আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি সিস্টেম হলো টাকার বিনিময়ে জমি বন্ধক রাখা হয় এবং জমি ভোগের নামে যে চুক্তি করা হয় যেমন জায়েদের টাকার প্রয়োজন সে বকরের কাছে টাকা চাইল বকর বলল আমি টাকা দেব তবে তুমি জমি বন্ধক রাখবে যখন টাকা ফেরত দিবে তখন আমি জমি ফেরত দেব মধ্য সময়ে আমি জমি ভোগ করব প্রশ্ন হল সমাজের বহুল প্রচলিত এ সিস্টেম বৈধ কি না?
মাইশা
নারায়ণগঞ্জ ।
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
উত্তর : সহজে বলা যায় যে প্রচলিত বন্ধকের নামে জমি ভোগ করার যে সিস্টেম সমাজে ব্যাপকভাবে চালু হয়ে আছে তা বৈধ নয়
বিশ্লেষণ :
মূলত শরীয়তের বিধান ছিল কেউ যদি কারো নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে এবার ঋণদাতা যদি ঋণের গ্যারান্টি হিসেবে তার কাছে কোন কিছু বন্ধক রাখতে বাধ্য করে এবং ঋণগ্রহীতা স্বেচ্ছায় কোন কিছু রাখে তাহলে এটাকে বন্ধক বলে
এমন উদাহরণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেও প্রমাণিত আছে যে একদা এক ইহুদীর কাছে তার লৌহবর্ম বন্ধক হিসেবে রেখেছিলে এটা মূলত ঋণের গ্যারান্টি হিসেবে ছিল
সুতরাং কেউ যদি কারো কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে আর গ্যারান্টি হিসেবে ঋণদাতার কাছে কোন জিনিস বন্ধক হিসেবে রাখে তাহলে তা জায়েজ আছে
কিন্তু প্রশ্ন হল ঋণদাতা বন্ধকৃত বস্তু থেকে উপকৃত হতে পারবে কি?
উত্তর : না। ঋণ দাতার জন্য বন্ধককৃত জিনিস থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ নেই কেননা তা সুদের অন্তর্ভুক্ত আর সাধারণভাবে সুদ দেওয়া নেওয়া উভয়টাই হারাম সুতরাং এমন লেনদেন বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই
কেননা শরীয়তের মূলনীতি হল প্রত্যেক ঐ ঋণ যার দ্বারা উপকার হাসিল করা হয় তা সুদ হিসেবে গণ্য হয় আর সুদ হল প্রত্যেক এমন বিনিময় যার মোকাবিলাতে কোন কিছু থাকে না
সুতরাং এখানে ঋণদাতা যে টাকা দিয়েছে শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে আর যে বস্তু ঋণদাতার কাছে বন্ধক হিসেবে রেখেছে সেটা ঋণের গ্রান্টি হিসেবে বিবেচিত হবে এবার কথা হল সে বন্ধক হিসেবে যে জমিটা রেখেছে সেটা থেকে উপকৃত হওয়াটা কিসের বিনিময়ে? এখানে স্পষ্ট ই বোঝা যাচ্ছে তার দেওয়া ঋণের বিনিময়ে ঋণ দাতা জমি ভোগ করছে আর ঋণের বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করা অবশ্যই সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে
কেননা নির্ধারিত সময়ে হুবহু তার দেওয়া টাকাটা ফেরত পাচ্ছে আর মধ্যখানে জমি ভোগ করছে যার কোন বিনিময় নির্ধারণ করা হয়নি সুতরাং আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত সিস্টেম টা বন্ধকের নামে অবৈধ একটা লেনদেন মাত্র
এখন কথা হল ঋণ দেওয়ার সময় বিনিময় হিসেবে কোন কিছুর শর্ত করেনি এবার ঋণগ্রহীতা টাকা জমা দেওয়ার সময় স্বেচ্ছায় কিছু টাকা শর্তহীন ভাবে দিয়ে দিল তখন সেটা বৈধ হয় তাহলে এখানে ও শর্তহীনভাবে জমি যদি ভোগ করে তাহলে কি বৈধ হবে?
উত্তর : না।
যেহেতু এ লেনদেনটা সাধারণভাবে ব্যাপক হয়ে গেছে বিধায় শরীয়তের মূলনীতি হলো المعروفكالمشروط তথা সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাওয়ার কারণে ঋণ দিয়ে জমি ভোগের শর্ত না করে ও যদি শর্তহীনভাবে ঋণদাতা জমি ভোগ করে তাহলে তা সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রচলন হওয়ার কারণে শর্ত হিসেবেই প্রযোজ্য হবে
সুতরাং ঋণ দাতা টাকা কর্জ দেওয়ার সময় জমি বন্ধক রেখে উপকৃত হওয়ার শর্ত না করেও যদি শর্ত হীনভাবে জমি ভোগ করে তাহলেও ঋণ দিয়ে জমি থেকে উপকৃত হওয়ার সিস্টেম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে যাওয়ার কারণে তা শর্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে এবং জমি থেকে উপকৃত হওয়া নাজায়েজ হিসেবে গণ্য হবে
বৈধ সুরত
(১) জমি থেকে উপকৃত হওয়ার একটি বৈধ পদ্ধতি হল জনৈক ব্যক্তি ঋণস্বরূপ জমির মালিক কে টাকা দিবে পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের জন্য নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে জমি ভাড়া নেবে এবং সময় শেষ হলে জমির দখল ছেড়ে দিবে তবে ভাড়া নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভাড়া ধার্য করা উচিত যদি নামে মাত্র ভাড়া নির্ধারণ করা হয় তাহলে লেনদেন মাকরুহে তানযিহির সাথে বৈধ হবে
(২) জমি ভাড়া নিবে নামে মাত্র একটা ভাড়া নির্ধারণ করে যা মাসে বা বছরে মূল টাকা থেকে কর্তিত হবে আর অগ্রিম হিসেবে অবশিষ্ট টাকাটা
জমির মালিক কে দিয়ে দিবে এভাবে যতদিন ইচ্ছা জমি ভোগ করতে পারবে তবে নামে মাত্র ভাড়া নির্ধারণ করার কারণে সে লেনদেন মাকরুহে তানজিহির সাথে বৈধ হবে
(৩) তৃতীয় পদ্ধতি হলো নামে মাত্র জমি ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে জমি থেকে উপকৃত হবে তার পদ্ধতি নিম্নরূপ
পৃথক দুটি চুক্তি করবে প্রথম চুক্তি হবে জমি ক্রয় বিক্রয়ের অতঃপর পৃথক মজলিসে আলাদাভাবে একটি চুক্তি হবে যেখানে ক্রেতা অঙ্গীকারবদ্ধ হবে বিক্রেতা যেই দিন জমির মূল্য পরিশোধ করতে পারবে সেই দিন বিকৃত জমি ক্রেতা প্রথম মালিকের কাছে বিক্রির মাধ্যমে উক্ত জমির মালিকানা হস্তান্তর করবে এভাবে জমি থেকে উপকৃত হওয়া বৈধ তবে বিক্রয়ের চুক্তিটি যেহেতু নামে মাত্র তাই সেটা বিক্রয়ের মজলিসে মৌখিকভাবে উচ্চারণ করবে না বরং তারা মনে মনে রাখবে
রদ্দুল মুহতার ৭/২৭১,কাওয়াঈদুল ফিকহ ৭৯
و الله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে
মুফতি মুঈনুল ইসলাম
মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি ফাতাওয়া ও মাসায়েল