প্রচলিত ব্যাংকিং বা ব্যবসায়িক সুদ প্রসঙ্গে
মুহতারাম মুফতি সাহেব, ১নং প্রশ্ন: সুদ কি? সুদের বৈশিষ্ট্য গুলো কি কি? লেনদেন বা ব্যবসায়ের কোন কোন ক্ষেত্র সুদ বলে বিবেচিত হবে?
২ নং প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনে রিবা বা সুদ নিষিদ্ধকারী আয়াত রয়েছে। কিন্তু সুদ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও ধরা-বাধা কোন সংজ্ঞা নেই। ৫০% একটি অস্পষ্ট বিষয়কে ভিত্তি করে কিভাবে বর্তমানে প্রচলিত সুদকে নিষিদ্ধ বা হারাম করা যেতে পারে?
৩ নং প্রশ্ন: আজ থেকে ১৪৫০ বছর বা তারও পূর্বে, "সে সময় ব্যাংকের অস্তিত্ব ছিল না, ও সবধহ "বানিজ্যিক ঋণের ও” প্রচলন ছিল না। মানুষ তার খাওয়া-পরার চাহিদা পূরণের জন্য বাধ্য হয়েই কেবল ঋণ গ্রহণ করত। যদি এ তথ্য সঠিক হয়, তাহলে আধুনিক ব্যাংকিং সুদ নিষিদ্ধ হয় কিভাবে?
৪ নং প্রশ্ন :"সুদ" ও "মুনাফার" মধ্যে পার্থক্য কী?
৫ নং প্রশ্ন: সুদী ব্যাংক সুদের বিনিময়ে নগদ অর্থ ঋণ দেয় আর ইসলামী ব্যাংক নগদ টাকার পরিবর্তে "পণ্য" দিয়ে লাভ নেয়। এ দুটির মধ্যে প্রকৃত কোনো পার্থক্য আছে ? নাকি সুদী ব্যাংক সরাসরি সুদ খায় আর ইসলামী ব্যাংক ক্রয়-বিক্রয়ের নামে ঘুরিয়ে সুদ খায়, তাহলে পার্থক্য কোথায়?
৬ নং প্রশ্ন: কোনো সুদভিত্তিক বিদেশী ব্যাংকের সাথে লেনদেনে অনিচ্ছাকৃতভাবে সুদ এসে গেলে এ ব্যাপারে ইসলামী শরী'আহর নীতিমালা কি?
৭ নং প্রশ্ন : আল- অদী'য়াহ্ এবং আমানাহ্ এ দুটোর মাঝে পার্থক্য কী?
৮ নং প্রশ্ন: মুরাবাহা কী? মুয়াজ্জাল, বাই-সালাম, মুশারাকা, মুদারাবা, কী ?
৯ নং প্রশ্ন: ঋণ থেকে সুদের উদ্ভব হয়। আর বিনিয়োগ থেকে হয়: মুনাফা। ঋণ ও বিনিয়োগের মধ্যকার পার্থক্য বুঝিয়ে বলবেন।
[উল্লেখ্য: উপরোক্ত বিষয়গুলো পবিত্র কোরআনের "সুনির্দিষ্ট আয়াতসমূহ উল্লেখপূর্বক, হাদিস শরীফ (বুখারী, মুসলিম তিরমীযি) শরীফের "সুনির্দিষ্ট" হাদিসের উদ্ধৃতি উল্লেখ করলে বিশেষ উপকৃত হব।]
নিবেদক,
নাম: আহমদ
আলমপুর, হাসারা, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ,
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
কোরআন ও হাদিসের আলোকে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো উত্তর ধারাবাহিকভাবে প্রদত্ত:
প্রশ্ন ১: সুদ কি? এর বৈশিষ্ট্যগুলো কী? কোন কোন লেনদেন সুদ বলে বিবেচিত হবে?
সংজ্ঞা:-
সুদ (رِبَا) অর্থ বাড়তি/অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা, যা বিনিময়ের স্বাভাবিক ন্যায্যতার বাইরে অন্যের ক্ষতিতে নিজের লাভ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: وَأَحَلَّاللَّهُالْبَيْعَوَحَرَّمَالرِّبَا
“আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)
বৈশিষ্ট্যসমূহ:-
১. ঝুঁকি ছাড়াই লাভের গ্যারান্টি থাকে।
২. সময় বাড়লে মূল টাকার ওপর অতিরিক্ত টাকা ধার্য্য করা হয়।
৩. লেনদেনে কোনো প্রকৃত সম্পদ বা ব্যবসা যুক্ত থাকে না।
৪. এক পক্ষ সর্বদা লাভবান, অন্য পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যে ক্ষেত্রগুলোতে সুদ হয়:-
টাকা ঋণ দিয়ে সময়ের বিনিময়ে অতিরিক্ত টাকা নেয়া।
পণ্য বিনিময়ে ওজন/পরিমাণের বাড়তি নেয়া।
আধুনিক ব্যাংক ঋণের সুদভিত্তিক লেনদেন।
প্রশ্ন ২: কুরআনে সুদের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, তবুও হারাম কেন?
সুদের বিস্তারিত সংজ্ঞা আল্লাহ তাআলা ও রাসূল ﷺএর কথায় নির্দিষ্টভাবে এসেছে।
হাদীস: لَعَنَرَسُولُاللَّهِﷺآكِلَالرِّبَاوَمُوكِلَهُوَكَاتِبَهُوَشَاهِدَيْهِ
“রসূল ﷺসুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)
অতএব, কুরআনে মৌলিক নিষেধাজ্ঞা এসেছে (সূরা বাকারা: ২৭৫২৭৯), আর হাদীসে সুদী লেনদেনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ফলে আধুনিক ব্যাংকিং সুদও ঐ নীতির অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন ৩: ১৪৫০ বছর আগে ব্যাংক ছিল না, তাহলে আধুনিক সুদ কেন হারাম?
ইসলামী শরীয়াহর নীতিমালা "কারণ" (علة) নির্ভরশীল। সুদের মূল কারণ হলো ঝুঁকিহীন বাড়তি অর্থ আদায় করা।
ব্যাংক ঋণেও একই জিনিস বিদ্যমানঋণের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময় পর বাড়তি অর্থ নেওয়া হয়। সুতরাং ব্যাংকীয় সুদও কুরআন-হাদীসে বর্ণিত রিবার (সুদের) অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ বলেন: وَإِنْتُبْتُمْفَلَكُمْرُءُوسُأَمْوَالِكُمْ
“যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধনই তোমাদের হবে।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৯)
অতএব, ব্যাংক না থাকলেও নীতি একই থাকবে।
প্রশ্ন ৪: সুদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য
সুদ: ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, যেখানে ব্যবসার কোনো ঝুঁকি নেই।
মুনাফা: ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্জিত বৈধ লাভ, যেখানে ঝুঁকি ও শ্রম রয়েছে।
রাসূল ﷺবলেন: التَّاجِرُالصَّدُوقُالْأَمِينُمَعَالنَّبِيِّينَ
“সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী নবী-রাসূলদের সঙ্গী হবে।”(তিরমিযী, হাদীস: ১২০৯)
প্রশ্ন ৫: ইসলামী ব্যাংক ও সুদী ব্যাংকের পার্থক্য কি?
সুদী ব্যাংক: নগদ টাকা ঋণ দিয়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ আদায় করে।
ইসলামী ব্যাংক: মাল (পণ্য) ক্রয়-বিক্রয়, মুরাবাহা, মুদারাবা, মুশারাকা ইত্যাদি শরীয়তসম্মত চুক্তির মাধ্যমে লাভ অর্জন করে।
মূল পার্থক্য: ইসলামী ব্যাংকে বেচা-কেনার বাস্তবতা থাকে, সুদী ব্যাংকে থাকে না। তবে বাস্তবে কিছু ইসলামী ব্যাংক ভুল প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সেটি শরীয়াহসম্মত হবে না।
প্রশ্ন ৬: অনিচ্ছাকৃতভাবে সুদ আসলে করণীয় কি?
যদি বিদেশী ব্যাংকের সাথে লেনদেনে অনিচ্ছাকৃতভাবে সুদ এসে যায়, তাহলেÑসুদ ভোগ করা যাবে না। বরং তা দান করে দিতে হবে (কোনো গরীবকে, কিন্তু সওয়াবের নিয়ত ছাড়া)।
হাদীস: فَمَنْجَاءَهُمَوْعِظَةٌمِنْرَبِّهِفَانْتَهَىفَلَهُمَاسَلَفَ
“যার কাছে তার প্রভুর উপদেশ পৌঁছল এবং সে বিরত হল, তার অতীত ক্ষমা করা হবে।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৫)
প্রশ্ন ৭: আল-অদী‘য়াহ্ ও আমানাহ্ এর পার্থক্য
أَدِيَّة (ঋণ/উধুহ): কারো নিকট পাওনা, যা ফেরত দেয়া বাধ্যতামূলক।
أمانة (অসধহধয): কারো কাছে রাখা বস্তু, যা যথাস্থানে পৌঁছে দেয়া ওয়াজিব।
প্রশ্ন ৮: মুরাবাহা, মুয়াজ্জাল, বাই-সালাম, মুশারাকা, মুদারাবা কাকে বলে?
১. মুরাবাহা: মূল দাম + সম্মত লাভ যোগে বিক্রি।
২. মুয়াজ্জাল: কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করা।
৩. বাই-সালাম: অগ্রিম দাম নিয়ে পরবর্তীতে পণ্য সরবরাহ।
৪. মুশারাকা: উভয় পক্ষ পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করা।
৫. মুদারাবা: এক পক্ষ পুঁজি দেয়, অপর পক্ষ শ্রম দেয়; লাভ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়।
প্রশ্ন ৯: ঋণ ও বিনিয়োগের পার্থক্য
ঋণ: টাকা ধার দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর নির্দিষ্ট পরিমাণ ফেরত নেওয়া। (এখান থেকে সুদের জন্ম হয়)
বিনিয়োগ: মূলধন ঝুঁকিতে রেখে ব্যবসা করা, যেখানে লাভ-ক্ষতি উভয়ই হতে পারে।
হাদীস: الخَرَاجُبِالضَّمَانِ“লাভ সেই পাবে, যে ক্ষতির ঝুঁকি নেবে।” (সুনান তিরমিযী, হাদীস: ১২৮৫)
الادلة الشرعية [البقرة: ٢٧٥] وَأَحَلَّ
اللّٰهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا) ) [البقرة: ٢٧٦] ﴿يَمْحَقُ
اللّٰهُ الرِّبٰوا وَيُرْبِي الصَّدَقٰتِ وَاللّٰهُ لاَ يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ
أَثِيمٍ﴾ [البقرة: ٢٧٨] ﴿يَا أَيُّهَا
الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبٰوا إِنْ
كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾ [البقرة: ٢٧٩] ﴿فَإِنْ لَمْ
تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللّٰهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ
فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ﴾ [صحيح مسلم،
كتاب المساقاة، باب لعن آكل الربا ومؤكله، رقم: 1598] لعنرَسُولُ
اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ
سَوَاءٌ [البيهقي
الكبرى، كتاب البيوع، باب التغليظ في أكل الربا، رقم: 10475] رهم رِبًا
يَأْكُلُهُ الرَّجُلُ وَهُوَ يَعْلَمُ أَشَدُّ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ سِتٍّ
وَثَلَاثِينَ زَنْيَةً [سنن ابن ماجه،
كتاب التجارات، باب التغليظ في الربا، رقم: 2274] رِّبَا ثَلاثَةٌ وَسَبْعُونَ بَابًا، أَيْسَرُهَا مِثْلُ أَنْ يَنْكِحَ
الرَّجُلُ أُمَّهُ [الفتاوى
الهندية، كتاب البيوع، ج: ٢، ص: ١٨٩] "الرِّبَا
مُحَرَّمٌ بِالنَّصِّ فِي الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالإِجْمَاعِ، وَهُوَ مِنَ
الْكَبَائِرِ، وَالْمُرَابِي مُسْتَحِقٌّ لِلْعِقَابِ الشَّدِيدِ." [الفتاوى
التاتارخانية، كتاب الكراهية، ج: ١٨، ص: ٤٧١] "اعْلَمْ أَنَّ
الرِّبَا حَرَامٌ فِي كُلِّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا، وَهَذَا مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
بَيْنَ الْفُقَهَاءِ، وَهُوَ الْمُعْتَمَدُ." [رد المحتار،
كتاب البيوع، ج: ٥، ص: ٢٣٤] "الرِّبَا فِي
الْقُرُوضِ أَنْ يَشْتَرِطَ الزِّيَادَةَ فِي الْمَبْلَغِ، وَهُوَ حَرَامٌ
بِالإِجْمَاعِ، وَيُعَدُّ مِنَ الْمُهْلِكَاتِ." [المبسوط، كتاب
البيوع، ج: ١٤، ص: ٢٤] "وَالرِّبَا
فَاسِدٌ فِي جَمِيعِ أَنْوَاعِ الْمُعَامَلَاتِ، وَالأَصْلُ فِيهِ قَوْلُهُ
تَعَالَى (وَحَرَّمَ الرِّبَا) وَقَدْ ثَبَتَتْ حُرْمَتُهُ بِالسُّنَّةِ أَيْضًا." [بدائع الصنائع،
كتاب البيوع، ج: ٥، ص: ١٨٧] "الرِّبَا مِنْ
أَشَدِّ الْمَعَاصِي، وَهُوَ ظُلْمٌ بَيِّنٌ، لأَنَّ فِيهِ أَخْذَ الْمَالِ بِلاَ
عِوَضٍ."
و الله اعلم بالصواب كتبه المجلس المشترك للإفتاء بمعهد الفقه الاسلامي داكا. بنغلاديش