বিধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কি ঈমানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
বিধর্মীদের উৎসবে শুভেচ্ছা ও অংশগ্রহণের বিধান
অমুসলিমদের পূজা বা ধর্মীয় উৎসবে গিয়ে তা উপভোগ করা হারাম; তাদেরকে শুভেচ্ছা জানানোও হারাম। ফিকহের বহু কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, ‘শিরকীয় কাজ উপভোগ করা কিংবা শিরককে কেন্দ্র করে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানানো কুফরের অন্তর্ভুক্ত।’
তবে যদি কেউ তাদের কুফর বা পূজার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে,
তাদের শিরকে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তবে নিঃসন্দেহে তার ঈমান সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাবে—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো ইখতিলাফ নেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا
‘তোমরা তাদের সাথে বসো না যতক্ষণ না তারা (কুফরী) আলোচনা থেকে বিরত হয়। অন্যথায় তোমরা তাদের মতোই হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করবেন।” [সূরা নিসা: ১৪০]
ইমাম কুরতুবী রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যখন কোনো গুনাহ প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়, তখন গুনাহগারদের সাহচর্য ত্যাগ করা ওয়াজিব। কেননা যে তাদের সাহচর্য ত্যাগ করল না, সে তাদের কাজের প্রতি যেন সন্তুষ্ট থাকল। আর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা নিজেই কুফর। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘নতুবা তোমরা তাদের মতো হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের আসরে বসে কিন্তু তাদেরকে বাধা দেয় না, সে পাপের ভারে তাদের সাথে সমান হয়ে যাবে। তাই উচিত হলো—তাদের অন্যায় কথা ও কাজের প্রতিবাদ করা। আর যদি প্রতিবাদ করার সামর্থ্য না থাকে, তবে সেই আসর ত্যাগ করা আবশ্যক; যাতে এ আয়াতের ভয়াবহ হুমকির অন্তর্ভুক্ত না হতে হয়।” [তাফসীরে কুরতুবী ৫/৪১৮]
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেনঃ “শীঘ্রই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তি পূজা করবে, আর কিছু লোক মূর্তি পূজারীদের সাথে মিশে যাবে।” সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩৯৫২
নবী করীম ﷺ আরো ইরশাদ করেছেনঃ “মানুষ যখন গুনাহকে চোখের সামনে দেখে কিন্তু তা প্রতিরোধ করে না, তখন অতি শীঘ্রই আল্লাহ তাদের সকলকেই গুনাহগারদের সাথে একত্রিত করে শাস্তি প্রদান করবেন।” [সহীহ ইবনু হিব্বান: ৩০৫; শাইখ শুয়াইব আল-আরনাউত্ব রহ. বলেছেন, এ হাদীস শাইখাইন-এর শর্ত অনুযায়ী সহীহ।]
সাহাবায়ে কেরামের সতর্কবাতা ও নির্দেশনা
ক. হযরত উমর রাযি. বলেছেনঃ “তোমরা মুশরিকদের পূজা-উৎসবের দিনে তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করবে না। কেননা সে সময় আল্লাহর গযব তাদের উপর সরাসরি নাযিল হয়।” [মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৯০৬১; মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ২৫/৩২১— সনদ সহীহ]
খ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা বলেনঃ
من بنى ببلاد الأعاجم فصنع نيروزهم ومهرجانهم وتشبه بهم حتى يموت وهو كذلك حشر معهم يوم القيامة
“যে ব্যক্তি অনারব দেশে বসবাস করে তাদের নওরোজ বা মেহরজান উৎসব পালন করবে এবং তাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করবে—এমনকি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন তার হাশর সেসব বিধর্মীদের সাথেই হবে।” [সুনানুল কুবরা, বাইহাকী ৯/৪৩২ হাদীস: ১৫৫৬৩; ইক্বতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ইবনু তাইমিয়া ১/৭৫৪ —সনদ সহীহ।]
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. এ বাণীর ্রحشر معهمগ্ধ (তাদের সাথেই হাশর হবে) অংশের ব্যাখ্যায় বলেনঃ “এতে বুঝা যায় যে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাযি. তাদের এসব উৎসব ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীকে হয় ক।*ফে*র সাব্যস্ত করেছেন, অথবা এমন এক কবীরাহ গুনাহের শামিল করেছেন যার কারণে তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যায়।” [ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ১/৯৫৪]
আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. (৯৭০ হি.) বলেন, অগ্নিপূজকদের নববর্ষে অংশগ্রহণ করলে এবং তাদের সাথে তাদের ওই দিনের কার্যাবলীর প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করলে অথবা শুধুমাত্র নববর্ষের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সেদিন কিছু খরিদ করলে, যা সে খরিদ করার ছিল না এবং তা পানাহারের জন্যও নয়, এমনিভাবে ওই দিনের সম্মানার্থে কোনো মুশরিককে হাদিয়া প্রদান করলে; চাই তা একটা ডিমই হোক না কেন, সর্বসম্মতভাবে কা*ফে*র হয়ে যাবে।” [আলবাহরুর রায়িক: ৫/১৩৩; হিন্দিয়া: ২/২৭৬]
ফাতহুল বারীতে এসেছে—
من أهدى لهم يوم عيدهم بطيخة بقصد تعظيم العيد فقد كفر بالله تعالى
যে ব্যক্তি তাদের পূজা-উৎসবের সম্মানার্থে একটি তরমুজ (বা অন্য কোনো হাদিয়া) উপহার হিসেবে দেয়, সে আল্লাহর সাথে কু*ফুরী অবস্থায় পতিত হয়। অর্থাৎ কু*ফরি করল। [ফাতহুল বারী ২/৩১৫]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন—“কোনো বিশেষ কুফরি কাজের প্রতি শুভেচ্ছা জানানো ইজমা অনুসারে হারাম। উদাহরণস্বরূপ, কাফেরদের পূজা-উৎসব বা ব্রত পালনকে স্বাগত জানিয়ে বলা—‘তোমাদের উৎসব বরকতময় হউক’ অথবা পূজার শুভেচ্ছা—এটি হারাম।
এটি এমনই একটি জঘন্য কাজ যে, আল্লাহর নিকট এটি সবচেয়ে বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, এমনকি মদপান, হ*ত্যা, অ*বৈধ যৌ*নাচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে শুভেচ্ছা জানানো থেকেও ভয়াবহ গোনাহ। অনেক মানুষ আছে যাদের দ্বীনের কোনো মূল্য নেই। তারা তাদের কর্মকাণ্ডের নিকৃষ্টতা ও ভয়াবহ পরিণতি জানে না। তাই যে ব্যক্তি কোনো বান্দার গোনাহ, বিদআত বা কুফুরী কাজে শুভেচ্ছা জানায়, সে সরাসরি মহান আল্লাহর আযাব ও ক্রোধকে ডেকে আনে।’’ [আহকামু আহলিয যিম্মাহ ১/১৬১]
আল্লামা যফর আহমদ থানভি রহ. বলেনঃ “যদি হি*ন্দু*দের মেলা-উৎসব ধর্মীয় উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, সেখানে মুসলমানদের অংশগ্রহণ জায়েয নয়। মুসলমানদের জন্য সেখানে দোকান-পাট নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। সওদাপাতি বা কেনাকাটার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দু’মত রয়েছে—কিছু ফকিহ সেটাও নিষেধ করেছেন।
কেউ বলেছেন, নিয়মিত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা যায় যদি বিশেষভাবে মেলার কারণে কিছু না ক্রয় করা হয়। তবে সতর্কতা হলো, তাদের ধর্মীয় মেলার জৌলুস বাড়ানো বা উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়।
আর যদি মেলা বাণিজ্যিক হয়, যেমন পশু-পাখি বা অন্যান্য পণ্য বিক্রির জন্য, সেখানে যেতে ও কেনাকাটা করতে সমস্যা নেই। শর্ত হলো—নাচ-গান বা বিনোদনমূলক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা।”
[ইমদাদুল আহকাম: ৭/১৭২; আরা দেখুন: ফাতওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ১৬/৩৯৮-৩৯৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৬৮-২৭০; আযিযুল ফাতাওয়া, পৃ: ৭১৮; রশিদিয়া, পৃ: ৪৫৫ ও ৪৭১]
যফর আহমদ থানভি রহ.এর সময়ে জনৈক হি*ন্দু তাদের ধর্মীয় প্রথায় স্থানীয় মুসলিদেরকে দাওয়াত করলে, জনৈক মুসলিম এবিষয়ে হযরতের নিকট ফতোয়া তলব করেন। তখন তিনি লিখেন,
مسلمانوں کو اس دعوت میں شریک ہونا جائز نہیں کیونکہ یہ دعوت ہندوؤں کی مذہبی دعوت هے اور كفار كى مذهبى دعوتوں میں شرکت جائز نہیں۔ امداد الاحكام: ৭/১৮১
“মুসলমানদের জন্য এই দাওয়াতে শরিক হওয়া জায়েয নেই। কেননা এটা হি*ন্দু*দের ধর্মীয় দাওয়াত। আর কা*ফে*রদের ধর্মীয় দাওয়াতে শরিক হওয়া জায়েয নেই।” [ইমদাদুল আহকাম: ৭/১৮১]
সারকথা—অমুসলিমদের পূজা-উৎসবে অংশগ্রহণ
কিংবা শুভেচ্ছা জানানো হারাম এবং ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। সাহাবায়ে কেরাম এটিকে সরাসরি কুফরের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তাই আমাদের উচিত, ঈমান-আমল রক্ষা করতে এগুলো থেকে দূরে থাকা।
সংকলনে
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল