আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ, হুজুর।আমি আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ও শরিয়াহসংক্রান্ত বিষয়ের সঠিক সমাধান জানতে চাই। দয়া করে আমার পুরো ঘটনা শুনে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে, বিশেষ করে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, আমাকে সঠিক মাসআলাটি জানাবেন।
১. প্রথম স্বামীর তালাকের ঘটনা: গত ১৫ সেপ্টেম্বর আমার স্বামী রাগের মাথায় এক নিঃশ্বাসে একই সময়ে আমাকে তিনবার “তালাক, তালাক, তালাক” বলেন। এটি ছিল আমার প্রতি তাঁর প্রথম তালাক। এর আগে তিনি কখনো আমাকে তালাক দেননি। ঘটনার সময় তিনি কী বলছেন, তা বুঝতে পারছিলেন।
২. পরের দিন মুফতির সঙ্গে কথা বলা: ১৬ সেপ্টেম্বর আমরা একজন মুফতির সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাদের হিল্লা বিয়ের বিষয়ে পরামর্শ দেন। তাঁর কথা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। আমার স্বামীও আমাকে আবার সংসারে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে তিনি রাগের মাথায় তালাক দিয়েছেন, কথাগুলো ফিরিয়ে নিতে চান এবং আবার নতুন করে সংসার করতে চান।
৩. দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা: ১৯ সেপ্টেম্বর আমি একজন অন্য পুরুষকে বিয়ে করি। ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমার স্বামীর সরাসরি কথা হয়নি; আমি নিজেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমাকে বিয়ে করে পরের দিন তালাক দিতে হবে। আমার প্রথম স্বামীও শর্ত দিয়েছিলেন, আমি পরের দিন ফিরে না এলে তিনি আর আমার সঙ্গে সংসার করবেন না।
এইভাবে আমি এক দিনের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করি এবং পরের দিন প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে আসি। দ্বিতীয় বিয়েতে আমার শারীরিক সম্পর্কও হয়েছিল। পরে দ্বিতীয় স্বামী আমাকে তালাক দেন। আমরা তখন আগের মুফতির পরামর্শ বুঝে উঠতে না পেরে তাড়াহুড়া করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
৪. আমার বর্তমান প্রশ্নগুলো:
১. আমার প্রথম স্বামীর একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার কারণে শরিয়াহ অনুযায়ী কয়টি তালাক কার্যকর হয়েছে?
২. দ্বিতীয় বিয়েতে আগে থেকেই পরের দিন তালাক দেওয়ার শর্ত থাকায়, সেই বিয়ে কি শরিয়াহ অনুযায়ী সহিহ হয়েছিল?
৩. এই দ্বিতীয় বিয়ে কি আমার প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে করার জন্য শরিয়াহসম্মতভাবে যথেষ্ট হয়েছে?
৪. বর্তমানে আমি কি আমার প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন করে নিকাহ করে সংসার করতে পারব, নাকি আমাদের একসঙ্গে থাকা শরিয়াহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ হবে?
৫. দ্বিতীয় স্বামীর তালাকের পর ইদ্দত এবং পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে আমার কী বিধান রয়েছে?
হুজুর, আমরা আগে একজন মুফতির পরামর্শ অনুযায়ী কাজটি করেছিলাম, কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। এখন আমরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সঠিকভাবে চলতে চাই। আমাদের ভুল হয়ে থাকলে তার শরিয়াহসম্মত সমাধান কী, সেটিও দয়া করে জানাবেন।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী আমার প্রথম স্বামীর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়া প্রার্থনা করছি।জাযাকাল্লাহু খাইরান।
الجواب بملهم الصدق والصواب
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক গ্রহণযোগ্য মত অনুসারে, একসাথে এক বাক্যে বা এক নিঃশ্বাসে স্বামী যদি স্ত্রীকে রাগান্বিত অবস্থায় তিন তালাক দেয়, তাহলে তিন তালাকই পতিত হয়।
এক,দুই, তিন নং প্রশ্নের উত্তর
সুতরাং, প্রশ্ন বর্ণনা অনুযায়ী আপনার স্বামী কর্তৃক আপনাকে যে তিন তালাক দেওয়া হয়েছে, এই কারণে আপনার ওপর তিন তালাকই ( তালাকে মুগাল্লাযা) পূর্ণ হয়ে গেছে এবং আপনারা একে অপরের জন্য হারাম হয়ে গেছেন। শরিয়তসম্মত হালালা ছাড়া পুনরায় সংসার করতে পারবেন না।তথা অন্য কোথাও স্ত্রীর বিয়ে হয় এবং ঘর-সংসার হয়, সেই স্বামী কোনো কারণে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন কিংবা মারা যান, তখন দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুজনিত ইদ্দত পালনের পর নতুনভাবে মোহর নির্ধারণ করে শরিয়তসম্মত পন্থায় প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন। এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
আর প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় হালাল হওয়ার শরয়ি শর্ত হলো তারাকের পর ঈদ্দত আদায় শেষে একটি সহিহ ও শরিয়তসম্মত দ্বিতীয় বিয়ে সম্পাদন হওয়া এবং তাতে শারীরিক সম্পর্ক হওয়া তারপর স্বেচ্ছায় তালাক প্রদান অতঃপর পুনরায় ইদ্দত আদায় শেষে প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বসতে পারবেন অন্যথায় নয়।
কিন্তু ফলাফল: যেহেতু প্রথম স্বামীর তালাকের পর ইদ্দত না মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করা হয়েছিল, তাই বিয়েটি ফাসিদ ছিল। যেহেতু ইদ্দত বিষয় না জেনে শুনে এমন বিবাহ হয়েছে বিধায় এমন বিবাহের ক্ষেত্রে মুতারাকাত অবশ্যক তথা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়া জরুরী সেটা হয়তো কাজীর মাধ্যমে হবে স্বামী স্ত্রীকে এমন শব্দ বলবে যার দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদ বুঝায় যেমন আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম অথবা তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটাবে অথবা এক তালাক দিয়ে দিবে । যেহেতু এই বিবাহে সহবাস হয়েছে হালাল মনে করে বিধায় যথা নিয়মে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর পাশাপাশি ইদ্দত ও আবশ্যক হবে এটাই শরিয়াতের বিধান। যেহেতু বিয়ে টি হয়নি তাই আপনার দ্বিতীয় বিয়েটি প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হওয়ার জন্য শরিয়তসম্মতভাবে আদায় হয়নি।
চার , পাঁচ নং উত্তর:
এখন করুনীয় হলো: তাৎক্ষণিক পৃথক হওয়া বাধ্যতামূলক: আপনি এবং আপনার প্রথম স্বামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এখন সম্পূর্ণ বেগানা (পরপুরুষ ও পরনারী)। তাই এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে আপনাদের অবিলম্বে পৃথক হয়ে যেতে হবে। বর্তমানে একসাথে থাকা বা সহবাস করা সরাসরি ব্যভিচার (যিনা) হিসেবে গণ্য হবে। এবং নতুন করে আকদ করলেও বিয়ে হবে না: যেহেতু তাহলীল (দ্বিতীয় বৈধ বিয়ে ও বিচ্ছেদ) সঠিকভাবে আদায় হয়নি, তাই এখন ইদ্দত শেষ করে নতুন করে আকদ/বিয়ে করলেও প্রথম স্বামীর সাথে সংসার করা সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ থাকবে।।
প্রথম স্বামীর নিকট ফেরার একমাত্র শরয়ি উপায়: এখন নতুন করে তালাকের ইদ্দত সম্পূর্ণ শেষ হতে হবে। এরপর সম্পূর্ণ শর্তহীন ও স্বাভাবিকভাবে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বৈধ বিয়ে (নিকাহ) হতে হবে।সেই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক হতে হবে।পরবর্তীতে কোনো কারণে স্বাভাবিক বিচ্ছেদ বা দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যু হতে হবে। দ্বিতীয় স্বামীর তালাক/মৃত্যুর ইদ্দত সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর কেবল প্রথম স্বামীর সাথে নতুন করে নিকাহ হতে পারবে। উল্লেখ্য: কোনো ধরণের চুক্তি বা কন্ট্রাক বিয়ে হতে পারবে না।
বিঃদ্রঃ না বুঝে শরিয়তের ইদ্দতের মতো স্পর্শকাতর বিধান লঙ্ঘন করা এবং অবৈধ সহবাসে লিপ্ত থাকার কারণে আপনাদের উভয়কে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে খাঁটি মনে তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।
الأدلة الشرعية
سورة البقرة (٢٣٠)
فان طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره
. الدر المختار مع رد المحتار، ٥/٢٠٢، دار إحياء التراث العربي:
غَيْرِ الْآيِسَةِ وَالْحَامِلِ) فَإِنَّ عِدَّتَهُمَا بِالْأَشْهُرِ وَالْوَضْعِ، (الْحَيْضُ لِلْمَوْتِ) أَيْ: مَوْتِ الْوَاطِئِ، (وَغَيْرِهِ) كَفُرْقَةٍ أَوْ مُتَارَكَةٍ، وَالْمُتَارَكَةُ أَيْ: إِظْهَارُ الْعَزْمِ مِنَ الزَّوْجِ عَلَى تَرْكِ وَطْئِهَا، بِأَنْ يَقُولَ بِلِسَانِهِ: تَرَكْتُكِ بِلَا وَطْءٍ وَنَحْوِهِ، وَمِنْهُ الطَّلَاقُ.
السنن الكبرى للبيهقي (١٤٤٩٢)
قال حسن : لولا اني سمعت ابي يحدث عن جدي النبي صلى الله عليه وسلم : من طلق امراته ثلاثا لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره
المصنف لابن ابى شيبة(١٨٠٨٧)
عن واقع بن سحبان قال سئل عمران بن حصين رضي الله عنه عن رجل طلق امراته ثلاثا في مجلس قال اثم بربه و حرمت عليه امراته
الهداية (٢/١٣٢)
وان كان الطلاق ثلاثا في الحرة او ثنتين في الامة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا ويدخل بها ثم يطلقها او يموت عنها
سنن الترمذي ١/٢٢٦
عن ابي هريره رضي الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كل طلاق جائز الا طلاق المعتوه المغلوب على عقله
رد المحتار ٤/٤٣٩ مكتبة الازهر
فالذي ينبغي التعويل عليه في المدهوش نحوه اناطة الحكم بغلبة الخلل فى اقواله وافعاله الخارجة عن عادته وكذا يقال فيمن اختل عقله لكبر او لمرض اولي مصيبه فاجاءته فما دام في حال غلبة الخلل في الاقوال والافعال لا تعتبر اقواله وان كان يعلمها ويريدها لان هذه المعر فة غير معتبرة لعدم حصوليا عن ادراك صحيح
وفيه ايضا
وللحافظ ابن القيم الحنبلي رسالة في طلاق الغضبان قال فيها انه على ثلاثة اقسام الثاني ان يبلغ النهاية فلا يعلم ما يقول ولا يريده فهذا لا ريب انه لا ينفذ شيئا من اقواله
:الفتاوى الهندية ١/٤٧٠
اذا طلق الرجل امراته تطليقة رجعية وتطليقتين فله ان يراجعها في عدتها رضيت بذلك او لم ترض
الهداية ٢/٣٩٥
الرجعه ان يقول راجعتك او راجعت امراتي
رد المحتار ٥/١٣٥
وان راجعتها بالفعل مثل ان يطاها او يقبلها او ينظر الى فرجها بشهوة فانه يصير مراجعا عندنا
الهداية (٢/١٣٢)
وان كان الطلاق ثلاثا في الحرة او ثنتين في الامة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا ويدخل بها ثم يطلقها او يموت عنها
سنن أبي داود: }٢١٩٤ /سنن الترمذي: ١١٨٤{
ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ، وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
و
الله اعلم بالصواب উত্তর প্রদানে মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা