════════════════
মুফতি মুহাম্মদ খাইরুল ইসলাম হাফিঃ
কুরআন মাজীদে যাকাতের নির্দিষ্ট খাত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই খাতগুলো ছাড়া অন্য কোথাও যাকাত প্রদান জায়েয নয়। অন্য খাতে প্রদান করলে যাকাত আদায় হবে না। ইরশাদ হয়েছে—
اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ ؕ فَرِیْضَةً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیْمٌ حَكِیْمٌ
“যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত উসূলকারী কর্মচারী, যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (জিহাদকারীদের জন্য) এবং মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবা : ৬০)
এই আয়াতে যাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো—
১. ফকির।
২. মিসকিন।
৩. আমিলীন—(ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক যাকাত উসুলের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ)।
৪. মু’আল্লাফাতুল কুলুব—অর্থাৎ দুর্বল ঈমানওয়ালা কোনো নওমুসলিম, যার মনোরঞ্জন উদ্দেশ্য।
তবে এ বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। তাই বর্তমানে কোন ধনী নব-মুসলিমকে যাকাত প্রদান জায়েয নয়। হিদায়া- ১/১৮৪, মাআরিফুল কুরআন-৪/১৭১, তাফসীরে মাযহারী-৪/২৩৫
৫. গারিমীন—(ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি)।
৬. রিকাব—(দাসমুক্তির খাত)। অর্থাৎ দাসমুক্তির জন্য। তবে যেহেতু বর্তমানে দাসপ্রথা নেই। তাই এ খাতটিতে এখন যাকাত প্রদান করা যাবে না।
৭. ফি সাবীলিল্লাহ—(আল্লাহর পথে জিহাদকারী)।
৮. ইবনুস সাবীল—(নিঃস্ব মুসাফির)।
এই আট খাতের বাইরে কোনো খাতে যাকাতের নিয়তে সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিলেও যাকাত আদায় হবে না। আবু বকর রাযি. ওমর রাযি.-এর প্রতি ওসিয়তে বলেন,
مَنْ أَدّى الزَّكَاةَ إلَى غَيْرِ أَهْلِهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ زَكَاةٌ، وَلَوْ تَصَدَّقَ بِالدُّنْيَا جَمِيعِهَا.
‘যে ব্যক্তি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত নয় এমন কাউকে যাকাত প্রদান করল তা গ্রহণযোগ্য হবে না; যদিও সে দুনিয়ার সকল সম্পদ দান করে দেয়।’ আলমুহাল্লা বিল আসার, ইবনে হাযাম ৪/২৭৬, বর্ণনা ৭২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, বর্ণনা ৬৯৩৪
যাকাত মূলত ব্যক্তির অধিকার। তাই যাকাত এমন ব্যক্তিকেই প্রদান করতে হবে, যে শরিয়ত নির্ধারিত খাতের অন্তর্ভুক্ত। কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, দল বা সংগঠনকে সরাসরি যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। এ কারণে ইসলাম কায়েমের নামে, বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যাকাত সংগ্রহ বা ব্যয় করা শরিয়তসম্মত নয়। একইভাবে সাধারণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প—যেমন রাস্তা নির্মাণ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ইত্যাদি—যাকাতের নির্ধারিত খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ঐ কাজগুলো হয়ত রাষ্ট্র আঞ্জাম দেবে, নতুবা মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান থেকে তার ব্যবস্থা করা হবে।
যাকাতের অর্থ দিয়ে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও জলাধার-কূপ ইত্যাদি খনন জায়েয নয়। এ ধরনের জনকল্যাণধর্মী কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করলে যাকাত যে আদায় হবে না। এবিষয়ে মুজতাহিদ ইমাম ও ফকীহগণের মতামত উল্লেখ করা হল,
দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর মুজতাহিদ ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রহ. (জন্ম : ১৫৭ হি.-মৃত্যু : ২২৪ হি.) বলেন, ‘মৃতের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ, মাইয়েতের কাফনের খরচ, মসজিদ নির্মাণ ও খাল খনন, এজাতীয় পুণ্যের কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হলে যাকাত আদায় হবে না। এ বিষয়ে সুফিয়ান রাহ. এবং ইরাক ও অন্যান্য অঞ্চলের ফকীহগণ একমত। কেননা এসকল খাত যাকাতের ৮টি খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ কিতাবুল আমওয়াল, বর্ণনা ১৯৮০
ইমাম কাসানী রহ. বলেন, ‘যাকাতের অর্থে জনকল্যাণমূলক কাজ করা, যেমন মসজিদ নির্মাণ, সরাইখানা ও জলাধার নির্মাণ এবং পোল মেরামত ও মৃতের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা জায়েয নয়।’ বাদায়েউস সানায়ে ২/১৪২
ইবনে কুদামা রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা যেসব খাতের কথা উল্লেখ করেননি সেসব খাতে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। যেমন মসজিদ নির্মাণ, পুল নির্মাণ, জলাধার তৈরি করা, রাস্তা মেরামত ও বাঁধ নির্মাণ কিংবা মৃতের কাফনের ব্যবস্থা করা ...এ জাতীয় সওয়াবের কাজ, যাকাতের খাতের আলোচনায় আল্লাহ তাআলা যার উল্লেখ করেননি।’ আল-মুগনী, ইবনে কুদামা ৪/১২৫
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান, ফাউন্ডেশন বা সংগঠন যদি এমন হয় যে, তারা মানুষের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ করে এবং তা যথাযথভাবে শরিয়ত নির্ধারিত খাত—বিশেষত ফকির ও মিসকিনদের মাঝে—বণ্টন করে দেয়, তাহলে তাদের কাছে যাকাত প্রদান করা বৈধ হবে।
শর্ত হলো—যাকাতের অর্থ তারা অন্য কোনো কাজে ব্যয় করবে না; যেমন গাড়ি ভাড়া, বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া বা প্রশাসনিক খরচ ইত্যাদিতে ব্যবহার করা যাবে না। বরং সম্পূর্ণ অর্থই যাকাতের উপযুক্ত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি মাধ্যম (ওয়াসিলা) হিসেবে কাজ করবে, যাতে যাকাতের অর্থ সঠিক ও শরিয়তসম্মত খাতে পৌঁছে যায়।
আর যদি কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান যাকাতের মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে সঠিক ইলম না রাখে এবং যাকাতের অর্থ যথেচ্ছভাবে ব্যয় করে—যেমন রাস্তার খরচ, অফিস বা বাসা ভাড়া, কর্মীদের বেতন-ভাতা কিংবা দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায়—তাহলে তাদেরকে যাকাত দেওয়া বৈধ হবে না। তাদেরকে প্রদান করলে যাকাত আদায় হবে না। তেমনিভাবে দ্বীন কায়েমের শ্লোগান থাকলেও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে তাদের দলীয় কার্যক্রম, সংগঠন পরিচালনা বা প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের জন্য যাকাত প্রদান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
তাখাসুস্স ফিল ফিকহ শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
সম্মানিত মুফতি ও সদস্য, ফতোয়া বোর্ড, ফাতাওয়া ও মাসায়েল
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা