একজন দরিদ্র গভর্নর সাহাবির কাহিনী

হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি : একজন দরিদ্র গভর্নর সাহাবির কাহিনী

 

তিনি ছিলেন হিমসের গভর্নর। তাঁকে গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। সাঈদ ইবনে আমেরর অপর দুই ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের ও উকবা ইবনে আমেরও গভর্নর ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রা. গভর্নর হিসেবে কাজ শুরু করার কিছুকাল পর হিমসের গ্রহণযোগ্য কিছু লোকের একটি প্রতিনিধিদল আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য আগমন করেন। আমিরুল মুমিনিন তাদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের অঞ্চলের অভাবী মানুষের একটি তালিকা করে দাও, যেন আমি তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করতে পারি। তারা তৎক্ষণাৎ একটি তালিকা করে দিল। তালিকায় হিমসের গভর্নর হযরত সাঈদ ইবনে আমেরের নামও ছিল।

 

আমিরুল মুমিনিন জিজ্ঞেস করলেন কোন সাঈদ ইবনে আমের? তারা বলল, আমাদের গভর্নর। তিনি বললেন, তোমাদের গভর্নর গরিব? তারা বলল, জি হ্যাঁ। আল্লাহর কসম! এমনও সময় যায় যে, দিনের পর তিন তাঁর ঘরের চুলোয় আগুন জ্বলে না। এ কথা শুনে আমিরুল মুমিনিন উমর রা. অনিচ্ছায় কেঁদে ফেলেন। এত বেশি কাঁদেন যে, তাঁর দাড়ি মোবারক ভিজে যায়। তিনি দাঁড়ালেন। ঘরের ভেতর থেকে এক হাজার দিনারের একটি থলে নিলে নিয়ে বললেন, তোমাদের গভর্নরকে আমার সালাম বলবে এবং পয়গাম দিবে যে, আমিরুল মুমিনিন এই থলে তোমার জন্য প্রেরণ করেছেন, যেন তা তুমি নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারো।

 

প্রতিনিধিদল হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে দিনারের থলে নিয়ে আগমন করল। থলে খুলে দিনার দেখে তিনি বললেন ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। যেন কোনো বিপদ আপতিত হয়েছে কিংবা কোনো দুর্ঘনা ঘটেছে। তাঁর এ অবস্থা দেখে ভেতর থেকে তাঁর স্ত্রী বলতে লাগল, আমার মাথার মুকুট! আপনার কী হয়ে গেল? আমিরুল মুমিনিন কি মারা গেছেন? তিনি বললেন, না, তা হয়নি। তবে এই ঘটনা আরও মারাত্মক। তার স্ত্রী বলল, তাহলে কি কোনো জিহাদে মুসলমানদের বড় ধরনের পরাজয় ঘটেছে? তিনি বললেন, আরও বেশি ভয়ানক। স্ত্রী বলল, তাহলে এরচেয়ে ভয়ানক বিষয় কী হতে পারে? তিনি বললেন, আমার কাছে দুনিয়া চলে এসেছে। যেন আমার আখেরাত ধ্বংস করে দেয়, যেন আমার ঘরে ফিতনা দিয়ে পূর্ণ করে দেয়। স্ত্রী বলল, আপনি কেন এই ফিতনা থেকে নিষ্কৃতি লাভের চেষ্টা করছেন না? দিনারের বিষয়ে স্ত্রী এখনও জানতে পারেনি। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, তুমি কি এ বিষয়ে আমাকে সহযোগিতা করবে? তিনি বললেন, অবশ্যই করব, কেন করব না? এরপর তিনি দিনারভর্তি থলেটি খুলে ছোটো ছোটো থলের মধ্যে ভাগ করেন এবং গরিব মুসলমানদের মাঝে বণ্টন করে দেন।

 

এই ঘটনার পর বেশি দিন অতিবাহিত হয়নি, তখন আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হিমস সফরে গেলেন। উদ্দেশ্য ছিল, নিজে ওই এলাকার পরিস্থিতি অবলোকন করা। সেসময় মানুষজন মজা করে হিমসকে কুয়াইফা অর্থাৎ ছেটো কুফা বলত। কারণ, হিমসের লোকজন খেলাফতের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার ক্ষেত্রে কুফার লোকদের কাছাকাছি ছিল।

 

আমিরুল মুমিনিন হিমসে আগমন করার পর স্থানীয় লোকজন তাঁকে সালাম করার জন্য হাজির হল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা তোমাদের গভর্নরকে কেমন পেয়েছ? তারা অভিযোগের পসরা সাজিয়ে বসল। সেখানকার গভর্নর হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ দায়ের করল। চারটি অভিযোগই একটার চেয়ে আরেকটা মারাত্মক ছিল।

 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন, আমি গভর্নর এবং বাসিন্দাদের একই সময়ে হাজির হতে বলেছি; এবং আমি মনে মনে দোয়া করছিলাম-- যেন হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে আমার সুধারণা মিথ্যা প্রমাণিত না হয়। তার ওপর আমার অনেক আস্থা ও ভরসা ছিল। পরের দিন সকালবেলা গভর্নর ও জনগণ একই সঙ্গে উপস্থিত হল। আমি লোকদের বললাম, তোমাদের গভর্নরের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগগুলো বলো। তারা বলল, আমাদের গভর্নর বেলা হওয়ার আগে বাসস্থান থেকে বের হয় না। এ বিষয়ে আমি হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম এ বিষয়ে তোমার মতামত কী?

 

হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহু একটু সময় চুপ থাকার পর বলতে শুরু করলেন, আল্লাহর কসম! আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিলাম না, কিন্তু এখন কিছু বলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। সবকিছু খুলে বলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মূল ঘটনা হল, আমার বাড়িতে কোনো সেবক নেই। সকালবেলা আমি পরিবারের জন্য আটা প্রস্তুত করি। এরপর আটার খামিরা তৈরি করার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। অতঃপর নিজ হাতে রুটি বানাই। তারপর বাসা থেকে অজু করে মানুষের উদ্দেশ্যে বের হই।

 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ রয়েছে? তারা বলল, আমাদের গভর্নর রাতের বেলা আমাদের কোনো কাজ করেন না, কোনো অভিযোগ শুনেন না। আমি বললাম, সাঈদ! এই অভিযোগের ব্যাপারে কিছু বলো। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এ বিষয়েও আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম না। সংক্ষিপ্ত কথা হল, আমার দিনের পুরো সময় জনগণের কাজের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছি আর রাত ওয়াকফ করেছি মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য। তাই রাতে কারও কাজ করে দিতে পারি না।

 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ রয়েছে? তারা বলল, আমাদের গভর্নর মাসে একবার অলসতা করে দিনের শেষবেলায় বের হয়। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, সাঈদ! এমনটা কেন করো?

 

হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমিরুল মুমিনিন! না আমার কোনো খাদেম আছে আর না আমার পরিধানের কাপড় ছাড়া আর কোনো কাপড় আছে। মাসে একবার আমার পরিধানের কাপড় ধৌত করি। কাপড় ধুয়ে শুকানোর অপেক্ষা করি। কাপড় শুকানোর পর পরিধান করে জনগণের উদ্দেশ্যে বের হই। কাপড় শুকাতে শুকাতে বেশ বেলা হয়ে যায়। তাই বের হতে বিলম্ব হয়।

 

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কোনো অভিযোগ রয়েছে? তারা বলল, মাঝেমধ্যে কোনো মজলিসে বসা অবস্থায়ই তিনি বেহুঁশ হয়ে যান, অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন, মনে হয় মজলিসের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। হযরত উমর রা. জিজ্ঞেস করলেন, এমনটা কেন হয় সাঈদ?

 

হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি হযরত খুবাইব ইবনে আদি রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি। তখন আমি মুশরিক ছিলাম। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাঁর অঙ্গ কর্তন করছিল আর বলছিল--- তোর কি এটা পছন্দ যে, তোর জায়গায় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরে তোকে ছেড়ে দেবো?

হযরত খুবাইব ইবনে আদি রাদিয়াল্লাহু আনহু সিংহের মতো গর্জে উঠে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! আমি এটা কখনোই পছন্দ করবা না যে, আমি নিরাপদে ও শান্তিতে আমার পরিবারের কাছে থাকব আর ওদিকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে একটি কাঁটা গাঁথবে।

 

হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ওই দিনের কথা স্মরণ হলে আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, চিন্তিত হই। আমি এটা ভেবে কুঁকড়ে উঠি যে, সেদিন আমি কেন হযরত খুবাইব ইবনে আদিকে সহযোগিতা করলাম না। ভয় পাই আল্লাহ তাআলা যদি আমার এই অপরাধ ক্ষমা না করেন। এসব ভাবতে ভাবতে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ি।

 

তাঁর এসব কথা শুনে আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর তাআলার বহুত শুকরিয়া যে, তিনি হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে আমার সুধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেননি।

 

তারপর আমিরুল মুমিনিন তাকে এক হাজার দিনার দিয়ে বললেন, এগুলো তোমার প্রয়োজনে ব্যয় করবে। চকমক করা এসব দিনার দেখে হযরত সাঈদ ইবনে আমের জুমাহি রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী অন্দর থেকে বলে উঠল, ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনুন এবং ঘরের কাজের জন্য একজন সেবক রাখুন। তিনি স্ত্রীকে বললেন, আমি কি তোমাকে এসব জিনিস থেকেও উত্তম জিনিস দেবো না? স্ত্রী বলল সেগুলো কী? তিনি বললেন, এসব দিনার আমরা তাঁকে ফিরিয়ে দেবো যিনি তা আমাদেরকে দিয়েছেন। আমরা এসব দিনারের চেয়ে তাঁর মুখাপেক্ষী বেশি। স্ত্রী বলল তিনি কে? তিনি বললেন, আমরা মহান আল্লাহকে কর্জে হাসান দিয়ে দিই! স্ত্রী বলল, অবশ্যই দিয়ে দিন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তিনি তৎক্ষণাৎ দিনারগুলোকে কয়েকটি থলেতে ভাগ করে নিলেন। তারপর ঘরের একজনকে নির্দেশ দিলেন যাও অমুকের স্ত্রী, অমুকের এতিম বাচ্চা, অমুক খান্দানের মিসকিন এবং অমুক কবিলার অভাবীদের মাঝে বণ্টন করে দিয়ে আসো।

 

মাত্র ২১ হিজরিতে ৪০ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন তিনি। রাদিয়াল্লাহু আনহু।


 

মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক

📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

২৬ ডিসেম্বর ২০২৫