মাযহাবের নামে আহলে হাদীস—শরয়ী ও ঐতিহাসিক সত্য কী?
নাস্তিকেরা স্বাধীন চলবার জন্য এক খোদা ও স্রষ্টার অস্তিত্বই অস্বীকার করেছে। তারা ভাবে ও দম্ভ করে বলে, আমরা খোদার বশ্যতা ও ধর্মের বন্ধন হতে মুক্ত। কিন্তু তারা যে এক খোদাকে অস্বীকার করতে গিয়ে অসংখ্য খোদার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে; বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গিয়ে ছাদের নালার নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বহুত্ববাদের ময়লাপানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে; সে অনুভূতিও তাদের নেই।
কারণ, প্রতিটি বস্তুকেই তারা স্বয়ম্ভূ তথা আপনাআপনি সৃষ্ট বলে বিশ্বাস করে; যার ফারসী প্রতিশব্দ খোদা (خود+ آ= خدا )বা স্বয়ম্ভূ। তারা নিজেকে এবং সবকিছুকে প্রকারান্তরে খোদা বলে স্বীকার করে নিয়েছে। আর এভাবেই তারা তাওহীদের নূর থেকে কুফরের যুলুমাতে, একত্ববাদকে অস্বীকার করে বহুত্ববাদের ভাগাড়ে প্রবেশ করেছে। কিন্তু وهملايشعرون. বোঝার মতো সে অনুভূতিও তাদের নেই।
আমাদের 'আহলে হাদীস' ভাইয়েরা 'তাকলীদে শাখসী' ও মাযহাব মানাকে অস্বীকার করেছে। এটা নাকি ব্যক্তিপুজা; যা ওদের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। এমনকি মাযহাব মানাকে শিরক বলে দাবী করেছে; যদিও এর পক্ষে কোনো দলীল নেই। এক মাযহাবের গণ্ডি থেকে বের হতে গিয়ে যে তারা স্ব-স্ব প্রবৃত্তি ও বহুমুখী তাকলীদে মাযহাবের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে, তার কোনো খবরও তাদের নেই। তারা চার মাযহাবের বাইরে আরেকটি মিশ্রমাযহাব দাঁড় করিয়েছে- যার নজীর পূর্বে ছিল না। অন্য মাযহাবকে অস্বীকার করে তারা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে যে, আমরা মাযহাব মানি না, হাদীস মানি। কারও তাকলীদ করি না, নবীজিকে অনুসরণ করি। অথচ এরা জানে না, মাযহাব অস্বীকারের নামে আরেকটি নতুন মাযহাব তারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বুঝতে অক্ষম যে, 'আহলে হাদীস' স্বয়ং একটি স্বতন্ত্র মাযহাব; যার কোন বিশেষ মূলনীতি নেই। নেই কোনো ইমাম ও ফকীহ, যার সিদ্ধান্তকে চুড়ান্ত ও মূল বলে গ্রহণ করা হবে। বরং এরা ইমাম চতুষ্টয়ের বহু পরের তথা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পরের কতেক আলিমের রায়কে প্রাধান্য দিয়ে চলেছে। কতেক ক্ষেত্রে তো দেখা যায়, এ মাযহাবের অনুসারীরা নিজেরাই যেন নিজেদের ইমাম। তারা প্রত্যেকেই যেন একেকজন ফকীহ! যার যেভাবে মনে চেয়েছে, সে সেভাবেই পথ চলতে শুরু করেছে। এজন্য দেখা যায়, অঞ্চল ভেদে আহলে হাদীস মাযহাবের ভার্সন ভিন্ন ভিন্ন। এমন একটি জগাখিচুড়ি মাযহাবের নাম 'আহলে হাদীস'।
বস্তুত তারা তাকলীদ ও মাযহাবকে অস্বীকার করতে গিয়ে একটি মিশ্র মাযহাবের জন্ম দিয়েছে। স্বীকৃত ও সালাফে সালেহীনের মাযহাব অগ্রাহ্য করে খালাফদের অনুসরণে লিপ্ত হয়েছে। অথচ এর অনুভূতিও তাদের নেই।
চলুন, বুঝে নিই 'আহলে হাদীস' কীভাবে একটি স্বতন্ত্র মাযহাব?
মাযহাব কাকে বলে?
মাযহাব শব্দের আভিধানিক অর্থ চলার পথ ও রাস্তা। পরিভাষায়, বিরোধপূর্ণ মাসআলায় দলীলপ্রমাণের আলোকে একটি মত ও পথ নির্ধারণ করাকে মাযহাব বলে। আর এর অনুসরণকে 'তাকলীদে মাযহাব' বলে।
শরীয়তের মৌলিক কোনো মাসআলায় কোনো মতবিরোধ নেই। বিচ্ছিন্ন কেউ মতবিরোধ করলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নানা কারণে শাখাগত বিষয়গুলোতে মতবিরোধ করার সুযোগ আছে এবং এ মতবিরোধ স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য। বরং এটি ইসলামের মতবৈচিত্রের সৌন্দর্য্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। এক কুরআন, একনবী এক শরীয়ত হওয়ার পরেও কেন ইখতিলাফ ও মতবিরোধ হয়, সেটা বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে, যা এখানে করার সুযোগ নেই।
এ অনিবার্য মতবিরোধপূর্ণ মাসআলায় দলীলপ্রমাণ দিয়ে একটি মত ও পথ নির্ধারণ করা জরুরি। একেই 'মাযহাব' বলে। শরীয়তের যেকোনো অনুসারীকেই সাংঘর্ষিক দলীলের ক্ষেত্রে অতি অবশ্যই একটি মত ও পথ গ্রহণ করে নিতে হবে। এর অন্যথা করার সুযোগ নেই। নতুবা সে বিরোধপূর্ণ মাসআলায় এক কদমও চলতে পারবে না। হয়তো তাকে থেমে যেতে হবে, নয়তো তাকে শরীয়তের বাইরে চলে যেতে হবে। এর কোনোটিরই এখানে সুযোগ নেই। এটা যেমন মাযহাবঅনুসারীদের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি মাযহাব অস্বীকারকারীদের বেলায় সত্য।
উদাহরণত, 'রাফয়ে ইয়াদাইন' নামাযে মোট কতবার হবে এবং কখন কখন হবে, এ ব্যাপারে শরীয়তের দলীল বিরোধপূর্ণ। হাদীস যেমন এখানে ভিন্ন ভিন্ন, তেমনি সাহাবায়ে কেরামের আমলেও ভিন্নতা রয়েছে। পরবর্তীদের অবশ্যই এ সব দলীলের কোনো একটিকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে হবে। এরই নাম মাযহাব।
সূরা ফাতেহার পর আমীন জোরে বলবে নাকি আস্তে বলবে; এক্ষেত্রে হাদীস সাংঘর্ষিক। আমালে সাহাবাও ভিন্ন ভিন্ন। পরবর্তী যুগের লোকেরা কোনো একটিকে গ্রহণ করে চলা সে লোকদের মাযহাব।
আস্তে আমীন বললেও আপনি মাযহাবে আছেন, জোরে আমীন বললেও আপনি মাযহাবেই আছেন। এখানে এ কথা বলার সুযোগ নেই, আস্তেওয়ালারা মাযহাবী ও মুকাল্লিদ; আর জোরেওয়ালারা মাযহাবমুক্ত। উভয়পক্ষই মাযহাবের অনুসারী। জোরেওয়ালারা যতই নিজেদেরকে আহলে হাদীস দাবী করুক।
এভাবে অন্যান্য বিরোধপূর্ণ মাসআলাগুলো বিচার করুন। বেতরের নামায এক রাকাআত নাকি তিন রাকাআত, মুকতাদী কেরাত পড়বে কি পড়বে না, ঈদের নামাযে কয় তাকবীর বলবে, প্রভৃতি মাসআলায় আপনি তালাশ করলে দেখবেন, উভয় পক্ষেরই করআন সুন্নাহর কোনো না কোনো দলীল আছে। আর সেখান থেকে প্রত্যেকে ইজতিহাদ বা পছন্দমত একটি পথ ও মত দাঁড় করিয়েছে। সেমতে অন্যান্য মাযহাবীরা যেমন মাযহাবী, তেমনি আহলে হাদীসও মাযহাবী।
বস্তুত, সবপক্ষই আহলে হাদীস, অথবা সবপক্ষই মাযহাবী। কারণ সবার পক্ষেই হাদীস আছে, আবার সবপক্ষই ইজতিহাদ করছে। প্রতিপক্ষকে মুকাল্লিদ/মাযহাবী বলে গালি দেওয়া, আর নিজেকে মাযহাবমুক্ত 'আহলে হাদীস' বলে নিস্পাপ মনে করা আত্মপ্রাবঞ্চনা ও কুপমুন্ডুকতা ছাড়া কিছু নয়।
শায়খ সাইফুদ্দীন গাজী