কোরআন ও হাদিসের আলোকে শবে কদরের প্রবন্ধ
শবে কদর পরিচিতি
ليلة القدر শবে কদর তথা
القدرশব্দের অর্থ সম্মান ও মর্যাদা। এ রাতের সম্মান ও মর্যাদার কারণেই এ রাতকে ليلة القدرবলা হয়।
হযরত আবু বকর ওয়াররাক র. বলেন, এ রাতকে ليلة القدرএজন্য বলা হয় যে, ইতোপূর্বে যারা আমলহীনতার দরুণ আল্লাহ তায়ালার নিকট মর্যাদাবান ছিলো না, তারা যেন এ রাতে তাওবা, ইস্তিগফার ও ইবাদতের মাধ্যমে صاحب قدرতথা মর্যাদাবান ও সম্মানিত হয়ে যায়।
القدرএর আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তাকদীর ও হুকুম। এ অর্থের দৃষ্টিতে ليلة القدرনামকরণের কারণ হচ্ছে, এ রাতে সকল সৃষ্টির এ রমযান হতে পরবর্তী রমযান পর্যন্ত সকল কাজের ভাগ্যলিপি নির্ধারণ হয় এবং তা ওইসব ফেরেশতাদের নিকট সোপর্দ করা হয়, যারা জাগতিক বিষয়াদি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
শবে কদর কী?
শবে কদর হচ্ছে, রমযানুল মুবারকের পবিত্র রাতসমূহের অন্যতম একটি রাত। এ রাতের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে নিম্নোক্ত সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।
بسم الله الرحمن الرحيم
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (۱) وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (۲) لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (۳) تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ (٤) سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
অর্থ: নিশ্চয় আমি কুরআন শরীফ কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। আপনি কি জানেন, কদরের রাত কি? কদরের রাত এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ অর্থাৎ জিবরাইল আ. তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে প্রত্যেক কল্যাণকর বিষয়সহ অবতরণ করেন। এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত। যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
আয়াতে ليلة القدرকে একহাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। সুতরাং ওই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান যে, এ রাত ইবাদতে কাটাতে পারল।
শবে কদর কি এই উম্মতের বৈশিষ্ট?
অধিকাংশ আলেমদের মতে শবে কদর এ উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদীর বৈশিষ্ট। যদিও কেউ কেউ বলেন, শবে কদর পূর্ববর্তী যুগেও ছিল। কিন্তু বিশুদ্ধ মত প্রথমটিই।
রাসূল স. এর ভাষ্য দ্বারাই তা প্রমাণিত-
و حَدَّثَنِي زِيَادِ عَنْ مَالِكَ أَنَّهُ سَمِعَ مَنْ يَثِقُ بِهِ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ يَقُولُ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرِيَ أَعْمَارَ النَّاسِ قَبْلَهُ أَوْ مَا شَاءَ اللَّهُ مِنْ ذَلِكَ فَكَأَنَّهُ تَقَاصَرَ أَعْمَارَ أُمَّتِهِ أَنْ لَا يَبْلُغُوا مِنْ الْعَمَلِ مِثْلَ الَّذِي بَلَغَ غَيْرُهُمْ فِي طُولِ الْعُمْرِ فَأَعْطَاهُ اللَّهُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (موطا مالك : ۳۲۱/۱ - رقم الحديث: (١١٤٥)
অর্থ: হযরত মালেক ইবনে আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বিশ্বস্ত এক আলেম থেকে শুনেছেন যে, রাসূল স.কে পূর্বের যুগের লোকদের বয়স (বা আল্লাহর যা ইচ্ছা) দেখানো হল। তখন তিনি দেখলেন, সে তুলনায় তার উম্মতের হায়াত অনেক কম। ফলে তার উম্মত আমলের মাধ্যমে ওই পর্যন্ত পৌছতে পারবে না।
যেখানে দীর্ঘ হায়াতের কারণে পূর্ববর্তী উম্মত পৌছেছে। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে অর্থাৎ রাসূল স.কে শবে কদর দান করলেন। যা একহাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (মুয়ান্ড মালেক: ১/৩২১)
শবে কদরের নির্ধারিত তারিখ গোপন রাখার রহস্য
যে বস্তু যত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ, তা ততো অধিক পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। সুতরাং শবে কদরের মত অতি মূল্যবান সম্পদ পরিশ্রম ছাড়া কিভাবে হাসিল হবে? এজন্য এর নির্দিষ্ট তারিখ গোপন রাখা হয়েছে
রাসূল সা. ইরশাদ করেন - عسى أن يكون خيرا لكم
অর্থাৎ আশা করা যায়, এরই মধ্যে তোমাদের কল্যাণ নিহিত আছে। এর মর্মার্থ অত্যন্ত পরিষ্কার যে, যদি এর নির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দেয়া হতো তাহলে এতটুকু মূল্য হতোনা। পক্ষান্তরে অবগতির পর মূল্যায়ণ না করা চূড়ান্ত দূর্ভাগ্য ও বঞ্চনার বিষয়।
আল্লামা ইবনে কাছীর র. বলেন, এটা গোপন রাখার মধ্যে হিকমত হচ্ছে, তার অনুসন্ধানকারী ও আগ্রহীগণ পুরো রমযান মাস ইবাদতের প্রতি গুরত্ব দিবে। (ইবনে কাছীর: ৪/৫৩৪)
শবে কদর কি এখনও বিদ্যমান?
অধিকাংশ আলেমদের মতে শবে কদর এখনও বিদ্যমান এবং এটিই সঠিক মত। যদিও কেউ কেউ এর বিপরীত বলে থাকেন। কেননা, যদি শবে কদর উঠিয়ে নেয়া হতো তাহলে রাসূল স. কেন শবে কদর তালাশের প্রতি এবং তাতে ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন? যেমনটি বুখারী শরীফের হাদীসে আছে- حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا هِشَامٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ্রمَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
(صحيح البخاري: ۲۷۰/۱ - رقم الحديث: (۱۸۰۲)
অর্থ: যে ব্যক্তি শবে কদরে পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে সাওয়াবের আশায় ইবাদত করে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী শরীফ: ১/২৭০)
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا أَبُو سُهَيْلِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
:تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الوِتْرِ، مِنَ الْعَشْرِ(صحيح البخاري: رقم الحديث : ۱۹۱۳)
অর্থ: তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করো। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী র. বলেন, হাদীসে فرفعتঅর্থাৎ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শবে কদরের তারিখ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। শবে কদর উঠিয়ে নেয়া উদ্দেশ্য নয়। (মাওসুআতুল ফিকহিয়য়াহ: ৩৫/৩৬৩)
শবে কদর সম্পর্কিত কিছু হাদীস
বুখারী ও আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে-
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ:্রالتَمِسُوهَا فِي العَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ لَيْلَةَ القَدْرِ، فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى تَابَعَهُ عَبْدُ الْوَهَّابِ، عَنْ أَيُّوبَ (صحيح البخاري: ۷۱۱/۲- رقم الحديث: (۱۹۱۷) (ابو داود : ٥٢٥/١ - رقم الحديث(۱۳۸۳)
অর্থ: হযরত ইবনে আবক্ষাস রা. থেকে বর্ণিত রাসূল স. বলেন- তোমরা শবে কদরকে প্রতি রমযানের শেষ দশদিনের মধ্যে তথা ২৯, ২৭, ২৫ তারিখ রাতেঅনুসন্ধান করো। (বুখারী শরীফ: পৃঃ ২০১১)
ইবনে মাজা শরীফে আছে-
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ أَبِي الشَّوَارِبِ، وَأَبُو إِسْحَاقَ الْهَرَوِيُّ إِبْرَاهِيمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَاتِمِ قَالَا: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ زِيَادٍ قَالَ: حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِي عَنِ الْأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ : كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ،
مَا لَا يَجْتَهِدُ فِي غَيْرِهِ (سنن ابن ماجه : ٥٦٢/١ - رقم الحديث : ١٧٦٧)
অর্থ: হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল স. রমযানের শেষ দশ দিন এত অধিক পরিমাণে ইবাদত করতেন, যা তিনি অন্য কোন সময় করতেন না। (ইবনে মাজা-১/৫৬২)
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে আছে-
حَدَّثَنَا يَزِيدُ بَنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " مَنْ كَانَ مُتَحَرِّبَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا لَيْلَةَ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ "، وَقَالَ" تَحَرَّوْهَا لَيْلَةَ سَبْعِ وَعِشْرِينَ " يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ
تعليق شعيب الأرنؤوط : إسناده صحيح على شرط الشيخين (مسند أحمد بن حنبل: ۲۷/۲- رقم الحديث : ٤٨٠٨)
অর্থ: হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূল স. বলেন- যে ব্যক্তি শবে কদর তালাশ করে, সে যেন ২৭এ রমযানে তা তালাশ করে। (মুসনাদে আহমদ-২/২৭) أن النبي صلي الله عليه وسلم قال: ليلة القدر التاسعة والعشرون أو السابعة والعشرون، وأن الملائكة بعدد الحصي. (مسند أحمد : ٥١٩/٢)
অর্থ: রাসূল স. বলেছেন- শবে কদর হচ্ছে, রমযানের ২৯ অথবা ২৭ এ রজনী। এ রাতে গুঁড়ি পাথরের সংখ্যা পরিমাণ ফেরেশতা অবর্তীণ হয়।
শবে কদর নিয়ে মতভেদ ও তার নিরসন
হযরত আবু যর গিফারী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল স. এর নিকট আরয করলাম, "শবে কদর" নবী যুগের সাথে নির্দিষ্ট না পরেও হবে? উত্তরে রাসূল স. বললেন, এটি কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। আমি আরয করলাম, এটি রমযানের কোন অংশে? তিনি বললেন, প্রথম দশ দিন ও শেষ দশদিনে অনুসন্ধান কর। অতপর রাসুল স. অন্য কথায় লিপ্ত হলে আবার সুযোগ পেয়ে আরয করলাম, বলে দিন যে, শেষ দশদিনের কোন অংশে হয়ে থাকে? একথা শুনে রাসূল স. এত অসুন্তুষ্ট হলেন যে, তিনি ইতোপূর্বে ও পরে আমার উপর এত রাগান্বিত হননি। এ অবস্থায় বললেন, এরূপ উদ্দেশ্য হলে আল্লাহ তা'আলা কি বলে দিতে পারতেন না? শেষ সাত রাতে তা অনুসন্ধান কর। এটিই যথেষ্ট। এরপর আর কোন কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। ইমাম আবু হানিফা র. এর বক্তব্য হচ্ছে যে, শবে কদর পুরো রমযান মাসে চক্কর দিয়ে থাকে।
ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ র. বলেন, শবে কদর রমযানের নির্দিষ্ট কোন এক রাতে হয়ে থাকে। তবে আমরা তা জানিনা।
শাফেয়ীদের প্রাধান্যতম মত হলো ২১ এর রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ইমাম মালিক ও আহমদ বিন হাম্বল র. বলেন, রমযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতসমূহে এটি চক্কর দিতে থাকে।
অধিকাংশ আলেমদের মত হচ্ছে, এটি ২৭শে রাতে হওয়ার প্রবল আশাবাদী। সুতরাং প্রত্যেকেরই নিজের সাহস ও সুযোগ অনুযায়ী সারা বছর তা অনুসন্ধান করা উচিত। তা সম্ভব না হলে, পুরা রমযান মাস তালাশ করা কর্তব্য। আর যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে রমযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতসমূহকে হাত ছাড়া করা যাবেনা। আল্লাহ না করুন, যদি এতটুকু ও সম্ভব না হয়, তাহলে সাতাশ তারিখের রাতকে শীতল গনীমত মনে করতে হবে। কেননা, আল্লাহর অনুগ্রহে যদি কারো এটা নসীব হয়ে যায়, তাহলে দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামতরাজি এর তুলনায় তুচ্ছ। পক্ষান্তরে ভাগ্যে না জুটলেও এর প্রতিফল শূন্য হবে না, যদি সে ইশা এবং ফজরের জামাতের প্রতি সারা বছর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেননা, সৌভাগ্যক্রমে যদি শবে কদরের রাতে এই দুই নামায জামাতের সাথে আদায় হয়ে যায়, তাহলে এক হাদীস অনুযায়ী সে শবে কদরের পূর্ণ ফযীলত লাভকরবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে প্রতিবছর শবে কদরের বরকত অর্জনের তাওফীক দান করুন। আমীন ॥
শবে কদরের আলামত
শবে কদরের আলামত সম্পর্কে উবাইদা ইবনে সামেত রা. এর এক হাদীসের একাংশ উল্লেখ করছি-
ومن اماراتها : أنها ليلة بلجة صافية ساجية لاحارة ولا باردة كأن فيها قمرا ساطعا ولا يتحل أن يرمي به تلك اليلة حتى الصباح، ومن امارتها : أن الشمس تطلع على صبيحتها لا شعاع لها مستوية كأنها القمر ليلة البدر وحرم الله علي الشيطان أن يخرج معها يومئذ. (ابن ابي شيبة: ٢٥١/٢)
অনুবাদ- শবে কদরের অন্যতম একটি আলামত হচ্ছে, এ রাত স্পষ্ট আলোকোজ্জল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, গরম ও নয় ঠান্ডা ও নয়, চন্দ্রালোকুজ্জল রাত। সকাল পর্যন্ত এ রাতে শয়তানের প্রতি তারকা নিক্ষেপ করা হয় না।
তদুপরি এ রাতের অন্যতম আলামত হচ্ছে, এ রাতের পরবর্তী ভোরে সূর্য কিরনহীন অবস্থায় উদিত হবে। যা প্রসারিত পিন্ডের মত, যেন একটা চতুর্দশীর পূর্ণচন্দ্র। এই দিন শুরু হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা শয়তানের বিচরন হারাম করে দেন। (মুছান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ২/২৫১)
শবে কদরের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস
বাইহাকী শরীফে আছে-
أَخْبَرَنَا أَبُو سَعْدٍ عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ أَبِي عُثْمَانَ الزَّاهِدُ ، حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ إِبْرَاهِيمُ بْنُ [ص: ٢٩١] أَحْمَدَ بْنِ رَجَاءٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ سُلَيْمَانَ الْأَشْعَثِ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى الْأَزْدِيُّ، حَدَّثَنَا أَصْرَمُ بْنُ حَوْشَبِ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُونُسَ الْحَارِثِيُّ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ نَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي كَبُكَبَةٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ يُصَلُّونَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ قَائِمٍ أَوْ قَاعِدٍ يَذْكُرُ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ، (البيهقي(
অর্থ: হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল স. ইরশাদ করেন, যখন শবে কদরের আগমন হয় তখন জিবরাইল আ. একদল ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন এবং বসা বা দাঁড়ানো অবস্থায় যে ব্যক্তিই আল্লাহর যিকির করে তাঁকে সালাম দেন এবং তার জন্য রহমতের দুয়া করেন। (তাফসীরে কুরতুবী: ২০/১০৩, বাইহাকী: ৩৭১৭)
ইবনে মাজা শরীফে আছে-
حَدَّثَنَا أَبُو بَدْرٍ عَبَّادُ بْنُ الْوَلِيدِ قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بِلَالٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عِمْرَانُ الْقَطَّانُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ دَخَلَ رَمَضَانُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:্রإِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ، وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ، وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ (ابن ماجه : ١٢٠/١ - رقم الحديث : ١٦٤٤)
অর্থ: হযরত আনাস রা. বলেন, করলেন, এ মাস তোমাদের নিকট আগমন করেছে। এতে এমন একটি রাত আছে যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত, সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত। আর এ রাতের কল্যাণ থেকে ওই ব্যক্তিই বঞ্চিত একবার পবিত্র রমযান এলে রাসূল স. ইরশাদ হয় যে, প্রকৃত পক্ষেই বঞ্চিত। (ইবনে মাজাহ: ১/১২০)
তাফসীরে কুরতুবীতে আছে- وَقَدْ روى عبيد الله ابن عَامِرِ بْنِ رَبِيعَةَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: (مَنْ صَلَّى صَلَاةَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ الْآخِرَةِ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ فِي جَمَاعَةٍ ্ فَقَدْ أَخَذَ بِحَظِهِ مِنْ لَيْلَة القَدْر . (تفسير القرطبي: ۱۰۷/۲)
অর্থ: হুজুর স. ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি শবে কদরে জামাতের সাথে মাগরীব ও ইশার নামায আদায় করলো, সে যেন শবে কদরের পূর্ণ ফযীলত লাভ করলো।(তাফসীরে কুরতুবী: ২০/১০৭)
শবে কদরের আমল
সুনানে কুবরা গ্রন্থে আছে-
أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا جَعْفَرٌ وَهُوَ ابْنُ سُلَيْمَانَ، عَنْ كَهْمَسٍ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ، مَا أَقُولُ فِيهَا؟ قَالَ قَوْلِي:্রاللهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيগ্ধ (السنن الكبري : رقم الحجيث: ۱۰۷۰۸)
অর্থ: আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি জানতে পারি কোনটি কদরের রাত, তাহলে আমি কী দোআ করবো? তিনি বললেন তুমি বল, হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমাকরাকে পছন্দ কর। সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (তিরমিযী শরীফ: হাদীস নং ৩৫১৩) এছাড়াও এ রাত্রে জাগ্রত থেকে নামায, তিলাওয়াত, দরুদ শরীফ, তাসবীহ, তাহলীল, দুয়াসহ অন্যান্য নফল ইবাদাতের গুরুত্ব দেয়ার প্রতি বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ রয়েছে।
মুফতি মুহাম্মদ আবু সালেহ
মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল