সূর্য ডুবে গেছে ধারণা করে ইফতার করার পর আবার সূর্য দেখা গেলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। হিদায়া গ্রন্থে বর্ণিত আছে-
لَوْ أَفْطَرَ وَهُوَ يَرَي أَنَّ الشَّمْسَ قَدْ غُرِبَتْ فَإِذَا هِيَ لَمْ تَغْرُبُ وَعَلَيْهِ الْقَضَاءُ لَا كَفَّارَةَ عَلَيْهِ.
সূর্য ডুবে গেছে দেখে ইফতার করার পর (বুঝতে পারল যে) সূর্য মূলত ডোবেনি। এমতাবস্থায় শুধু কাযা ওয়াজিব হবে, কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। (আল হিদায়া: ১/২২৫)
স্বপ্নদোষ বা অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়ার পর রোযা নষ্ট হয়ে গেছে ধারণা করে ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। আল্লামা হাসকাফী রহ. বলেন- كَذَا لَوْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ وَظَنَّ أَنَّهُ يُفَطِرُهُ فَأَفْطَرَ،فَلَا كَفَّارَةَعَلَيْهِ لِوُجُودِ شُبْهَةِ الاشْتِبَاهِ بِالنَّظِيرِ فَإِنَّ الْقَيْءَ وَالِاسْتِقَاءَ مُتَشَابِهَانِ؛ لِأَنَّ مَخْرَجَهُمَا مِنْ الْفَمِ وَكَذَا لَوْ احْتَلَمَ
স্বপদোষ অথবা অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়ার পর রোযা ভেঙ্গে গেছে ধারণা করে স্বেচ্ছায় আরো খেয়ে নিলো। তার উপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে, কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার: ৩/৩৭৫)
নাকে তেল বা ঔষুধ দিলে রোযা ভঙ্গ হবে। এ অবস্থায় শুধু কাযা ওয়াজিব হবে, কাফ্ফারা নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৫৮, দারুল উলূম করাচী)
হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোযা ভঙ্গ হবে। এতে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
ফতোয়ায়ে শামীতে আছে-
وَكَذَا الِاسْتِمْنَاءُ بِالْكَفَّ) أَيْ فِي كَوْنِهِ لَا يُفْسِدُ لَكِنَّ هَذَا إِذَا لَمْ يُنْزِلُ أَمَّا إِذَا أَنْزَلَ فَعَلَيْهِ الْقَضَاءُ كَمَا سَيُصَرَحُ بِهِ وَهُوَ الْمُخْتَارُ.
(الدر المختار: (۳۹۹/۲)
নাক থেকে রক্ত বের হয়ে পেটে চলে গেলে কাযা ওয়াজিব হবে কাফফারা নয়। (আহসানুল ফতোয়া: ৪/৪২৮)
লোহা, পাথরজাতীয় বস্তু যা সাধারণত আহারযোগ্য নয় এবং কোনো উপকারেও আসেনা তা গিলে ফেললে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
إِذَا ابْتَلَعَ الْحَصَاةَ أَوْ الْحَدِيدَ فَلِوُجُودِ صُورَةِ الْفِطْرِ عَلَى مَا قَالَ ابْنُ عَبَّاسِ الْفِطْرُ مِمَّا دَخَلَ وَعَلَى هَذَا كُلُّ مَا لَا يُتَغَذَّى بِهِ وَلَا يُتَدَاوَى بِهِ عَادَةً كَالْحَجَرِ وَالتَّرَابِ لَا يُوجِبُ الْكَفَّارَةَ. (تبيين الحقائق : ١٧٥/٣)
লোহা, পাথর গিলে ফেললে রোযা ভঙ্গ হবে। কেননা, তা বাহ্যিকভাবে রোযা ভঙ্গের কারণ। কিন্তু কাফ্ফারা আসবে না; কারণ এতে খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় না। (তাবয়ীনুল হাকায়েক-৩/১৭৫, হিন্দিয়া-১/২০৩)
বুখারী শরীফের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন- পেটে কোনো কিছু প্রবেশ করা দ্বারা রোযা ভেঙ্গে যায়; কিন্তু পেট থেকে কিছু বের হওয়া দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয় না। (বুখারী: হা-১৯৩৮, তা'লীকে)
অযু ও গোসলের সময় রোযা স্মরণ থাকাবস্থায় কুলি বা নাকে পানি দেয়ার সময় পানি গলার ভেতরে চলে গেলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। ফতোয়ায়ে হিন্দিয়াতে বর্ণিত আছে-
وَإِنْ تَمَضْمَضَ أَوْ اسْتَنْشَقَ فَدَخَلَ الْمَاءُ جَوْفَهُ إِنْ كَانَ ذَاكِرًا لِصَوْمِهِ فَسَدَ صَوْمُهُ وَعَلَيْهِ الْقَضَاءُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ ذَاكِرًا لَا يَفْسُدُ صَوْمُهُ كَذَا فِي الْخُلَاصَةِ وَعَلَيْهِ الاعْتِمَادُ.. (هندية : ٢٠٢/١)
কারো যদি রোযা স্মরণ থাকাবস্থায় কুলি অথবা নাকের পানি পেটে চলে যায়, তাহলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। (হিন্দিয়া-১/২০২)
রাসূল সা. ইরশাদ করেন- بَالِغَ فِي الاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا (سنن الترمذي رقم: ۷۸۸)
ভালোভাবে নাকে পানি দাও। তবে রোযা রাখাবস্থায় নয়। (তিরমিযী: ৭৮৮) তাই নাকে মুখে পানি দিতে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
যদি কেউ হাই তোলে বা অন্য কোনো কারণে উপরের দিকে হা করে তাকায় এবং বৃষ্টি বা ঝর্ণার পানি কিংবা বরফের টুকরা মুখে পড়ে পেটে চলে যায়। তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ১/২০২)
অনুরূপ যদি গোসলের সময় নাক বা মুখ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তাতেও রোযা নষ্ট হবে এবং কাযা ওয়াজিব হবে। (আলমগীরী: ১/২০২)
যদি কেউ ঘুমন্ত অবস্থায় পানি পান করে, তার রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। ফতোয়ায়ে হিন্দিয়াতে আছে- النَّائِمُ إِذَا شَرِبَ فَسَدَ صَوْمُهُ
ঘুমন্ত ব্যক্তি কিছু পান করলে তার রোযা ভেঙ্গে যায়। (হিন্দিয়া: ১/২০২)
রোযাবস্থায় কেউ বেহুশ হয়ে গেলে যেদিন বেহুশ হয়েছে সেদিন ছাড়া বাকি যতদিন বেহুশ ছিলো ততদিনের রোযা কাযা করতে হবে। তবে যদি বেহুশ হওয়ার দিন রোযা না রাখে। অথবা খাবার জাতীয় কিছু গলায় প্রবেশ করে, তাহলে সে দিনের রোযাও কাযা করতে হবে। (মাসায়েলে রোযা: ৭৩)
দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে যদি থুথুর সাথে গলার ভেতর চলে যায় এবং রক্তের পরিমাণ থুথুর সমান বা বেশী হয়, তাহলে রোযা নষ্ট হয়েযাবে। এ অবস্থায় শুধু কাযা করা জরুরী। (বাহরুর রায়েক: ২/২৭৩)
মুখ ভরে বমি চলে আসলে তা ইচ্ছাকৃত গিলে ফেললে রোযা ভেঙ্গে যাবে। যদিও গিলে ফেলার পরিমাণ কম হয়। এক্ষেত্রে উক্ত রোযাকাযা করতে হবে। (শামী: ২/৪১৪)
রোযাবস্থায় মহিলাদের হায়েয বা নিফাস আরম্ভ হলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। পরে তা অবশ্যই কাযা করতে হবে। রাসূল সা. একপর্যায়ে মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেন-
أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ؟ قُلْنَ: بَلَى، قَالَ: فَذَلِكِ مِنْ نُقْصَانِ دينهاগ্ধ. (صحيح البخاري: ٤٤/١ ، رقم: ١٩٥١)
দেখনি! মহিলারা ঋতুস্রাবের সময় রোযা নামায কিছুই করতে পারে না। এটা তাদের দ্বীনের অসম্পূর্ণতা। (বুখারী:১/৪৪, হা-১৯১৫)
শরীরের যে কোনো ক্ষত জায়গায় ঔষধ লাগালে তা যদি পেটের ভেতর প্রবেশ করে, তাহলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। তাতে শুধু কাযা করতে হবে।(ফতোয়ায়ে আলমগিরী: ১/২০৪)
মলদ্বারের ভিতরে ঔষধ বা পানি ইত্যাদি প্রবেশ করলে রোযা ভেঙ্গে যায় এবং কাযা করতে হয়। ইবনে আব্বাস রা. বলেন-
إنما الوضوء مما يخرج وليس مما يدخل و انما الفطر مما دخل وليس مما خرج.
শরীর থেকে কিছু বের হলে অযু করতে হয়, প্রবেশ করলে নয়। পক্ষান্তরে রোযার ক্ষেত্রে শরীরে প্রবেশ করলে রোযা ভেঙ্গে যায়, বের হলে নয়। (এ মাসআলা থেকে বীর্যপাতের প্রসঙ্গটি অবশ্য স্বতন্ত্র)। (আলমগিরী: ১/২০৪)
সুবহে সাদিকের পর সাহ্রীর সময় বাকি আছে মনে করে কেউ পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করলে রোযা ভেঙ্গে যায়। এতে শুধু কাযা করতে হয়। যারা বলে সুবহে সাদিকের পরও বা আযানের সময় ঘুম ভেঙ্গে গেলে তাড়াহুড়ো করে কিছু খেতে পারে এতে রোযা নষ্ট হয়না, তাদের উক্তি কুরআন হাদিস বিরোধী। (আলবাহরুর রায়েক: ২/২৯১: মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: ৬/১৪০)
অনিচ্ছাকৃত মুখভরে বমি করলেও রোযা ভাঙ্গে না; তবে ভেঙ্গে গেছে মনে করে পানাহার বা স্ত্রী সহবাস করলে কাযা করতে হবে, কাফ্ফারা নয়। তেমনিভাবে রোযা অবস্থায় ভুলবশত পানাহার করলে রোযা নষ্ট হয় না; কিন্তু রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে এবং এতে কাযা করতে হবে।উপরোল্লিখিত মাসআলাগুলোর প্রমাণ হাদিস থেকে -
ক. আউন রহ. থেকে বর্ণিত যে, মুহাম্মদ ইবনে সীরীন রহ. রাত বাকি আছে মনে করে সাহরী খেলেন। পরে জানতে পারেন যে, তিনি সুবহে সাদিকের পর সাহরী খেয়েছেন। তখন তিনি বললেন, "আমি আজ রোযাদার নই" অর্থাৎ রোযা ভেঙ্গে গেছে। এতে তার কাযা করতে হবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা: ৬/১৪৯ হা: নং-৯১৩১)
খ. আলী ইবনে হানযালা রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এক রমযানে উমর রা. এর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তার নিকট কিছু
পানীয় পেশ করা হলে উপস্থিত লোকদের কেউ কেউ সুর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে তা পান করে ফেললো। তখন হযরত উমর রা. ঘোষণা দিলেন "যারা ইফতার করে ফেলেছে অথচ সূর্যাস্ত হয়নি, তারা উক্ত রোযার কাযা দিতে হবে"। আর যারা ইফতার করেনি তারা সূর্যাস্তের অপেক্ষা করুন।(মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: ৬/১৫০ হা: নং-৯১৩৮)
উল্লেখ্য
لَا يَغُرَّنَّكُمْ مِنْ سَحُورِكُمْ أَذَانُ بِلَالٍ (مسلم رقم الحديث ۱۰۹۷)
(অথ্যাৎ বেলালের আযান শুনে তোমরা ভুল বুঝে সাহরী বন্ধ করো না)।
এর আলোকে সুবহে সাদিকের পরও সাহরীর অবকাশ আছে মনে করেন, তারা হাদীসের ব্যাপারে বিভ্রান্তির স্বীকার হয়েছেন। কারণ, এ হাদিসে বণির্ত আযান সুবহে সাদিকের ছিলো না; বরং তাহাজ্জুদের আযান ছিলো। এ কারণে ধোকা না খেতে বলা হয়েছে। (তিরমিযী শরীফ: ১-১৫০)
কুরআনের আয়াত তো সুস্পষ্ট
كُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ .... (البقرة: ۱۸۷)
অর্থ: তোমরা সুবহে কাযিব থেকে সুবহে সাদিক স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত খাও এবং পান কর। (সূরা বাকারা-১৮৭)
অর্থাৎ সুবহে সাদিকের পর সাহরী খাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। জেনে শুনে ইচ্ছাকৃত খেলে কাযা কাফফারা উভয়টি জরুরী। আর সুবহে সাদিক হয়নি মনে করে খেলে শুধু কাযা করতে হবে, কাফ্ফারা নয়।
উত্তর প্রদানে
মুফতি মুহাম্মদ আবু সালেহ
মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল