শরঈ দৃষ্টিকোণে ঈদ মোবারক
শরঈ দৃষ্টিকোণে ঈদ মোবারক
আজ ৩০ রমাযান। চলে গেল বরকত, রহমত, ও নাজাতের মাস। আগামীকাল হতে যাচ্ছে ঈদ। ঈদে আমরা নিজেরাও আনন্দ করি। অন্যদের সাথেও আনন্দ ভাগাভাগি করি। এতে ঈদ হয়ে ওঠে আরো আনন্দময়। ঈদের এক দু দিন পূর্বেই শুরু হয় ঈদ অভিনন্দন পর্ব। ঈদ ও ঈদের পূর্বাপর দিনগুলোতে যে বার্তাটি আমরা পরস্পর সর্বাধিক আদান প্রদান করি তা হলো, ‘ঈদ মুবারক’। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এভাবে মুবারকবাদ জানানো ইসলাম কি সমর্থন করে? সালাফের যুগে কি এর প্রচলন ছিলো? ঈদের মুবারকবাদ জানানোর জন্য কি সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি রয়েছে? বক্ষমান প্রবন্ধে এই জিজ্ঞাসাগুলোর সংক্ষিপ্ত সমাধান তুলে ধরার চেষ্টা করবো। ইনশা আল্লাহ॥
কোনো শুভ ও সুন্দর কাজে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোকে আরবীতে বলা হয় তাহনিআ। এই তাহনিআ সর্বপ্রকার বৈধ কাজের জন্য অনুমোদিত। যেমন- কারো পদোন্নতি হওয়া, কারো ভাল কোন সংবাদ আসা ইত্যাদি। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেও এরূপ তাহনিআ-অভিনন্দনের প্রচলন ছিলো। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাহনিআ জানিয়েছেন। হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন,
أنزلت على النبي صلى الله عليه وسلم (ليغفر لك الله ما تقدم من ذنبك وما تأخر) مرجعه من الحديبية فقال النبي صلى الله عليه وسلم لقد نزلت على آية أحب إلى مما على وجه الأرض ثم قرأها عليهم فقالوا هنيئا لك يا رسول الله...
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়া থেকে রওয়ানা হওয়ার পথে ليغفر لك الله ما تقدم من ذنبك وما تأخرআয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন তিনি বললেন, আমার উপর একটি আয়াত অবর্তীণ হয়েছে, যা যমীনের সবকিছু থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়। অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবাদের সামনে উক্ত আয়াতটি পড়ে শুনালেন। তারপর সাহাবায়ে কেরাম বলেছিলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ আপনাকে মুবারাকবাদ...।
সুনানে তিরমিযী (৩২৬৩), সহীহ বুখারী (৪১৭২),সহীহ মুসলিম (১৭৮৬).
এছাড়াও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে তাহনিআ জানিয়েছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা সমর্থন করেছেন। অন্যান্য বিষয়ের মত সাহাবায়ে কেরাম ঈদের তাহনিআও জানাতেন। পরবর্তী যুগেও এ ধারা অব্যাহত ছিলো। একাধিক আছারে এর প্রমাণ মেলে। নিম্নে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করছি,
মুহাম্মাদ বিন যিয়াদ রাহ. বলেন,
كنت مع ابى امامة الباهلى وغيره من اصحاب النبي صلى الله عليه وسلم فكانوا إذا رجعوا يقول بعضهم لبعض تقبل الله منا ومنك
‘আমি আবু উমামা বাহেলী রা. সহ আরো কয়েকজন সাহাবীর সাথে ছিলাম। তাঁরা যখন (ঈদ থেকে) ফিরলেন তখন একজন অপরজনকে বললেন, تقبل الله منا ومنك।’
(ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রাহ. হাদীসটিকে জায়্যিদ বলেছেন। ইবনুত তুরকুমানী ও ইবনে কুদামা রাহ. তার সমর্থন করেছেন। আল্লামা সুয়ূতী রাহ. সনদটিকে হাসান বলেছেন। তুহফাতু ঈদিল আযহা, তাহনিআতুল ঈদ- ইবনে আকীল দ্র. আলমুগনী- ইবনে কুদামা ২:২৯৬, আলজাওহারুন নাকী ৩: ৩২০-৩২১। আলহাভী লিল ফাতাওয়া পৃ.৯৪।)
হযরত জুবায়ের বিন নুফায়র রাহ. বলেন,
كان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا التقوا يوم العيد يقول بعضهم لبعض تقبل الله منا ومنكم
‘সাহাবায়ে কেরামের ঈদের দিন পরস্প দেখা হলে একে অপরকে তাহনিআ জানিয়ে বলতেন,
تقبل الله منا ومنكم’।
(হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. এবং আল্লামা সুয়ূতী রাহ. এ বর্ণনার সনদকে হাসান বলেছেন। মাশীখাতুল ফারাযী; দ্র. জুযউন ফিত তাহনিআ পৃ.৩৪। আলহাভী লিল ফাতাওয়া পৃ. ৯৪।)
সাফওয়ান বিন আমর রাহ. বলেন,
سمعت عبد الله بن بسر وعبد الرحمن بن عائذ، وجبير بن نفر وخالد بن معدان يقال لهم في أيام الأعياد: تقبل الله منا ومنكم، ويقولون ذلك لغيرهم.
আমি শুনেছি লোকেরা আবদুল্লাহ বিন বুসর, আবদুর রহমান বিন আয়েয, জুবায়ের বিন নুফায়র ও খালেদ বিন মাদান রাহ. কে , تقبل الله منا ومنكمবলত। তাঁরাও অনুরূপ অন্যদেরকে বলতেন।’
(আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ১: ২৫১। সনদটি নির্ভযোগ্য।)
হাফিযুল হাদীস, ইমাম শু‘বা রাহ. বলেন,
لقيت يونس بن عبيد في يوم عيد فقلت: تقبل الله منا ومنك
‘একবার ঈদের দিন ইউনুস বিন উবাইদের সাথে স্বাক্ষাত করি। তখন তাঁকে এ বলে শুভেচ্ছা জানাই, تقبل الله منا ومنك।’
(সনদটি সহীহ, আদদুআ- তাবারানী [৯২৯], জুযউন ফিত তাহনিআ পৃ.৩৬, আলহাভী লিল ফাতাওয়া পৃ. ৯৪।)
মদীনার আমল ও মালেক রাহ. এর বক্তব্য
ঈদের দিনে তাহনিআর আমল মদীনায় ব্যাপক প্রচলন ছিলো। ইমাম আলী বিন ছাবেত রাহ. বলেন,
سألت مالكا عن قول الناس في العيد تقبل الله منا ومنك فقال ما زال الأمر عندنا كذلك ما نرى به بأسا
আমি ইমাম মালেক রাহ.কে ঈদের দিন মানুষের তাহনিআ, ‘تقبل الله منا ومنك’সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে বললেন, আমাদের এখানে আমল এভাবেই চলে আসছে। আমরা তাতে আপত্তির কিছু দেখি না।’
(আসসিকাত- ইবনে হিব্বান ৯:৯০, আলমুগনী-ইবনে কুদামা ২:২৯৬, জুযউন ফিত তাহনিআ পৃ.৪১।)
মালেকী মাযহাবের অন্যান্য ইমামগণও অনুরূপ মত পোষণ করেন।
হানাফী আলেমদের বক্তব্য
আল্লামা ইবনে আমীরে হাজ্জ রাহ. ঈদের তাহনিআকে মুস্তাহাব বলেছেন। তিনি স্বপক্ষে একাধিক আছার উল্লেখ করে বলেন,
والتعامل في البلاد الشامية والديار المصرية حرسها الله تعالى قول الرجل لصاحبه عيد مبارك عليك ونحوه و أن يلحق هذا اللفظ بذلك في الجوار الحسن لأن اللفظ المأثور إما إخبار بقبول طاعته كما هو ظاهر اللفظ ،وإما دعاء بقبولها كما هو ظاهر الحال فيستنبط مشروعية هذا واستحبا به من مشروعية الأول واستحبابه لما بينهما من التلازم فإن من قبلت طاعته في زمان كان ذلك الزمان عليه مباركا كما ان من كان الزمان المعين عليه مباركا كان طاعته فيه مقبولة على أنه قد ورد الدعاء للإنسان بالبركة في أمور شتى فيؤخذ منه استحباب الدعاء له بها في هذا أيضا اه
‘সিরিয়া এবং মিসরে ‘ঈদ মুবারক’ বলে তাহনিআ জানানোর প্রচলিত রীতি মুস্তাহাব ও শরীআত অনুমোদিত। কেননা, সালাফের তাহনিআর বাক্যটি ইবাদাত কবুলের বার্তা বহন করে। যেমনটি শব্দ থেকে বুঝা যায়। অথবা ইবাদাত কবুল হওয়ার দুআ বুঝানো হতো। যেমনটি অবস্থার তাকাযা। এ থেকে ‘ঈদ মুবারক’ মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। কারণ উভয় দুআর মাঝে সামাঞ্জস্যতা রয়েছে। কেননা ইবাদাত কবুল হওয়ার সময়টি নিঃসন্দেহে ইবাদতকারীর জন্য বরকতপূর্ণ হয়ে থাকে। তদ্রুপ বরকতময় সময়ে ইবাদাত কবুল হয়ে থাকে। তাছাড়া হাদীসে মানুষের বরকতের জন্য দু‘আর কথাও বলা হয়েছে। সুতরাং এ থেকে ‘ঈদ মুবারক’ বলা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়।
হালবাতুল মুজাল্লী ২:৫৫২। রদ্দুল মুহতার ২: ১৬৯
আল্লামা তাহতাভী রাহ.সহ আরো অনেক হানাফী আলেম ও মুফতীগণ অনুরূপ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। (হাশিয়াতুত তাহতাভী পৃ. ৩৪৫)
উপমহাদেশের মুফতীয়ানে কেরামও একই মত পোষণ করেন।
(ফাতাওয়ায়ে কাসিমিয়্যা ৩:১৭৬।)
শাফিয়ী মাযহাবের আলোকে তাহনিআ
শাফিয়ী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ, আল্লামা শিরবীনী রাহ. বলেন,
قال القمولي: لم أر لأحد من أصحابنا كلاما في التهنئة بالعيد والأعوام والأشهر كما يفعله الناس، لكن نقل الحافظ المنذري عن الحافظ المقدسي أنه أجاب عن ذلك بأن الناس لم يزالوا مختلفين فيه، والذي أراه أنه مباح لا سنة فيه ولا بدعة. وأجاب الشهاب ابن حجر بعد اطلاعه على ذلك بأنها مشروعة
‘কামূলী রাহ. বলেন, ঈদ, বৎসর ও মাসের তাহনিআর বিধান সম্পর্কে আমাদের ফুকাহায়ে কেরামের কোন আলোচনা আমার নযরে পড়ে নি। হাফিয মুনযিরী রাহ. হাফিয মাকদেসী রাহ. এর এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তর বর্ণনা করেন যে, এ বিষয়টি ফুকাহায়ে কেরামের নিকট মতভেদপূর্ণ। তবে আমি তা সুন্নাত বা বিদআত নয়; জায়েয মনে করি। হাফিয ইবনে হাজার রাহ. বলেন, ঈদের দিন মুবারাকবাদ দেয়া শরীয়তসম্মত। (মুগনীউল মুহতাজ ১:৫৯৬।)
আল্লামা সুলাইমান রাহ. বলেন,
جرت عادة الناس بالتهنئة في هذه الأيام ولا مانع منه لأن المقصود منه التودد وإظهار السرور...
وعبارة البرماوي والتهنئة بالأعياد والشهور والأعوام مستحبة ويستأنس لها بطلب سجود الشكر عند حدوث نعمة وبقصة كعب وصاحبيه حين بشر بقبول توبته لما تخلف عن غزوة تبوك وتهنئة أبي طلحة له والله أعلم
‘এ সকল দিনে মুবারাকবাদ দেয়া মানুষের মাঝে বেশ প্রচলিত এবং শরীয়তেও এর কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। কারণ, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা ও আনন্দ প্রকাশ। আল্লামা বিরমাবী রাহ. এর বক্তব্য হলো, ঈদ, মাস ও বৎসরের তাহনিআ মুস্তাহাব। এর প্রমাণ হিসেবে নিআমত লাভে সাজদায়ে শুকরিয়ার হাদীস, তাওবার সুসংবাদ শুনে কাব রা.ও তাঁর সাথীদ্বয়ের ঘটনা এবং আবু তালহা রা. কর্তৃক তাঁকে তাহনিআ প্রদানকে পেশ করা যায়।’ (হাশিায়াতুল জুমাল ২:১০৫।)
ইমাম আহমদ ও হাম্বলী আলেমদের বক্তব্য
ইমাম আবু দাউদ রাহ. বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ. কে ঈদের দিনتقبل الله منا ومنكمদিয়ে তাহনিআ প্রদান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন,
أرجو أن لا يكون به بأس.
‘এভাবে অভিনন্দন প্রদানে কোনো সমস্যা নেই।’ (মাসাইলু ইমাম আহমাদ-ইমাম আবু দাউদকৃত বর্ণনা পৃ.৮৯।)
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ. বলেন,
ولا بأس أن يقول الرجل للرجل يوم العيد: تقبل الله منا ومنك
‘ঈদের দিন এক অপরকে تقبل الله منا ومنكবলাতে কোন সমস্যা নেই।’
(আলমুগনী- ইবনে কুদামা ২: ২৯৫, আলমুবদি ২:১৯৪, আলফুরূ ২:১১৭।)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, মানুষ ঈদের দিন ‘ঈদ মুবারক’ বা এ ধরণের শব্দ দিয়ে মুবারকবাদ জানায় তা শরীয়ত সম্মত কি না? তিনি উত্তরে বলেন,
أما التهنئة يوم العيد يقول بعضهم لبعض إذا لقيه بعد صلاة العيد: تقبل الله منا ومنكم وأحاله الله عليك ونحو ذلك فهذا قد روي عن طائفة من الصحابة أنهم كانوا يفعلونه ورخص فيه الأئمة كأحمد وغيره
‘ঈদের নামায শেষে একে অপরকে ‘تقبل الله منا ومنكم وأحاله الله عليك’ এ জাতীয় শব্দ দ্বারা তাহনিআ জানানোর আমল সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে অনুসৃত। ইমাম আহমাদ রাহ. সহ ইমামদের কেউ কেউ তার অনুমতিও প্রদান করেছেন।’
মাজমুউল ফাতাওয়া ২৪: ২৫৩, আলফাতাওয়াল কুবরা ২:৩৭১।
মুবারকবাদ জানানোর পদ্ধতি
লিখিত বা মৌখিক উভয়ভাবেই তাহনিআ ও মুবারকবাদ জানানো যায়। নির্দিষ্ট কোনো শব্দ বা বাক্যের উপস্থিতি আবশ্যক নয়। তবে সালাফের যুগে ঈদের তাহনিআর ক্ষেত্রে সাধারণত تقبل الله منا ومنكمবাক্যটি ব্যবহৃত হত। তাই অন্যান্য বাক্যের তুলনায় এটি ব্যবহার করাই অধিক উত্তম হবে। আমরা একটু শিখে নিলেই সালাফের প্রচলিত বাক্য দ্বারাই মুবারকবাদ জানাতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের উত্তম পদ্ধতিতে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল