ভূমিকা

ইসলামী হিজরি সনের তৃতীয় মাস হলো রবিউল আউয়াল। ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম উম্মাহর আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে এ মাসের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ এর পবিত্র জীবন, নবুওয়াতের দায়িত্ব, তাঁর দাওয়াত, সংগ্রাম, ত্যাগ, আদর্শ এবং ইন্তেকালের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি এ মাসের আলোচনায় উঠে আসে। এ কারণে রবিউল আউয়াল এলেই স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের অন্তরে রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অনুভূতি জাগ্রত হয়।

তবে একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমারেখা রক্ষা করা। কারণ ভালোবাসা যেমন ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনি সেই ভালোবাসার প্রকাশও হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী।

আল্লাহ তাআলা বলেন

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।[সূরা আল-আহযাব: ২১]

সুতরাং রবিউল আউয়াল আমাদের জন্য কেবল কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করার মাস নয়; বরং রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ, চরিত্র ও আদর্শকে নতুন করে জানার এবং নিজের জীবনে বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এ মাসকে কেন্দ্র করে শরিয়তে কোনো বিশেষ ইবাদত, নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা বিশেষ ধর্মীয় উৎসব নির্ধারিত হয়নি। তাই যে আমলের শরয়ী ভিত্তি রয়েছে, তা করা যাবে; আর যে বিষয়কে শরিয়তের অংশ বা বিশেষ সওয়াবের আমল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। মূল লেখাতেও এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

রবিউল আউয়ালকে কীভাবে গ্রহণ করা উচিত?

রবিউল আউয়ালকে একজন মুসলমান এমনভাবে গ্রহণ করবেন, যাতে রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং তাঁর সুন্নাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। শুধু আবেগ, আলোচনা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ভালোবাসার দাবি যথেষ্ট নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল -এর আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

 

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

[সূরা আল-হাশর: ৭]

আরও বলেন

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ

[সূরা আলে ইমরান: ৩১]

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ভালোবাসার প্রকৃত দাবি হলো অনুসরণ। তাই রবিউল আউয়ালে রাসূল -এর জীবন ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি নিজের জীবনেও তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত।


রবিউল আউয়ালের করণীয়

১. রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ অনুসরণ করা

রবিউল আউয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ জানা, শেখা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

রাসূল -এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ হলো তাঁর নির্দেশ মেনে চলা। তিনি নামাজ যেভাবে আদায় করেছেন, আমরা সেভাবে নামাজ আদায় করব। তিনি মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করেছেন, আমরাও সেভাবে উত্তম আচরণের চেষ্টা করব। তিনি পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সঙ্গে যে সুন্দর আচরণ করেছেন, তা আমাদের জীবনেও বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাসূল -এর সুন্নাহ শুধু পোশাক বা বাহ্যিক কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর সুন্নাহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত ইবাদত, আখলাক, লেনদেন, পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী, ব্যবসা-বাণিজ্য, দাওয়াত, নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে আচরণ সব ক্ষেত্রেই তাঁর আদর্শ রয়েছে।

তাই রবিউল আউয়ালে নিজের জীবনের অন্তত কয়েকটি ক্ষেত্রে সুন্নাহ বাস্তবায়নের সংকল্প করা যেতে পারে।

২. রাসূল -এর সীরাত অধ্যয়ন করা

রাসূলুল্লাহএর জীবন জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ।

আল্লাহ তাআলা বলেন

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

[সূরা আল-আহযাব: ২১]

তাই রবিউল আউয়ালে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে সীরাত পাঠের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাসূল -এর শৈশব, নবুওয়াত, মক্কি জীবন, হিজরত, মাদানি জীবন, দাওয়াত, সাহাবাদের সঙ্গে আচরণ, পরিবার পরিচালনা, ধৈর্য, ক্ষমা, দয়া ও উম্মতের প্রতি তাঁর মমতা সম্পর্কে জানা যেতে পারে।

তবে সীরাত পাঠের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি রাসূল -এর নামে প্রচলিত প্রতিটি ঘটনা সহিহ নয়। অনেক দুর্বল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কাহিনিও মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য সীরাত ও হাদিসের গ্রন্থ থেকে তথ্য গ্রহণ করা উচিত।

৩. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা

রাসূলুল্লাহ -এর ওপর দরুদ পাঠ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।

আল্লাহ তাআলা বলেন

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

[সূরা আল-আহযাব: ৫৬]

রাসূলুল্লাহ বলেছেন

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا

[সহিহ মুসলিম: ৪০৮]

সুতরাং রবিউল আউয়ালে বেশি বেশি দরুদ পড়া ভালো আমল। তবে মনে রাখতে হবে, দরুদ শুধু রবিউল আউয়ালের আমল নয়; বরং সারা বছরই বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উচিত।

৪. সোমবার নফল রোজা রাখা

রাসূলুল্লাহ সোমবারের রোজা রাখতেন। তাঁকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন

ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ

[সহিহ মুসলিম: ১১৬২]

এ হাদিসে রাসূল সোমবারের রোজার সঙ্গে তাঁর জন্মের দিনের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো রাসূল তাঁর জন্মের কথা স্মরণ করার ক্ষেত্রে কোনো বার্ষিক জন্মোৎসবের পদ্ধতি শিক্ষা দেননি; বরং ইবাদত হিসেবে সোমবার রোজা রেখেছেন।

অতএব কেউ যদি রবিউল আউয়ালের সোমবারগুলোতে নফল রোজা রাখতে চান, সাধারণ নফল রোজার নিয়তে তা রাখতে পারেন। তবে রবিউল আউয়ালের সোমবারকে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বিশেষ ফজিলতের দিন মনে করা যাবে না।

৫. রাসূল -এর চরিত্র অনুসরণ করা

রাসূলুল্লাহ ছিলেন উত্তম চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ।

আল্লাহ তাআলা বলেন

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰخُلُقٍ عَظِيمٍ

[সূরা আল-কলম: ৪]

তাঁর প্রতি ভালোবাসা শুধু প্রশংসা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং তাঁর চরিত্রকে নিজের জীবনে ধারণ করতে হবে।

তিনি ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, দয়ালু, ক্ষমাশীল ও বিনয়ী। তিনি দুর্বলদের প্রতি দয়া করতেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতেন, প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করতেন এবং মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন।

তাই রবিউল আউয়ালে আমরা নিজেদের জন্য কিছু চরিত্রগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারি। যেমন

  • মিথ্যা পরিত্যাগ করা;
  • আমানত রক্ষা করা;
  • গীবত থেকে বেঁচে থাকা;
  • মানুষের সঙ্গে নম্র আচরণ করা;
  • রাগ নিয়ন্ত্রণ করা;
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা;
  • প্রতিবেশীর হক আদায় করা;
  • গরিব-দুঃখীর সাহায্য করা;
  • স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা;
  • মানুষের ভুল ক্ষমা করা।

এসবই রাসূল -এর আদর্শ অনুসরণের বাস্তব দৃষ্টান্ত।

৬. পরিবারকে সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া

নিজে দ্বীন শেখার পাশাপাশি পরিবারকেও দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

[সূরা আত-তাহরীম: ৬]

রবিউল আউয়াল উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট পরিসরে সীরাত পাঠ করা যেতে পারে। শিশুদের রাসূল -এর জীবনের শিক্ষণীয় ঘটনা শোনানো যেতে পারে। প্রতিদিনের কিছু সুন্নাহ তাদের শেখানো যেতে পারে।

যেমন খাওয়ার সুন্নাহ, সালামের প্রচলন, ডান হাতে খাওয়া, ঘুমের সুন্নাহ, মসজিদের আদব, পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ ইত্যাদি।

এভাবে রবিউল আউয়ালকে পরিবারে সুন্নাহ চর্চা বৃদ্ধির একটি উপলক্ষ বানানো যেতে পারে।

৭. তওবা-ইস্তিগফার ও নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা

রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো বিশেষ ইবাদত আবিষ্কার না করে শরিয়তে প্রমাণিত সাধারণ নেক আমল বেশি বেশি করা উচিত।

যেমন

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা;
  • সম্ভব হলে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা;
  • তাহাজ্জুদ পড়া;
  • কুরআন তিলাওয়াত করা;
  • দরুদ ও যিকির করা;
  • তওবা ও ইস্তিগফার করা;
  • নফল রোজা রাখা;
  • সদকা করা;
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা;
  • গরিব ও অসহায় মানুষের সাহায্য করা;
  • গুনাহ থেকে বিরত থাকা।

রবিউল আউয়াল উপলক্ষে এসব আমলের প্রতি নতুন করে উৎসাহ সৃষ্টি করা যেতে পারে।


রবিউল আউয়ালে বর্জনীয় বিষয়

১. শরিয়তবিরোধী নতুন আমলকে দ্বীনের অংশ মনে করা

ইসলামে ইবাদত নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা যায় না। কোনো আমলকে বিশেষ ইবাদত, বিশেষ ফজিলত বা দ্বীনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য শরয়ী দলিল থাকা আবশ্যক।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

[সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮]

অন্য বর্ণনায় এসেছে

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

[সহিহ মুসলিম: ১৭১৮]

সুতরাং কোনো আমলকে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ ফজিলতের সঙ্গে দ্বীনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার আগে তার দলিল যাচাই করা জরুরি।

২. ঈদে মিলাদুন্নবীকে শরয়ী ঈদ বা ধর্মীয় উৎসব বানানো

রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কিন্তু তাঁর জন্মদিনকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব বা শরয়ী ঈদ হিসেবে পালন করার জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

রাসূল মদিনায় এসে দেখলেন, লোকেরা দুটি দিনে আনন্দ-উৎসব পালন করছে। তখন তিনি বলেন

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ

[সুনান আবু দাউদ: ১১৩৪]

এ থেকে বোঝা যায়, মুসলমানদের শরয়ী ঈদ নির্ধারিত। তাই অন্য কোনো দিনকে শরয়ী ঈদ বা বিশেষ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাসূল -এর জন্মের আলোচনা করা এবং তাঁর জন্মদিনকে শরয়ী উৎসব বানানো এক বিষয় নয়। সীরাত আলোচনা, দরুদ, সুন্নাহ শিক্ষা এসব আলাদা বিষয়; আর একটি নির্দিষ্ট দিনকে ধর্মীয় উৎসব বানানো আলাদা বিষয়।

৩. ১২ রবিউল আউয়ালকে নিশ্চিত জন্মতারিখ মনে করা

১২ রবিউল আউয়ালকে রাসূল -এর জন্মতারিখ হিসেবে সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলেও ঐতিহাসিকদের মধ্যে তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ২, , , ১০, ১১, ১২, ১৭ ও ১৮ রবিউল আউয়ালসহ বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। তাই ১২ রবিউল আউয়ালকে নিশ্চিত ও সর্বসম্মত জন্মতারিখ হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়।

মূল আলোচনাতেও এ তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

অতএব কোনো ঐতিহাসিক মতকে নিশ্চিত শরয়ী সত্য হিসেবে প্রচার না করে বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা উচিত।

৪. রাসূল এর প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করা

রাসূলুল্লাহ -এর মর্যাদা সর্বোচ্চ। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান ঈমানের অংশ। কিন্তু তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যা তাঁর বান্দা ও রাসূল হওয়ার মর্যাদা অতিক্রম করে অথবা আল্লাহ তাআলার বিশেষ গুণাবলীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন

لاَ تُطْرُونِي، كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ، وَرَسُولُهُ

[সহিহ বুখারি: ৩৪৪৫]

সুতরাং রাসূল -কে সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসতে হবে, কিন্তু তাঁকে আল্লাহর কোনো বিশেষ গুণে শরিক করা যাবে না। রাসূল আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল। এই পরিচয়ই তাঁর সর্বোচ্চ সম্মানের পরিচয়।

৫. অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা

রাসূল এর জন্ম উপলক্ষে রাস্তাঘাট, ভবন বা ঘরবাড়িতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা করে বিপুল অর্থ ব্যয় করা শরিয়তের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন

وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا ۝ إِنَّ الْمُبَذِّرِینَ کَانُوا إِخْوَانَ الشَّیَاطِینِ

[সূরা আল-ইসরা: ২৬-২৭]

অর্থাৎ সম্পদ অপচয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসার নামে এমন ব্যয় করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে দরিদ্রের হক নষ্ট হয় বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে অর্থ অপচয় হয়।

বরং সেই অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, এতিমদের সহযোগিতা করা, দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার করা বা দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো অধিক উপকারী।

৬. রবিউল আউয়ালকে অশুভ মনে করা

কিছু মানুষের ধারণা, যেহেতু রাসূল -এর ইন্তেকাল রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছে, তাই এ মাসটি শোক বা অমঙ্গলের মাস। এ ধারণা সঠিক নয়।

ইসলামে কোনো মাস বা দিন নিজস্বভাবে অশুভ নয়।রাসূল বলেছেন

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ

[সহিহ বুখারি: ৫৭০৭]

অতএব রবিউল আউয়াল মাসে বিয়ে করা, ব্যবসা শুরু করা, নতুন বাড়িতে ওঠা বা অন্য কোনো বৈধ কাজ করা নিষিদ্ধ মনে করা যাবে না।

কোনো দিন বা মাসকে অশুভ মনে করে শরিয়তসম্মত কাজ থেকে বিরত থাকা কুসংস্কারের অন্তর্ভুক্ত।

৭. রাসূল -এর নামে দুর্বল ও বানোয়াট ঘটনা প্রচার করা

রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসার কারণে অনেকে তাঁর জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা প্রচার করেন। কিন্তু প্রচলিত প্রতিটি ঘটনা সহিহ নয়।

রাসূল -এর নামে কোনো কথা বা ঘটনা প্রচার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ যাচাই না করে রাসূল -এর দিকে কোনো কথা সম্বন্ধ করা মারাত্মক অপরাধ।

বিশেষ করে তাঁর জন্ম, শৈশব, মিরাজ, মুজিজা ও ইন্তেকাল সম্পর্কিত অনেক কাহিনি মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, যেগুলোর সবগুলো নির্ভরযোগ্য নয়।

তাই সীরাত মাহফিল, আলোচনা, বই বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা প্রকাশ করার আগে তার সূত্র ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা উচিত। মূল লেখাতেও এ সতর্কতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কী?

রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসার পরিচয় হলো প্রিয় ব্যক্তির আদর্শ অনুসরণ করা।

একজন ব্যক্তি যদি মুখে বলে যে সে রাসূল -কে ভালোবাসে, কিন্তু নামাজ পড়ে না, সুন্নাহ অনুসরণ করে না, মানুষের হক নষ্ট করে, মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, গীবত করে এবং হারাম কাজে লিপ্ত থাকে—তাহলে তার ভালোবাসার দাবি অবশ্যই আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

রাসূল -এর ভালোবাসা আমাদের জীবন পরিবর্তন করবে এটাই প্রত্যাশিত।

আমরা যদি তাঁকে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর সত্যবাদিতা গ্রহণ করব।

তাঁকে ভালোবাসলে তাঁর আমানতদারি গ্রহণ করব।

তাঁকে ভালোবাসলে তাঁর নম্রতা ও ক্ষমাশীলতা গ্রহণ করব।

তাঁকে ভালোবাসলে তাঁর ইবাদতের প্রতি যত্নবান হব।

তাঁকে ভালোবাসলে তাঁর সুন্নাহকে গুরুত্ব দেব।

তাঁকে ভালোবাসলে তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকব।

এটাই ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ।


শুধু রবিউল আউয়াল নয় সারা বছর রাসূল -এর সুন্নাহ

একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার রাসূল -এর প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

রবিউল আউয়ালে আমরা যদি সীরাত পড়ি, কিন্তু বছরের বাকি সময় রাসূল -এর সুন্নাহ ভুলে যাই, তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হলো না।

রবিউল আউয়ালে যদি বেশি দরুদ পড়ি, কিন্তু অন্য সময় দরুদ থেকে দূরে থাকি, তবুও বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

রবিউল আউয়ালে যদি রাসূল -এর চরিত্র নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু নিজের পরিবার ও মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করি, তাহলে তাঁর চরিত্রের শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হলো না।

তাই এ মাসকে একটি সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত—যাতে বছরের বাকি সময়েও সুন্নাহর চর্চা অব্যাহত থাকে।


রবিউল আউয়ালে একটি বাস্তব কর্মপরিকল্পনা

একজন মুসলমান চাইলে এ মাসে নিজের জন্য একটি সহজ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন।

প্রথমত, প্রতিদিন কিছু সময় রাসূল -এর সীরাত পড়া।

দ্বিতীয়ত, নিয়মিত দরুদ শরিফ পাঠ করা।

তৃতীয়ত, প্রতিদিন অন্তত একটি সুন্নাহ নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।

চতুর্থত, পরিবারে সপ্তাহে অন্তত একদিন সীরাত পাঠের ব্যবস্থা করা।

পঞ্চমত, সন্তানদের রাসূল এর চরিত্র ও আদর্শ শেখানো।

ষষ্ঠত, কোনো একটি বদঅভ্যাস পরিত্যাগের সংকল্প করা।

সপ্তমত, কোনো একটি ভালো অভ্যাস গ্রহণ করা।

অষ্টমত, গরিব-অসহায় মানুষের সাহায্য করা।

নবমত, তওবা-ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা।

দশমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন হাদিস বা সীরাতের ঘটনা প্রচার না করা।

এভাবে রবিউল আউয়ালকে আত্মশুদ্ধি ও সুন্নাহর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির মাস হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।


উপসংহার

রাসূলুল্লাহএর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি। কিন্তু এ ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়; বরং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শ গ্রহণ এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করতে হয়।

রবিউল আউয়াল আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময়—আমরা কার উম্মত, আমাদের আদর্শ কে এবং আমাদের জীবন কোন পথে পরিচালিত হওয়া উচিত।

তাই এ মাসে আমাদের উচিত রাসূল -এর জীবন অধ্যয়ন করা, তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা, তাঁর সুন্নাহ শেখা, পরিবারকে সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া, তাঁর চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তিগফার করা।

অন্যদিকে শরিয়তে ভিত্তিহীন কোনো আমলকে দ্বীনের অংশ মনে করা, নির্দিষ্ট কোনো দিনকে শরয়ী ঈদবানানো, রাসূল -এর প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করা, অপচয় করা, কুসংস্কার পোষণ করা এবং যাচাইহীন বা বানোয়াট ঘটনা প্রচার করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

আমরা যেন শুধু রাসূল -এর জন্মের আলোচনা না করি; বরং তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি।আমরা যেন শুধু তাঁর প্রশংসা না করি; বরং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি।আমরা যেন শুধু তাঁর প্রতি ভালোবাসার দাবি না করি; বরং তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করি।রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি ভালোবাসা শুধু রবিউল আউয়ালের বিষয় নয়; বরং একজন মুমিনের পুরো জীবনের অঙ্গীকার।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ -এর প্রকৃত ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআত লাভের তাওফিক দান করুন।

آمِين يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ

লেখক:মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল

মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদদক্ষিণখানঢাকা