অনলাইনে বিজনেস—হালাল নাকি হারাম? শরিয়তের চূড়ান্ত ফয়সালা
অনলাইনে বিজনেস কি বৈধ?
অনলাইন বিজনেসে পণ্য যদি বিক্রেতার মালিকানাধীন না হয় এবং তিনি কেবল সেই পণ্য বিজ্ঞাপন, চিত্র দেখিয়ে কারো কাছে বিক্রি করে (অর্থাৎ, চুক্তি করার সময় এ কথা বলে যে—‘অমুক জিনিষ আমি আপনাকে এত টাকায় দিবো, ইত্যাদি) এবং পরবর্তীতে সেই পণ্য অন্য কোনো দোকান, স্টোর অথবা শপ থেকে ক্রয় করে ওই ক্রেতার কাছে পার্সেল করে দেয়। সুতারাং উক্ত অবস্থায় বিক্রেতার মালিকানায় পণ্য বিদ্যমান না থাকার দরুন এ বিক্রয় জায়েয নয়।
এজন্য শরয়ীভাবে যে পণ্য বিক্রেতা বিক্রি করতে চাইবে, সেটা তার মালিকানায় বিদ্যমান থাকা জরুরি। হাদিস নববীতে ইরশাদ হয়েছে—
عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، يَأْتِينِي الرَّجُلُ فَيُرِيدُ مِنِّي الْبَيْعَ لَيْسَ عِنْدِي أَفَأَبْتَاعُهُ لَهُ مِنَ السُّوقِ؟ فَقَالَ: لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ
হাকিম ইবনু হিযাম রাযি. সূত্রে বর্ণিত। একদা তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোনো ব্যক্তি আমার নিকট এসে এমন জিনিস কিনতে চায় যা আমার কাছে নেই। আমি এভাবে বিক্রয় করতে পারি কি যে, তা বাজার হতে ক্রয় করে এনে তাকে দিব? তখন নবী করিম সা. বললেন, তোমার কাছে যা নেই তা বিক্রি করো না।
[সুনানে আবু দাউদ-৩৫০৩, সুনান আত তিরমিজী-১২৩২]
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (نَهَى أَنْ يَبِيعَ الرَّجُلُ طَعَامًا حَتَّى يَسْتَوْفِيَهُ). قُلْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ : كَيْفَ ذَاكَ ؟ قَالَ : ذَاكَ دَرَاهِمُ بِدَرَاهِمَ وَالطَّعَامُ مُرْجَأٌ. رواه البخاري
ইবনু ‘আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদ্য (ক্রয় করে) পুরোপুরি আয়ত্বে না এনে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। [রাবী তাউস (রহ.) বলেন,] আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ কিভাবে হয়ে থাকে? তিনি বললেন, এ এভাবে হয়ে থাকে যে, দিরহাম এর বিনিময়ে আদান-প্রদান হয় অথচ পণ্যদ্রব্য অনুপস্থিত থাকে।
[সহিহ বুখারী-২১৩২, সহিহ মুসলিম-১৫২৫]
জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচীর ফতোয়া ওয়েবসাইটে ‘অনলাইনে বিজনেসের’ বৈধতার কয়েকটি সুরত উপস্থাপন করেছে।
১. বিক্রেতা ক্রেতাকে এ কথা বলে দিবে যে—এই পণ্য আমার মালিকানায় নেই, আপনি যদি চান তাহলে আমি এটি কিনে আপনার কাছে এত দামে বিক্রি করতে পারি। এভাবে বিক্রেতা যদি পণ্য ক্রয় করে নিজের দখলে নিয়ে আসে, তারপর ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তাহলে তা জায়েয হবে।
২. অনলাইন বিক্রেতা ব্যক্তি বা কোম্পানি একজন গ্রাহকের কাছ থেকে অর্ডার নিবে এবং কাঙ্খিত পণ্য অন্য কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি থেকে সংগ্রহ করে ক্রেতার কাছে পৌছে দিবে। এবং কাজের জন্য যদি মজুরি নির্ধারণ করে নেয় তাহলেও তা বৈধ। অর্থাৎ পণ্য ক্রয়-বিক্রয় না করে মধ্যস্বত্বভোগিতার মজুরি নির্ধারণ করে এ লেনদেন করবে।
৩. পণ্য যদি বিক্রেতার মালিকানায় থাকে এবং ছবি দেখিয়ে লেনদেন করা হয়, তাহলে এমন অবস্থায় অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। তবে হ্যাঁ বৈধতার প্রত্যেকটি সুরতেই ক্রেতার জন্য কাঙ্খিত পণ্য হাতে আসার পর ‘খেয়ারে রুইয়াত’ থাকবে। অর্থাৎ যখন পণ্য ক্রেতা হাতে পাবে তখন তা দেখার পর, কাঙ্খিত শর্ত অনুযায়ী না হলে ফেরত দিতে পারবে।
আর যদি নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে লেনদেন হয়, তাহলে সেই চুক্তি বাতিল করতে হবে। তবে মোবাইল ইত্যাদি যদি ক্রেতার দখলে চলে আসে এবং সে মূল্য পরিশোধ করে থাকে, তাহলে এখন
মোবাইল ইত্যাদি ক্রেতার মালিকানাধীন বলে গণ্য হবে। ভবিষ্যতে শরিয়াহ বিধি-বিধানের কথা মাথায় রেখেই চুক্তি করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, অনলাইনে কারেন্সি, স্বর্ণ ও রৌপ্য ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। কেননা এই জিনিসগুলোর বিক্রয় বৈধ হওয়ার জন্য হাতে হাতে হওয়া এবং চুক্তির মজলিশে উভয় পক্ষের বিনিময় কব্জা করা জরুরি। [বাদায়েস সানায়ে ৫/১৪৬, বিন্নুরি ফাতাওয়া-১৪৪১০৮২০১৯৭৩]
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল