শয়তানের ওয়াসওয়াসা, অনিচ্ছাকৃত সন্দেহ ও “তালাক দিলাম” উচ্চারণ দ্বারা তালাক হবে?
প্রশ্ন: এক ব্যক্তি শুক্রবার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে গেছেন। ইমাম তালাকের উপর মাসায়েল বর্ণনা করেন। এরপর থেকে তার মনে বিষয়টি ঢুকে পড়ে। নামাজ শেষে মনে জাগ্রত হয়, তাদের মধ্যে ( স্বামী-স্ত্রী’র) মধ্যে সম্পর্ক নেই। তাদের মধ্যে ‘ছাড়াছাড়ি’ হয়ে গেছে।মনে জাগ্রত বিষয়টি নিয়ে তার ব্যাপক টেনশন হয়। (যদিও তিনি মাসায়েল শোনার আগে কখনো স্ত্রীকে তালাক দেওয়া তো দুরের কথা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনাও করেননি।)রাতে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইলে টেনশনের বিষয়টি নিয়ে শেয়ার করেন। বলেন, তালাকের মাসায়েল শোনার পর নানান কু-চিন্তা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।তার স্ত্রী তাকে বলেন, তুমি কি আমাকে (স্ত্রী) তালাক দেবে ?উত্তরে স্বামী বলেন- খবরদার, এ ধরণের কথা মুখেও আনবে না। জীবন থাকতে তোমাকে কখনোই ওটা (তালাক ইঙ্গিত করে) দেব না।তখন স্ত্রী বলেন, কেন হুজুর আর কিছু বলেন নাই; ( মোবাইলে স্ত্রীকে কিস দেওয়াকে ইঙ্গিত করে)।এরপর অন্যান্য বিষয়ে কথা হয়। শেষে ফোন কেটে দেওয়ার আগ মুহুর্তে স্বামী নিজের অজান্তে মনে মনে ( ঠোট, জিহ্বা, দাত, মুখ না নাড়িয়ে) বলেন ‘ ঠিকাছে তোমাকে দিলাম’। এরপর ফোনের সংযোগ কেটে দেন।মোবাইলে কথা বলার কিছু সময় পর স্বামীর মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন- শেষে মনে মনে কি বলেছেন। ‘তোমাকে’; না ‘তালাক’ কোন শব্দ বলেছে। এ নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›েদ্ধ পড়ে যান রীতি মতো। মনে মনে ভাবতে শুরু করেন-“ ‘ ঠিকাছে তোমাকে দিলাম’ না কি ‘ঠিকাছে তালাক দিলাম’ কোনটা বলেছে। ঠিকাছে তোমাকে দিলাম- এটাই বলেছি। ঠিকাছে তালাক দিলাম- এটা বলেনি।” এ বাক্যগুলো মনে মনে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন।সকালে ঘুম থেকে উঠার পর আবার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। কখনো মনে মনে, আবার কখনো ( ঠোট, জিহ্বা, দাত, মুখ নাড়িয়ে) শব্দবিহীন ভাবে বাক্য দুটি জপতে থাকেন, ‘ঠিকাছে তোমাকে দিলাম’ না কি ‘ঠিকাছে তালাক দিলাম’- কোনটা বলেছি। ঠিকাছে তোমাকে দিলাম- এটাই বলেছি। ঠিকাছে তালাক দিলাম- এটা বলেনি।” ভাবনার সময় (কানে এমনি এমনি মোবাইল ধরে রাতে বাক্যটি মনে মনে বলার সময় কিভাবে বলেছেন সেটা ধিয়ানোর) এক পর্যায়ে মুখে মিন মিন কন্ঠে একবার উচ্চারণ করে ফেলেন- “ ‘ ঠিকাছে ‘তো-মা-কে’ দিলাম’। ‘ঠিকাছে ‘তা-লা-ক’ দিলাম’।”কিছু সময় নিয়ে পৃথক বাক্য দুটি উচ্চারণ করা শেষ হতেই তার স্ত্রী তাকে ফোন দেয়। ফলে এবার আর কোনটা বলেছে, কোনটা বলেনি উচ্চারণ করতে পারে না।ফোনে কথা বলা শেষে আবার টেনশন শুরু হয়- কি বলেছেন। বিষয়টি নিয়ে বেচারা ব্যাপক মানসিক যন্ত্রণায় আছেন, এ কারণে যে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন কি না- ভাবনার সময় মুখে ‘‘ ‘তালাক’ দিলাম” উচ্চারণ করার তার স্ত্রীর উপর কোন তালাক পতিত হয়েছে কি না?প্রসঙ্গত, তিনি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কিম্বা তার নাম ধরেও কিংবা ইঙ্গিত করে শব্দ দুটি (তালাক দিলাম) বলেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল- কোন শব্দটি মনে মনে বলেছিলেন- ‘তোমাকে’; না ‘তালাক’ এটা নিশ্চিত হওয়া।ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোরআন-হাদীসের মাসায়েল কী? জানালে খুবই উপকার হয়।স্বামী ঢাকায়, আর স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে থাকেন। প্রসঙ্গত: ব্যক্তিটি যখন একা একা থাকেন ( রুমে কেউ থাকে না), তখন যে কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা মিন মিন্ কন্ঠে করেন ( একা একাই বিড়বিড় করে কথা বলেন ( চিন্তার বিষয়ও)। এটা তার পুরাতন অভ্যাস। বিষয়টি নিয়ে তিনি কামিল মাদ্রাসার একজন অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন- স্পষ্ট করে না বললে তালাক হয় না। স্বাক্ষীরও দরকার হয়। কিন্তু তার মন থেকে সন্দেহ দুর হচ্ছে না তার। দিনে দিনে ওয়াসওয়াসাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি জানতেনও না- ‘তালাক’ উচ্চারণ করলেই তালাক হয় কি না। প্রশ্ন হলো- ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেছে কি না- ভাবনার সময় ‘তালাক দিলাম’ উচ্চারণে কি তালাক হয়?
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
ইসলামিক শরীয়াহ মোতাবেকউল্লিখিত পরিস্থিতিতে আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাকই সংঘটিত হয়নি। কারণ এখানে তালাকের জন্য যে স্পষ্ট উচ্চারণ, নিশ্চিত ইচ্ছা বা দৃঢ় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন—তার কিছুই পাওয়া যায়নি। বরং পুরো ঘটনাটি সন্দেহ, কল্পনা এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসার অন্তর্ভুক্ত।
শরীয়তের মূলনীতি হলো—সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক প্রমাণিত হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ বা নিশ্চিতভাবে তালাকের ইচ্ছা প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ তালাক কার্যকর হয় না।অতএব এই ধরনের চিন্তা নিয়ে অহেতুক উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোকে গুরুত্ব দিলে মানসিক কষ্ট আরও বাড়বে।
করণীয় হলো—এই ধরনের ওয়াসওয়াসা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা, তালাক বিষয়ক চিন্তা থেকে দূরে থাকা এবং মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
আরো পড়ুন :হায়েজ অবস্থায় এক বৈঠকে তিন তালাকের বিধান
আরো পড়ুন :ওয়াসওয়াসাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক: কার্যকর নাকি বাতিল?
আরো পড়ুন :ওসিডি ব্যাক্তি রাগের মাথায় স্ত্রীকে “ডিভোর্স, ডিভোর্স, ডিভোর্স” বললে কি তালাক হয়ে যায়?
আরো পড়ুন :রাগান্বিত অবস্থায় তিন তালাকের বিধান
আরো পড়ুন : হিল্লা বিয়ের পর প্রথম স্বামী কি হালাল হয়?
الأدلة الشرعية
(الأشباه والنظائر ص: ١٠٨، جديد ص: ١٩٦)
منها شك هل طلق أم لا لم يقع
(بدائع الصنائع، كتاب الطلاق ٣/١٢٦، جديد ٣/١٩٩)
عدم الشك من الزوج في الطلاق وهو شرط الحكم بوقوع الطلاق حتى لو شك فيه لا يحكم بوقوعه
(الفقه الإسلامي وأدلته، كتاب الطلاق ٧/٣٦٨)
يشترط بالاتفاق القصد في الطلاق، وهو إرادة التلفظ به ولو لم ينو فلا يقع طلاق
(فتح القدير، كتاب الطلاق ٤/٤)
ولو كرر مسائل الطلاق بحضرة زوجته ويقول: أنت طالق ولا ينوي طلاقا لا تطلق
والله تعالى أعلم بالصواب
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল