(২য় পর্ব)

তাছাড়া যয়ীফ হাদীস বর্ণনাযোগ্য এবং আমলযোগ্য হওয়া সাধারণ যুক্তিরও দাবী। কেননা কোন হাদীস যয়ীফ হওয়ার অর্থ হল, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত উক্ত হাদীসের সনদ যাচাই করে দেখেছি যে, এর সনদে কোন দুর্বল রাবী রয়েছে বা অন্য কোন সমস্যা রয়েছে যার কারণে আমরা হাদীস যাচাইয়ের মূলনীতি অনুযায়ী তাকে সহীহ বলতে পারি না। এর অর্থ কখনই এই হতে পারে না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদীসটি বলেননি, এবিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত। বরং এর অর্থ হল, রাবী দুর্বল বা অন্য কারণে আমাদের একটু সন্দেহ হয়েছে যে, হয়ত এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস নয়।

এমনো হতে পারে, আমরা যে রাবীকে তার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে বা তার বর্ণনায় ভুল হয় এই কারণে তাকে দুর্বল বলছি যদিও তার বর্ণনায় ভুল হয় কিন্তু এই হাদীসটি সে সঠিকভাবে বর্ণনা করেছে। একজন মানুষের স্মরণশক্তি দুর্বল হলে সে কি সব সময়ই ভুল করবে? তাই সাধারণ দুর্বল হাদীস প্রকৃতপক্ষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অবশ্য মুনকার (আপত্তিজনক) মাতরুক (পরিত্যাজ্য) রেওয়ায়াতের বিষয়টি ভিন্ন।

সুতরাং, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে আমরা যদি দুর্বল হাদীসের উপর আমল করি তাহলে তো সমস্যার কিছু নেই। কেননা এর উপর আমল করাইতো যুক্তিসঙ্গত। কারণ বাস্তবে যদি এই দুর্বল হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস না হয় তাহলেও তো কোন সমস্যা নেই, কেননা আমরা তো বলেছি, এধরনের হাদীস থেকে বিধান আহরণ করা বা কোন জিনিসকে হালাল-হারাম সাব্যস্ত করা যাবে না।

তবে এখানে যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এ ধরনের হাদীস কোন শর্ত ছাড়াই আমলযোগ্য, না এর উপর আমল করতে কোন শর্ত আছে? এ সম্পর্কে আল্লামা সাখাভী রহ.(৯০২ হি:) তাঁর আল-কাউলুল বাদী, গ্রন্থে (পৃ. ৩৬৪) বলেন, আমি আমার শায়খ (হাফেজ ইবনে হাজার রহ.(৮৫২ হি:) কে অনেক বার বলতে শুনেছি এবং তিনি নিজে আমাকে লিখেও দিয়েছেন যে, দুর্বল হাদীসের উপর আমল করার শর্ত তিনটি:

এক. হাদীসটি অতি দুর্বল না হওয়া। সুতরাং, কোন মিথ্যাবাদী বা মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অথবা যে রাবী মারাত্বক পর্যায়ের ভুল করেন এমন ব্যক্তি যদি শুধু একা একাই কোন হাদীস বর্ণনা করেন তাহলে তার বর্ণনার উপর আমল করা যাবে না (এই শর্তের ব্যাপারে সবার ঐকমত্য রয়েছে)।

দুই. হাদীসটি কোন আসল (শরীয়তের মূলনীতি)-এর অন্তর্ভূক্ত হতে হবে। সুতরাং ঐ সকল মনগড়া বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হবে না, যার কোন ভিত্তি নেই।

তিন. উক্ত হাদীসের উপর আমল করার সময় এ কথার বিশ্বাস রাখা যাবে না যে, এটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত, যাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে এমন জিনিসের সম্পর্ক করা না হয় যা তিনি বলেননি।

যাই হোক, এতো গেল বিধানাবলী ছাড়া ফাযায়েল ইত্যাদির ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস আমলযোগ্য হওয়ার বিষয়। আচ্ছা বিধানাবলীর ক্ষেত্রে কি দুর্বল হাদীস কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হবে না?

মুহাদ্দেসীন ও ফুকাহাদের বক্তব্য অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে। যেমন

এক. একটি কাজ দলীল দ্বারা জায়েজ প্রমাণিত হল। কিন্তু একটি দুর্বল হাদীস দ্বারা কাজটি মাকরূহ প্রমাণিত হল। এই ক্ষেত্রে ইহতিয়াত (সতর্কতা)-এর দাবী যেহেতু এর উপর আমল না করা তাই এর উপর আমল না করাই ভাল।

দুই. কেউ কেউ বলেন, কোন মাসআলায় যদি সহীহ হাদীস না পাওয়া যায় এবং ঐ বিষয়ে একটি দুর্বল হাদীস পাওয়া যায় তাহলে ঐ যয়ীফ হাদীসের উপর আমল করা হবে এমনকি উক্ত হাদীসটি যদি যুক্তি ও কিয়াসের বিপরীত হয়। এ সংক্রান্ত আলোচনা দেখুন, (নুকাতুয যারকাশী: ২/৩১৩; আল-আজ ইবাতুল ফাজিলা, পৃ. ৪৬)

এখানে আরো একটি বিষয় খবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সনদের বিচারে কোন যয়ীফ হাদীস যদি উম্মাহর মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের কাছে সমাদৃত হয় তখন হালাল-হারাম ও বিধানাবলীর ক্ষেত্রেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। এমনকি তা হাদীসে মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হাদীস)-এর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এধরনের হাদীসকে আয যীয়ফুল মুতালাক্কা বিল কবূল বলা হয়। এ সম্পর্কে মুহাদ্দেসীনদের বক্তব্য খুবই সুস্পষ্ট।

আয যীয়ফুল মুতালাক্কা বিল কবূল সম্পর্কে মুহাদ্দেসীনদের কয়েকটি বক্তব্য নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

ক্স মুয়াত্তা মালেক গ্রন্থের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রহ.(৪৬৩ হি:) একটি হাদীস সম্পর্কে আলোচনার এক পর্যায়ে বলেন

هذا الحديث لا يحتج أهل الحديث بمثل إسناده وهو عندي صحيح لأن العلماء تلقوه بالقبول له والعمل به .

মুহাদ্দিসগণ এধরনের ইসনাদ দিয়ে দলীল দেন না। কিন্তু হাদীসটি আমার নিকট সহীহ। কেননা উলামাগণ উহাকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং এর উপর আমল করেছেন। (আত-তামহীদ: ১৬/২১৮)

ক্স আল্লামা ইবনু কায়্যিমিল জাওজিয়্যাহ রহ.(৭৫১ হি:) তাঁর আর-রুহ গ্রন্থে (১/১১৪) একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেন

فهذا الحديث وإن لم يثبت فاتصال العمل به في سائر الأمصار والأعصار من غير إنكار كاف في العمل به.

এই হাদীসটি যদিও প্রমাণিত নয় কিন্তু সকল যুগে সকল শহরে ধারাবাহিকভাবে-এর উপর আমল চলে আসা এতটুকুই এর উপর আমল করার জন্যে যথেষ্ট।

ক্স আল্লামা যারকাশী রহ.(৭৪৫-৭৯৪ হি:) তাঁর আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ গ্রন্থে (পৃ. ১/৩৯০) বলেন

إن الحديث الضعيف إذا تلقته الأمة بالقبول، عمل به على على الصحيح حتى أنه ينزل منزلة المتواتر.

যয়ীফ হাদীস যখন ব্যাপকভাবে উম্মাহর (ফকীহ ও মুহাদ্দিসের) কাছে সমাদৃত হয় তখন তার উপর আমল করা হবে এটাই বিশুদ্ধ কথা। এমনকি তখন তা হাদীসে মুতাওয়াতির-এর পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

ক্স হাফেজ ইবনে হাজার রহ.(৮৫২ হি:) তাঁর আন-নুকাত গ্রন্থে (১/৪৯৪) বলেন

ومن جملة صفات القبول أن يتفق العلماء على العمل بمدلول الحديث فإنه يقبل حتى يجب العمل به وقد صرح بذلك جماعة من أئمة الأصول .

হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিদর্শন সমূহের একটি হল, ইমামগণ এর বক্তব্যের উপর আমল করতে একমত হওয়া। এক্ষেত্রে হাদীসটি গ্রহণ করা হবে এবং এর উপর আমল অপরিহার্য হয়ে যাবে। উসূলের ইমামগণ এ বিয়টি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।

ক্স ইমাম সূয়ূতী রহ.(৯১১ হি:) তাঁর তাদরীবুর রাবী গ্রন্থে (১/৬৬) বলেন

يحكم للحديث بالصحة إذا تلقاه الناس بالقبول وإن لم يكن له إسناد صحيح.

লোকজন (উলামা, মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ) যখন কোন হাদীস গ্রহণ করেন ঐ হাদীসের সহীহ সনদ না থাকলেও তার ব্যাপারে সহীহ হওয়ার হুকুম দেয়া হবে।

মুহাদ্দেসীন ও ফুকাহায়ে কেরাম থেকে এ ধরনের বক্তব্য অনেক পাওয়া যায়। শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ (রহ.) তাঁর তাহকীককৃত আল-আজ ওয়ীবাতুল ফাজেলা গ্রন্থে (পৃ. ২২৮-২৮৩) এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন।


মাওলানা মাহবুবুল হাসান আরিফী

জামিয়া ইসলামিয়া মোমেনশাহী,বাংলাদেশ।