ফিকহ তালাক

এক তালাকের পর কীভাবে রুজু করবেন? রজঈ তালাকের পূর্ণ শরয়ী বিধান

আসসালামু আলাইকুম জনাব, আমি একজন পুরুষ মানুষ। আমার বাড়ি সিলেট। আমার নাম আহমদ, আমি একটি প্রাইভেট জব করি। গত বছর আমার স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে যায়, সাথে আমার একমাত্র ছেলে সন্তানকে নিয়ে যায়। আমি এবং আমার পরিবার, মুরুব্বী অনেক চেষ্টা করেও ঘরে ফেরত আনতে ব্যর্থ হই। পরবর্তীতে সকলের পরামর্শে লিখিতভাবে আমি এক তালাক এর একটি চিঠি পাঠাই। কিন্তু এতে আমার স্ত্রীর মধ্যে কোনরকম পরিবর্তন হয়নি। আমি এক তালাকে চিটি দিয়েছিলাম এই জন্যে হয়তো এটা দেখে ওর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে। এদিকে তিন ইদ্দত শেষ হলে বিয়ে ভেঙ্গে যাবে তাই আমি মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী সুলভ কথা বলে ওকে ফিরিয়ে নেই। তারপর অনেক যোগাযোগ করে চেষ্টা করে আবার ব্যর্থ হই। এভাবে কয়েক মাস যাবার পর অনেকের পরামর্শে সরকারিভাবে সিটি কর্পোরেশন এর কাছে তালাকের আবেদন করি। এখানে উল্লেখ্য যে তালাকের নিয়তে নয় ভয় দেখানোর জন্য সিটি কর্পোরেশনের দ্বারস্থ হওয়া। সিটি কর্পোরেশন এর নিয়ম অনুযায়ী তালাকের আবেদন করার পর উভয় পক্ষকে তিনটি নোটিশ পাঠায়। প্রত্যেক নোটিশ পাবার পর ৭ দিনের ভিতরে একজন গার্ডিয়ানসহ সিটি কর্পোরেশন এ হাজিরা দিতে হয় যেটি আমি বা আমার স্ত্রী কেউই দেই নাই। দ্বিতীয় চিঠি পাওয়ার পর আমার স্ত্রীর সাথে সিটি কর্পোরেশন থেকে যোগাযোগ করা হলে আমার স্ত্রী ওদেরকে জানায় আমাদের মধ্যে আপোষ হয়ে গেছে এবং আমরা একসাথে থাকতেছি। পরবর্তীতে আমি সিটিতে গেলে উক্ত বিষয় আমাকে অবহিত করা হয় এবং আমি এর জবাবে বলি এটি মিথ্যে কথা। সিটি থেকে আমাকে জিজ্ঞেস করা হলে আমি বলি এটা কার্যকর করার জন্য তালাকের বিষয়টি। আবার উনারা আমার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলেন আপনার স্বামী বলেছেন তালাক কার্যকর করার জন্য। কিন্তু এটি আমি ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে উনাদেরকে দিয়ে কল দেওয়াই। আমার মনে কখনোই তালাক দেয়ার নিয়ত ছিল না। এক জুলাই আমি তিন নাম্বার নোটিশ পাই। সিটি কর্পোরেশন এর কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন যেহেতু আমি তালাকের আবেদন করেছি, তাই আমি যদি গিয়ে হাজির হয়ে সাইন দিয়ে আসি  তাহলেও তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। আর যদি সাইন না দেই তাহলে হবে না। এখন জনাব আমার প্রশ্ন আমি তো আগে এক তালাক দিয়েছি, পরবর্তীতে আবার সিটি কর্পোরেশন এর মাধ্যমে নোটিশ যায়। এখন কি আমাদের মধ্যে তালাক হয়ে গেছে কিনা। আমি জুলাই এক তারিখে তিন নাম্বার নোটিশ পাই। এটাতে লেখা ছিল তিন নাম্বার নোটিশ এবং চিঠি পাওয়ার সাত দিনের ভিতর যোগাযোগ করার জন্য। এখন যদি আমাদের মধ্যে তালাক না হয় আর আমিও যদি সাত দিনের ভিতর তালাকের আবেদন প্রত্যাহার করে তাহলে কি আমাদের বিবাহ থাকবে? আর আমাদের মধ্যে কয় তালাক উদিত হইছে দয়া করে দ্রুত জানাবেন

 


الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب

       ইসলামী বিধান মতে তালাক একটি  নিকৃষ্ট গর্হিত  বৈধ কাজ অতি প্রয়োজন ব্যতীত শরীয়ত তালাক দেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত   করে তথাপি  কোন ব্যক্তি যদি কারণে অকারনে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় লিখিত বা  মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে দেয় তাহলে সংখ্যা  অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যায়।

     সুতরাং প্রথমত: আপনি পূর্বে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট ভাষায় লিখিত এক তালাক প্রদান করেছিলেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর দ্বারা একটি রজঈ তালাক সংঘটিত হয়েছে।আর আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই আপনি মেসেজের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছেন এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।"আমি তোমাকে রুজু করলাম", "আমি তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নিলাম"এ ধরনের সুস্পষ্ট বাক্য উচ্চারণ করলে রুজু হয়ে যাবে। আবার, রুজুর নিয়তে স্বামী-স্ত্রী সহবাস করলে অথবা সহবাসের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ঘনিষ্ঠ আচরণ (যেমন কামভাবসহ স্পর্শ বা চুম্বন) করলে, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাতেও রুজু হয়ে যায়। যদি ইদ্দতের মধ্যেই রুজু সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনরায় বহাল হয়েছে। তবে এক তালাক ব্যবহৃত হয়েছে, অবশিষ্ট রয়েছে দুই তালাক।

উল্লেখ্য : আপনি সিটি কর্পোরেশনে যে আবেদন করেছেন, আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সেটি তালাক কার্যকর করার জন্য নয়।বরং পারিবারিকভাবে সমাধান ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

আর আপনি যে তিনটি নোটিশ দিয়েছেন, সেগুলোতে কোথাও নতুন করে তালাকের ঘোষণা নেই। বরং সেখানে উভয় পক্ষকে সালিশি বোর্ডে উপস্থিত হয়ে মীমাংসার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। এগুলো প্রশাসনিক নোটিশ মাত্র। অতএব, শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশনের নোটিশ জারি হওয়া, তিনটি নোটিশ পাওয়া, কিংবা হাজির না হওয়ার কারণে শরীয়তের দৃষ্টিতে নতুন কোনো তালাক সংঘটিত হয় না।

 


সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা যে বলেছেন—"সাইন করলে তালাক হবে, সাইন না করলে হবে না"—এটি শরয়ী বিধান নয় বরং শরীয়তে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে শরয়ী পদ্ধতিতে তালাক প্রদান আবশ্যক। লিখিতভাবে অথবা মৌখিকভাবে। সুতরাং, আপনার বর্ণিত তথ্য এবং প্রদত্ত নোটিশসমূহের ভিত্তিতে আপনাদের মধ্যে দ্বিতীয় কোনো তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে প্রমাণিত হয় না। যদি অন্য কোনো সময় আপনি নতুন করে তালাকের শব্দ উচ্চারণ বা লিখে না থাকেন, তাহলে বর্তমানে একটি তালাক গণ্য হবে, দুইটি তালাক অবশিষ্ট থাকবে এবং বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকবে।

 

الادلة الشرعية

الدر المختار (٤/٥٢٦)

كنايته عند الفقهاء ما لم يوضع له اى الطلاق واحتمله و غيره

الفتاوى الهندية ١/٤٧٠

         اذا طلق الرجل امراته تطليقة رجعية وتطليقتين فله ان يراجعها في عدتها رضيت بذلك او لم ترض

الهداية ٢/٣٩٥

        الرجعه ان يقول راجعتك او راجعت امراتي

رد المحتار ٥/١٣٥

       وان راجعتها بالفعل مثل ان يطاها او يقبلها او ينظر الى فرجها  بشهوة فانه يصير مراجعا عندنا

بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع ٤/٢٧١/مكتبة العتيق

       أما الصريح : فهو اللفظ الذي لا يُستعمل إلا في حل قيد النكاح، وهو لفظ الطلاق أو التطليق مثل قوله : أنت طالق أو أنت الطلاق، أو طلقتك، أو أنتِ مُطَلَقةٌ مُشَدِّدًا ، سُمِّي هذا النوع صريحًا؛ لأن الصريح في اللغة اسم لما هو ظاهر المراد . المراد مكشوف المعنى  عند السامع  من قولهم  : صرح فلان بالامر اي كشفه  واوضحه

باسمہ سبحانہ تعالی

 

মুফতী আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

মুফতী ,ফাতাওয়া ও মাসায়েল

মুফতিমাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদদক্ষিণখানঢাকা

 


📋 ফতোয়া পর্যালোচনা ও অনুমোদন:

অনুমোদিত ফতোয়া দ্বারা: fatwamasail.com ফতোয়া board ও উপদেষ্টা প্যানেল

* এই সমাধানটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি অনুযায়ী মুফতি শরীফ মালিক (প্রধান মুফতি) এবং ফতোয়া পর্যালোচনা প্যানেল দ্বারা কিতাবের সুস্পষ্ট রেফারেন্সসহ সম্পাদিত ও অনুমোদিত।

০৪ জুলাই ২০২৬