্ভব হয় না।
তবে স্বামী যদি 'ইন্নীন' তথা যৌনদুর্বল বা অক্ষম অথবা খাসী তথা অণ্ডকোষহীন হয়, তাহলে তাঁদের সঙ্গে নির্জন অবস্থান সহীহ খিলওয়াত হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এসব অবস্থা সহবাসকে সম্পূর্ণ অসম্ভব করে দেয় না। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের খিলওয়াত অন্য স্বামীদের খিলওয়াতের মতোই গণ্য হবে।
(খ) শরয়ি বাধা( المانع الشرعى)
শরয়ি বাধা হলো— স্বামী বা স্ত্রী কেউ রমজানের ফরজ রোজা পালনরত থাকা, অথবা হজ বা উমরার ইহরাম অবস্থায় থাকা। আবার স্ত্রী যদি হায়েজ বা নিফাস (প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব) অবস্থায় থাকে, তবেও তা শরয়ি বাধা।
কারণ এসব অবস্থায় সহবাস শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম। তাই এগুলো শরয়ি বাধা হিসেবে গণ্য হয়। তাছাড়া হায়েজ ও নিফাস স্বাভাবিকভাবেও সহবাসের প্রতিবন্ধক, কারণ এ সময় রক্তস্রাব কষ্টদায়ক ও অপছন্দনীয়; সুস্থ স্বভাবের মানুষ সাধারণত এ অবস্থায় সহবাস থেকে বিরত থাকে।
(গ) স্বাভাবিকবাধা ( المانع الطبعى)
স্বাভাবিক বাধা হলো— নির্জন অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকা।
কারণ সাধারণ মানুষ অন্য কারও উপস্থিতিতে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে লজ্জাবোধ করে এবং সংকোচ অনুভব করে। তাই তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবে সহবাসে বাধা সৃষ্টি করে।
এ ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি দৃষ্টিসম্পন্ন হোক বা অন্ধ, জেগে থাকুক বা ঘুমিয়ে থাকুক, প্রাপ্তবয়স্ক হোক বা এমন বুদ্ধিমান শিশু হোক, পুরুষ হোক বা নারী, অপরিচিতা নারী হোক বা নিজের আরেক স্ত্রী—সব ক্ষেত্রেই একই বিধান প্রযোজ্য।
কারণ অন্ধ ব্যক্তি দেখতে না পেলেও উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। ঘুমন্ত ব্যক্তি যে কোনো সময় জেগে যেতে পারে। তাই তাদের উপস্থিতিতেও মানুষ সহবাসে সংকোচ বোধ করে।
আর বুদ্ধিমান শিশুর সামনেও মানুষ যেমন লজ্জাবোধ করে, তেমনি একজন প্রাপ্তবয়স্কের সামনেও করে। তবে যদি শিশু এত ছোট হয় যে তার কোনো বোধশক্তি নেই, তাহলে তাকে পশুর মতো গণ্য করা হয়। তার উপস্থিতি সহবাসে কোনো স্বাভাবিক বাধা সৃষ্টি করে না, কারণ সাধারণত তার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
আর যদি তৃতীয় ব্যক্তি কোনো পরনারী হন, তাহলে তার সামনে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই লজ্জাবোধ করে। উপরন্তু, সেই নারীর জন্যও স্বামী-স্ত্রীর প্রতি এভাবে দৃষ্টিপাত করা বৈধ নয়। ফলে তার উপস্থিতিতেও স্বামী-স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকে।
( সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ ১৯/২৭০)
আরও পড়ুন: রবের সান্নিধ্যে মুমিনের প্রশান্তি: হৃদয়ের শান্তি লাভের ইসলামী উপায়
এমনিভাবে যাদুল মুহতাজ নামক কিতাবে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ,সহীহ খিলওয়াত (সঠিক নির্জন অবস্থান) হলো এমন নির্জন অবস্থান, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে কোনো ধরনের বাধা থাকে না। এই বাধা তিন প্রকার হতে পারে— বাস্তব শরয়ি এবং স্বাভাবিক।
প্রথমত: বাস্তব বাধা (المانع الحقيقى )
যেমন— স্বামী বা স্ত্রীর কারও এমন রোগ থাকা, যার কারণে সহবাস করা সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত: শরয়ি বাধা ( المانع الشرعى)যেমন— রমজানের ফরজ রোজা। তবে কাযা রোজা, মান্নতের রোজা, কাফফারার রোজা বা নফল রোজা এ ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে গণ্য নয়। একইভাবে ফরজ নামাজ শরয়ি বাধা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু নফল নামাজ নয়।
তৃতীয়ত: স্বাভাবিক বাধা( المانع الطبعى)যেমন— ইস্তিহাযা (অনিয়মিত রক্তস্রাব)।
আর শরয়ি ও স্বাভাবিক—উভয় ধরনের বাধা একত্রে পাওয়া যায় হায়েয (মাসিক) ও নিফাস (প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব)-এর ক্ষেত্রে। কারণ এগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে সহবাস নিষিদ্ধ করে, আবার স্বাভাবিকভাবেও সহবাসে বাধা সৃষ্টি করে।
( যাদুল মুহতাজ২/২৬০/মাকতাবাতু শাইখিল ইসলাম)
আরও পড়ুন: মুসলিম পরিবারে তালাকের অপব্যবহার: শরীয়তের বিধান
(২)
পর নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থানের বিধান।
পরনারী বলতে এমন নারীকে বোঝায়, যিনি স্ত্রী নন এবং মাহরামও নন।ফকীহগণ সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে, পর নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করা হারাম।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৭)
(৩)
পরনারীর সঙ্গে অন্য কেউ উপস্থিত থাকলে নির্জনতার বিধান।
হানাফি ফকীহদের মতে, যদি একজন বিশ্বস্ত ও সৎ নারী সেখানে উপস্থিত থাকেন, তাহলে পরনারীর সঙ্গে নিষিদ্ধ খলওয়াত (নির্জন অবস্থান) আর থাকে না। এ থেকে বোঝা যায়, একজন পুরুষের একাধিক নারীর সঙ্গে একই স্থানে থাকা—যদি সেখানে একজন বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকেন—তবে তা নিষিদ্ধ খিলওয়াত বা নির্জনবাস হিসেবে গণ্য হবে না।
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী উল্লেখ করেছেন, পরনারীর সঙ্গে যে খিলওয়াত নির্জন বাস হারাম, তা নিম্নোক্ত অবস্থায় আর খিলওয়াত বা নির্জন বাস হিসেবে গণ্য হয় না—দুজনের মাঝে কোনো আড়াল বা বাধা থাকলে, পুরুষের সঙ্গে তার কোনো মাহরাম উপস্থিত থাকলে,অথবা সেখানে একজন বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকলে।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৮)
(৪)
মাখতুবার সাথে নির্জন বাসের বিধান।
যে মেয়ের সঙ্গে শুধু বিয়ের কথা চলতেছে অথবা বিবাহ পাকা হয়েছে কিন্তু এখনো নিকাহ সম্পন্ন হয়নি, সে তার হবু স্বামীর জন্য শরীয়তের দৃষ্টিতে পরনারী-ই। তাই নিকাহের আগে তার সঙ্গে নির্জনে একান্তে থাকা বা এমন স্থানে অবস্থান করা, যেখানে অন্য কারও প্রবেশ বা দেখা সম্ভব নয়, হারাম।এটাই ফকীহদের সর্বসম্মত মত।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৯)
আরও পড়ুন:চেহারা কি পর্দার অন্তর্ভুক্ত?
(৫)
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পর নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকার বিধান।
চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও কোনো পুরুষের জন্য পরনারীর সঙ্গে নির্জনে একান্তে থাকা বৈধ নয়। তবে যদি ওই নারীর মাহরাম, স্বামী, অথবা একজন বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকেন, তাহলে তা নিষিদ্ধ খিলওয়াত হিসেবে গণ্য হবে না।কারণ, তাদের উপস্থিতি অনৈতিক শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা দূর করে।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৯)
(৬)
কিশোর বা আমরাদ-এর সঙ্গে নির্জনবাসের বিধান।
( আমরাদ বলা হয় যার মুখে এখনো দাড়ি গজায়নি)যদি সুন্দর আমরাদ কিশোরের সঙ্গে নির্জনে একান্তে অবস্থান করলে ফিতনা বা কুপ্রবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন খিলওয়াত হারাম।শাফেয়ি ফকীহদের মতে, এমন অবস্থায়—একজন কিশোরের সঙ্গে আরেকজন কিশোরের নির্জনে থাকা, যদিও তারা একাধিক হয়; অথবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে এক বা একাধিক কিশোরের নির্জনে থাকা—উভয়ই হারাম।তবে যদি কোনো সন্দেহ, কুপ্রবৃত্তি বা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে তা হারাম নয়। যেমন—মানুষের চলাচল রয়েছে এমন রাস্তা, মসজিদ বা অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানে একসঙ্গে থাকা।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৯)
(৭)
মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনবাসের বিধান
ফকীহগণের মতে, কোনো পুরুষের জন্য তার মাহরাম নারী (যেমন—মা, বোন, মেয়ে, ফুফু, খালা ইত্যাদি)-এর সঙ্গে নির্জনে থাকা বৈধ।হানাফি ফকীহরা আরও বলেছেন, যদি নিজের ব্যাপারে নিরাপদ থাকার পূর্ণ আস্থা থাকে, তাহলে মাহরাম নারীর সঙ্গে সফর করা এবং নির্জনে থাকাও জায়েজ আছে।কিন্তু যদি সে জানে বা প্রবল ধারণা থাকে যে, তার মনে ঐ মাহরাম নারীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগতে পারে, অথবা ঐ নারী তার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে, কিংবা এ বিষয়ে সন্দেহও থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সফর করা বা নির্জনে থাকা কোনটাই বৈধ হবে না।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৬৯)
আরও পড়ুন: কেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত নারী-পুরুষ?
(৮)
নির্জনবাসের পূর্বে তালাকের বিধান।
বিবাহ পরবর্তী খিলওয়াতে সহিহা বা সঠিক নির্জনবাস অথবা সহবাসের পূর্বে কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে পৃথক পৃথক তিন তালাক দেয় যেমন তোমাকে একতলাক দুই তালাক তিন তালাক অথবা তোমাকে তালাক তালাক তালাক এমন পদ্ধতিতে তালাক দেয় তাহলে প্রথম তালাকের সাথে সাথে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় এবং অবশিষ্ট দুটি তালাক অকার্যকরী হিসেবে গণ্য হয়। এ ব্যাপারে তাবয়ীনুল হাক্বায়ীক গ্রন্তে বর্ণিত হয়েছে, স্বামী যদি তালাকগুলো আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করে, তাহলে স্ত্রী এক তালাকের মাধ্যমেই বায়িন তালাকপ্রাপ্তা হয়ে যাবে যেমন স্বামী যদি বলে তোমাকে এক তালাক, এক তালাক, এক তালাক দিলাম।"অথবা তুমি তালাক, তালাক, তালাক। এক্ষেত্রে প্রথম তালাক উচ্চারণের সঙ্গেই স্ত্রী এক তালাকে বায়েনের মাধ্যমে স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যায়। এরপর একই মজলিসে উচ্চারিত পরবর্তী তালাকগুলো আর কার্যকর হয় না, কারণ প্রথম তালাকেই বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে।নতুন ভাবে বিবাহে আবদ্ধ হইতে চাইলে ইসলামী বিধান মোতাবেক বিবাহ করে নিতে পারবে সেই সুযোগ আছে ।
(তাবয়ীনুল হাক্বায়ীক ৩/৭১/দারুল কুতবিল ইলমিয়্যাহ/ আদ্দুরুল মুখতার ৪/৪৯৯/ মাকতাবাতুল আজহার/ কিতাবুল মাসাইল ৫/৮৯/জাকারিয়া)
আর যদি এমন স্ত্রীকে একই শব্দে তিন তালাক দেয় যেমন স্ত্রীকে বলল তোমাকে তিন তালাক দিলাম তাহলে স্ত্রীর উপর তিন তালাকই পতিত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে একজন অপরজনের জন্য হারাম হয়ে যাবে।
বৈধভাবে সংসার করার পদ্ধতি
উত্তর তালাকপ্রাপ্তা ইদ্দত পালন পরবর্তী স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার পর স্বামী মারা গেলে অথবা তালাক দিলে ইদ্দত পালনের মাধ্যমে চাইলে প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহে আবদ্ধ হতে পারবে অন্যথায় নয় এ হুকুমের ক্ষেত্রে مدخول بها (যার সাথে সহবাস করা হয়েছে) এবং غير مدخول بها (যার সাথে সহবাস করা হয়নি) দুজনই সমান তথা উভয়জনই তিন তালাকপ্রাপ্তা হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্যত্র বিবাহের আবদ্ধ হওয়া ব্যতীত প্রথম স্বামীর সাথে সংসার করার সুযোগ নেই। এ বিষয়টি বিস্তারিত চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন কামাল উদ্দিন ইবনুল হুমান রাহিমাহুল্লাহ তার কালজয়ী গ্রন্থ ফাতহুল কাদিরে
সাহেব হেদায়া আল্লামা বুরহান উদ্দিন মারগিনানি বলেন যদি কোনো স্বাধীন নারীকে তিন তালাক দেওয়া হয় তবে সে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে না।উক্ত মূল মাসআলা বিশদ বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লামা ইবনুল হুমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন ,এই বিধানের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস হয়েছে কি না, এ দুই অবস্থার মধ্যে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ, সহবাসের আগে তিন তালাক দেওয়া হোক বা সহবাসের পরে—উভয় ক্ষেত্রেই একই বিধান প্রযোজ্য। কারণ, এ বিষয়ে কুরআনের নির্দেশ সর্বজনীন ও সুস্পষ্ট; সেখানে কোনো ধরনের ব্যতিক্রমের অবকাশ রাখা হয়নি।
যদিও কিছু গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সহবাসের পূর্বে তিন তালাক হলে অন্য স্বামীকে বিয়ে ছাড়াই প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী হালাল হয়ে যাবে। কিন্তু এ বক্তব্য চরম ভ্রান্ত ও মারাত্মক ভুল। এটি কুরআনের স্পষ্ট বিধান এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ইজমা এর সরাসরি বিরোধী।
এ কারণে কোনো মুসলিমের জন্য এমন মতামত বর্ণনা করা, প্রচার করা বা তার ওপর আমল করা বৈধ নয়। কারণ, এ ধরনের ভুল মত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তালাকের মতো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়কে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং শয়তান এ সুযোগে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।এ বিষয়টি এমন নয় যে, এখানে ব্যক্তিগত গবেষণা ইজতিহাদ করে ভিন্ন মত দেওয়া যাবে। কেননা, যেখানে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ এবং উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ইজমা বিদ্যমান, সেখানে ইজতিহাদের কোনো সুযোগ থাকে না।আল্লাহ তাআলার কাছে আমরা ভ্রষ্টতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।‘মুখতারাতুন নাওয়াজিল’ গ্রন্থেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সহবাস হয়েছে বা হয়নি—উভয় ক্ষেত্রেই এ বিধান একই। এটি ইসলামের এমন একটি মৌলিক ও সর্বজনবিদিত বিধান, যার বিরোধিতা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
ফাতহুল কাদির ৪/১৫৮/ আশরাফিয়া ,তানভিরুল আবসার ৪/৪৯৬/আজহার ,আদ্দুররুল মুখতার ৪/৪৯৮/আজহার ,মাজমাউল আনহুর ৩/৩১/ ইলমিয়্যাহ,রদ্দুল মুহতার ৪/৯৮/ আযহার,মাহমুদিয়া ১৩/৪৭৪/ আশরাফি বুক
নিম্নে বর্ণিত সুরতগুলোতে সহীহ খিলওয়াতকে প্রকৃত সহবাসের স্থলাভিষিক্ত ধরা হয়।
(১)
ফকীহদের অধিকাংশের মতে, সহীহ খিলওয়াত (যে নির্জন অবস্থান শরয়ি সব শর্ত পূরণ করেছে) এমন একটি বিষয়, যার মাধ্যমে স্ত্রীর পূর্ণ মোহর নিশ্চিত হয়ে যায়।অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে সহীহ খিলওয়াতে অবস্থান করার পর, সহবাসের পূর্বেই তাকে তালাক দেয়, তাহলে যদি বিবাহের সময় মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তবে স্বামীর ওপর নির্ধারিত পূর্ণ মোহর আদায় করা আবশ্যক হবে।
আর যদি বিবাহের সময় মোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা না হয়ে থাকে, তাহলে স্বামীর ওপর স্ত্রীর সমপর্যায়ের নারীদের প্রচলিত মোহর (মহরে মিসল) সম্পূর্ণ পরিশোধ করা আবশ্যক হবে।
এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ তাআলার বাণী:"আর যদি তোমরা একজন স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তোমরা তাদের কাউকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ (মোহর) দিয়ে থাকো, তবে তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিও না। তোমরা কি তা অন্যায় অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে নেবে? আর কীভাবে তা ফিরিয়ে নেবে, অথচ তোমরা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলিত হয়েছ?"
(সূরা আন-নিসা: ২০–২১),(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৭২)
(২)
দ্বিতীয়ত: ইদ্দতের ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতের প্রভাব।
হানাফি, মালেকি ও হাম্বলি ফকীহদের মতে, সহীহ নিকাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহীহ খিলওয়াত সংঘটিত হলে, এরপর তালাক হলে স্ত্রীর ওপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে; যদিও প্রকৃত সহবাস সংঘটিত না হয়ে থাকে।তবে ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) নিকাহের ক্ষেত্রে শুধু সহীহ খিলওয়াতের কারণে ইদ্দত আবশ্যক হয় না। সেখানে প্রকৃত সহবাস সংঘটিত হলেই কেবল ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে।অর্থাৎ, সহীহ নিকাহে সহীহ খিলওয়াত ইদ্দত ওয়াজিব হওয়ার জন্য যথেষ্ট; কিন্তু ফাসিদ নিকাহে শুধু খিলওয়াত যথেষ্ট নয়, বরং সহবাস হওয়া আবশ্যক।এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা বলেন—"হে মুমিনগণ! যখন তোমরা মুমিন নারীদের বিবাহ কর, অতঃপর তাদের স্পর্শ করার (সহবাস করার) পূর্বেই তালাক দাও, তখন তাদের ওপর তোমাদের জন্য এমন কোনো ইদ্দত নেই, যা তারা পালন করবে।
"(সূরা আল-আহযাব: ৪৯),(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৭৩)
(৩)
তৃতীয়ত: রুজু (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)-এর ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতের প্রভাব।
হানাফি ফকীহদের মতে, শুধু সহীহ খিলওয়াত সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে রুজু (رجعة) সাব্যস্ত হয় না।কারণ, রুজু প্রমাণিত হওয়ার জন্য এমন কোনো কথা বা কাজ থাকতে হবে, যা স্পষ্টভাবে স্ত্রীকে বৈবাহিক সম্পর্কে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। অথচ কেবল নির্জনে একত্রে অবস্থান করার মাধ্যমে এমন কোনো স্পষ্ট মৌখিক বা বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না।অতএব, শুধু খিলওয়াতে সহীহা সংঘটিত হওয়া রুজু হিসেবে গণ্য হবে না। রুজু কার্যকর হওয়ার জন্য শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে কথা বা কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৭৪)
(৪)
চতুর্থত: সন্তানদের বংশপরিচয় (নসব) প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতের প্রভাব।
হানাফি ফকীহদের মতে, সহীহ খিলওয়াতের মাধ্যমে সন্তানের বংশপরিচয় (নসব) প্রমাণিত হতে পারে। এমনকি স্বামী যদি মাজবুব (مجبوب) হন—অর্থাৎ যার পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে—তবুও এ বিধান প্রযোজ্য।আল্লামা ইবনে আবেদীন (রহ.) ইবনুশ শাহনা (রহ.)-এর আকদুল ফারায়েদ গ্রন্থ থেকে বর্ণনা করেন—যদি কোনো নারী সহবাসের পূর্বেই তালাকপ্রাপ্তা হন এবং তালাকের পর ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে সন্তান প্রসব করেন, তাহলে সেই সন্তানের বংশপরিচয় স্বামীর সঙ্গে সাব্যস্ত হবে। কারণ, নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে, গর্ভধারণ তালাকের আগেই হয়েছিল। আর গর্ভধারণ যেহেতু প্রমাণিত হয়েছে, সেহেতু তা সহবাসের পরই সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
কিন্তু যদি তিনি তালাকের ছয় মাসের বেশি সময় পরে সন্তান প্রসব করেন, তাহলে সেই সন্তানের বংশপরিচয় সাব্যস্ত হবে না। কারণ, সহবাসের পূর্বে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ওপর ইদ্দত নেই; ফলে এত দীর্ঘ সময় পরে জন্ম নেওয়া সন্তানকে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ থাকে না।
তবে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহীহ খিলওয়াত সংঘটিত হওয়ার পর তালাক হয়, এরপর স্ত্রী ছয় মাসের বেশি সময় পরে সন্তান প্রসব করেন, তবুও সেই সন্তানের বংশপরিচয় স্বামীর সঙ্গে সাব্যস্ত হবে।
ইবনুশ শাহনা (রহ.) বলেন, এ ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতেরই বিশেষ প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ, সহীহ খিলওয়াতের কারণেই এ অবস্থায় সন্তানের বংশপরিচয় স্বামীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৭৪
(৫)
পঞ্চমত: বৈবাহিক নিষিদ্ধতা (হুরমত) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতের প্রভাব।
সহীহ খিলওয়াতের অন্যতম প্রভাব হলো—এর মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে বৈবাহিক নিষিদ্ধতা (হুরমত) প্রতিষ্ঠিত হয়।আল্লামা ইবনু আবেদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সহীহ খিলওয়াতের ফলে স্ত্রীর ইদ্দত চলাকালে তার বোনকে বিয়ে করা এবং একত্রে চারজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় পঞ্চম নারীকে বিয়ে করা বৈধ নয়।তবে স্ত্রীর পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত কন্যাকে (রবীবা) বিয়ে হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, শুধু সহীহ খিলওয়াত স্ত্রীর কন্যাকে চিরতরে হারাম করে না। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে সহীহ খিলওয়াতকে প্রকৃত সহবাসের স্থলাভিষিক্ত ধরা হয় না।
অন্যদিকে নাওয়াদিরে আবু ইউসুফ-এ বর্ণিত হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি রমজানের ফরজ রোজা অবস্থায় অথবা ইহরাম অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সহীহ খিলওয়াতে অবস্থান করে, তাহলে তার জন্য স্ত্রীর কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ হবে না।কিন্তু ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, এ অবস্থায় স্ত্রীর কন্যাকে বিয়ে করা বৈধ। কারণ, এ ধরনের খিলওয়াতে স্বামীকে প্রকৃত সহবাসকারী হিসেবে গণ্য করা হয় না। এর প্রমাণ হলো—এ অবস্থায় তালাক হলে স্ত্রীর জন্য পূর্ণ মোহর নয়; বরং অর্ধেক মোহরই প্রাপ্য হয়।
(সূত্র আল-মাওসুয়াতুল ফেকহিয়্যাহ১৯/২৭৫)
বর্ণিত সুরতগুলোতে সহীহ খিলওয়াতকে(সঠিক নির্জন বাস) প্রকৃত সহবাসের স্থলাভিষিক্ত ধরা হয় না ।
(১) গোসল ওয়াজিবের ক্ষেত্রে।
لا يجب الغسل على واحد منهما بمجرد الخلوة بخلاف الوطء
অর্থ: শুধু সহীহ খিলওয়াত সংঘটিত হওয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রীর কারো ওপরই গোসল ফরজ হয় না। কেননা, গোসল ফরজ হওয়ার কারণ হলো প্রকৃত সহবাস। তাই খিলওয়াত ও সহবাস এক নয়।
(২) রজমের ক্ষেত্রে।
فلو زنا بعد الخلوة الصحيحة لا يلزمه الرجم لفقد شرط الإحصان وهو الوطء
অর্থ: যদি কোনো ব্যক্তি সহীহ খিলওয়াতের পর (কিন্তু সহবাসের পূর্বে) ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাহলে তাকে রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড) দেওয়া হবে না। কারণ, রজমের জন্য ব্যক্তি 'মুহসান' হওয়া শর্ত, আর মুহসান হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো বৈধ স্ত্রীর সঙ্গে প্রকৃত সহবাস সংঘটিত হওয়া। শুধু খিলওয়াত দ্বারা এ শর্ত পূরণ হয় না।
(৩)
প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হওয়ার ক্ষেত্রে।
لا تحل مطلقة الثلاث للزوج الأول بمجرد خلوة الثاني بل لابد وطؤه لحديث العسيلة
অর্থ: কোনো নারী তিন তালাকপ্রাপ্ত হলে, তিনি কেবল দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান (সহীহ খিলওয়াত) করার মাধ্যমে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হয়ে যান না। বরং দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত সহবাস হওয়া অপরিহার্য। কারণ, এ বিষয়ে হাদিসে «حتى تذوقي عسيلته ويذوق عسيلتك» ("যতক্ষণ না তোমরা উভয়ে দাম্পত্য মিলনের স্বাদ আস্বাদন কর") বলে স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে।
(৪)
রাজআতের ক্ষেত্রে।
لا يصير مراجعا بالخلوة ولا رجعة له بعد الطلاق الصريح بعد الخلوة لوقوع الطلاق بائنا
অর্থ: শুধু সহীহ খিলওয়াতের মাধ্যমে রুজু (স্ত্রীকে বৈবাহিক সম্পর্কে ফিরিয়ে নেওয়া) সংঘটিত হয় না। কারণ, সহীহ খিলওয়াতের পর যদি স্বামী স্পষ্ট ভাষায় তালাক দেয়, তাহলে সে তালাক বায়িন হিসেবে কার্যকর হয়। ফলে ইদ্দতের মধ্যে শুধু খিলওয়াতের মাধ্যমে রুজু করার সুযোগ থাকে না; নতুন করে বিবাহের প্রয়োজন হয়।
(৫)
উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে।
لو طلقها ومات وهي في عدة الخلوة لا ترث
অর্থ: যদি স্বামী সহীহ খিলওয়াতের পর স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং স্ত্রী খিলওয়াতজনিত ইদ্দত পালনরত অবস্থায় স্বামী মারা যায়, তাহলে স্ত্রী স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে না। কারণ, এখানে ইদ্দত থাকলেও বৈবাহিক সম্পর্ক বায়িন তালাকের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে; তাই উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সারকথা
মোটকথা
সহীহ খিলওয়াত কিছু মাসআলায় সহবাসের হুকুম পেলেও, সব মাসআলায় নয়। বিশেষ করে গোসল, ইহসান, তিন তালাকের পর পুনর্বিবাহের বৈধতা, রুজু এবং মীরাসের মতো বিধানে প্রকৃত সহবাসই মূল ভিত্তি; শুধু সহীহ খিলওয়াত যথেষ্ট নয়।
তানভীরুল আবসার / আদ্দুরুল মুখতার / রদ্দুল মুহতার ৪/২৪৮/ আযহার
উপসংহার
ইসলামে খিলওয়াত (নির্জনবাস) একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয়, যার সঙ্গে বৈবাহিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক শালীনতার বহু বিধান সম্পৃক্ত। শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক নির্জন অবস্থান একই ধরনের নয়; বরং যে নির্জন অবস্থানে স্বামী-স্ত্রীর সহবাসে কোনো বাস্তব, শরয়ি বা স্বাভাবিক বাধা থাকে না, কেবল সেই অবস্থানই সহীহ খিলওয়াত হিসেবে গণ্য হয় এবং এর ওপর বিভিন্ন শরয়ি বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
এ আলোচনায় আমরা দেখেছি, সহীহ খিলওয়াতের মাধ্যমে পূর্ণ মোহর, ইদ্দত, কিছু ক্ষেত্রে বংশপরিচয় এবং নির্দিষ্ট কিছু বৈবাহিক নিষেধাজ্ঞার মতো বিধান সাব্যস্ত হলেও, গোসল, ইহসান, তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হওয়া, রুজু ও উত্তরাধিকারের মতো বিষয়ে এটি প্রকৃত সহবাসের স্থলাভিষিক্ত নয়। একই সঙ্গে পরনারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান, মাখতুবার সঙ্গে একান্তে থাকা, চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্জনতা, আমরাদ কিশোর এবং মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জন অবস্থানের বিধান সম্পর্কেও ফকীহদের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিন তালাক প্রসঙ্গে কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর ইজমার আলোকে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে যে, সহবাস হয়েছে কি না—এটি তিন তালাকের চূড়ান্ত বিধান পরিবর্তন করে না। তিন তালাক কার্যকর হয়ে গেলে প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বৈধভাবে সংসার করার একমাত্র শরয়ি পদ্ধতি হলো, নারী স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বৈধ বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার পর সেই বিবাহ স্বাভাবিক কারণে সমাপ্ত হওয়া এবং ইদ্দত শেষ হওয়া। কৃত্রিম বা পরিকল্পিত 'হালালা' শরীয়তসম্মত নয়।
অতএব, খিলওয়াত-সংক্রান্ত মাসআলাগুলো যথেষ্ট সূক্ষ্ম ও গবেষণানির্ভর। এ বিষয়ে ব্যক্তিগত ধারণা, প্রচলিত কথা বা আবেগের পরিবর্তে কুরআন, সহীহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন, তার ওপর আমল করা এবং সমাজে বিশুদ্ধ শরয়ি বিধান প্রচার করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মা’হাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল