বহু রোযাদার এমন আছে, যারা রোযা রেখে এমন কাজ করে যাতে রোযা ভঙ্গ হয় না। অথচ মাসআলা না জানার কারণে রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃত পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করে ফেলে, ফলে কাযা ওয়াজিব হয়ে যায়।তাই সতর্কতার জন্য এমন কিছু বিষয় নিম্নে প্রদত্ত হলো, যার কারণে রোযা ভঙ্গ হয়না।যদি কোনো ব্যক্তি ভুলবশত পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করে, তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না। ইমাম আবুল হাসান কুদুরী রহ. বলেন-

فَإِنْ أَكَلَ الصَّائِمُ أَوْ شَرِبَ أَوْ جَامَعَ نَاسِيًا لَمْ يُفْطِرُ ( القدوري : ٥٢)

ভুলে পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করলে রোযা ভঙ্গ হয় না। (কুদুরী-পৃঃ ৫২, রশীদিয়া) রোযাবস্থায় সুরমা, তেল এবং আতর ইত্যাদি সুগন্ধি গ্রহণ জায়েয। থুথু (বা শ্লেষ্মা) -এর সাথে সুরমার চিহ্ন দেখা গেলেও কোনো সমস্যা নাই।ইমাম আবুল হাসান কুদুরী রহ. বলেন-

أوادهن أو احتجم أو اكتحل لم يفطر.অথবা যদি তেল ব্যবহার করে, সিঙ্গা লাগায় কিংবা সুরমা ব্যবহার করে, তাহলেও রোযা ভঙ্গ হবে না। (কুদুরী: ৫২, রশীদিয়া) থুথুর সাথে যদি সুরমার প্রভাব বা রং দেখা যায়, তখনো অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে রোযা ভঙ্গ হবে না। (হিন্দিয়া- ১/২০৩ শামেলা) وَإِذَا بَزَقَ فَرَأَى أَثَرَ الْكُحْلِ، وَلَوْنَهُ فِي بُزَاقِهِ عَامَّةُ الْمَشَايِخِ عَلَى أَنَّهُ لَا يُفْسِدُ صَوْمَهُ كَذَا فِي النَّخِيرَةِ

স্বপ্নদোষ হওয়ার পর গোসল না করে রোযা রাখার কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না। (মাসায়েলে রোযা: ৫৮, মাকতাবায়ে জায়েদ আহমদ) রোযাবস্থায় যদি মশা মাছি অথবা ধুলা-বালি বা ধোঁয়া গলায় চলে যায়, এতে রোযা নষ্ট হবে না। তবে যদি এগুলোর কোনো একটি স্বেচ্ছায় হয়, তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। যেমন আলমগীরীতে আছে-وَمَا لَيْسَ بِمَقْصُودِ بِالْأَكْلِ، وَلَا يُمْكِنُ الاحْتِرَازُ عَنْهُ كَالذُّبَابِ إِذَا وَصَلَ إِلَى جَوْفِ الصَّائِمِ لَمْ يُفْطِرُهُ যেসব বস্তুর মাধ্যমে খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় না এবং এ থেকে বাচাঁও সম্ভব নয়। যেমন: মাছি, এসব যদি পেটে পৌঁছে যায়, তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না।

উল্লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝা যায়, ধুলা-বালি এবং ধোঁয়ার মাধ্যমেও রোযা নষ্ট হবে না। (হিন্দিয়া: ১/২০৩, শামেলা) রোযাবস্থায় যদি এক-দুই ফোঁটা চোখের অশ্রু মুখে চলে যায়, তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না। আর যদি বেশী হয় এবং লোনা অনুভব হয় অথবা অশ্রু অত্যাধিক বেশী হয়, তাহলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। আলমগীরীতে আছে-

الدُّمُوعُ إِذَا دَخَلَتْ فَمَ الصَّائِمِ إِنْ كَانَ قَلِيلًا كَالْقَطْرَةِ وَالْقَطْرَتَيْنِ أَوْ نحْوِهَا لَا يُفْسِدُ صَوْمَهُ،

এক দুই ফোঁটা চোখের অশ্রু রোযাদারের মুখে চলে গেলে রোযা ভঙ্গ হবে না। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/২০৩) সুবহে সাদিকের পূর্বে গোসল ফরয হওয়ার পর গোসল না করে সূর্যোদয় পর্যন্ত এমন কি পুরো দিন অতিবাহিত করলেও রোযা ভঙ্গ হবে না। (কিতাবুল ফিক্ আলাল মাযাহিবিল আরবা'আ: ১/৫৩৬) নাক থেকে রক্ত বের হয়ে যদি পেটে চলে যায়, তাতে রোযা ভঙ্গ হবে। অন্যথায় ভঙ্গ হবে না। (ফাতাওয়া দারুল উলুম: ৬/৪৩৬) রোযাবস্থায় গোসল করলে শরীরে যে ঠাণ্ডা অনুভব হয় তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না।

ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-وَمَنْ اغْتَسَلَ فِي مَاءٍ وَجَدَ بَرْدَهُ فِي بَاطِنِهِ لَا يُفْطِرُ هَكَذَا فِي النَّهْرِ الْفَائِقِরোযাবস্থায় গোসলের কারণে যে ঠাণ্ডা অনুভূত হয় তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না। (ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/২০৩) রোযা রেখে চোখে ঔষধ দিলে রোযা ভঙ্গ হয় না। যদিও গলায় ঔষধের স্বাদ অনুভূত হয়। আলমগীরীতে আছে-

وَلَوْ أَقْطَرَ شَيْئًا مِنْ الدَّوَاءِ فِي عَيْنِهِ لَا يُفْطِرُ صَوْمَهُ عِنْدَنَا، وَإِنْ وَجَدَ طَعْمَهُ فِي حَلْقِهِ، চোখে ঔষুধ ব্যবহার করা হলে রোযা ভঙ্গ হবে না। যদিও অষুধের স্বাদ গলায় অনুভূত হয়। (আলমগীরী: ১/২০৩) কুলি করে কয়েকবার থুথু ফেলে দেয়ার পর অবশিষ্ট আদ্রতা ভেতরে চলে গেলে রোযা ভঙ্গ হবে না। (মাসায়েলে রোযা: ৬১, ইলমুল ফিকহ: ৩/৩২) যদি নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা গলায় চলে যায় ও গিলে ফেলে অথবা মুখের লালা গিলে ফেলে, তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না। দাঁতে আটকে থাকা খাদ্য-দ্রব্য যদি চনাবুটের চেয়ে ছোট হয় এবং তা গিলে ফেলে, তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না। পক্ষান্তরে যদি চনাবুটের চেয়ে বড় হয় বা ছোট হয় কিন্তু মুখ থেকে বের করে পুনরায় খেয়ে ফেললে, তাতে রোযা ভঙ্গ হবে। আল্লামা জাযায়েরী রহ. বলেন-

وإذا أكل ما بقي من نحو تمرة بين أسنانها إذا كان قدر الحمصة وجب القضاء، فا إن كان أقل فلا يفسد لعدم الاعتداد به كتاب الفقه على المذاهب الأربعة : ٥٣٥/١ ، التوفيقيةমুখের লালা বের হয়ে যদি ঝুলে থাকে, আর ঝুলন্ত লালা মুখে ফিরিয়ে নেয়া হয়, তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে না। ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-

وَلَوْ سَالَ لُعَابُهُ مِنْ فِيهِ إِلَى ذَقَنِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقَطِعَ مِنْ دَاخِلِ فَمِهِ ثُمَّ رَدَّهُ إِلَى فِيهِ وَابْتَلَعَهُ لَا يُفْطِرُهُ ( الهندية: ۲۰۳/۱ ، دار الفكر) মুখ থেকে বের হওয়া রক্ত যদি থুথুর তুলনায় কম হয় এবং রক্তের স্বাদ অনুভূত না হয়, তাতে রোযা ভঙ্গ হবে না। আল্লামা কাযীখান রহ. বলেন- إِذَا خَرَجَ الدَّمُ مِنْ بَيْنِ أَسْنَانِهِ، وَالْبُزَاقُ غَالِبٌ فَابْتَلَعَهُ وَلَمْ يَجِدْ طَعْمَهُ لَا يَفْسُدُ صَوْمُهُ. فتاوى قاضيخان: ١٨٤/١ ، قديمي کتب خانهইঞ্জেকশন নিলে রোযা নষ্ট হয় না। তবে বিনা প্রয়োজনে গ্লুকোজ ইঞ্জেকশন নিলে রোযা মাকরূহ হবে। (আহসানুল ফাতাওয়া: ৪/৪২২, যাকারিয়া)

অনিচ্ছাকৃত মুখভরে বমি হলেও রোযা ভঙ্গ হবে না। তবে বমি মুখে চলে আসার পর ইচ্ছাকৃত গিলে নিলে বমি অল্প হলেও রোযা ভঙ্গ হবে। আল্লামা হাছকাফী রহ. বলেন-

وَإِنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ وَخَرَجَ) وَلَمْ يَعُدْ لَا يُفْطِرُ مُطْلَقًا) مَلَأَ أَوْ لَا (فَإِنْ عَادَ بِلَا صُنْعِهِ (وَ) لَوْ هُوَ مِلْءُ الْفَمِ مَعَ تَذَكَّرِهِ لِلصَّوْمِ لَا يَفْسُدُ) خِلَافًا لِلثَّانِي وَإِنْ أَعَادَهُ) أَوْ قَدْرُ حِمَّصَةٍ مِنْهُ فَأَكْثَرَ حَدَادِيٌّ أَفْطَرَ

إجماعًا). (الدر المختار: ۳۹۲/۳ ، زكرياঅনিচ্ছাকৃত মুখভরে বমি হলেও রোযা নষ্ট হবে না। (দুররুল মুখতার: ৩/৩৯২)

 

উত্তর প্রদানে

মুফতি মুহাম্মদ আবু সালেহ

মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল