শবে বরাত সম্পর্কে প্রবন্ধ  



ভূমিকা

نحمده ونصلي علي رسوله الكريم.

اما بعد!

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার। যিনি মানবজাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। দুনিয়াতে কাজে কর্মেও এই শ্রেষ্ঠত্ব বাকী রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা হিদায়াত স্বরূপ আসমানি কিতাব এবং শিক্ষক হিসাবে যুগে যুগে নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী শয়তান মানুষকে আল্লাহর হুকুম থেকে বিরত রাখে। ফলে মানবজাতি বিভিন্ন পাপাচারে লিপ্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চান না, তার সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক শয়তানের ধোকায় পড়ে জাহান্নামী হয়ে যাক। তাই বান্দাকে আপন করে নেওয়ার জন্য তাওবার পথ খুলে দিয়েছেন।

তওবার জন্য বিশেষ সময় যেমন, শেষ রাত, আযান-ইকামাতের মাঝের সময়, শুক্রবার আসরের পর। বিশেষ স্থান যেমন: বাইতুল্লাহ শরীফ, হজরে আসওয়াদ। বিশেষ রাত যেমন: দুই ঈদের রাত, শবে বরাত ও শবে কদর ইত্যাদি দান করেছেন। যেগুলো আমরা কুরআন ও বিভিন্ন হাদীস দ্বারা জানতে পেরেছি। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে, আমাদেরই কিছু ভাই শয়তানের ধোকায় পড়ে শবে বরাতের মত পূণ্যময় রাতকে অস্বীকার করে এবং বলে, এটা জাল তথা মনগড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এর কোন অস্তিত্ব নেই। সাথে সাথে মানুষের মধ্যে এসব ভ্রান্ত কথা বলে ফিত্না ছড়ায়। তাই আমি এখানে কুরআন-হাদীসের আলোকে শবে বরাতের অস্তিত্ব ও তার ফযীলত প্রমাণ করার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ।

 

শবে বরাত কী?

শবে বরাতকে হাদীসের ভাষায় )ليلة النصف من شعبانলাইলাতুন নিসফ্ মিন্ শাবান বা শাবানের মধ্যরাত বলা হয়। পরবর্তীতে এটাকে শবে বরাত কিংবা লাইলাতুল বরাত নামকরণ করা হয়েছে। কুরআন-হাদীসে 'লাইলাতুল বরাত' নামটি উল্লেখ নেই। এ রাতের গুরুত্ব মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ জনপদে অপরিসীম। কেননা, রাসুল স. ও তার সাহাবাগণের নিকট এবং পরবর্তীতে সাহাবাদের শিষ্য তাবেয়ীন ও তাদের শিষ্য তাবে-তাবেয়ীনসহ সর্বকালের ইতিহাসে রাতটি একটি তাৎপর্যমন্ডিত ও ফযীলতপূর্ণ রাত হিসেবেই স্বীকৃত। মুসলিম বিশ্বের মহা মনীষীগণ নির্ভরযোগ্য তাফসীরগ্রন্থ, হাদীসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং বহু মুহাদ্দিস ও ফকীহ তাদের লিখনীর মাধ্যমে শবে বরাতের ফযীলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন।

এর মধ্যে ইমাম গাযালী র. )احياء علوم الدين( -এর 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন'আব্দুল কাদের জীলানী র. এর )غنية الطالبين( 'গুনিয়াতুত তালিবীন'ইমাম নববী র. এর )رياض الصالحين( 'রিয়াস সালেহীন'ইমাম দেহলভী র. এর )ال (ما ثبت بالسنةসাবাতা বিস সুন্নাহ'হযরত থানভী র.এর (৪৮, ৮০) 'ওয়ায ও তাবলীগ'মুফতি শফী র.-এর حقیقت شب برات 'হাকীকতে শবে বরাত' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কুরআনের আলোকে শবে বরাত

পবিত্র কুরআনে সূরায়ে দুখানের তিন নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন-أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍঅর্থাৎ "একটি মুবারক রাতে আমি কুরআন নাযিল করেছি"এরপর এ সুরার ৪নং আয়াতে ইরশাদ করেন: فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حكيم

অর্থাৎ এই রাতেই প্রত্যেক জ্ঞানপূর্ণ বিষয় স্থীর হয় (মানুষের ভাগ্য তালিকা বণ্টন হয়)

অন্য দিকে ভাগ্য তালিকা বণ্টনের রাতকে রাসুল স. এর হাদীসে শা'বানের মধ্য রাত তথা পনেরো তারিখের রাত বলা হয়েছে। এদুটি কথার মর্ম দাঁড়ায়, শাবানের পনের তারিখের রাত যাকে শবে বরাত বলা হয়। এ রাতেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে। অপর দিকে সূরা ক্বদরে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে যে, )إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ( "পবিত্র কুরআন লাইলাতুল ক্বদরেই নাযিল করা হয়েছে"যে রাতটি পবিত্র রমযান মাসেরই অর্ন্তগত। যেমন সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ .. الخ.

সুতরাং এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। একটি হলো, কুরআন নাযিল হওয়ার রাত। আরেকটি হলো, মানুষের ভাগ্য লিপি চুড়ান্তের রাত। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো, সূরা দুখানে )ليلة مباركة( "বরকতপূর্ণ রাত বলা হয়েছে। কিন্তু শবে কদর বা শবে বরাত কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। তাই লাইলাতুল মুবারাকা/বরকতপূর্ণ রাত বলতে কোন রাতকে বুঝানো হয়েছে। এনিয়ে তাফসীর বিশারদদের মধ্যে বিভিন্ন মত দেখা দিয়েছে।

প্রথম মত: অধিকাংশ মুফাস্সিরদের মত হলো, লাইলাতুল মুবারাকা থেকে উদ্দেশ্য 'শবে ক্বদর' যা রমযান মাসের অর্ন্তগত। কেননা, সূরা দুখানের ৩ নং আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে, "আমি পবিত্র কুরআন নাযিল করেছি মুবারক রাতে।" আর এটা সর্বস্বীকৃত যে, কুরআন শবে ক্বদরেই অবতীর্ণ হয়েছে।

দ্বিতীয় মত: হযরত ইকরামা ও কাতাদাহ র.-এর মতো শীর্ষ তাবেয়ীদের মতহচ্ছে-

লাইলাতুল মুবারকা থেকে উদ্দেশ্য, শবে বরাত। কেননা, পরের আয়াতে (৪নং আয়াত) বলা হয়েছে, উক্ত রাতে মানুষের ভাগ্যলিপি চুড়ান্ত হয়। আর সব হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে, ভাগ্য তালিকা বণ্টন শবে বরাত তথা শাবানের মধ্য রাতেই হয়। আর ৩নং আয়াতে কুরআন নাযিল হওয়ার মর্ম হলো, সকল প্রজ্ঞাময় বিষয়ের মধ্যে কুরআন অবতীর্ণ সবার শীর্ষে। তাই ভাগ্য তালিকা বণ্টনের রাতে কুরআন অবতীর্ণ করার সিদ্ধান্তও আল্লাহ নিয়েছেন। সে অনুপাতে কুরআন লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এখানে নাযিলের সিদ্ধান্তকে নাযিল করেছি বলা হয়েছে।

আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী র. তার প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ 'আত-তাফসীরুল কাবীরে' লিখেন-

اخْتَلَفُوا فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ الْمُبَارَكَةِ، فَقَالَ الْأَكْثَرُونَ : إِنَّهَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ، وَقَالَ عِكْرِمَهُ وَطَائِفَةٌ آخَرُونَ: إِنَّهَا لَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ، وَهِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ: ۳۳٨/١٤، مفاتيح الغيب: ۳۰۳/۲۷)

অর্থ: এ বরকতময় রাতের ব্যাপারে সাহাবাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে এটা লাইলাতুল কদর। আর হযরত ইকরিমা র.সহ অন্য একদল আলেমের মতে এ রাতটি হলো শবে বরাত। অর্থাৎ শাবানের মধ্য রাত। (আত-তাফসীরুল কাবীর-১৪/৩৩৮)

ইমাম রাযী র. এ মতের পক্ষে দলীল পেশ করার পর বলেন-

أَنَّ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ لَهَا أَرْبَعَةُ أَسْمَاءَ : اللَّيْلَةُ الْمُبَارَكَةُ، وَلَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ، وَلَيْلَةُ الصَّكِ ، وَلَيْلَة القدر الجامع لاحكام القرآن: (١٢٦/١٦)

অর্থ: (অতপর) যারা এ আয়াতে ليلة مباركةএর অর্থ 'শবে বরাত' করেছেন তাদের দৃষ্টিতে শা'বানের মধ্যরাত্রির চারটি প্রসিদ্ধ নাম রয়েছে। যথা: আল লাইলাতুল মুবারকাহ, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুত্সক এবং লাইলাতুল কদর। (তাফসীরে কাবীর: ১৪/৩৩৯)

সারকথা- 'শবে বরাত' কুরআন দ্বারা প্রমাণিত কিনা? এর জবাব উপরোক্ত আলোচনা থেকেই বুঝে যায়। অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে সূরা দুখানে শবে বরাতের আলোচনা নেই। সূরা দুখানের ৩নং আয়াতে বরকতপূর্ণ রাত )ليلة مباركة( বলতে শবে বরাত উদ্দেশ্য নয়; বরং শবে কুদরই উদ্দেশ্য। তারা বলেন, শবে বরাত বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। বিধায় শবে বরাত অস্বীকারকারী পথভ্রষ্ট।

আর হযরত ইকরিমা, কাতাদাহ এবং তাদের অনুসারী কিছু সংখ্যক মুফাসসির বলেন, শবে বরাত স্বয়ং কুরআনের সূরা দুখানের ৩নং আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। এর অস্বীকার কুরআনের আয়াতের সরাসরি অস্বীকারের শামিল। (দ্র. তাফসীর খ.১৪ পৃ.৩৪১)

আমাদের দৃষ্টিতে এ দু'মতের মধ্যে প্রথমটি অগ্রগণ্য। এ ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যাসহ জানতে লিখকের বই 'কুরআন হাদীসের আলোকে শবে বরাত পড়তে পারেন'

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যারা প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন যে, মুবারক রাত থেকে উদ্দেশ্য শবে ক্বদর। তারা কেউই কিন্তু শবে বরাতকে অমান্য বা বিদআত বলেননি। বরং তারা সবাই শবে বরাত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং বড়ই গুরুত্বপূর্ন রাত বলে মত ব্যক্ত করেছেন। শবে বরাতের ফযীলত অর্জনের লক্ষে তা পালনও করতেন।

কিন্তু আজ যারা এদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে কুরআনের উক্ত আয়াতে শবে বরাতের আলোচনা নেই বলছেন। তারা অনেকে শবে বরাত কে ভিত্তিহীন, জাল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, অগ্রহণযোগ্য, বিদআত বলছেন। অথচ তাদের তাফসীরের অনুকরণে কুরআনে শবে বরাত অবশ্য মান্য করার কথা ছিলো। কিন্তু তারা তা না করে কুরআনে না থাকার অজুহাত দেখিয়ে ১২টির মতো সহীহ, হাসান আমলযোগ্য হাদীস কে অস্বীকার করছেন। এটা মোটেও কাম্য নয়। আল্লাহ পাক সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন

হাদীসের আলোকে শবে বরাত

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা বিশ্বাস হচ্ছে- কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা যে বিষয়টি প্রমাণিত নয় এবং খুলাফায়ে রাশেদা ও সাহাবাগণের আমল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় সেটাকে দীনের অংশ মনে করা যাবে না; বরং দীনের বিধান বা ইবাদত মনে করলেও তা বিদআত হবে।

বড়ই পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে কিছু ভাই শবে বরাত সম্পর্কে দাবী তুলছে যে, শবে বরাত কুরআন-হাদীসে নেই। এ জাতীয় ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে শবে বরাতের ফযীলত সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে। এমনকি এ পবিত্র রজনীতে নফল নামায পড়া, যিকির করা, দরূদ শরীফ পড়া ও কুরআন তিলাওয়াতসহ সব ইবাদত বন্দেগীকে অবৈধ ও বিদআত বলে অপপ্রচার করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে চলেছে।

মূলকথা: আমি পূর্বেই বলেছি, মুসলিম উম্মাহর একটি বিশেষ জামাতের দৃষ্টিতে শবে বরাত সূরা দুখানের ৩নং আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যদিও দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের এমতটি অপর মতের তুলনায় জোরালো নয়।

যদি ধরে নেয়া হয় যে, কুরআনে এনিয়ে আলোচনাই নেই। তবুও হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবা, তাবেয়ী, সালফে সালেহীন ও চার মাযহাবের ইমামগণসহ কোনো মুফাসসির, মুহাদ্দিস ওফকীহর দ্বিমত নেই।

আর যে আমল হাদীস, সুন্নাতে খুলাফায়ে রাশেদীন, আসারে সাহাবা ও তাবেয়ীন এবং উম্মতের ব্যাপক অবিচ্ছিন্ন আমল দ্বারা প্রমাণিত, তা অস্বীকার করে বিদআত বলা পুরো শরীয়তকে অমান্য করার শামীল।

পক্ষান্তরে শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোকে জাল বলা রাসূল স.এর সম্মানের বিরুদ্ধে মারাত্মক বিদ্রোহ এবং হাদীস শাস্ত্র সম্পর্কে চরম দৃষ্টতা প্রদর্শন।

কারণ, শবে বরাত সম্পর্কে প্রায় দশজনের অধিক সাহাবী রাসূল স. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে মাত্র তিনটি হাদীস সূত্রের দিক বিবেচনায়দুর্বল। এছাড়া একটি হাদীস সনদের বিচারে সহীহ। আর দুটি হাদীস )حسن لذاته( হাসান লি-জাতিহী যা সহীর অন্তর্ভুক্ত। দুটি হাদীস সহীহ লি-গায়রিহী তথা সহীহ বলেই গণ্য।

যার বিস্তারিত বিবরণ আমার লেখা বই "কুরআন হাদীসের আলোকে শবে বরাত"-এ দেখুন। এ ক্ষুদ্র পরিসরে এগুলো উল্লেখ করার সুযোগ নেই। মাত্র কয়েকটি হাদীস সামনে তুলে ধরা হবে। (ইনশাআল্লাহ)

 

এ হাদীসগুলো সম্পর্কে প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদদের মন্তব্য শুনুন:

ক. আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর অভিমত: তিনি বলেন- اعْلَمْ أَنَّهُ قَدْ وَرَدَ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ عِدَّةُ أَحَادِيثَ مَجْمُوعُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا فَمِنْهَا حَدِيثُ الْبَابِ وَهُوَ مُنْقَطِعٌ وَمِنْهَا حَدِيثُ عَائِشَةَ، ومنها حديث معاذ، ومنها حديث عبد الله بن عمرو، ومنها حديث علي (رض). فَهَذِهِ الْأَحَادِيثُ بِمَجْمُوعِهَا حُجَّةٌ عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ شَيْءٌ. (تحفة الاحوذي: ٤٤٢/٣ - دار الفكر)

অর্থাৎ জেনে রাখো, শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যার সমষ্টি প্রমাণ করে শরীয়তে শবে বরাতের ভিত্তি রয়েছে। এসব হাদীসের মধ্যে আলোচ্য হাদীসটি ছাড়াও রয়েছে হযরত আয়েশা রা., হযরত মু'আয রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. এবং হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ। এসব হাদীসের সমষ্টি ওদের বিরুদ্ধে অকাট্য দলীল হয়, যাদের ধারণা হচ্ছে শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত কোন হাদীস প্রমাণযোগ্য নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী: ১/৪৪২)

উল্লেখ্য, আল্লামা মুবারকপুরী আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ইমাম ও মহামান্য ব্যক্তি। যিনি তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি ওই ব্যাখ্যাগ্রন্থেই এ মত উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমান তথাকথিত আহলে হাদীসরা দাবী করছেন, এসব হাদীস নাকি 'জাল'এদেরই বিপক্ষে তাদের ইমামের উক্ত মন্তব্যটিই প্রমাণ করে যে, বর্তমান আহলে হাদীসগণ তাদের মান্যবরগণের মতের প্রতিও ইনসাফ করছেন না। এমনটা ঠিক নয়।

 

১. আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবের অভিমত-

বর্তমান যুগের লা-মাযহাবীদের সবচেয়ে বড় ইমাম ও মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী বলেন-

وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب والصحة تثبت بأقل منها عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث، فما نقله الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في " إصلاح المساجد " (ص ۱۰۷) عن أهل التعديل والتجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح، فليس مما ينبغي الاعتماد عليه (سلسلة الاحاديث الصحيحة للالباني: (۱۳۸/۳)

অর্থাৎ সারকথা হচ্ছে, (শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত) হাদীসটি বহু সূত্রের সমষ্টির কারণে নিঃসন্দেহে সহীহ। কোন হাদীস অত্যাধিক দুর্বলতা থেকে নিরাপদ হলে এর চেয়ে কম সূত্রে বর্ণিত হলেও তা সহীহ প্রমাণিত হয়। আর আলোচ্য হাদীসটি অত্যাধিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত। সুতরাং কাসেমী যে তার কিতাব 'ইসলাহুল মাসাজিদ'এ উল্লেখ করেছেন, "শবে বরাতের ফযীলতের হাদীস সহীহ নয়" তার এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহ: ৩/১৮৩)

 

গ. আলবানী সাহেবের আরেকটি মন্তব্য

শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীসের উপর আলবানী সাহেবের মন্তব্য নিম্নরূপ-" يطلع الله تبارك وتعالى إلى خلقه ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن ".

قال الالباني: حديث صحيح، روي عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا وهم معاذ ابن جبل وأبو ثعلبة الخشني وعبد الله بن عمرو وأبي موسى الأشعري وأبي هريرة وأبي بكر الصديق وعوف ابن مالك وعائشة (سلسلة الاحاديث الصحيحة للالباني: ١٣٥/٣)

অর্থাৎ শবে বরাতের হাদীসটি (মূল বক্তব্যের দিক থেকে) 'সহীহ'সাহাবায়ে কিরামের একটি বড় জামাত থেকে হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত।

তারা হলেন- হযরত মু'আয রা., আবু ছা'লাবা আল খোশানী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা., আবু মুসা আশআরী রা., আবু হুরায়রা রা., আবু বকর রা., আউফ ইবনে মালিক রা. এবং হযরত আয়েশা রা. (দ্র: সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহ: ৩/১৩৫)

উপরোক্ত মন্তব্যগুলো ভাল করে পড়ুন, আরো বহু মুহাদ্দিসের মন্তব্য রয়েছে যারা

শবে বরাতের বেশ কিছু হাদীসকে সহীহ বলেছেন। একজন মুহাদ্দিসও এমন পাওয়া যাবে না, যিনি শবে বরাতের কোন একটি হাদীসকে 'জাল' বা 'মওযু' বলেছেন। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয়, হাদীস শাস্ত্রের সকল আলেমদের বিপরীতে বর্তমান লা-মাযহাবী বন্ধুরা শবে বরাতের হাদীসগুলো 'জাল' বা 'প্রত্যাখ্যাত' বলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। আর মুসলিম উম্মাহকে এ মহিমান্বিত রজনীর ফযীলত থেকে বঞ্চিত করছেন। এতে প্রমাণ হয়, তারা হাদীস অস্বীকারকারী।

শবে বরাত সম্পর্কীয় বহু বর্ণনা হাদীসের কিতাবে বিদ্যমান। তন্মধ্যে

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হাদীস নিম্নে পেশ করছি-

 

প্রথম হাদীস

أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ، وَإِسْحَاقُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ السُّوسِيُّ، وَأَبُو بَكْرِ الْقَاضِي، قَالُوا: حَدَّثَنَا أَبُو الْعَبَّاسِ مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الصَّمَدِ الدِّمَشْقِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ خَالِدٍ،

 

حَدَّثَنَا أَبُو خُلَيْدٍ يَعْنِي عُتْبَةَ بْنَ حَمَّادٍ الْحَكَمِيَّ، عَنِ الْأَوْزَاعِي، عَنْ مَكْحُولٍ، وَابْنِ ثَوْبَانَ يَعْنِي عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ ثَابِتِ بْنِ ثَوْبَانَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَكْحُولٍ، عَنْ مَالِكِ بْنِ يُخَامِرَ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : " يَطْلُعُ اللهُ عَلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لمُشْرِك أَوْ مُشاحن (المعجم الكبير : ۱۰۸/۲۰ - رقم الحديث : (۲۱۵) (البيهقي في شعب الايمان: ٢٧٢/٥)

অর্থ: হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে সমস্ত সৃষ্টি কুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে সকলকে ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া। (দেখুন: শুয়াবুল ঈমান-৫/২২৭, আল-মু'জামূল কাবীর-২০/১০৮)

 

হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের অভিমত

ক. হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী র. মুয়ায রা. এর হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, ইবনে হিবক্ষান হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আর নির্ভরযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

খ. হাদীস পর্যালোচক আদনান আব্দুর রহমান বলেন, উক্ত হাদীসটি ইমাম বায়হাকী র. "ফাযাইলুল আওকাত" অধ্যায়ে বর্ণনা করেন। তার সনদ 'হাসান' গ. )المعجم الكبير( গ্রন্থের মুহাক্কিক এবং বিশিষ্ট হাদীস পর্যালোচক বলেন, শবে বরাতের হাদীসটি বহু সূত্রে বর্ণিত। যারা সূত্রগুলো সম্পর্কে অবগত তাদের নিকট হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ পরিগণিত। (আল-মুজামূল কাবীর: ২০/১০৮)

 

দ্বিতীয় হাদীস

أَخْبَرَنَا أَبُو زَكَرِيَّا بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ، أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ سَلْمَانَ الْفَقِيهُ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ [ص: ٣٥٧] مَسْلَمَةَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا الْحَجَّاجُ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: فَقَدْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلَبُهُ، فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعًا رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ، فَقَالَ : " يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ "، قَالَتْ: قُلْتُ: وَمَا بِي مِنْ ذَلِكَ، وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ : " إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبِ " ( سنن ابن ماجه: ص ۹۹ ، رقم الحدیث: ۱۳۸۹ شعب الايمان للبيهقي : ٣٨٢٥/٣)

অর্থ: হযরত আয়েশা রা. বলেন, একরাতে আমি রাসূল স.কে বিছানায় পেলাম না। তাই (খোজার উদ্দেশ্যে) বের হলাম। তখন দেখতে পেলাম, তিনি জান্নাতুল বাকীতে আছেন। আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, তুমি কি এ আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করছিলাম, আপনি আপনার অন্য স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। রাসূল স. বলেন শাবানের পনের তারিখ রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং 'বনু কালব' গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে মাফ করে দেন। (তিরমিযী শরীফ: ১/১৫৬)

 

হাদীসটির ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অভিমত

ইবনে হিবক্ষান র. আয়েশা রা. এর হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়‍্যাহ: ৭/৪৪১)

এছাড়া ইমাম ইবনে মাজা র. তার সুনানে ইবনে মাজাতে, ইবনে আবী শাইবা তার মুছান্নাফে, ইমাম আহমদ তার মুসনাদে এছাড়া আরো অনেকেই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেউ হাদীসটিকে জাল বা অত্যাধিক দুর্বল বলেন নি। হাদীসটির বর্ণনাকারী ছিকাহ (বিশ্বস্ত)আর অন্য হাদীসের সহযোগিতায় হাদীসটি শক্তিশালী। এছাড়া আবু বকর রা., মু'আজ বিন জাবাল রা. প্রমূখ প্রসিদ্ধ সাহাবী থেকে এরূপ বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে হাদীসটি হাসান এবং সহীহ লি-গাইরিহী।

 

তৃতীয় হাদীস

أَخْبَرَنَا أَبُو طَاهِرِ الْفَقِيهُ ، أَخْبَرَنَا أَبُو حَامِدِ بْنُ بِلَالٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْأَحْمَسِي، حَدَّثَنَا الْمُحَارِبِيُّ، عَنِ الْأَحْوَصِ بْنِ حَكِيمٍ، عَنِ الْمُهَاصِرِ بْنِ حَبِيبٍ، عَنِ مَكْحُولٍ، عَنْ أَبِي ثَعْلَبَةَ الْخُشَنِي، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : " إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ اطَّلَعَ اللهُ إِلَى خَلْقِهِ فَيَغْفِرُ لِلْمُؤْمِنِ، وَيُمْلِي لِلْكَافِرِينَ، وَيَدَعُ أَهْلَ الْحِقْدِ بِحِقْدِهِمْ حَتَّى يَدَعُوهُ " شعب الايمان للبيهقي : ۳۸۱/۳ - رقم الحديث: (۳۸۳۲)

وكذا في العجم الكبير : ٢٢٤/٢٢ - رقم الحديث: (٥٩٣)

অর্থ: হযরত আবী সা'লাবা আল খুশানী রা. থেকে বর্ণিত হুজুর স. ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা শা'বান মাসের পনের তারিখ রাতে স্বীয় বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। অতঃপর মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন এবং কাফেরদেকে সুযোগ দেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে বিদ্বেষ পরিত্যাগ করা পযর্ন্ত অবকাশ দেন। (শুয়াবুল ঈমান: ৩/৩৮১, মু'জামূল কাবীর: ২২/২২৩)

 

হাদীসের আলোকে শবে বরাতের ফযীলত

ক) এ রাতে জীবন-মৃত্যু ও বার্ষিক বাজেট চুড়ান্ত হয়-

قوله (وَعَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ) : وَفِي نُسْخَةٍ صَحِيحَةٍ مَنْسُوبَةٍ إِلَى الْعَفِيفِ : عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " قَالَ هَلْ تَدْرِينَ ، أَيْ: تَعْلَمِينَ (مَا) ، أَيْ: مَا يَقَعُ فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ ، أَيْ: مِنَ الْعَظَمَةِ وَالْقُدْرَةِ وَتَقْدِيرِ الْأَمْرِ ، وَقَوْلُ ابْنِ حَجَرٍ : نَبَّهَ - عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ ..... لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ : وَالظَّاهِرُ أَنَّ قَائِلَ يَعْنِي عَائِشَةَ (قَالَتْ) : نَقَلَ بِالْمَعْنَى، وَإِلَّا فَالظَّاهِرُ قُلْتُ: (مَا فِيهَا ، أَيْ: مَا يَقَعُ فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَقَالَ: " فِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ مَوْلُودٍ مِنْ بَنِي آدَمَ) : وَتَخْصِيصُهُمْ تَشْرِيفٌ لَهُمْ فِي هَذِهِ السَّنَةِ ، أَيْ: الْآتِيَةِ إِلَى مِثْل هَذِهِ اللَّيْلَةِ وَفِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ هَالِكِ ، أَيْ: مَيِّتٌ مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ : قَالَ الطَّيبِيُّ : هُوَ مِنْ قَوْلِهِ تَعَالَى: {فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ} [الدخان: ٤] مِنْ أَرْزَاقِ الْعِبَادِ وَآجَالِهِمْ، وَجَمِيعِ أُمُورِهِمْ إِلَى الْأُخْرَى الْقَابِلَةِ وَفِيهَا تُرْفَعُ أَعْمَالُهُمْ). (۱۳۱۳) المطبعة الهندية: (٤٠٨/١) مشكاة المصابيح مع شرحه ٦٧١/٤ - رقم الحديث:

অর্থ: আয়শা রা. রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- তুমি কি জান এ রাতে কি কাজ করা হয়? অর্থাৎ শা'বানের মধ্য রাতে। (আয়েশা রা. বলেন আমি বললাম) কি কাজ করা হয় হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, এ রাতে পুরো বছর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে পুরো বছর কত লোক ইন্তেকাল করবে তা লেখা হয়। আর এ রাতেই বান্দাদের (পুরো বছরের) কার্যাবলী (আসমানে) উঠানো হয়। আর এ রাতেই নির্ধারিত রিযিক অবতীর্ণ হয়। তারপর আয়েশা রা. জানতে চাইলেন যে, আল্লাহর রহমত ব্যতীত কেউ কি জান্নাতে যেতে পারবে? হুজুর স. তিনবার বললেন কখনো না। আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও না? তখন রাসূল স. নিজের মাথায় হাত রেখে বললেন, আমিও না। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত আমাকে ঢেকে রেখেছে। একথাটি তিনি তিনবার বললেন। (মিশকাত: ১/৪০৮)

 

(খ) সূর্যাস্ত থেকে সকাল পর্যন্ত পুরষ্কার বিতরণের ঘোষণা-

حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِي الْخَلَّالُ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ أَبِي سَبْرَةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ : أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلَى فَأَعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ " (سنن ابن ماجه: ١٤٤/١-

رقم الحديث: ۱۳۸۸ ، وكذا في شعب الايمان (۳۷۸/۳)

অর্থ: হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত হুজুর স. বলেন, যখন শা'বানের পঞ্চদশ রাতের আগমন হয় তখন তোমরা সারা রাত নামাজ পড় এবং দিনে রোজা রাখ।

 

কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের সময় আল্লাহ তা'আলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত এই আহবান করতে থাকেন। আছে কি কোন ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছে কি কোন রিযিক যাচনাকারী, আমি তাকে রিযিক দিব। আছে কি কোন বিপদগ্রস্থ, আমি তাকে বিপদ হতেপরিত্রাণ দিব। আছে কি এমন কেউ? আছে কি এমন কেউ?

 

(গ) শবে বরাতে জাগরণ করলে জান্নাতের সু-সংবাদ

وروي عن معاذ بن جبل رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من أحيا الليالي الخمس وجبت له الجنة ليلة التروية وليلة عرفة وليلة النحر وليلة الفطر وليلة النصف من شعبان (الترغيب والترهيب : ١٥٢/٢ - رقم الحديث: (١٦٥٩)

"হযরত মু'আয রা. বর্ণনা করেন, রাসূল স. ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি পাঁচ রাত ইবাদত বন্দেগীতে কাটাবে তার জন্য জান্নাত অবধারিত। ১. জিলহজ্জের আট তারিখের রাত। ২. আরাফার রাত। ৩. ঈদুল আযহার রাত। ৪. ঈদুল ফিতরের রাত। ৫. শাবানের মধ্য রাত অর্থাৎ শবে বরাত। (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ২/১৫২)

 

শবে বরাতে করণীয়

'শবে বরাত' তথা শা'বানের মধ্য রাতটি বান্দার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমতস্বরূপ। এ রাতে অগণিত মানুষের গুনাহ মাফ হয়। তাই এ রাতকে গনীমত মনে করে স্বীয় প্রভুর দরবারে বেশী বেশী তাওবা ইসতিগফার করা জরুরী। সকল প্রকার নব-আবিস্কৃত কুসংস্কার থেকে নিজকে মুক্ত রাখা ফযীলত অর্জনের পূর্বশর্ত।

 

এ রাতে যা করণীয়

ক. রাত জেগে নফল ইবাদাত করা: এ রাতে ইবাদাতের বিশেষ কোনো নিয়ম পদ্ধতি শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নেই। কত রাকাত নামায পড়বে, কোন সূরা দিয়ে পড়বে তারও কোনো বাধ্যবাদকতা নেই। সমাজে এ ব্যাপারে প্রচলিত নিয়মনীতি ভিত্তিহীন। তাই সাধ্যমত নফল নামায পড়বে। দরুদ শরীফ, তাওবা, ইস্তিগফার, যিকির করবে, তাসবীহ পড়বে, কুরআন তিলাওয়াত করবে। বিশেষকরে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবে, সালাতুস তাসবীহ পড়বে। আর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ইশা ও ফজর নামায অবশ্যই জামাতের সাথে পড়বে।

খ. দিনে রোযা রাখবে। এ রোযার ব্যাপারে হযরত আলী রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি সূত্রের দিক থেকে যয়ীফ হলেও যেহেতু শাবান মাসে রোযা রাখার ব্যাপারে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, বিশেষ করে মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ তিনটি রোযা রাখার উপর গুরুত্ববহ হাদীস বর্ণিত আছে। যাকে 'আইয়ামে বীর্যে'র রোযা বলে। আর ১৫ তারিখের রোযা আইয়ামে বীযের রোযারই অন্তর্ভুক্ত। তাই ১৫ তারিখের রোযা মুস্তাহাব। তাই রোযা না রেখে নফল রোযার সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো যুক্তিকতা নেই। তবে যারা মনে করেন, রোযা দুইটি রাখা আবশ্যক। এ কথা ভিত্তিহীন। হ্যাঁ, এটা একমাত্র আশুরার রোযার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

গ. শবে বরাতে কবর যিয়ারত করা। হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূল স. শবে বরাতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই এ রাতে কবরস্থানে গমন ও যিয়ারত ভালো কাজ। তবে মনে রাখতে হবে, রাসূল স. জীবনে মাত্র একবার শবে বরাতে কবরস্থানে গিয়েছিলেন। একাধিকবার যাওয়ার কোনো প্রমাণ মিলে না। তাই প্রত্যেক শবে বরাতে যাওয়া বৈধ হলেও সুন্নাত বলা যাবে না। এ কারণে প্রতি শবে বরাতে কবর যিয়ারতের নিয়ম বানানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে বর্তমান আমাদের দেশে ওই রাত কবর যিয়ারতে নারী-পুরুষের সমাগম ঘটে। এতে সাওয়াবের তুলনায় গুনাহের সম্ভাবনা থাকে। বিধায় মাঝে মধ্যে গুনাহমুক্ত পরিবেশে কবর যিয়ারত করাই শ্রেয়।

শবে বরাতে যা বর্জনীয়

ক. ফরয নামায, রমযানে বিতর ও তারাবীহ এবং ইস্তেসকাহ-এর নামায ছাড়া অন্য নামাযের জামাত করা বৈধ নয়।

সুতরাং শবে বরাতে ও শবে ক্বদরে নফল নামায জামাতে পড়া যাবে না। ইমাম আবু হানীফা র. বলেন, নফল ইবাদতের সঠিক মূল্য দাও, আর তা হচ্ছে-  "তুমি থাকবে আর তোমার আল্লাহ থাকবেন তৃতীয় কেউ থাকবে না" অর্থাৎ একাকী। হাদীসের বর্ণনায় এ রাতে আল্লাহর আহক্ষান উল্লেখ আছে-

أَلا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلَى فَأَعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ

 

এখানে একবচন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ তুমি একা আল্লাহর নিকট আসো।

দলবদ্ধভাবে জামাতের সাথে প্রভুর দরবারে উপস্থিত হওয়া এ আহক্ষান পরিপন্থী। তাই জামাতের সাথে নফল নামায আদায় করা মাকরূহ। বড় পরিতাপের বিষয়, আমাদের সমাজে ইদানিং মহিলারাও জামাতের সাথে সালাতুস তাসবীহ, তাহাজ্জুদ পড়া শুরু করেছে। এটা নিতান্তই শরীয়া গর্হিত কাজ।

খ. শবে বরাতে যেহেতু আল্লাহর রহমতের বারিধারা নেমে আসে, অগণিত বান্দার গুনাহ মাফ হয়, তাই শয়তান থেমে নেই; বরং বান্দাকে রহমত ও মাগফিরাতের নির্ঝরণী থেকে বঞ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা করেই কিছু কুসংস্কারে লিপ্ত রাখতে আবিষ্কার করে, আতশ বাজি ও আলোক সজ্জার মতো বিজাতীয় কু-প্রথা। আর কিছু লোককে ব্যস্ত রাখে হালুয়া-রুটি, মিষ্টি ও শিরনী বণ্টনের কুসংস্কারে। কিছু লোকের ধারণা, হালুয়া-রুটি ও মিষ্টির আয়োজন ছাড়া শবে বরাতই পালন হয় না। এগুলো সব শয়তানের সুক্ষ্ম কারসাজী। এগুলো গুনাহের কাজ বিধায় বর্জনীয়।এ ব্যাপারে আল্লামা মুহাদ্দিসে দেহলভী বলেছেন-

ومن البدع الشنيعة ما تعارف الناس في أكثر بلاد الهند من ايقاد السرج ووضعها علي البيوت والجدران والاجتماع للهو واللعب بالنار واحراق الكبريت، فإنه مما لا اصل له في الكتب

الصحيحة المعتبرة، ولم يرو فيها حديث ضعيف ولا موضوع (ماثتب بالسنة : ٢١٤)

আল্লাহ পাক সকলকে এসব কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখুন। আমীন।



মুফতি মুহাম্মদ আবু সালেহ

মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল


 

📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

২৭ জানুয়ারী ২০২৬