ঈদের অতিরিক্ত ছয় তাকবীর: একটি দালিলিক আলোচনা
ঈদের নামায একদিকে ইবাদাত অন্যদিকে আনন্দ। ঈদের নামাযের মাধ্যমে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য ফুটে ওঠে। এই একতা ও ভ্রাতৃত্বকে সুদৃঢ় রাখার জন্য প্রত্যেকেরই কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখা মেনে চলা কর্তব্য। কুরআন-সুন্নাহকে অমান্য করলে যেভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ক্ষুণ্ন হয়, ঠিক তেমনি কুরআন-সুন্নাহর প্রশস্ত কোন বিধানকে সংকীর্ণ করলেও স্থায়ী ভ্রাতৃত্ব ক্ষুণ্ন হয়। এক পর্যায়ে বিবাদ-কলহে পৌঁছায়। কুরআন-সুন্নাহয় যে বিষয়গুলোকে প্রশস্ত রাখা হয়েছে তার মাঝে ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীরসমূহ অন্যতম।
আমাদের দেশে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরে ঈদের নামায আদায় করা হয়। এ আমলটি সহীহ হাদীস ও সুন্নাহসম্মত। যুগ যুগ ধরে এভাবেই আমল চলে আসছে। অল্প কিছু দিন হলো কিছু ভাই ঈদের নামাযে নতুন কলহ ও বিবাদের জন্ম দিয়েছে। তাদের প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচারে সরলমনা মুসলিম ভাইদের অনেকে প্রভাবিত হচ্ছে। নিজের আমলের ক্ষেত্রে সংশয়ী ও সন্দিহান হয়ে পড়ছে। ভাবতে থাকে, তাদের নামায ভুল ছিলো; আলেমগণ তাদেরকে ভুল নামায শিক্ষা দিয়েছেন! এ সকল ভাইদের জন্যই আজকের বক্ষমান প্রবন্ধ। প্রিয় পাঠক, আপনি নিজেই দেখে নিন, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সহীহ হাদীস আছে কি না?
এ প্রবন্ধে দুটি বিষয় সরলভাবে পেশ করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
১. ছয় তাকবীরের সহীহ হাদীস ও প্রামান্যতা।
২. যে লা মাযহাবী ও সালাফীরা হাদীসের নামে উম্মাহর মাঝে দ্বিধাভক্ত করছে, তারা আজও ঈদের নামাযের বিভিন্ন বিষয়ে একমত হতে পারে নি! নিজেরাই নানা ইখতিলাফ ও মতানৈক্যে লিপ্ত। এমনি কি ঈদের তাকবীর বিষয়েও!
সর্বজনবিদিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো আমল ও সুন্নাহ প্রমাণিত হওয়ার দুটি পদ্ধতি রয়েছে।
এক. তাওয়ারুস ও তালাক্কী বা উম্মাহর আমল পরম্পরা।
দুই. সহীহ সনদ।
প্রিয় পাঠক! এখন আমরা দেখব, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর উল্লিখিত উভয় পদ্ধতিতে প্রমাণিত কি না?
এক. তাওয়ারুস ও তালাক্কীর দৃষ্টিতে ছয় তাকবীর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে ঈদের নামায আদায় করেছেন। অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে। সাহাবায়ে কেরাম রা. প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে সরাসরি সে পদ্ধতি শিখেছেন। কখনো স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ গুরুত্বের সাথে তাকবীর সংখ্যা স্পষ্টরূপে হাতেকলমে বলে দিয়েছেন।
একাধিক সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী আহলে ইলমগণ নবীজী থেকে অনুসৃত ছয় তাকবীরের সাথেই ঈদের নামায আদায় করেছেন। ইমাম তিরমিযী রাহ. (২৭৯হি.) বলেন,
وروى عن أبن مسعود أنه قال في التكبير في العيدين : تسع تكبيرات في الركعة الأولى وخمس تكبيرات قبل القراءة في الركعة الثانية يبدأ بالقراءة ثم يكبر أربعا مع تكبيرة الركوع. وقد روى عن غير واحد من أصحاب النبي ‘ نحو هذا وهو قول أهل الكوفة، وبه يقول سفيان الثوري.
“ হযরত ইবনে মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঈদের তাকবীর নয়টি। প্রথম রাকাতে কিরাআতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর। দ্বিতীয় রাকআতে রুকূর তাকবীরসহ চার তাকবীর। একাধিক সাহাবী থেকে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর এটা হলো আহলে কুফা ও ইমাম সুফিয়ান ছাওরী এর অভিমত।” (সুনানে তিরমিযী [৫৩৫])
ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. (৪৬৩হি.) বলেন,
وروي قول الثوري وأبي حنيفة عن جماعة من سلف أهل العراق من الصحابة والتابعين ولم يرو عن أحد منهم أنه فرق بين تكبير الفطر والأضحى إلا عن علي وحده رضي الله عنه وليس الإسناد عنه بالقوي
“ইমাম আবু হানীফা ও সুফিয়ান ছাওরী রাহ. এর ন্যায় কুফার সাহাবা তাবেঈনের এক জামাত থেকেও অনুরূপ আমল বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের কেউ ঈদুল ফিতর ও ঈদুর আযহায় তাকবীরের ক্ষেত্রে পার্থক্য করতেন না। তবে হযরত আলী রা. এর প্রতি ‘পার্থক্য হওয়ার’ বক্তব্যটি সুনিশ্চিত নয়।” (আলইসতিযকার ৩/৩৯৭।)
কাযী শাওকানী (১২৫০) বলেন,
وهو مروي عن جماعة من الصحابة: ابن مسعود، وأبي موسى، وأبي مسعود الأنصاري، هو قول الثوري، وأبي حنيفة
“এ আমল সাহাবা রা.এর এক জামাত থেকেও অনুসৃত। ইবনে মাসঊদ, আবু মূসা আশআরী, আবু মাসঊদ আনসারী রা. তাঁদের অন্যতম। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী ও আবু হানীফার রাহ. এর আমলও অনুরূপ।” (নায়লুল আওতার ৩/৩৫৫)
উপরে আমরা ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. ও লা মাযহাবীদের ইমাম শাওকানী রাহ. এর বক্তব্য দেখলাম। তাদের বক্তব্যে মৌলিকভাবে দুটি বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। এক, অনেক সাহাবী ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর দিতেন। এখন প্রশ্ন হলো, এত সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম এই আমলটি পেলেন কোত্থেকে? তারা কি মিথ্যা আমল করেছেন? বিদআত আবিষ্কার করেছেন? এ তো সম্ভব নয়! তাহলে নিশ্চিত যে, তারা এ আমলটি শিখেছেন খোদ রাসূলে কারীস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। নবীজীই এ শিক্ষা দিয়েছেন স্বীয় সাহাবায়ে কেরামকে।
দুই. উল্লিখিত বক্তব্যে দ্বিতীয় বিষয় যা উঠে এসেছে, ইসলামের দ্বিতীয় দারুল খিলাফা তথা রাজধানী কুফাতে ঈদে ছয় তাকবীরের আমল জারী ছিলো। সহস্রাধিক সাহাবায়ে কেরাম এই দারুল খিলাফায় অবস্থান করেছেন। তারা এই আমল করতেন এবং অন্যদের শিক্ষা দিতেন। এমনিভাবে আবু মূসা আশআরী রা. ভাষ্যমতে বসরা শহরেও ছয় তাকবীরের আমল ছিল। (সুনানে আবু দাউদ [১১৫৩])
এ থেকে সহজেই প্রমাণিত হয় যে, ঈদে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের আমল খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই অনুসৃত ও প্রমাণিত।
ইসলমের স্বর্ণ যুগে ছয় তাকবীরের আমলের সপক্ষে আরো অনেক আছার রয়েছে সংক্ষিপ্ততার করণে উল্লেখ করা হলো না। পরবর্তীতেও ধারাবাহিকতার সাথে ছয় তাকবীরের আমল বাকী ছিল। উপরোল্লিখিত বক্তব্যসমূহে আমরা দেখলাম, সাহাবা, তাবেয়ীন ও পরবর্তী আহলে ইলমের অনেকেই অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে ঈদের নামায আদায় করেছেন।
এখন দেখব, দ্বিতীয় পদ্ধতি তথা সহীহ হাদীসে প্রমাণিত কি না?
দুই: ছয় তাকবীরের সপক্ষে সহীহ হাদীস
আমরা দেখলাম, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এর শিখানো) অতিরিক্ত তাকবীর সাহাবায়ে কেরাম অনুসরণ করেছেন এবং অন্যদের কাছে বর্ণনা করেছেন। বিষয়টি সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত।
হাদীস উপস্থাপন করার পূর্বে একটি মূলনীতি জানা থাকলে মূল আলোচনা বুঝতে সহজ হবে ইনশা আল্লাহ। হাদীসের সঠিক মর্ম অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজনে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয়। তবে নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে। এ কাজটি শোরগোলকারী সালাফী ও লা মাযহাবীরাও করে। যেমন আলোচ্য বিষয়ে তারা বার তাকবীরের প্রবক্তা। হাদীসের ব্যাপকতা থেকে প্রশ্ন জাগে যে, বার তাকবীর তাহরীমার তাকবীর সহ নাকি ব্যতিত? ইমাম মালেকসহ লামাযহাবীদের ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহ. তাহরীমার তাকবীরসহ বার তাকবীরের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাহলে অতিরিক্ত তাকবীর বারটি হচ্ছে না। বরং এগারোটি হচ্ছে। (আলইসতিযকার, ২/৩৯৫-৩৯৬, আলআওসাত, ৪/৩১৪)
এমনিভাবে ইবনে আব্বাস রা. থেকে তাহরীমা ও রুকূ এর তাকবীরসহ তের তাকবীর বর্ণিত হয়েছে। (আলআওসাত, ৪/৩১৭।) এখানেও তারা ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে বার তাকবীর প্রমাণ করে থাকে। তাহলে বোঝা গেলো, প্রয়োজনে নিয়ম নীতি অনুসরণ করে হাদীসের ব্যাখ্যা একটি সর্বজন স্বীকৃত বিষয়।
ছয় তাকবীরের হাদীসগুলোতেও প্রয়োজনে এ ধরনের ব্যাখ্যার আাশ্রয় গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কেননা হাদীসে তাকবীরের সংখ্যা উল্লেখ করতে গিয়ে কখনো রুকূ ও তাহরীমার তাকবীরসহ উল্লেখ করা হয়েছে। কখনোবা শুধু রুকূ বা তাহরীমার তাকবীরসহ উলেখ করা হয়েছে। তাই হাদীস পড়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে যে, রুকূ বা তাকরীমার তাকবীর সহ উল্লেখ করা হলো কি না? এভাবে উল্লেখ থাকলে অতিরিক্ত তাকবীর হবে তিন তিন ছয়। বাকীগুলো রুকূ বা তাহারীমার তাকবীর। এই ব্যাখ্যাটি আমরা নিজেরা করছি না। রাসুলের আস্থাভাজন খাদেম ও ফকীহ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. নিজেই এমন ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। যেমন, ইমাম ইবনুল মুনযির রাহ. (২১৯) বলেন,
وفيه قول سواه وهو أن التكبير في العيدين تسع تسع... وفسر ذلك ابن مسعود لبعض الأمراء فقال: تقوم فتكبر أربعا متواليات، ثم تقرأ ثم تكبر، فتركع وتسجد، ثم تقوم فتقرأ ثم تكبر أربعا تركع بآخرهن.
“এখানে আরেকটি অভিমত রয়েছে, আর তা হলো, উভয় ঈদেই নয়টি করে তাকবীর দিবে। ... ইবনে মাসঊদ রা. কতক আমীরকে এর পদ্ধতি এভাবে বর্ণনা করেন যে, প্রথমে নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়াবে। তারপর ধারাবাহিক চারটি তাকবীর দিবে। অতঃপর কিরাআত শেষ করে তাকবীর দিয়ে রুকূ, সেজদা করবে। সেজদা শেষে দাড়িয়ে কিরাআত পড়বে। কিরাআত শেষে ধারাবাহিক চারটি তাকবীর দিবে; চতুর্থ তাকবীর দিয়ে রুকূতে চলে যাবে।” (আলওসাত ৪/৩১৫)
অনুরূপ বিশিষ্ট তাবেঈ ইমাম আবু হানীফা রাহ-ও (১৫০হি.) ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. (১৮৯হি.) বলেন,
قلت أرأيت التكبير في صلاة العيدين كيف هو؟ قال: يقوم الإمام فيكبر واحدة يفتتح بها الصلاة، ثم يكبر بعدها ثلاثا، فإذا كبر قرأ بفاتحة القرآن وبسورة، فإذا فرغ من القراءة كبر الخامسة، فركع بها، فإذا فرغ من ركوعه وسجوده، قام في الثانية، فبدا فقرأ بفاتحة القرآن وبسورة، فإذا فرغ من القراءة كبر ثلاث تكبيرات، ثم يكبر الرابعة، فيركع بها، ثم يسجد، فإذا فرغ تشهد وسلم.
“আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত তাকবীরসংখ্যা ও পদ্ধতি কী? উত্তরে বললেন, ইমাম নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলবে। তারপর ধারাবাহিক তিনটি তাকবীর বলবে। তাকবীর শেষ করে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করবে। এরপর পঞ্চম তাকবীর বলে রুকূ করবে। রুকূ, সেজদা সমাপ্ত করে দ্বিতীয় রাকআতের জন্য দাঁড়াবে। তারপর সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পাঠ করবে। কিরাআত শেষে ধারাবাহিক তিনটি তাকবীর বলবে। তারপর চতুর্থ তাকবীর বলে রুকূতে যাবে। তারপর রুকূ, সেজদা সম্পন্ন করে তাশাহহুদ... আদায় করে সালাম দিয়ে নামায শেষ করবে।” (আলআছ্ল ১/৩৭২ তাহকীক: আবুল ওয়াফা আফগানী)
সর্বোপরি আমরা বুঝতে পারলাম, সংখ্যার ব্যাখ্যা কারো মনগড়া বা নতুন নয়। বরং সাহাবী থেকে অনুসৃত। অনুরূপ ব্যাখ্যা অন্য ইমামগণও করেছেন। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রাহ. প্রমুখ তাঁদের অন্যতম। এতোটুকু বুঝে নেয়ার পর আশা করি নিম্নের হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা বুঝতে অসুবিধা হবে না।
নিম্নে ছয় তাকবীরের সপক্ষে বর্ণনাসমূহ উল্লেখ করা হল,
(১) কাসিম ইবনে আবদুর রহমান রাহ. (১১২হি.) বলেন,
حدثني بعض أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم قال صلى بنا النبي صلى الله عليه وسلم يوم عيد ، فكبر أربعا ، وأربعا ، ثم أقبل علينا بوجهه حين انصرف ، قال : لا تنسوا ، كتكبير الجنائز ، وأشار بأصابعه ، وقبض إبهامه
“আমাকে কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম রা. হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে (তাহরীমা/রুকূসহ) চার চারটি তাকবীরের সহিত ঈদের নামায আদায় করেছেন। নামায শেষে তিনি আমাদের প্রতি তাকিয়ে বললেন, ভুলে যেয়ো না (ঈদের নামাযের সমূহ তাকবীর) জানাযার নামাযের ন্যায়- এ বলে তিনি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল চেপে ধরে চার আঙ্গুল দেখিয়ে ইশারা করলেন।” (সাহাবী ও তাবেঈর ব্যাখ্যা অনুযায়ী হাদীসে তাহরীমা ও রুকূর তাকবীরসহ চার চারটি তাকবীরের কথা বলা হয়েছে। তন্মধ্যে ছয়টি হলো, ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর তাকবীর এবং দুটি হলো তাহরীমা ও রুকূর তাকবীর)
([সহীহ] শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭১, আহকামুল ঈদাইন-মাহামিলী [৩]। সনদের সকল রাবী ছিকাহ-নির্ভরযোগ্য। ইমাম তহাবী রাহ. এ হাদীসকে হাসানুল ইসনাদ বলেছেন। আল্লামা আইনী, যফার আহমাদ থানভী, আল্লামা ইউসুফ বানূরী রাহ.সহ প্রমূখ মুহাদ্দিস এ হাদীসকে সহীহ বলেছেন। (নুখাবুল আফকার ১৬/৪৪২, ইলাউস সুনান ৬/২৪০৫-২৪০৬, মাআরিফুস সুনান ৪/৪৪০) সালাফীদের শ্রদ্বেয়ভাজন শাইখ আলবানৗও সহীহ বলেছেন। বরং তিনি আরও বলেছেন,
وهي في الحقيقة رواية عزيزة جيدة، مما حفظه لنا الإمام الطحاوي رحمه الله، ولست أدري لم لم يتعرض لها بذكر كل الذين أخرجوه من الطريق الأخرى من الذين تكلموا عليه بالتضعيف كالنووي والعسقلاني، بل والزيلعي،
(সিলসিলাতুস সহীহা [২৯৯৭])
কাসিম ইবনে আবদুর রহমান শামী
সনদের কেন্দ্রীয় রাবী কাসিম ইবনে আবদুর রহমান। তাবেঈ; দিমাশকী; শামী। বহুসংখ্যক জারহ তাদীলের ইমাম তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি একাধিক সাহাবীর দর্শন লাভ ও তাঁদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এ কথা বলা যথার্থ নয় যে, তিনি কোনো সাহাবীর সাক্ষাৎ পান নি। (বিস্তারিত জানতে দেখুন, তারীখে কাবীর-বুখারী ৭/১৬৯, তারীখে আবু যুরআ পৃ.৩২০, তাহযীবুল কামাল ২৩/৩৯০)
(২) প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মাকহুল রাহ. (১১৩হি.) বলেন,
أخبرنى أبو عائشة جليس لأبى هريرة : أن سعيد بن العاص سأل أبا موسى وحذيفة بن اليمان كيف كان رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يكبر فى الأضحى والفطر؟ فقال أبو موسى : كان يكبر أربعا تكبيره على الجنائز، فقال حذيفة : صدق. فقال أبو موسى: كذلك كنت أكبر في البصرة حيث كنت عليهم. وقال أبو عائشة وأنا حاضر سعيد بن العاص...وزاد الإمام أبو داود فما نسيت قوله : أربعا كالتكبيرة على الجنائز.
“আমাকে আবু হুরায়রা রা. এর সাথী আবু আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, হযরত সাঈদ বিন আস রাহ. আবু মুসা আশআরী ও হুযাইফা বিন য়ামান রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল আযহা’তে কিভাবে তাকবীর দিতেন? উত্তরে আবু মুসা আশআরী রা. বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার তাকবীরের ন্যায় চার তাকবীর দিতেন। তখন হুযাইফা রা. আবু মুসা আশআরী রা. কে পূর্ণ সমর্থন করলেন। আবু মুসা রা. বললেন, আমি বসরায় (শাসনকর্তা) থাকালীন এরূপই (ঈদের নামাযে) তাকবীর দিয়েছিলাম। আবু আয়েশা রা. বলেন, আমি তখন সাঈদ বিন আসের নিকট উপস্থিত ছিলাম। সুনানে আবূ দাঊদের বর্ণনায় এসেছে, আবু আয়েশা রাহ. বলেন, আমি “أربعا كالتكبيرة على الجنائز” শব্দটি ভুলিনি।” ([হাসান] মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (৫৭৪৪), মুসনাদে আহমদ (১৯৭৩৪), সুনানে আবু দাঊদ (১১৫৩), শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭১।
মুহাদ্দিস নিমাবী রাহ. বলেন, সনদটি হাসান (আছারুস সুনানে পৃ ৩১৪)। আল্লামা ইউসুফ বানূরী রাহ. হাদীসটিকে শক্তিশালী বলেছেন। (মাআরিফুস সুনান ৪/৪৩৯) শাইখ আলবানী মারহুম এ হাদীসকে ‘হাসান সহীহ’ বলেছেন। (সহীহ ও যঈফ সুনানে আবু দাউদ [১১৫৩], সিলসিলাহ সহীহা ৬/১২৬০)। শাইখ শুআইব আরনাউত রাহ. এ হাদীসকে হাসান বলেছেন। (মুসনাদে আহমদ-টীকা দ্রষ্টব্য) আবু দাউদ ও মুনযিরী এ হাদীস উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করেন নি। সুতরাং তাদের নিকট ‘সলিহ’।
আবদুর রহমান ইবনে ছাওবান
সনদের একজন রাবী ইবনে ছাওবান। ইমাম আবু হাতেম, আবু যুরআ, আলী ইবনুল মাদীনী, ইবনে মাঈন রাহ.সহ অনেক ইমাম তাঁকে ছিকাহ নির্ভরযোগ্য বলেছেন। (বিস্তারিত জানতে দেখুন,আলজারহু ওয়াততাদীল ৫/২১৯, মারিফাতুস সিকাত-ঈজলী [৯৩৭], কিতাবুস সিকাত-ইবনে হিব্বান [৯১৫১] , মাশাহীরু উলামায়িল আমসার-ইবনে হিব্বান [১৪৪০], তাহযীবুল কামাল ১৭/১২-১৭)। শাইখ আলবানী মারহুম তাঁকে হাসানুল হাদীস বলেছেন (ইরওয়াউল গালীল [৪১২]) এবং তাঁর সূত্রে বর্ণিত একাধিক হাদীসকে সহীহ, হাসান বলেছেন। (সিলসিলাহ সহীহা [১১৫], [৪৪৭], ইরওয়াউল গালীল [১২৬৯, ২৩০০])
তাই তাঁকে যঈফ ও দুর্বল বলা যথার্থ নয়। ইমাম ইবনুল জাওযী রাহ. এর আপত্তির খন্ডনে ইমাম ইবনে আবদুল হাদী রাহ. বলেন,
وعبد الرَّحمن بن ثابت بن ثوبان: وثَّقه غير واحد، وقال يحيى ابن معين في رواية: ليس به بأسٌ.
(তানকীহুত তাহকীক ২/৫৮৬)
আবু আয়েশা
সনদের আরেকজন বর্ণনাকারী আবু আয়েশা আবদুর রহমান। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনে আবি আয়েশা ও মূসা ইবনে আবি আয়েশার পিতা। আবু আয়েশা একজন ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য রাবী। ইমাম কাশমিরী রাহ. তাঁকে ছিকাহ বলেছেন। (মাআরিফুস সুনান ৪/৪৩৯)। হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. তাঁকে মাকবূল বলেছেন। (তাকরীবুত তাহযীব)
ইমাম ইবনে হায্ম ও ইবনে কাত্তান রাহ. এর ‘মাজহুল’ মন্তব্য যথার্থ নয়। কারণ, আবু আয়েশা থেকে একাধিক ছিকাহ ব্যক্তি হাদীস বর্ণনা করেছেন।
১. মাকহুল শামী (শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭১)
২. খালেদ ইবনে মা’দান (তাহযীবুত তাহযীব ৮/২৬৭ [৯৮৮২])
উসূলুল হাদীসের স্বীকৃত নীতি অনুসারে দুজন ছিকাহ রাবীর বর্ণনা দ্বারা তাঁর উপর আরোপিত জাহালত দূর হয়ে যায়। (আলকিফায়া-খতীব বাগদাদী পৃ.৮৯)
তাছাড়া ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বা ও আবু জাফর তহাবী রাহ.সহ অনেক ইমাম তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন। (মুসান্নাফ [৫৭৪৪], শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭১)
আর আবু আয়েশাকে মাজহুল মেনে নিলেও আমাদের প্রামাণ্য হাদীসে কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, এ হাদীসের অনেক শাওয়াহিদ, মুতাবাআত রয়েছে। যার কারণে শাইখ আলবানী মারহুম বলেন,
وعلى هذا ينبغي أن يكون هذا الحديث مقبولا عند الحافظ، لأنه قد تابعه القاسم أبو عبد الرحمن في رواية الطحاوي، وهو وإن لم يسم الصحابي فإنه لا يضر عند أهل السنة، لأن الصحابة كلهم عدول مع احتمال أن يكون هو أبا موسى الذي في هذه الطريق الأخرى، ثم كيف لا يكون الحديث مقبولا وهو حسن الإسناد من الرواية الأولى. وهي في الحقيقة رواية عزيزة جيدة،
(সিলসিলাতুস সহীহা ৬/১২৬০)
স্বয়ং সহীহাইনে এমন বহুসংখ্যক বর্ণনাকারী আছেন, যাদেরকে মাজহুল বলা হয়েছে; অথচ মুতাবাআত ও শাওয়াহিদের ভিত্তিতে তাদের হাদীসকে সহীহ গণ্য করা হয়েছে। (আলমাজহূলূনা ফীস সহীহাইন-আদাব বিন মাহমূদ পৃ.৪৮০-৪৮১,৪৮৫,৫২৫)
(৩) আলকামা (৬২হি.) ও আসওয়াদ বিন ইয়াযীদ রাহ. (৭৪হি.) বর্ণনা করেন,
كان ابن مسعود جالسا وعنده حذيفة وأبو موسى الأشعري، فسألهما سعيد بن العاص عن التكبير في الصلاة يوم الفطر والأضحى، فجعل هذا يقول: سل هذا، وهذا يقول: سل هذا، فقال له حذيفة: سل هذا لعبد الله بن مسعود، فسأله، فقال ابن مسعود: يكبر أربعا ثم يقرأ، ثم يكبر فيركع، ثم يقوم في الثانية فيقرأ، ثم يكبر أربعا بعد القراءة.
“আবদুল্লাহ বিন মাসঊদ রা. বসা ছিলেন। আর তার নিকট তখন আবু মুসা ও হুযাইফা রা. উপস্থিত ছিলেন। সাঈদ বিন আস রাহ. তাদের দু’জনকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযে তাকবীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন উভয়ের একজন অপরজনের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, তাকে জিজ্ঞাসা কর। এরপর হুযাইফা রা. আবদুল্লাহ বিন মাসঊদ রা. প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, তাঁককে জিজ্ঞাসা কর। পরে তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম রাকাআতে চার তাকবীর দিতেন এরপর কিরাআত পাঠ করতেন। তারপর তাকবীর দিয়ে রুকূতে যেতেন। তারপর দ্বিতীয় রাকাআতের জন্য উঠে দাঁড়াতেন। এরপর কিরাআত পড়তেন। এরপর চার তাকবীর দিতেন।”
([সহীহ] মুসান্নাফ আবদুর রায্যাক ৩/২৯৩, আলমুজামুল কাবীর [৯৫১৬], আলমুহাল্লাহ ৫/৯৩। হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সকলেই ‘ছিকাহ্’। ইবনে হাযম যাহিরী রাহ. এ হাদীস সম্পর্কে বলেন,
وهذا إسناد في غاية الصحة
হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ.,মুহাদ্দিস নিমাবি ও যফার আহমাদ থানভী রাহ. বলেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ্। (আদদিরায়াহ ১/২২০, আছারুস সুনান পৃ. ৩১৩, ইলাউস সুনান ৬/২৪০৯)
আবু ইসহাক সাবিয়ী রাহ. এর তাদলীস
কেউ কেউ আবু ইসহাক সাবিয়ী রাহ. কে তাদলীসে অভিযুক্ত করে এ হাদীসকে দুর্বল বলতে চান। কিন্তু তাদের আপত্তিই ভিত্তিহীন ও অসার। বিশেষত আলোচ্য হাদীসের ক্ষেত্রে আরও দুর্বল। কারণ,
ক. এ হাদীসটি ইমাম মাহামিলী রাহ. তাঁর আহকামুল ঈদাইন কিতাবে ইমাম শুবার সূত্রে আবু ইসহাক সাবিয়ী থেকে উল্লেখ করেছেন। (আহকামুল ঈদাইন [৫]) আর আবু ইসহাকের তাদলীসের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ নীতি হলো, তাঁর থেকে শুবা রাহ.কৃত বর্ণনা তাদলীসমুক্ত। কারণ, শুবা রাহ. নিজেই বলেছেন,
كفيتكم تدليس تلاثة: الأعمش، وأبي إسحاق، وقتادة. (قال ابن حجر رحمه الله: فهذه قاعدة جيدة في أحاديث هؤلاء الثلاثة أنها إذا جاءت من طريق شعبة دلت على السماع ولو كانت معنعنة)
(মারিফাতুস সুনানি ওয়ালআছার ১/১৫২, তারীফু আহলিত তাকদীস পৃ.৫৯)
স্বয়ং ইমাম বুখারী তাঁর সহীহে কিতাবে শুবা রাহ. এর সূত্রে আবু ইসহাক সাবিয়ী রাহ. এর বহুসংখ্যক মুআনআন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। যে সমস্ত বর্ণনার উপর সকল মুহাদ্দিসীন সর্বসম্মতিক্রমে ইত্তিসাল তথা অবিচ্ছিন্নতার হুকুম আরোপ করেছেন। (সহীহ বুখারী (২৪০, ১০৭০, ১১৪৬, ১৬৫৬, ৩৭৪৫,... দ্র. রিওয়ায়াতুল মুদাল্লিসীন ফী সহীহিল বুখারী)
খ. তিনি মুকছির ফিততাদলীস নন। তাঁর বর্ণিত রিওয়ায়াতের তুলনায় মুদাল্লাস বর্ণনার সংখ্যা মুষ্টিমেয়। ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম বায়হাকী রাহ. প্রমূখ এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। (দ্র. সুনানে কুবরা-বায়হাকী ১/২০১, আলমাজরূহীন ২/৮৬)
এ কারণেই ইমাম ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান রাহ. বলেন,
حديث سفيان وأبي إسحاق والأعمش ما لم يعلم أنه مدلس يقوم مقام الحجة.
(আলমারিফাতু ওয়াততারীখ ২/৬৩৭)
কেউ কেউ সাবিয়ী রাহ.কে ইখতিলাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করতে চাইলে হাফিয যাহাবী রাহ. তাঁদের খন্ডনে বলেন,
وقد كبر وتغير حفظه تغير السن، ولم يختلط.
(সিয়ারু আলামিন নুবালা ৫/৩৯২, মুখতালিতীন-আলাঈ পৃ.৯৪)
(৪) আবদুল্লাহ বিন হারেস রাহ. বর্ণনা করেন, (হযরত ইবনে আব্বাস ও মুগীরা রা. এর হাদীস)
شهدت ابن عباس كبر في صلاة العيد بالبصرة تسع تكبيرات، والى بين القراءتين قال: وشهدت المغيرة بن شعبة فعل ذلك أيضا. فسألت خالدا كيف فعل ابن عباس؟ ففسر لنا كما صنع ابن مسعود في حديث معمر والثوري عن أبي إسحاق سواء.
“আমি বসরা শহরে ইবনে আব্বাস রা. কে ঈদের নামাযে নয়টি তাকবীর দিতে, উভয় রাকাআতে ধারাবাহিকতার সহিত কিরাআত পড়তে দেখেছি। তিনি আরো বলেন, মুগীরা বিন শুবাকেও এরূপ করতে দেখেছি। এরপর খালিদ রাহ. কে ইবনে আব্বাস রা. এর আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি ব্যাখ্যা করলেন, ইবনে মাসঊদ রা. এর মতই। যেমনটি মা’মার ও ছাওরী রাহ. এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।” ([সহীহ] মুসান্নফে আবদুর রাযযাক (৫৭৫৭), মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৫৭৫৭), আলমুহাল্লা ৫/৯৩। একাধিক ইমাম এ হাদীসকে সহীহ বলেছেন। ইবনে হাযম যাহিরী রাহ. এ হাদীস সম্পর্কে বলেন,
وهذا إسناد في غاية الصحة
ইবনে হাজার রাহ. এই হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন। (দিরায়াহ ১/২২০) শাইখ আলবানী মারহুম এ হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন। (ইরওয়াউল গালীল ৩/১১১।)
এ ছাড়াও আরও অনেক সাহাবী থেকে সহীহ সনদে ছয় তাকবীরের হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ততার লক্ষ্যে এখানে আর উল্লেখ করা হলো না।
আমরা ছয় তাকবীর সম্পর্কে ইমামদের মত ও সালাফের কর্মধারা এবং সহীহ হাদীস দেখলাম। ইনসাফের দৃষ্টিতে যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে হ্যাঁ, কোনো ব্যক্তি নিজ চিন্তায় অস্বাভাবিক মুতাআসসিব হয়ে পড়লে, তার কাছে কী আর অসম্ভব থাকে।
সংশয় নিরসন
উপরে ছয় তাকবীরের সপক্ষে বিশদ আকারে আমরা শক্তিশালী প্রমাণসমূহ দেখলাম। যা থেকে প্রমাণিত হয়, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ছয় তাকবীর সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এখন আমরা দেখব, বার তাকবীরের প্রবক্তাদের দলীল ও দলীলের গ্রহণযোগ্যতা। বার তাকবীরের সপক্ষে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে, সনদের বিচারে সবগুলোই দুর্বল। ইমাম বুখারীসহ অনেকের দৃষ্টিতে বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে সর্বাধিক সঠিক হাদীসটি হলো, কাছীর বিন আবদুল্লাহর সুত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আওফ মুযানী রা. হাদীস।
এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী কাছীর ইবনে আবদুল্লাহ। তিনি অত্যন্ত যঈফ ও দুর্বল। ইমাম শাফিয়ী রাহ. বলেন,
ركن من أركان الكذب
(আলমাজরূহীন ২/২২২)
ইমাম নাসাঈ ও দারাকুতনী রাহ. তাঁকে ‘متروك’ বা পরিত্যাজ্যা বলেছেন। (আযযুআফা-নাসাঈ [৫০৪], আযযুআফা ওয়ালমাতরুকীন-দারাকুতনী [৪৪৪], মীযানুল ইতিদাল [৬৯৫৪])
ইমাম বুখারী ও ইমাম তিরমিযী রাহ. তাকবীর সংক্রান্ত অধ্যায়ে বর্ণিত সমস্ত বর্ণনা থেকে এ হাদীসকে তুলনামূলক বিশুদ্ধ বললে- ইমাম নববী রাহ. তা খন্ডন করে বলেন,
وهذا الذي قاله نظر، فإن كثير بن عبد الله ضعيف، ضعفه الجمهور.
(আলমাজমূ’ শরহুল মুহাযযাব ৫/১৬)
হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ.ও কাছীরকে যঈফ বলেছেন। (আততালখীসুল হাবীর ২/১৯৯)
পরবর্তীতে সালাফীরা হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর ও হযরত আয়েশা রা. এর হাদীসকেই বিশুদ্ধতম মনে করেন। যেমন শায়খ আলবানী বলেন-
وأحسن أحاديث الباب عندي حديث عائشة وعبد الله بن عمرو، فإن الضعف الذي في سنديهما يسير، بحيث يصلح أن يتقوى أحدهما بالآخر.
(ইরওয়াউল গালীল ৩/১১০)
শায়খ আলবানী রাহ. এর আলোচনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, আয়েশা ও আমর রা. এর হাদীসও বিশুদ্ধ নয়; দুর্বলতা আছে। বাস্তবতাও এমনি। আয়েশা রা. এর এ হাদীসটি নিম্ন দুটি কারণে প্রমাণযোগ্য নয়:-
ক. সনদের একজন রাবী আবদুল্লাহ বিন লাহীআ। তিনি যঈফ ও দুর্বল।
খ. এ হাদীসে ইযতিরাব পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে লাহীআ এ হাদীস বর্ণনায় ইযতিরাবের শিকার হয়েছেন। যথা-
(১) কখনো তিনি ইয়াযিদ ইবনে আবি হাবীব ও ইউনুস থেকে যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেন। (সুনানে দারাকুতনী ২/৪৬, আলমুজামুল আওসাত [৩১৩৯])
(২) আবার কখনো উকাইলের সূত্রে যুহরী থেকে বর্ণনা করেন। (আহকামুল ঈদাইন-ফিরয়াবী [১০৪] মুসনাদে আহমাদ [২৪৩৬২], সুনানে আবু দাউদ [১১৪৯])
(৩) কখনো আবুল আসওয়াদ ও উরওয়াহর সূত্রে আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন। (শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭০)
(৪) কখনো আরাজ সূত্রে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন। (মুসনাদে আহমাদ [৮৬৭৯])
(৫) কখনো খালিদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেন। সেখানে তিনি ‘سوي تكبيرتي الركوع’ বৃদ্ধি করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ [১১৫০], সুনানে ইবনে মাজাহ [১২৮০])
(৬) কখনো খালিদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে উকাইল, উকাইল থেকে যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেন। (শরহু মাআনিল আছার ২/৩৭০)
ইমাম দারাকুতনী রাহ. বলেন, এই ইযতিরাবের মূলে হলেন, ইবনে লাহীআ। (আলইলাল-দারাকুতনী ১৪/১১০, আততালখীসুল হাবীর ২/২০০) যার কারণে ইমাম বুখারী রাহ. ও ইবনে হাযম রাহ. এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন। (আলইলালুল কাবীর [১৫৫], আলমুহাল্লা ৫/৯৪)
আর মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহয়া যুহলী রাহ. ইবনে ওয়াহাবের সূত্রে খালেদ ইবনে ইয়াযিদের বর্ণনাকে মাহফূয বললে- শাইখ শুআইব আরনাউত রাহ. তাঁর খন্ডনে বলেন,
وأما ما قاله محمد بن يحيى الذُّهلي- فيما نقله البيهقي عنه- أن المحفوظ عنده حديث خالد بن يزيد لأنه من رواية ابن وهب، وهو قديم السماع منه، ففيه نظر، فقد فاته أنَّ ابن لهيعة قد اضطرب فيه في رواية ابن وهب نفسها، فمرة قال: عن عُقيل، وأخرى قال: عن خالد بن يزيد، كما سلف بيانه.
(মুসনাদে আহমাদ ৪০/৪২০, দ্র. টীকা)
লা মাযহাবী ও সালাফী আলেমদের মাঝে মতানৈক্য
প্রিয় পাঠক! আশ্চর্যের বিষয় হলো, যাদের শ্লোগান ছিলো, হাদীস ধরুন, মতভেদ ছাড়ুন। তারাই আজ পরস্পরে মতভেদ ও মতভিন্নতায় লিপ্ত। তাও দু একটি বিষয়য়ে নয়; অহরহ বিষয়ে! তবুও যদি তাদের বোধোদয় হতো! আলোচ্য বিষয়ে তাদের মতভেদের কিছু নমূনা তুলে ধরা হলো।
১. ঈদের নামায সুন্নাত না ওয়াজিব?
ঈদের নামাযের ফিকহী দৃষ্টিকোণ স্থির করতে গিয়ে সালাফীদের ইমাম সায়্যিদ সাবেক সাহেব সুন্নাত বলেছেন। (ফিকহুস সুন্নাহ ১/২২৮) অথচ তাদের আরেক ইমাম শায়খ আলবানী তা খন্ডন করে ওয়াজিব বলেছেন। (তামামুল মিন্নাহ পৃ. ৩৪৪)
২. অতিরিক্ত তাকবীর বলার সময় হাত উঠানো সুন্নাহ কি না?
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল রাহ. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ., ইবনুল কায়্যিম রাহ. সাইয়্যেদ সাবেক, ইবনে উসাইমীন, লা মাযহাবী অগ্রজ শারাফুদ্দীন দেহলভীসহ প্রমূখ সালাফীদের মত হলো, অতিরিক্ত তাকবীর বলার সময় হাত উঠানো সুন্নাহ। (ফিকহুস সুন্নাহ ১/২৩০, ফাতাওয়া নূর আলাদ্দারব ১৪/১৪, ফাতাওয়া ছানাইয়্যা ১০/৬১৩)
অপরদিকে ইবনে হাযম যাহিরী, মুহাম্মাদ শাওকানী ও শায়খ আলবানী মারহুমের মত হলো, অতিরিক্ত তাকবীর বলার সময় হাত উঠানো সুন্নাহ নয়। (আলমুহাল্লাহ ৫/৯১, নায়লুল আওতার ৪/৭৭,তামামুল মিন্নাহ পৃ. ৩৪৮)
৩. ছয় তাকবীরও সুন্নাহসম্মত
অধিকাংশ সালাফী আলেমের মত হলো, তাকবীরসংখ্যার সবগুলি পদ্ধতিই সুন্নাহ। বার তাকবীর যেভাবে সুন্নাহ ছয় তাকবীরও সুন্নাহ। (মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ১৬/২৩৮, সিলসিলাতুল আহাদিসীস সহীহা ৬/১২৬৩)
অপরদিকে উপমহাদেশের কট্টর লা মাযহাবী, গুরাবা আহলে হাদীসের ইমাম আবদুস সাত্তার সাহেব বলেন,
جو آجکل لوگوں میں صلاۃ عیدین کے تکبیریں چو مروج ہیں، یہ بالکل بدعت اور گمراہی ہیں۔ کیونکہ ان کا ثبوت شریعت محمد میں نہیں اور یہ جو چھ تکبیریں ہیں یہ مذہبی تکبیر گھری کھڑائی ہیں، خدا اور رسول ﷺ سے یہ حکم قطعا نہیں۔ اور جو کوئی کہیں کہ یہ حکم خدا اور رسول ﷺ کا ہے تو وہ بڑا کاذب بلکہ کذاب ہے۔
(ফাতাওয়া সাত্তারিয়া ১/১১৮, সংকলক; আবদুল গাফফার সালাফী)
তাদের অনুসরণে এ দেশের লা মাযহাবী ও সালাফী জনাব মুযাফফর বিন মুহসিনও কাছাকাছি মত প্রকাশ করেছে। (সহীহ হাদীছের কষ্টিপাথরে ঈদের তাকবীর-ভূমিকা)
খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, যেখানে তারা নিজেরাই মতানৈক্য ও বৈপরিত্যের বেড়াজালে আবদ্ধ। নিজেরাই এক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে নি। সেখানে আমাদেরকে দোষারোপ করছে কোন যুক্তিতে! অথচ তারা এ ইখতিলাফ করছে হাদীস অনুসরণ শিরোনামে!! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল