প্রশ্ন: তালাক কী? ইসলামী শরীয়তে তালাকের সঠিক পরিচয় ও বিধান (কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে) জানতে চাই

الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب

ইসলামিক শরিয়াহ মোতাবেক, তালাক (الطلاق) হলো স্বামীর পক্ষ থেকে শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানো। ইসলাম বিবাহকে অত্যন্ত পবিত্র, মর্যাদাপূর্ণ এবং দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক কোনো কাম্য বিষয় নয়; বরং এটি এমন একটি বৈধ ব্যবস্থা, যা কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করা আর সম্ভব হয় না। ইসলাম প্রথম থেকেই সংসার টিকিয়ে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং বিচ্ছেদকে সর্বশেষ সমাধান হিসেবে অনুমোদন করেছে।আল্লাহ তাআলা বিবাহ সম্পর্কে বলেন

﴿وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا﴾

তারা তোমাদের কাছ থেকে এক দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।সূরা আন-নিসা: ২১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিবাহ কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি পবিত্র অঙ্গীকার। তাই সামান্য মতবিরোধ, রাগ বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তখন কুরআন সর্বপ্রথম সংশোধনের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন

﴿وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنَهُمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا﴾

যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা কর, তবে একজন সালিশ স্বামীর পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ স্ত্রীর পরিবার থেকে নিযুক্ত কর। তারা যদি মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দেবেন।সূরা আন-নিসা: ৩৫ -এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলাম তালাকের আগে আপস-মীমাংসা, উপদেশ, ধৈর্য এবং পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে সংসার রক্ষার চেষ্টা করতে নির্দেশ দিয়েছে। যদি সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দাম্পত্য জীবন আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হয়, তখন ইসলাম তালাকের অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন

﴿ٱلطَّلَٰقُ مَرَّتَانِۖ فَإِمْسَاكٌۢ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌۢ بِإِحْسَٰنٍ﴾তালাক দুইবার। এরপর হয় উত্তমভাবে স্ত্রীকে রেখে দেবে, অথবা সুন্দরভাবে বিদায় দেবে।সূরা আল-বাকারাহ: ২২৯  আল্লাহ তাআলা আরও বলেন

﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ﴾

হে নবী! যখন তোমরা নারীদের তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের সময় বিবেচনা করে তালাক দেবে এবং ইদ্দতের হিসাব সংরক্ষণ করবে।সূরা আত-তালাক: ১- এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তালাকও একটি নিয়মতান্ত্রিক ইবাদতসদৃশ বিধান; এটি ইচ্ছামতো বা যেকোনো সময়ে দেওয়ার বিষয় নয়।রাসূলুল্লাহ তালাককে অপছন্দনীয় বলে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন

أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ

আল্লাহর নিকট বৈধ বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক।سنن أبي داود، رقم: ٢١٧٨

এছাড়া হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) ঋতুকালে স্ত্রীকে তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ তাঁকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে বলেন এবং পবিত্র অবস্থায়, সহবাস না করে প্রয়োজন হলে তালাক দিতে নির্দেশ দেন।

صحيح البخاري: ٥٢٥١، صحيح مسلم: ١٤٧١

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক একটি গুরুতর শরয়ী ঘোষণা। তাই এটি উচ্চারণের আগে এর পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক। রাগ, আবেগ, পারিবারিক চাপ বা সাময়িক মতবিরোধের কারণে তালাক দেওয়া অত্যন্ত অনুচিত। কারণ একটি তালাকের মাধ্যমে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়; সন্তান, পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ইসলাম সব সময় মিল-মহব্বত, ক্ষমাশীলতা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সংসার টিকিয়ে রাখার শিক্ষা দেয়।

সর্বোপরি বলা যায়,ইসলামে তালাক কোনো উৎসাহিত বিষয় নয়; বরং এটি একটি বৈধ কিন্তু অপছন্দনীয় ব্যবস্থা, যা কেবল একান্ত প্রয়োজনেই গ্রহণযোগ্য। একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে সর্বপ্রথম সম্পর্ক রক্ষার সব প্রচেষ্টা করা। এরপরও যদি দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে তালাক প্রদান করা বৈধ হবে। এভাবেই ইসলাম পরিবার, সমাজ এবং মানবজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করেছে।

তথ্যসূত্র:-

 القرآن الكريم: سورة النساء (٢١، ٣٥)- سورة البقرة (٢٢٩-٢٣٠)- سورة الطلاق (١-٢)- صحيح البخاري (٥٢٥١)- صحيح مسلم (١٤٧١)- سنن أبي داود (٢١٧٨)- الهداية، كتاب الطلاق- بدائع الصنائع- رد المحتار على الدر المختار

 

 

মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল

মুফতিমাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদদক্ষিণখানঢাকা