শাইখ মাহবুবুর রহমান আরেফী হাফিযাহুল্লাহ

 

বিবাহের মজলিসসমূহে আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত খেজুর ছিটানো হয়। আর এটিকে বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত মনে করা হয়। প্রশ্ন হলো বাস্তবেই কি আকদের মজলিসে খেজুর ছিটানো সুন্নত? এব্যাপারে প্রথম কথা হলো, আকদের মজলিসে খেজুর বা যেকোন মিষ্টি জাতীয় বস্তু বিতরণের ক্ষেত্রে শরিয়তের পক্ষ থেকে কোন বিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়নি। তাই আকদের অনুষ্ঠানে মিষ্টি জাতীয় যেকোন বস্তু বিতরণ করার অবকাশ রয়েছে।

মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবায় (১১/৯৯) এসেছে, বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাহ. এবং প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হযরত শাবী রাহ. আকদের মজলিসে খেজুর বা মিষ্টান্ন জাতীয় বস্তু ছিটানোর অনুমতি দিতেন। তেমনিভাবে ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেন, বিবাহের অনুষ্ঠানে মিষ্টান্ন, আখরোট, বাদাম ছিটানোর ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা নেই। মাবসুতে সারাখসি: ৩০/১৬৭

তবে মনে রাখতে হবে খেজুর ছিটানো সুন্নত নয়। বরং আকদের অনুষ্ঠান যদি মসজিদে হয়, তাহলে সেখানে খেজুর ছিটানো থেকে অবশ্যই বিরত থাকা উচিত। কেননা এতে হৈ চৈ ও কাড়াকাড়ির কারণে মসজিদের আদব ক্ষুণ্ন হওয়ার এবং মসজিদ ময়লাযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরং মসজিদের আদব ক্ষুণ্ন হওয়া ও ময়লাযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ছিটানো ছাড়া স্বাভাবিকভাবেও মসজিদে মিষ্টি ইত্যাদি বিতরণ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা উচিত।

প্রশ্ন হলো, খেজুর ছিটানো সুন্নত হওয়ার ধারণাটি কিভাবে তৈরী হয়েছে? হ্যাঁ, মূলত কয়েকটি রেওয়ায়েতের কারণেই এমন ধারণা তৈরী হয়েছে। কিন্তু সেগুলো নিতান্তই দুর্বল বা ভিত্তিহীন। নিচে আমরা এসকল রেওয়ায়েত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পেশ করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।

এক. বায়হাকি রহ. তাঁর সুনানে কুবরায় (৭/২৮৭) বর্ণনা করেন, আয়েশা রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁর কোন এক স্ত্রীকে বিবাহ করেন, তখন তার সামনে খেজুর ছিটানো হয়।

এই রেওয়ায়েতের সমস্যা হলো, এতে একজন বর্ণনাকারী হলেন, হাসান ইবনে আমর ইবনে সাইফ আল-আবাদি। তিনি নিতান্ত দুর্বল ও পরিত্যাজ্য একজন রাবি। বিরল বিরল হাদিস বর্ণনা করা তার অভ্যাস ছিল। যেমনটা আবু আহমদ ইবনে আদি ও ইবনে হিব্বান রহ. বলেছেন। এমনকি ইমাম বুখারি ও আলি ইবনুল মাদিনি রহ. তাকে মিথ্যাবাদি বলেছেন।

দুই. বায়হাকি রহ. তাঁর সুনানে কুবরায় (৭/২৮৭) আয়েশা রা. এর সূত্রে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাউকে বিবাহ দিতেন কিংবা নিজে বিবাহ করতেন, তখন খেজুর ছিটাতেন।

এই রেওয়ায়েতে একজন বর্ণনাকারী হলেন, আসিম ইবনে সুলাইমান আল-বাসারি। তিনি হাদিস জাল করতেন। ইবনে আদি এবং ফাল্লাস রহ. এমনটিই বলেছেন। দারা কুতনি রহ. বলেন সে একজন মিথ্যাবাদী। দেখুন লিসানুল মিযান: ৩/৩৬৮

তিন. বায়হাকি রহ. তাঁর সুনানে কুবরায় (৭/২৮৭) মুআয ইবনে জাবাল রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আনসারি সাহাবির বিবাহে উপস্থিত হয়ে খুতবা পাঠ করলে, অতঃপর বিবাহ দিলেন... এরপর ফল ও মিষ্টান্নের থালা নিয়ে আসা হলে তিনি বললেন, তোমরা তা লুন্ঠন করে নেও। সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদেরকে লুন্ঠন করা থেকে কি বারণ করেন নি? তিনি বললেন, আরে আমি তো সৈন্যদের লুন্ঠন (গনিমত লুন্ঠন) থেকে বারণ করেছি। বিবাহে লুণ্ঠন থেকে বারণ করিনি। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও টানাটানি করে নিলেন সাহাবিগণও তাঁর থেকে টানাটানি করে নিলেন।

হাদিসটি ইবনুল জাওযি রহ. তাঁর জাল হাদিসের গ্রন্থে (৩/৫৮) উল্লেখ করেছেন। বায়হাকি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন, এই সনদে অনেক মজহুল (অপরিচিত) বর্ণনাকারী রয়েছে। এবং সনদে অনেক ইনকিতা (বিচ্ছিন্নতা) রয়েছে। এরপর বলেন এপ্রসঙ্গে (বিবাহের মজলিসে খেজুর ছিটানোর বিষয়ে) একটি হাদিসও প্রমাণিত নয়।

সুতরাং এসকল রেওয়ায়েত দ্বারা এটি সুন্নত প্রমাণিত হবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দান করুন, আমিন।

 

 

 

মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

তাখাসুস্স ফিল ফিকহ শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

সম্মানিত মুফতি ও সদস্য ফতোয়া বোর্ডফাতাওয়া ও মাসায়েল

মুফতিমাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা