প্রশ্ন:
যখন আমি কোনো কাস্টমারকে এক তোলা স্বর্ণ বিক্রি করি, যা ১২ গ্রাম হয়, কিন্তু পরে সে-ই স্বর্ণ আবার আমার কাছে বিক্রি করে দিলে আমি প্রতি তোলায় ২ মাশা (প্রায় ২ গ্রেন) কম ধরে হিসাব করি , এটা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর:
স্পষ্ট করে জানা দরকার যে, স্বর্ণ যখন প্রচলিত মুদ্রা (যেমন টাকা, রিয়াল ইত্যাদি) এর বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় হয়, তখন তা "বাই‘ আস-সারফ" নামে পরিচিত।
এই ধরনের লেনদেন শরীয়তসম্মত হওয়ার জন্য দুই পক্ষের মধ্যে লেনদেনটি নগদে (হাতে হাতে) হওয়া জরুরি। তবে স্বর্ণ ও টাকা যেহেতু ভিন্ন প্রকারের (مختلف الجنس) বস্তু, তাই ওজন সমান হওয়া আবশ্যক নয় । কিন্তু প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্রেতার কাছ থেকে পুরনো স্বর্ণ কিনতে গিয়ে ওজনে কম ধরা হচ্ছে, এবং সেই কম ধরার মাধ্যমে বিক্রেতা অতিরিক্ত লাভ করছে । এটা স্পষ্টভাবে হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআন ও হাদীসে এমন লেনদেনের ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি এসেছে।
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিতভাবে পুরনো স্বর্ণ পুনরায় ক্রয়ের সময় ওজন থেকে ২ মাশা কমিয়ে হিসাব করা জায়েয নয় । তবে, যদি ক্রয়ের সময় পারস্পরিক সম্মতিতে (বাজারমূল্য বিবেচনায়) দামে কিছু কম-বেশি করা হয়, তাহলে সেটা বৈধ।
দলিলসমূহ :
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ، الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ، وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ۔
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয় , যারা মানুষের কাছ থেকে মাপ নেয়, পূর্ণ পরিমাণে নেয় ; কিন্তু যখন তারা অন্যদের মাপে দেয় বা ওজনে দেয়, তখন কম দেয়।”
(সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন, আয়াত ১ু৩)
أنَّ رَسولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ اسْتَعْمَلَ رَجُلًا علَى خَيْبَرَ، فَجَاءَهُ بتَمْرٍ جَنِيبٍ، فَقالَ رَسولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: أكُلُّ تَمْرِ خَيْبَرَ هَكَذَا؟ قالَ: لا واللَّهِ يا رَسولَ اللَّهِ، إنَّا لَنَأْخُذُ الصَّاعَ مِن هذا بالصَّاعَيْنِ، والصَّاعَيْنِ بالثَّلَاثَةِ، فَقالَ رَسولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ: لا تَفْعَلْ، بِعِ الجَمْعَ بالدَّرَاهِمِ، ثُمَّ ابْتَعْ بالدَّرَاهِمِ جَنِيبًا..
“রাসুলুল্লাহ ﷺ খাইবারে একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন । তিনি উৎকৃষ্ট খেজুর নিয়ে এলে নবী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, সব খেজুরই কি এমন ? তিনি বললেন, না, আমরা উৎকৃষ্ট এক সা’ দিয়ে সাধারণ দুই সা’ নেই, কখনো দুই সা’ দিয়ে তিন সা’ নেই।’ নবী ﷺ বললেন, এভাবে করো না ; সাধারণ খেজুরগুলো দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করো, তারপর সেই দিরহাম দিয়ে উৎকৃষ্ট খেজুর কিনে নাও। ’ বুখারি (২২০১), মুসলিম (১৫৯৩), নাসায়ী আল-কুবরা (৬১০০), মুশকিলুল আথার (১২৯৬)
عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه قال: قال رسول الله ﷺ: ্রالذَّهَبُ بالذَّهَبِ، والفِضَّةُ بالفِضَّةِ، والبُرُّ بالبُرِّ، والشَّعِيرُ بالشَّعِيرِ، والتَّمْرُ بالتَّمْرِ، والمِلْحُ بالمِلْحِ، مِثْلًا بمِثْلٍ، يَدًا بِيَدٍ؛ فمَن زادَ أوِ اسْتَزادَ فقد أرْبَى، الآخِذُ والمُعْطِي فيه سَواءٌسواءً بسواءٍ، يَدًا بِيَدٍ، فإذا اخْتَلَفَتْ هذه الأصنافُ فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ إذا كان يَدًا بِيَدٍوفي رواية:..
“স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রূপার বিনিময়ে রূপা, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ ; সবই সমপরিমাণে এবং হাতে-হাতে (একই মজলিসে উভয় বিনিময় কবজ ) হতে হবে। যে বেশি দেয় বা বেশি নেয়, সে রিবা গ্রহণ করে; এতে গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়েই সমানভাবে দায়ী।” আর আছে: “এগুলো ভিন্ন হলে (যেমন স্বর্ণের সঙ্গে রূপা), ইচ্ছামতো বিক্রি করতে পারো—তবে শর্ত হলো হাতে-হাতে হবে।” আর অন্য বর্ণনায় আছে: “যখন এসব জিনিস ভিন্ন হবে (যেমন স্বর্ণের সঙ্গে রূপা), তখন ইচ্ছামতো বিক্রি করতে পারো । তবে শর্ত হলো তা হাতেহাতে হতে (একই মজলিসে উভয় বিনিময় কবজ ) হবে। ” (মুসলিম (২৮০৯)
“ স্বর্ণকে রূপার বিনিময়ে বিক্রি করলে জিনস ভিন্ন হওয়ায় বেশিুকম (পরিমাণ/দামে পার্থক্য) জায়েয; তবে শর্ত হলো একই মজলিসে উভয়ের কবজ সম্পন্ন হওয়া। কারণ নবী ﷺ বলেছেন : “স্বর্ণ রূপার বিনিময়ে হলে হাতে হাতে (একই মজলিসে উভয় বিনিময় কবজ ) না হলে তা রিবা। ” (হেদায়া ৩/১০৫)
উত্তর প্রদানকারী
মুফতি নুরুদ্দিন মাসরুর
তাকমিল,দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী
ইফতা (উচ্চতর ইসলামি আইন ও গবেষনা), মারকাযুল বুহুস আল-ইসলামিয়া।