খাতামুন নাবিয়্যীন এর শ্রেষ্ঠত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্য

 

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله، خاتم النبيين لا نبي بعده، صلى الله تعالى وبارك وسلم، عليه وعلى آله الأطهار، ورضي الله تعالى عن صحابته الكرام الغر الميامين أجمعين، أما بعد!

আল্লাহ তাআলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অন্যান্য নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম থেকে অনেক বিষয়ে স্বাতন্ত্র্য দান করেছেন। তাঁকে বিশেষভাবে অনেক বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা দান করেছেন।

সেসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে নবুওত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত করেছেন। তাঁকে খাতামুন নাবিয়্যীনহওয়ার মর্যাদা দান করেছেন এবং এই উপাধিতে তাঁকে অভিষিক্ত করে কুরআনে কারীমে ঘোষণা করেছেন।

এ ছাড়া তাঁর নবুওত ও রিসালাতকে ব্যাপক করে দেওয়া হয়েছে। বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও ভূখণ্ডের সীমা অতিক্রম করে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য তাঁকে রাসূল বানানো হয়েছে। সবার ওপর তাঁর আনুগত্য ফরয করা হয়েছে। তাঁকে নবুওত দানের পর দুনিয়াবী সফলতা ও পরকালীন মুক্তিকে তাঁর প্রতি ঈমান ও তাঁর অনুসরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

অন্য অনেক বৈশিষ্ট্য ও ফযীলতের মতো এই দুই বৈশিষ্ট্যও কুরআনে কারীমে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে যেমনিভাবে তাঁর খাতামুন নাবিয়্যীন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তেমনিভাবে তাঁকে রহমাতুল্লিল আলামীন খেতাবও দান করেছেন।
দ্র. সূরা আহযাব (৩৩): ৪০; সূরা আম্বিয়া (২১): ১০৭।

সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূলআল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ঘোষণা

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَّنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

সূরা সাবা (৩৪): ২৮।

কুরআনে কারীমে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য গুণ ও বৈশিষ্ট্যের আলোচনা যদি নাও করা হয়, তবুও শুধু এই দুই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এবংসায়্যিদুন নাস, অন্য শব্দেসায়্যিদু উলদি আদম’সায়্যিদুল মুরসালীনহওয়া প্রমাণিত হয়ে যায়।

এখানে এই বাস্তবতাটি কুরআন কারীম থেকে পেশ না করে হাদীস শরীফ, সাহাবায়ে কেরামের বাণী এবং ইজমা তথা মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যের আলোকে আলোচনা করা হবে।

শরীয়তের যে কোনো দলীলের মাধ্যমে কোনো বিষয় সাব্যস্ত হয়ে গেলে মুমিন সেটাকে সত্য ও সঠিক বলে মেনে নেয়। গোমরাহ লোকদের মতো সে এই হঠকারিতা করে না যে, অমুক দলীলে প্রমাণিত হলে মানব, নতুবা মানব না। কুরআন যেসব বিষয়কে দ্বীন ও শরীয়তের দলীল সাব্যস্ত করেছে, সবগুলোই দলীল। আর দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত সকল বিষয় সত্য ও সঠিক। শরয়ী দলীলের মাধ্যমে প্রমাণিত কোনো বিষয়কে মিথ্যা বলাটাই স্বয়ং মিথ্যা এবং স্পষ্ট ভ্রষ্টতা।

হাদীসে বর্ণিত কিছু বৈশিষ্ট্য

১. তিনি ইমামুন নাবিয়্যীন; সর্বপ্রথম তাঁর সুপারিশের অনুমতি লাভ হবে

শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত নবী-রাসূলের ইমাম। আল্লাহ তাআলা মেরাজের রজনীতে এই বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। সে রাতে মসজিদে আকসায় সকল নবী তাঁর ইকতিদা করে নামায আদায় করেন। বিষয়টি বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়বার এই বিষয়টি প্রকাশ করবেন সমস্ত বনী আদমের উপস্থিতিতে হাশরের ময়দানে।

উবাই ইবনে কাব রা. থেকে শক্তিশালী সনদে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ كُنْتُ إِمَامَ النَّبِيِّينَ وَخَطِيبَهُمْ، وَصَاحِبَ شَفَاعَتِهِمْ غَيْرَ فَخْرٍ.

কিয়ামত দিবসে আমি সকল নবীর ইমাম হব, তাঁদের খতীব হব এবং শাফাআতকারীও হব। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১২৪৫; কিতাবুয যুহদ, ইমাম ইবনুল মুবারক, হাদীস ১৬১৭; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৩২২৯৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৯৪১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪৩১৪; আলমুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস ২৪১; আল আহাদীসুল মুখতারাহ, হাদীস ১১৭৯।

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

أَنَا قَائِدُ الْمُرْسَلِينَ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ وَلَا فَخْرَ.

আমি রাসূলগণের সরদার; কোনো গর্ব নয়। আমি সর্বশেষ নবী; কোনো গর্ব নয়। আমি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই কবুল করা হবে; কোনো গর্ব নয়।

সুনানে দারেমী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৩, ফাতহুল মান্নান, হাদীস ৫১।

২. কিয়ামত দিবসে হামদের ঝাণ্ডা তাঁর হাতে থাকবে

নির্ভরযোগ্য সনদে একাধিক হাদীসে এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আহমাদে মজবুত সনদে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি

إِنِّي لَأَوَّلُ النَّاسِ تَنْشَقُّ الْأَرْضُ عَنْ جُمْجُمَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا فَخْرَ، وَأُعْطَى لِوَاءَ الْحَمْدِ، وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا فَخْرَ.

কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম তাঁর কবর খুলবে, তাঁকে হামদের ঝাণ্ডা প্রদান করা হবে, তিনি কিয়ামতের দিন সকল মানুষের সরদার হবেন এবং সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৪৬৯; সুনানে দারেমী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৪, ফাতহুল মান্নান, হাদীস ৫৫।

আরও দেখুন মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৫৪৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪১৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪৩০৮; দালায়েলুন নুবুওয়াহ, আবু নুআঈম ইস্পাহানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৪, হাদীস ২৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬৪৭৫।

মুসনাদুল বাযযারে মজবুত সনদে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ صَاحِبَكُمْ لَصَاحِبُ لِوَاءِ الْحَمْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، تَحْتَهُ آدَمُ فَمَنْ دُونَهُ.

মুসনাদুল বাযযার, হাদীস ৮১৩৩; শরহু ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, হিবাতুল্লাহ লালিকায়ী, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৭৮৩; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২১৭, হাদীস ১৪০২২।

৩. জান্নাতের দরজা সর্বপ্রথম তাঁর জন্য খোলা হবে

সহীহ মুসলিমে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتَفْتِحُ، فَيَقُولُ الْخَازِنُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَأَقُولُ: مُحَمَّدٌ، فَيَقُولُ: بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَكَ.

কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়াব এবং দরজা খুলতে বলব। জান্নাতের প্রহরী জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কে? আমি বলব, মুহাম্মাদ। তিনি বলবেন, আপনার বিষয়েই আমাকে হুকুম করা হয়েছে; আপনার আগে কারও জন্য যেন জান্নাতের দরজা না খুলি।সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭।

৪. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সায়্যিদুন নাস ও সায়্যিদু উলদি আদম

শাফাআতের দীর্ঘ হাদীসটি মুতাওয়াতির। এর সারকথা হলো, আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকল বনী আদমের সরদার বানিয়েছেন।হাশরের ময়দানের ভয়াবহতায় মানুষ আদম আলাইহিস সালাম থেকে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত বিশেষ বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদার অধিকারী নবীগণের নিকট সুপারিশের জন্য যাবে। কিন্তু সবশেষে তাদেরকে খাতামুন নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসতে হবে।শাফাআতের হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী সহীহ সনদে প্রমাণিত

أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.

কিয়ামত দিবসে আমি সকল মানুষের সরদার হব।সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৭১২।

আর সহীহ সনদে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

أَنَا سَيِّدُ وُلْدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ، وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ.

কিয়ামতের দিন আমি সকল বনী আদমের সরদার হব। সর্বপ্রথম আমার কবর খুলবে। আমি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী হব এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশ কবুল করা হবে।সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৭৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬৭৩।

সকল নবী-রাসূল আদম আলাইহিস সালামের সন্তান। অতএব তিনি যখন সকল আদম সন্তান এবং সমস্ত মানুষের সরদার, তখন তিনি সকল নবী-রাসূলেরও সরদার। তিনিইমামুল আম্বিয়াসায়্যিদুল মুরসালীন

সাহাবায়ে কেরাম থেকে অদ্যাবধি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দুই বৈশিষ্ট্য উম্মতের মাঝে স্বীকৃত।

সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবী আবু হুরায়রা রা. বলেন

سَيِّدُ الْأَنْبِيَاءِ خَمْسَةٌ، وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَيِّدُ الْخَمْسَةِ: نُوحٌ وَإِبْرَاهِيمُ وَمُوسَى وَعِيسَى وَمُحَمَّدٌ صَلَوَاتُ اللهِ وَسَلَامُهُ.

নবীগণের সরদার পাঁচজন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পাঁচজনের মধ্যেও সরদার—নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালাম।মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৪০০৭।

মহান সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. দরূদ শরীফের শব্দ এভাবে শেখাতেন

اللّٰهُمَّ اجْعَلْ صَلَوَاتِكَ وَرَحْمَتَكَ وَبَرَكَتَكَ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَإِمَامِ الْمُتَّقِينَ، وَخَاتَمِ النَّبِيِّينَ مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ إِمَامِ الْخَيْرِ، وَقَائِدِ الْخَيْرِ وَرَسُولِ الرَّحْمَةِ...

মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৩, হাদীস ৩১০৯; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১১৫, হাদীস ৮৫৯৪; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৪৫৩।

আকীদার নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে নবী -এর শ্রেষ্ঠত্ব

যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বৈশিষ্ট্য শরীয়তের দলীল দ্বারা প্রমাণিত এবং তা ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেজন্য এ বিষয়টি মুসলমানদের আকীদার কিতাবগুলোতেও বিবৃত হয়েছে।

ইসলামী আকীদার নির্ভরযোগ্য ও সর্বস্বীকৃত গ্রন্থআলআকীদাতুত তহাবিয়্যাহ-তে হানাফী ইমাম ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর সূত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদাসমূহ আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলা হয়েছে

وَأَنَّهُ خَاتَمُ الْأَنْبِيَاءِ وَإِمَامُ الْأَتْقِيَاءِ وَسَيِّدُ الْمُرْسَلِينَ وَحَبِيبُ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

তিনি সর্বশেষ নবী, মুত্তাকীদের ইমাম, রাসূলগণের সরদার এবং রাব্বুল আলামীনের বন্ধু।ইমাম বায়হাকী রাহ.শুআবুল ঈমানগ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্যের আলোচনায় লেখেন

وَمِنْهَا أَنَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ سَيِّدَ الْمُرْسَلِينَ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সায়্যিদুল মুরসালীন নবীগণের সরদার।

শুআবুল ঈমান, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৮।ইমাম আহমাদ রাহ.-এর বর্ণনা অনুযায়ী আকীদা সংকলন করেছেন ফকীহ আবুল ফযল তামীমী। তাতে রয়েছে

إِنَّ بَعْضَ النَّبِيِّينَ أَفْضَلُ مِنْ بَعْضٍ، وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْضَلُهُمْ.

কতক নবী কতক নবীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন তাঁদের মাঝে শ্রেষ্ঠ।

তবাকাতুল হানাবিলা, কাযী ইবনে আবী ইয়ালা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩।

বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও ফকীহ আবদুল গনী মাকদিসী ইসলামী আকীদার কিতাবআলইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ-এ লেখেন

وَنَعْتَقِدُ أَنَّ مُحَمَّدًا الْمُصْطَفَى خَيْرُ الْخَلَائِقِ، وَأَفْضَلُهُمْ، وَأَكْرَمُهُمْ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَأَعْلَاهُمْ دَرَجَةً، وَأَقْرَبُهُمْ إِلَى اللهِ وَسِيلَةً.

আলইকতিসাদ, পৃষ্ঠা ১৯৬।

অতএব, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সায়্যিদুল মুরসালীন এবং সর্বোত্তম সৃষ্টির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের স্বীকৃত আকীদা।

হাদীস অস্বীকারের ফিতনা থেকে সতর্কতা

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যক্তি নিজেকে গবেষক পরিচয় দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইমামুল আম্বিয়া ও সায়্যিদুল মুরসালীন হওয়ার মতো প্রমাণিত বৈশিষ্ট্যগুলো অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। অথচ এসব বিষয় কুরআন, হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য এবং আকীদার নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণিত।

হাদীস শরীফ দ্বীন ও শরীয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলীল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হাদীস ওহীর একটি প্রকার। তা কখনো কুরআন পরিপন্থী হতে পারে না। সুতরাং নির্ভরযোগ্য হাদীসে প্রমাণিত কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার।

দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে বিভিন্ন শিরোনামে হাদীস অস্বীকারের ফিতনা বিস্তার লাভ করছে। আল্লাহ তাআলা উম্মতকে সব ধরনের ফিতনা ও গোমরাহী থেকে হেফাজত করুন।

ইলম, তাকওয়া, আমানতদারি ও দ্বীনদারি ছাড়া নিজেকে গবেষক মনে করার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—মানুষ অজ্ঞাতসারে গোমরাহ হয়ে যেতে পারে। অথচ সে নিজেকে সবচেয়ে বড় হেদায়েতপ্রাপ্ত ও জ্ঞানী মনে করে এবং অন্য সবাইকে গোমরাহ ও মূর্খ মনে করতে থাকে।

কবি যথার্থই বলেছেন

 

آں کس کہ نداند ونداند کہ نداند    در جہل مرکب ابد الدہر بماند

آں کس کہ نداند ونخواہد کہ بداند    حیف است چنیں جانوری زندہ بماند

কবিতার মর্ম হলো যে জানে না এবং সে যে জানে না, তাও জানে না; সে আজীবন জাহলে মুরাক্কাব-এর মধ্যে থেকে যাবে।

আর যে জানে না এবং জানতেও চায় না তার অজ্ঞতা দূর করার সুযোগ অত্যন্ত সংকীর্ণ।

গোমরাহীর শিকার কেউ যখন নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে অথবা অন্তত এটুকু অনুভব করে যে, সম্ভবত আমি ভুলের মধ্যে আছি, তখন সে কোনো আলেমে দ্বীনের কাছ থেকে ইলম হাসিলের চেষ্টা করতে পারে এবং তার সংশয়গুলোর সমাধান খুঁজতে পারে। কিন্তু আলেমদেরই যদি সে মুনাফিক মনে করে বসে থাকে, তাহলে তার সংশোধনের পথ আরও কঠিন হয়ে যায়।

উপসংহার

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনিখাতামুন নাবিয়্যীন, ইমামুল আম্বিয়া, সায়্যিদুল মুরসালীন, সায়্যিদুন নাস এবং সায়্যিদু উলদি আদমতাঁর হাতে কিয়ামতের দিন হামদের ঝাণ্ডা থাকবে, সর্বপ্রথম তাঁর শাফাআত কবুল হবে এবং সর্বপ্রথম তাঁর জন্য জান্নাতের দরজা খোলা হবে।

এসব বৈশিষ্ট্য কুরআন, হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য, ইজমা এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নির্ভরযোগ্য আকীদার গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খাতামুন নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুবারক সুন্নতের অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। তাঁর ওপর অবতীর্ণ সর্বশেষ হেদায়েতের গ্রন্থ কুরআন কারীমে তাদাব্বুর করার, এর হেদায়েতসমূহ মনেপ্রাণে গ্রহণ করার এবং তার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

هذا، وصلى الله تعالى وسلم على سيدنا ومولانا محمد خاتم النبيين، وسيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، والحمد لله رب العالمين.

 

মুফতী আব্দুল মালেক দাঃবাঃ 

মারকাযুদ দাওয়াহ ঢাকা

খতিব বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ বাংলাদেশ