بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله، وسلام على عباده الذين اصطفى، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله، أما بعد:
নামায” একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। ঈমানের পর যে ফরয ইবাদতের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা হলো সালাত। কুরআন ও সুন্নাহয় নামায কায়েমের নির্দেশ বারবার এসেছে। আর নামায কায়েম বলতে শুধু নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গভঙ্গি সম্পন্ন করাকে বোঝায় না; বরং নামাযের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত, আদব ও খুশু-খুযুর প্রতি যথাযথ যত্ন রেখে তা আদায় করাই এর প্রকৃত দাবি।
নামাযের গুরুত্বপূর্ণ আরকানের মধ্যে রয়েছে কিয়াম, কিরাত, রুকু, সিজদা ও কাদা। স্বাভাবিক অবস্থায় এগুলো যথাযথভাবে আদায় করাই শরীয়তের বিধান। তবে মানুষ সবসময় একই শারীরিক অবস্থায় থাকে না। অসুস্থতা, দুর্বলতা কিংবা কোনো বাস্তব অক্ষমতার কারণে কেউ যদি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে নামায আদায় করতে না পারে, শরীয়ত তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে। এই বিকল্প ব্যবস্থারই একটি হলো প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বসে নামায আদায় করা।
কিন্তু বর্তমানে অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রকৃত ওযর না থাকা সত্ত্বেও শুধু সামান্য ব্যথা, বয়সজনিত দুর্বলতা কিংবা আরামের জন্য চেয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে যে রুখসত শরীয়ত প্রকৃত প্রয়োজনের জন্য দিয়েছে, তা অনেকের কাছে যেন নামাযের সাধারণ পদ্ধতিতে পরিণত হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সক্ষমতা ও অক্ষমতার শরয়ী সীমারেখা জানা জরুরি।
নামাযের স্বাভাবিক পদ্ধতি কেন পরিবর্তন করা যাবে না
নামাযের মূল নিয়ম হলো- যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম, সে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবে; যে রুকু ও সিজদা করতে পারে, সে যথানিয়মে রুকু-সিজদা করবে। বিশেষ করে সিজদা নামাযের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ، عَلَى الجَبْهَةِ وَأَشَارَ بِيَدِهِ عَلَى أَنْفِهِ وَاليَدَيْنِ وَالرُّكْبَتَيْنِ، وَأَطْرَافِ القَدَمَيْنِ.
আমাকে সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কপাল ও নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলের ওপর। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮১২)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সক্ষম ব্যক্তির সিজদা স্বাভাবিক নিয়মেই হতে হবে। তবে কেউ যদি বাস্তব ওযরের কারণে এভাবে সিজদা করতে না পারে, তার জন্য শরীয়ত বিকল্প পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। সুতরাং চেয়ারকে মূল পদ্ধতি না ভেবে প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
অক্ষমতার ক্ষেত্রে শরীয়তের নীতি-
অসুস্থ ব্যক্তির নামায সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর একটি মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে। ইমরান ইবনে হুসাইন রা. বলেন, তিনি অসুস্থ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ -এর কাছে নামাযের পদ্ধতি জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন-
صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ.
দাঁড়িয়ে নামায পড়ো। যদি দাঁড়াতে সক্ষম না হও, বসে পড়ো। বসতেও সক্ষম না হলে কাত হয়ে শুয়ে পড়ো। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১১৭)
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, রাসূল প্রথমে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর যদি সক্ষম না হও বলে বসার অনুমতি দিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা বসে নামায পড়ার কারণ নয়; বরং দাঁড়ানোর বাস্তব অক্ষমতা থাকতে হবে।
ইমাম ইবনে আবদুল বার রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন
-هَذَا يُبَيِّنُ لَكَ أَنَّ الْقِيَامَ لَا يَسْقُطُ فَرْضُهُ إِلَّا بِعَدَمِ الِاسْتِطَاعَةِ
অর্থাৎ সক্ষমতা থাকা পর্যন্ত কিয়ামের ফরয বহাল থাকবে। যখন কিয়াম করার সামর্থ্য
থাকবে না, তখন তা পরিত্যাগের সুযোগ হবে। একই নিয়ম
নামাযের অন্যান্য ফরযের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
-আততামহীদ, ১/১৩৫
এ থেকে একটি মৌলিক কথা বোঝা যায়-একটি আমল করতে অক্ষম হওয়ার কারণে অন্য সব আমল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যায় না। যে অংশ যতটুকু করা সম্ভব, ততটুকুই করতে হবে।
সামান্য অসুস্থতা কি শরয়ী ওযর?
কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলেই সে শরীয়তের দৃষ্টিতে মাযূর হয়ে যায় না। বরং অসুস্থতার প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে, যাতে স্বাভাবিকভাবে নামায আদায় করলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা সংশ্লিষ্ট রুকন আদায় করা বাস্তবভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মায়মূন ইবনে মেহরান রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, অসুস্থ ব্যক্তি কখন বসে নামায পড়বে? তিনি বলেন-
إِذَا كَانَ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَقُومَ لِدُنْيَاهُ فَلْيُصَلِّ قَاعِدًا.
যখন সে তার দুনিয়াবি প্রয়োজনীয় কাজের জন্যও দাঁড়াতে সক্ষম হয় না, তখন বসে নামায পড়বে।
-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস: ৪১২৬
হানাফি ফিকহের আল-মুহীতুল বুরহানী-তেও
বলা হয়েছে, দাঁড়ালে রোগের অবনতি হওয়া, প্রচণ্ড
ব্যথা সৃষ্টি হওয়া কিংবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা অক্ষমতার
অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
-আল-মুহীতুল বুরহানী, ৩/২৬
অন্যদিকে শুধু সামান্য ব্যথা, হালকা দুর্বলতা কিংবা কিছুটা কষ্ট হওয়াকে এমন অক্ষমতা বলা যাবে না, যার কারণে কিয়াম পরিত্যাগ করা বৈধ হয়ে যাবে।
রোগের ক্ষতির আশঙ্কা কীভাবে নির্ধারিত হবে?
কেউ দাঁড়ালে তার রোগ বেড়ে যাবে অথবা সুস্থ হতে সময় বেশি লাগবে-এমন সিদ্ধান্ত নিছক অনুমানের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত নয়। ইমাম ইবনুল হুমাম রহ. এ বিষয়ে বলেন-
وتحقق الحرج منوط بزيادة المرض أو إبطاء البرء أو فساد عضو، ثم معرفة ذلك باجتهاد المريض، والاجتهاد غير مجرد الوهم، بل هو غلبة الظن عن أمارة أو تجربة أو بإخبار طبيب مسلم غير ظاهر الفسق.
অর্থাৎ রোগ বৃদ্ধি, সুস্থ হতে বিলম্ব কিংবা শরীরের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাস্তব ভিত্তির ওপর নির্ণয় করতে হবে। তা হতে পারে পূর্ব অভিজ্ঞতা, দৃশ্যমান আলামত অথবা দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে। (ফাতহুল কাদীর, ২/৩৫১)
ইবনে আবেদীন শামী রহ.ও পূর্ব অভিজ্ঞতা কিংবা দক্ষ মুসলিম চিকিৎসকের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা নির্ধারণের কথা উল্লেখ করেছেন। (রদ্দুল মুহতার, ২/৯৬)
তাই নিজের সুবিধামতো দাঁড়ালে হয়তো সমস্যা হবে এমন ধারণা করে চেয়ার নেওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়। বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছ থেকেও মাসআলা জেনে নিতে হবে।
কোন অবস্থায় চেয়ার ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়
Øপূর্ণ সক্ষম ব্যক্তির জন্য
যে ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে মাযূর নন এবং স্বাভাবিকভাবে কিয়াম, রুকু ও সিজদা করতে সক্ষম, তার জন্য বসে মাটিতে হোক কিংবা চেয়ারে নামায আদায় করার সুযোগ নেই। শুধু সামনে চেয়ার রাখা আছে কিংবা বসে নামায পড়তে সুবিধা হচ্ছে এটি কোনো শরয়ী ওযর নয়। এভাবে নামায আদায় করলে তা সহীহ হবে না।
Øনিছক আরাম বা সামান্য কষ্টের কারণে
শুধু আরাম পাওয়ার জন্য, শরীরে সামান্য কষ্ট হওয়ার কারণে কিংবা সামান্য অসুবিধাকে অজুহাত বানিয়ে চেয়ার গ্রহণ করা বৈধ নয়। এমনকি একই কারণে মাটিতে বসে নামায পড়লেও তা যথাযথ হবে না। নামাযের কোনো ফরয রুকন কেবল স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বাদ দেওয়ার অনুমতি শরীয়ত দেয়নি।
Øসহনীয় ব্যথা থাকলে
পা, কোমর বা শরীরের কোনো স্থানে ব্যথা থাকলেও যদি সেই ব্যথা এমন পর্যায়ের না হয় যে দাঁড়িয়ে নামায পড়া অসহনীয় হয়ে পড়ে, অথবা দাঁড়িয়ে নামায পড়লে রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে—তাহলে চেয়ার ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ ব্যথা থাকা মাত্রই রুখসত পাওয়া যায় না; বরং ব্যথার মাত্রা ও তার বাস্তব প্রভাব বিবেচ্য।
Øসামান্য অসুস্থতার অজুহাতে
কেউ অসুস্থ হলেও যদি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে কিয়াম, রুকু ও সিজদা করতে পারেন এবং এভাবে নামায আদায় করলে রোগের অবনতি বা আরোগ্য লাভে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে সেই অসুস্থতা চেয়ার ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ওযর নয়। এ অবস্থায় স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই নামায আদায় করতে হবে।
Øপ্রচলিত ভঙ্গিতে বসতে না পারলেও মাটিতে বসতে পারলে
কেউ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারেন এবং মাটিতে সিজদাও করতে পারেন, কিন্তু তাশাহহুদের প্রচলিত ভঙ্গিতে বসতে পারেন না এ কারণে চেয়ার নেওয়া যাবে না। তিনি যেভাবে সম্ভব মাটিতে বসবেন পা ছড়িয়ে, চারজানু হয়ে কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত ভঙ্গিতে এবং সেখানেই কাদা আদায় করবেন। কারণ সুন্নত ভঙ্গিতে বসতে না পারা মানেই মাটিতে বসার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা নয়। এমন ব্যক্তি চেয়ার নিয়ে ইশারায় সিজদা করলে তার নামায সহীহ হবে না।
Øদাঁড়াতে না পারলেও মাটিতে বসে সিজদা করতে সক্ষম হলে
যে ব্যক্তি কিয়াম করতে পারেন না, কিন্তু মাটিতে বা সমতলে কোনোভাবে বসতে পারেন এবং সেখানেই যথাযথভাবে সিজদা করতে সক্ষম, তার জন্য শুরু থেকেই মাটিতে বসে নামায আদায় করা জরুরি। চেয়ার ব্যবহার করে নামায শুরু করার পর মাটিতে সিজদা ও কাদার জন্য নামতে না পারা শরয়ী সমাধান নয়। কারণ তিনি যখন মাটিতেই বসে সিজদার ফরয আদায় করতে সক্ষম, তখন চেয়ার গ্রহণ করে সেই সুযোগ নষ্ট করা ঠিক হবে না।
Øদাঁড়ানো ও বসার মধ্যে স্থানান্তর করতে না পারলেও
কেউ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারেন, মাটিতে বসতে পারেন এবং মাটিতে সিজদাও করতে পারেন; কিন্তু দাঁড়ানো থেকে বসা কিংবা বসা থেকে আবার দাঁড়ানোর সময় তার এমন সমস্যা হয় যে এভাবে অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয় তবুও সরাসরি চেয়ার গ্রহণ করা জরুরি নয়। বরং যে পদ্ধতিতে মাটিতে বসে পুরো নামায আদায় করে যথাযথভাবে সিজদা করা সম্ভব, সে পদ্ধতিই গ্রহণ করবে। কারণ লক্ষ্য হলো শরীয়তসম্মতভাবে যত বেশি ফরয ও রুকন আদায় করা সম্ভব, তা যথাযথভাবে আদায় করা।
দাঁড়ানো সম্ভব না হলেও মাটিতে বসা সম্ভব হলে
কেউ যদি দাঁড়িয়ে নামায পড়তে না পারেন, কিন্তু মাটিতে বসতে এবং সিজদা করতে পারেন, তাহলে তার জন্য মাটিতে বসেই নামায আদায় করা উচিত। চেয়ার ব্যবহার করে সিজদার পরিবর্তে ইশারা করার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে মাটিতে সিজদা করতে সক্ষম।
এখানে মূলনীতি হলো- যে বিকল্প পদ্ধতিতে শরীয়তের মূল রুকন আদায় করা সম্ভব, তার উপস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরও দূরের বিকল্প গ্রহণ করা যাবে না।
কিয়াম ও সিজদার সক্ষমতা ভিন্ন হলে
কেউ দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারেন এবং রুকুও করতে পারেন, কিন্তু মাটিতে সিজদা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ফিকহবিদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী এমন ব্যক্তি বসে ইশারায় নামায আদায় করতে পারেন। তবে ইমাম যুফার রহ.-এর মত এবং অন্যান্য ইমামদের মত হলো- যদি দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকে, তাহলে কিয়াম বাদ দেওয়া যাবে না। বরং দাঁড়িয়ে নামায পড়বে এবং সিজদা সম্ভব না হলে ইশারায় সিজদা করবে।
মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী সাহেব দামাত বারাকাতুহুম তাঁর একটি ফতোয়াতে এই মাসআলার উপর বিশদ আলোচনা করেছেন এবং ফাতহুল কাদীর খ. ১ পৃ. ৪৬০, আননাহরুল ফায়েক খ. ১ পৃ. ৩৩৭ এবং ‘ইলাউস সুনান খ. ৭ পৃ. ২০৩ ইত্যাদির বরাতে দলীলের বিচারে এ মতকে শক্তিশালী বলেছেন। কারণ কিয়াম নামাযের একটি স্বতন্ত্র ফরয; শুধু সিজদা করতে না পারার কারণে কিয়ামও পরিত্যাগ করতে হবে- এ কথা অপরিহার্য নয়।
তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে, কেউ যদি হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুসরণ করে পুরো নামায বসে ইশারায় আদায় করেন, তাকে সরাসরি নামায ফাসেদ হয়েছে বলা হবে না। কারণ এটি ইজতিহাদনির্ভর একটি ফিকহি মত এবং এরও কিছু দলীল রয়েছে।
কখন নামাযের কিছু অংশ চেয়ারে পড়া যেতে পারে?
যদি কোনো ব্যক্তি দাঁড়াতে পারেন, কিন্তু মাটিতে বসতে পারেন না, তাহলে তিনি দাঁড়িয়ে নামায শুরু করবেন। স্বাভাবিকভাবে রুকু করতে পারলে রুকুও করবেন। এরপর যেখানে বসার প্রয়োজন হবে, সেখানে চেয়ার ব্যবহার করতে পারবেন।
আর যে ব্যক্তি কিয়াম ও রুকু করতে সক্ষম এবং সরাসরি যমিনে বা সমতলে কোনো না কোনোভাবে বসতেও পারে, কিন্তু যমিনে সিজদা করতে পারে না, সে তো কিয়াম ও রুকু যথানিয়মেই আদায় করবে। এরপর যমিনে বসে যাবে। ইশারায় সিজদা আদায় করবে এবং তাশাহহুদ যমিনে বসেই আদায় করবে। এমন ব্যক্তি যেহেতু মাটিতে বা সমতলে বসতে পারে তাই তার জন্য যমিনে বসে নামাজ পড়ার পরীবর্তে চেয়ারে বসা মাকরূহ তাহরীমী। যা পরিহার করা কর্তব্য।
পুরো নামায কখন চেয়ারে পড়া যাবে?
যে ব্যক্তি কিয়াম করতে পারেন না, রুকু-সিজদা করতে পারেন না এবং মাটিতে বসেও নামাযের প্রয়োজনীয় অঙ্গগুলো যথাযথভাবে আদায় করতে পারেন না- শুধু চেয়ারই যার জন্য বাস্তবসম্মত উপায়, তার জন্য পুরো নামায চেয়ারে বসে আদায় করা বৈধ হতে পারে।
তবে এ অবস্থাও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ শরীয়তের রুখসত প্রকৃত ওযরের ওপর নির্ভরশীল। নিজের অবস্থা সম্পর্কে সংশয় থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে নিজের শারীরিক পরিস্থিতি বিস্তারিত জানিয়ে মাসআলা জেনে নেওয়া উচিত।নতুবা নিজে নিজে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে কখনো নামায নাও হতে পারে।
মোটকথা হলো : ১. যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে অক্ষম, তার জন্য প্রথম বিকল্প হলো মাটিতে বসে নামায আদায় করা।২. যে ব্যক্তি রুকু-সিজদা করতে সক্ষম নন, তার জন্য শরীয়ত ইশারার মাধ্যমে রুকু-সিজদা আদায়ের সুযোগ রেখেছে। ৩. যে ব্যক্তি মাটিতে বসতে অক্ষম, তার জন্য মাটিতে কা‘দা করার পরিবর্তে চেয়ারে বসার অবকাশ রয়েছে। ৪. অতএব, শুধু দাঁড়াতে অক্ষম হওয়া কিংবা রুকু-সিজদা করতে না পারার কারণে সরাসরি চেয়ার ব্যবহার করা যাবে না; বরং মাটিতে বসে নামায আদায় করা সম্ভব কি না- প্রথমে তা বিবেচনা করতে হবে। ৫. অর্থাৎ, চেয়ারের রুখসত মূলত তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন মাটিতে বসেও নামাযের প্রয়োজনীয় আমল যথাযথভাবে আদায় করা সম্ভব নয়।
চেয়ারে বসে ইশারায় সিজদার নিয়ম
যে ব্যক্তি কিয়াম, রুকু, সিজদা ও মাটিতে বসা- কোনোটিই করতে পারেন না এবং বাস্তবভাবে শুধু চেয়ার ব্যবহার করেই নামায আদায় করতে পারেন, তার জন্য চেয়ার শরয়ী বিকল্প হতে পারে। তিনি ইশারায় সিজদা করবেন। রুকুর সময় মাথা যতটুকু ঝোঁকাবেন, সিজদার সময় তার চেয়ে কিছুটা বেশি ঝোঁকাবেন। সামনে টেবিল, তখতা বা উঁচু বস্তু রেখে তার ওপর কপাল ঠেকানোকে সিজদার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই।কেননা সিজদার জন্য সামনে টেবিল বা উঁচু বস্তু রাখা এবং তাতে সিজদা করার কোনো বিধান হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। অবশ্য এর দ্বারা যেহেতু ইশারার কাজ হয়ে যায় ফলে নামায আদায় হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, ইশারায় সিজদা আদায় করার নিয়ম হল, রুকুর জন্য মাথা যতটুকু ঝোঁকাবে সিজদার জন্য তার চেয়ে একটু বেশি ঝোঁকানো। ইশারার সময় হাত হাঁটুর ওপর রাখাই যথাযথ পদ্ধতি।
আখেরী কথা
চেয়ারে নামায পড়ার বিষয়টি মূলত সুবিধা ও অসুবিধার নয়; এটি সক্ষমতা ও শরয়ী অক্ষমতার বিষয়। তাই প্রত্যেক মুসল্লীর উচিত নিজের শারীরিক অবস্থাকে শরীয়তের নির্ধারিত মানদণ্ডে বিচার করা।
যে ব্যক্তি দাঁড়াতে পারেন, তিনি দাঁড়াবেন। যে দাঁড়াতে পারেন না কিন্তু মাটিতে বসে সিজদা করতে পারেন, তিনি মাটিতে বসবেন। যে মাটিতে সিজদা করতে পারেন না, তার জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ইশারার বিধান আসবে। আর যে ব্যক্তি কিয়াম, রুকু, সিজদা ও মাটিতে বসা- কোনোটিই করতে পারেন না এবং বাস্তবভাবে শুধু চেয়ার ব্যবহার করেই নামায আদায় করতে পারেন, তার জন্য চেয়ার শরয়ী বিকল্প হতে পারে।
সুতরাং চেয়ারকে নামাযের সহজ ও সাধারণ পদ্ধতি না বানিয়ে শরীয়ত যে সীমারেখায় তা অনুমোদন করেছে, সেখানেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। নিজের সুবিধার জন্য রুখসত গ্রহণ না করে প্রকৃত প্রয়োজনের সময় শরীয়তের দেওয়া ছাড় গ্রহণ করাই সঠিক ভারসাম্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নামাযের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করার, শরীয়তের বিধান সঠিকভাবে বোঝার এবং রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
মুফতি মুয়াজ বিন ইয়াহইয়া
ফারেগ শেখ জানূরুদ্দীন র. দারুল কুরআন মাদরাসা, (চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা) ঢাকা-১২১৯
সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া হুসাইনিয়া আসা'দুল উলূম, দক্ষিণখান (উত্তরা), ঢাকা-১২৩০