এক নজরে বুনিয়াদি আকাইদ এর সারাংশ
বুনিয়াদি আকাইদ এর সারাংশ
(১)
ঈমান ও কুফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাব্যস্ত হয় মৃত্যুর সময়। যেমন কেউ সারা জীবন মুসলিম ছিল, কিন্তু মৃত্যুর সময় নিজ ইচ্ছায় কুফরি কালিমা উচ্চারণ করে মৃত্যুবরণ করল, তাহলে সে কাফের বলে সাব্যস্ত হবে।
আরেকজন সারা জীবন কাফের ছিল, কিন্তু প্রাণ কণ্ঠনালীতে আসার পূর্বে ঈমানসুলভ কোনো কালিমা উচ্চারণ করল, তাহলে সে মুমিন বলে সাব্যস্ত হবে। তবে কতক মুহাক্কিক আলেমের মত হচ্ছে, এ সময় মুমিনের তাওবা কবুল হবে কিন্তু কোনো কাফেরের ঈমান কবুল হবে না।
গারগারা বা প্রাণ কণ্ঠনালীতে আসার পর কিংবা স্বচক্ষে পরকালীন বিভিন্ন আজাব ও অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে থাকাবস্থায় ঈমান আনলে বা তাওবা করলে কবুল হয় না। অনুরূপ কিয়ামতের পূর্বে পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয়ের পর কারও তাওবা ও ঈমান কবুল করা হবে না; কারণ মুমিন বলা হয় যে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর থেকে বর্ণিত সকল বিষয়ের ওপর না দেখেই ঈমান আনবে। যদিও কোনো বিষয় তার বুঝে না আসে।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ২৫)
(২)
নবি-রাসুল, সিদ্দিকিন ও সাধারণ মানুষের ঈমান সত্তাগত দিক থেকে সমান হলেও শক্তি ও মজবুতির দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। নবিদের ঈমান বিলুপ্ত হওয়া অসম্ভব, কেননা তা বাস্তব দেখার মাধ্যমে অর্জিত। সিদ্দিকিনদের ঈমান মজবুত দলিলের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন সন্দেহ-সংশয় টলাতে পারে না। পক্ষান্তরে অন্যান্য সকল মানুষের ঈমান সর্বদা একটা ঝুঁকিতে থাকে। কেননা তা নবি ও সিদ্দিকিনদের মতো মজবুত দলিলের মাধ্যমে অর্জিত নয়। এজন্যই তারা সর্বদা দোয়ায় বলবে,
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
( বুনিয়াদি আকাঈদ ২৯)
(৩)
হুকুমের মাঝে শিরক
ব্যাখ্যা: ধর্মীয় বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম, এই হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। সুতরাং "তিনি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, শাসক, পির ও অলিকে তাঁর সমপর্যায়ের বিধানদাতা মনে করা শিরক। অর্থাৎ তাদের কাউকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের অধিকারপ্রাপ্ত মনে করা এবং তাদের নিজস্ব নির্দেশ বা প্রণীত আইনকে বিশ্বাসগতভাবে অকাট্য ধর্মীয় অধ্যাদেশের মর্যাদা দেওয়া বা এর বিকল্প ও পরিবর্তিতরূপ মনে করা শিরক।
তবে শাসক, বিচারক বা ক্ষমতাশালী কেউ অনৈসলামিক কোনো নির্দেশ দিলে এবং প্রবৃত্তি, স্বার্থ কিংবা ভয়ে তা পালন করলে ঢালাওভাবে শিরক হয় না। মূলত কারও আদেশ নিষেধ মানা হচ্ছে ইতাআত বা আনুগত্য। আর ইবাদত হচ্ছে, কাউকে কোনো বিষয়ে শ্রষ্টার পর্যায়ভুক্ত মনে করে উপাসনা করা। তাই কোনো শাসক, বিচারক বা ক্ষমতাশালী কেউ যদি ধর্মীয় বিধানের ওপরে কোনো নির্দেশনা কার্যকর করতে বলে, কিন্তু বিশ্বাসগতভাবে একে ধর্মীয় আইনের পর্যায়ভুক্ত মনে না করে কিংবা একে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা রহিতকারী হিসেবে ঘোষণা না করে, তাহলে হাকিমিয়ায় শিরককারী হিসাবে গণ্য হবে না
অনুরূপভাবে তার অধীনরা এবং বিচারপ্রার্থী বা অনুরাগীরা যদি একে বিশ্বাসগতভাবে অকাট্য ধর্মীয় বিধানের পরিবর্তিতরূপ হিসেবে মনে না করে; বরং ধর্মীয় বিধানের ওপরে বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি কোনো পার্থিব স্বার্থের কারণে এই অনৈসলামিক নির্দেশ অনুসরণ করে, তাহলে তারা পাপী গণ্য হবে কিন্তু মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ৩৩)
(৪)
একটি সংশয়
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إن الله لا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ تَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ مَنْ تَشَاءُ )
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। শিরক ছাড়া অন্য যা গুনাহ আছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।"
প্রশ্ন: এক ব্যক্তি বুঝে বা না বুঝে আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক করে ফেলে। পরবর্তী সময়ে সে ঈমান আনে এবং তাওবা করে, এখন কি আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন?
উত্তর: উল্লিখিত আয়াতটি মৃত্যুসন্নিকটবর্তী অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ মানুষ মৃত্যুর সময় তিনটির যেকোনো একটি অবস্থায় থাকে-
১. মুশরিক অবস্থায় মারা যায়। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। মৃত্যুর সাথে সাথে সে জাহান্নামে চলে যাবে এবং চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। সুতরাং উল্লিখিত আয়াতের তাফসির হলো, যে ব্যক্তি মুশরিক অবস্থায় মারা গেল, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না।
২. মুসলিম অবস্থায় মারা গিয়েছে। তবে সে দুনিয়াতে চেষ্টা করেছে সগিরা ও কবিরা সকলপ্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে। শয়তানের ধোঁকায় কখনো হয়ে গেলে, সাথে সাথে মন থেকে তাওবা করে নিয়েছে এবং তাওবার পরবর্তী সকল শর্ত মেনে চলেছে। আশা করা যায় এমন ব্যক্তি মারা গেলে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন। ইনশাআল্লাহ।
৩. মুসলিম অবস্থায় মারা গিয়েছে এবং জীবনে সগিরা ও কবিরা গুনাহও করেছে, কিন্তু তাওবা না করেই মৃত্যু হয়েছে (নাউজুবিল্লাহ)। এমন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে আপন রহমতে তাকে ক্ষমা করতে পারেন। অথবা তিনি যাদেরকে সুপারিশ করার অধিকার
দেবেন, তাদের কারও সুপারিশের মাধ্যমে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তবে ঈমান থাকার কারণে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না, বরং কৃত অপরাধের শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে যাবে। ইনশাআল্লাহ।( বুনিয়াদি আকাঈদ ৩৪)
(৫.)
আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন।
ব্যাখ্যা: যখন কোনো বান্দা নিজ ইচ্ছায় সঠিক পথ তালাশ করে অথবা সৃষ্টিকর্তার নিকট সঠিক পথ প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাআলা আপন অনুগ্রহে তাকে সঠিক পথ দেখান এবং তার মধ্যে সঠিক পথ গ্রহণের অবস্থা তৈরি করে দেন। পক্ষান্তরে যখন কোনো বান্দা নিজ ইচ্ছায় গোমরাহির পথ বেছে নেয়, তখন তিনি তাকে গোমরাহ করেন। এটাই আল্লাহ তাআলার ন্যায়সংগত ফয়সালা ( বুনিয়াদি আকাঈদ ৩৮)
(৬)
. আল্লাহ তাআলা ও তার সকল সিফাত আবাদি তথা চিরস্থায়ী। ইমাম তাহাবি রহ. বলেন,
كما كان بصفاته أزليا كذلك لا يزال عليها أبديا.
তিনি তাঁর যাবতীয় গুণসহ যেমন অনাদি ছিলেন, তেমনই এ সকল গুণসহ অনন্তকাল থাকবেন।
ব্যাখ্যা: তিনি পূর্ব থেকেই যে-সকল গুণের অধিকারী ছিলেন, অনন্তকাল তিনি সেসব গুণের অধিকারী থাকবেন। এমন নয় যে, কোনো গুণ আগে ছিল না, পরে হয়েছে। বা আগে ছিল কিন্তু পরে নেই; বরং তাবৎ সৃষ্টির আগে থেকে নিয়ে ধ্বংসের পর পর্যন্ত তিনি ও তাঁর সকল গুণ চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনশীল।( বুনিয়াদি আকাঈদ ৩৯)
(৭)
আল্লাহ তাআলা সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।
ব্যাখ্যা: আমাদের জানা ও আল্লাহ তাআলার জানা এক নয়। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনে থাকি এবং আমাদের জানার মাঝেও ত্রুটি ও অপূর্ণতা থাকে। যেমন সময়ের বিচারে যেকোনো বিষয়ে আমরা প্রথমে কিছুই জানি না। তারপর ধীরে ধীরে জানতে থাকি এবং একসময় অনেককিছু ভুলেও যাই। প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও আমরা সাধারণত বিভিন্ন জিনিস দেখে, পড়ে ও চিন্তা করার মাধ্যমে জানি। আবার সবকিছু জানার পরও মাঝে মাঝে দেখা যায়, আমাদের জানার মাঝে অনেক ভুল থেকে যায়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা এ সবকিছু থেকে মুক্ত। তিনি শুরু থেকেই সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণরূপে জানেন এবং তাঁর জানা সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র।
তিনি অনাদি এবং অনন্তকালের সকল বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। সৃষ্টির পূর্ব থেকেই তিনি সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। যা-কিছু অস্তিত্বে এসেছে এবং ভবিষ্যতে আসবে কিংবা কখনোই আসবে না, সে সকলকিছু সম্পর্কে তিনি পরিষ্কার জানেন। প্রতিটি বস্তু অস্তিত্বে আসার আগে কেমন ছিল এবং পরে কেমন হবে তা সম্পর্কেও তিনি স্পষ্ট জ্ঞাত। তাঁর এ সকল জানার মাঝে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন কখনো হয় না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। তা ছাড়া তিনি কখনো কিছু ভুলে যান না।
আসমান ও জমিনের কোনো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্তুও তাঁর জ্ঞানের পরিসীমার বাহিরে নয়। তাঁর জ্ঞান উপস্থিত কোনো জ্ঞান নয় এবং কোনো মাধ্যম থেকেও অর্জিত নয়। জ্ঞানের জন্য তিনি কোনো মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের মুখাপেক্ষী নন।
সৃষ্টি ও বান্দার ওপর তাঁর জ্ঞানের প্রভাব পড়ে না। যেমন অমুক এই অপরাধটি করবে, এটা তিনি জানেন বলে সে অপরাধটি করেছে ব্যাপারটা এমন নয়। (নাউজুবিল্লাহ) ( বুনিয়াদি আকাঈদ ৪০)
(৮)
একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সকল সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা। নিজের কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তিনি এ সকলকিছু সৃষ্টি করেছেন।
ব্যাখ্যা: সকল সৃষ্টি, চাই তা বস্তু বা বস্তুর গুণ, শারীরিক অবয়ব বা শারীরিক গুণ, আসমান জমিন, পৃথিবী বা সৌরজগৎ কিংবা অন্য যা-কিছুই হোক না কেন, এ সবই একমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি।
ভালো-মন্দ উভয়টিরই স্রষ্টা মহান আল্লাহ তাআলা, কিন্তু ভালোর প্রতি তিনি সন্তুষ্ট আর মন্দের প্রতি অসন্তুষ্ট। আলো-আঁধার, পবিত্রতা-অপবিত্রতা, ফেরেশতা-শয়তান, নেক ও বদ ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু সন্তুষ্টির বিবেচনায় তিনি ভালো পছন্দ করেন এবং মন্দকে করেন অপছন্দ।
ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও ইচ্ছায় হয় বটে, কিন্তু তাঁর ক্ষমতা ও ইচ্ছার প্রভাব সৃষ্টির ওপর পড়ে না। বরং সবকিছু তাঁর ক্ষমতা, ইচ্ছা ও বান্দার অর্জন-দুইয়ে মিলেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ বান্দা যখন কোনো নেক কাজের ইচ্ছা করে, আল্লাহ তখন সেই কাজটির ইচ্ছা করেন এবং তার মাঝে সেই কাজটি করার ক্ষমতা দান করেন। অনুরূপ বান্দা যখন কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করে, তিনি তখন সেই কাজটির ইচ্ছা করেন এবং তার মাঝে সেই কাজটি করার ক্ষমতা দান করেন।
কোনোকিছুই তিনি নিজ স্বার্থে ও প্রয়োজনে সৃষ্টি করেননি, বরং সকলকিছুই তিনি মাখলুকের প্রয়োজন ও কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন। ( বুনিয়াদি আকাঈদ ৪৪)
(৯)
শাফেয়ি, হানাফি, মালেকি ও সঠিক ধারার হাম্বলি এবং আহলে সুন্নাতের অন্যান্য সকল বিজ্ঞরা এ বিষয়ে একমত যে, মহান আল্লাহ তাআলা দিক, দেহ, সীমা, স্থান ও সমস্ত মাখলুকের সদৃশ হওয়া থেকে চিরপবিত্র।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলাকে বিভিন্ন দিক, সীমা-পরিসীমা, পরিধি ও স্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট ও যুক্ত না করার অর্থ হলো, এটা বলা যাবে না যে, আল্লাহ তাআলা ডানে আছেন বা বামে আছেন। কিংবা সামনে বা পেছনে আছেন। অথবা এটাও বলা যাবে না যে, আল্লাহ তাআলা ওপরে আছেন বা নিচে আছেন।
তদ্রূপ এটাও বলা যাবে না যে, তিনি অমুক জায়গাতে আছেন। অথবা তিনি হুলুলের সাথে 'সব জায়গায় আছেন' কিংবা তিনি সত্তাগতভাবে শুধু 'আরশে' আছেন, কোনোটাই বলা যাবে না; বরং এ সবগুলোই গোমরাহি আকিদা। এ ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাতের আকিদা হলো, তিনি সকলকিছু সৃষ্টির পূর্বে যেমন ছিলেন, এখনো তেমনই আছেন। আল্লাহ তাআলা সর্বত্র আছেন দৈহিকভাবে নয় বরং তার অর্থ হল তার জ্ঞান সর্বত্র বিরাজমান। ( বুনিয়াদি আকাঈদ ৫৩)
(১০)
: আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাতের আকিদা হলো, আল্লাহ তাআলা সুরাত ও আকার-আকৃতি থেকে চিরপবিত্র। হাফেজ ইবনে হাজার রহ.-এর উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, গোমরাহ মুজাসসিমা বা দেহবাদীদের আকিদা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সুরাত ও আকার-আকৃতি রয়েছে।
আল্লাহ তাআলার জাত ও সত্তা এবং সিফাত ও গুণের জন্য কোনোপ্রকার ধরন সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ কোনো জিনিসের ধরন থাকার অর্থই হলো তার একটি সুরাত ও আকার-আকৃতি থাকা। ফলে আল্লাহ তাআলার জাত ও সিফাত ধরন থেকে চিরপবিত্র। কাজেই এমন কথা বলা যাবে না যে আল্লাহ তায়ালার জাত ও সিফাতের একটি ধরন রয়েছে । আল্লাহর ধরন আল্লাহর মতো, মাখলুকের মতো নয় বা আমরা জানি না। আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত কোনোপ্রকার ধরন ছাড়াই আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও সকল গুণকে স্বীকার করেন।( বুনিয়াদি আকাঈদ ৫৫)
(১১)
: আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর সিফাতের মাঝে কোনো পরিবর্তন হয়নি আর হবেও না। এমন না যে, তিনি সকলকিছু সৃষ্টির পূর্বে একরকম ছিলেন আর এখন ভিন্নরকম আছেন। অথবা এমনও না যে, তিনি এখন যেমন আছেন, সকলকিছু ধ্বংসের পর আর তেমন থাকবেন না। সুতরাং যারা বলে, 'সকলকিছু সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ কোথায় ছিলেন তা আমরা জানি না, তবে এখন তিনি আরশে আছেন।' তাদের এই আকিদা সঠিক নয়। কারণ এতে তাঁর সত্তার মাঝে পরিবর্তন সাব্যস্ত হয়।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ৫৯)
(১২)
আল্লাহ তাআলার সকল নাম ও সিফাত তাওকিফি এবং তাঁর নাম কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তবে হাদিসে ৯৯ সংখ্যা উল্লেখের কারণ হচ্ছে, ৯৯টি মুখস্থের ফজিলত বর্ণনা করা।
বিভিন্ন কিতাবে নির্দিষ্টভাবে তাঁর ৯৯টি নাম বলে যে-সকল নাম এবং যে সিলসিলায় পাওয়া যায়, তা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, বরং তা মুদরাজ বা পরবর্তী কোনো বর্ণনাকারীর থেকে অনুপ্রবিষ্ট।
. আল্লাহ তাআলার নাম ও সত্তা এক নয় বরং ভিন্ন, তবে তাঁর নাম ও গুণ সত্তা থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্নও নয় এবং তাঁর সত্তার মতো সকল নাম ও গুণ অনাদি। যখন তাঁকে তাঁর সুন্দর কোনো নামে ডাকা হয়, তখন তা তাঁর পবিত্র সত্তাকেই বোঝায়। যেমন 'রহমান' তাঁর একটি নাম, যখন 'রহমান' নামে তাঁকে ডাকা হয় তখন তাঁর পবিত্র সত্তাকেই ডাকা হয়। দুর্বল হাদিস দ্বারা নাম সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়ে ইখতেলাফ রয়েছে। তবে অগ্রাধিকারযোগ্য মত হচ্ছে, ভিন্ন করিনা বা লক্ষণ না থাকলে সাব্যস্ত হবে না, কিয়াসের মাধ্যমে কোনো নাম সাব্যস্ত হবে না, কেননা তা তাওকিফির বিপরীত।
প্রতিটি ভাষায় আল্লাহ তাআলার নাম, গুণ ও সত্তাকে বোঝানোর উপযুক্ত শব্দ রয়েছে। ভাষাভাষীদের জন্য তা ব্যবহার জায়েজ। যেমন ফারসিতে 'খোদা', ইংরেজিতে 'গড', বাংলায় দয়ালু, চিরদয়াময় ইত্যাদি। ( বুনিয়াদি আকাঈদ ৬২)
১৩
কিছু নাম শুধু আল্লাহ তাআলার জন্য নির্দিষ্ট, ফলে তা অন্য কারও জন্য ব্যবহার জায়েজ নেই। যেমন-
الله ، الرحمن ، القدوس ، الجبار ، المتكبر ، الخالق ، الباري ، المصور ، الرزاق ، الغفار ، القهار ، الوهاب ، الخلاق ، الفتاح ، القيوم ، الرب المحيط ، المالك ، الغفور ، الأحد ، الصمد ، الحق ، القادر.
উল্লিখিত নামসমূহের পূর্বে )عبد( 'আবদ' শব্দ যুক্ত করে মানুষের জন্য ব্যবহার জায়েজ। যেমন আবদুর রহমান ইত্যাদি।
যে-সকল নাম আল্লাহ তাআলার জন্য সাব্যস্ত, অনুরূপ ভিন্ন অর্থে কুরআন, হাদিস, উরফ ও সালাফদের মাঝে মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, এমন নাম রাখাতে সমস্যা নেই। যেমন-
عزيز، علي، كريم، رحیم عظیم رشید بدیع كفيل، واسع، حكيم وغيره.
ইসমে আজম বা মহান ও সর্বোত্তম নাম কোনটি? এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে বড় ইখতেলাফ রয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারিতে ইসমে আজম নির্ধারণের বিষয়ে প্রায় ১৪টি মত উল্লেখ করেন। তবে নির্ভরযোগ্য কথা হচ্ছে, নির্দিষ্টভাবে কোনো একটি নামকে ইসমে আজম বলার মতো কোনো দলিল শরিয়তের মাঝে পাওয়া যায় না, ফলে তাঁর সকল নামই ইসমে আজম এবং তাঁকে তাঁর সুন্দর সুন্দর সকল নামেই ডাকার চেষ্টা করা।( বুনিয়াদি আকাঈদ ৬৩)
-আস-সিফাতুল খাবারিয়া।
আল্লাহ তাআলার কিছু সিফাত এমন, মহাবিশ্বের স্রষ্টার জন্য এমন বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক ও আবশ্যক। এমনকি কুরআন-হাদিসে সে সম্পর্কে কোনোরূপ বয়ান না পাওয়া গেলেও যুক্তির আলোকে তা সাব্যস্ত করা ছিল অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ তাআলা আছেন, তিনি যা ইচ্ছা তা করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন, তিনি সব দেখেন ও শোনেন ইত্যাদি।
(১৪)
আস-সিফাতুল খাবারিয়া দ্বারা এমন কিছু সিফাতকে বোঝানো হয়, কুরআন-হাদিসে যার সম্পর্কে বর্ণনা ও ব্যবহার পাওয়া যায়। কুরআন-হাদিসে না থাকলে যুক্তি দিয়ে তা সাব্যস্ত করার সুযোগ ছিল না। যেমন(وجه) চেহারা,(اصبع)
আঙ্গুল ( يد) হাত ইত্যাদি
এ প্রকার সিফাতের অর্থ ও উদ্দেশ্য পরিষ্কাররূপে বোঝার সুবিধার্থে দুটি উদাহরণ উল্লেখ করছি, তবে মনে রাখতে হবে, এ উদাহরণ দুটি কেবলই বিষয়টি বোঝার জন্য, আল্লাহ তাআলার সাথে সাদৃশ্য দেওয়ার জন্য নয়, নাউজুবিল্লাহ।
উদাহরণ: ১
ধরা যাক, আমি আপনাকে বললাম, পুরো বাংলাদেশের ক্ষমতা এখন আপনার 'হাতে'। আমার এ কথা দ্বারা আপনি কি বুঝবেন যে, আপনার যে 'হাত' আছে, আমি এটা বোঝাচ্ছি? নিশ্চয় এমন কিছু নয়? বরং আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমার এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনার ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও বিশালতা বোঝানো। এবার আপনি কুরআনের এই আয়াতটি লক্ষ করুন, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলছেন,
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِ وَالْمُلْكُ )
বরকতময় সেই সত্তা, যার 'হাতে' সর্বময় কর্তৃত্ব।
এ আয়াতটির প্রতি লক্ষ করলে দেখবেন, এখানে আল্লাহ তাআলা এটা বোঝাতে চাননি যে, হে বান্দা! জেনে রাখো, আমার কিন্তু 'হাত' আছে। এ আয়াত দ্বারা বরং আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি বোঝানো উদ্দেশ্য।
৮৪. সুরা মুলক, ১
উদাহরণ: ২
আপনার বাবা আপনাকে বললেন, কাজটি তুমি আমার চোখের সামনেই করো।
এই কথা দ্বারা কিন্তু মোটেও আপনার বাবার এ কথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয় যে, আপনার বাবার চোখ আছে; বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, কাজটি যেন আপনি তার তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনামতে করেন। সুতরাং এবার এ আঙ্গিকে আপনি কুরআনের এ আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন
وَاصْنَعِ الفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا
আর তুমি আমার 'চোখের' সামনে কিশতি তৈরি করো। ৮৫
উপরোল্লেখিত উদাহরণটির প্রেক্ষিতে আপনি এ আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করলে দেখবেন, এখানেও আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য এটা বোঝানো নয় যে, হে বান্দা! জেনে রাখো, আমার চোখ আছে; বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা যেভাবে নির্দেশ করছেন, সেভাবে করো। আমরা বলে থাকি 'দেয়ালেরও কান আছে', 'আপনাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি', এ জাতীয় কথা বলে আমরা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গকে উদ্দেশ্য নিই না, বরং একটি বক্তব্যকে জোরদার করি।
একইভাবে কুরআনের যত আয়াতে ইয়াদ, আইন, ওয়াজ তথা হাত, চোখ, চেহারা ইত্যাদি শব্দগুলোর ব্যবহার হয়েছে, সেসব আয়াতের পূর্বাপর মেলালে দেখা যাবে যে, সেখানে আল্লাহ তাআলার জন্য শারীরিক কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে আয়াতের মূল বক্তব্যকে জোরদার করা।
আস-সিফাতুল খাবারিয়াকে কেন্দ্র করে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত ও কয়েকটি বাতিল ফেরকার অবস্থান
মুতাজিলা ও জাহমিয়্যা
এ ফেরকা দুটি আকিদা এবং এ জাতীয় শব্দগুলোর মধ্যে তালগোল প ফেলেছে। আকিদা যেহেতু বলছে, আল্লাহ তাআলা দৈহিক বিভিন্ন আ থেকে চিরপবিত্র, সেহেতু তারা যখন দেখল যে, কুরআনে আল্লাহ তা
৮৫. সুরা হুদ, ৩৭
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত হয় এমন কিছু শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তখন তারা ঢালাওভাবে শব্দগুলোর তাবিল ও ব্যাখ্যা করল এবং সেগুলোকে তাঁর সিফাত হওয়ার ব্যাপারেই অস্বীকার করল। (নাউজুবিল্লাহ)
মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহা
এরা আবার সম্পূর্ণ উলটো কাজ করেছে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জাতীয় শব্দগুলোর শাব্দিক ও বাহ্যিক অর্থ ধরে আল্লাহ তাআলার জন্য রীতিমতো শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গই সাব্যস্ত করে দিয়েছে, নাউজুবিল্লাহ। যেমন তাদের আকিদা হলো, আল্লাহ তাআলার হাত-চোখ-চেহারা ইত্যাদি নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে। অবশ্য তার ধরন কেমন তা সম্পর্কে তারা বলে, 'আমরা জানি না।'
আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত
আস-সিফাতুল খাবারিয়াকে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে এবং শব্দগুলো যেহেতু আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাত বিশ্বাস করে যে, এ শব্দগুলো আল্লাহ তাআলার সিফাত। কোনো অর্থেই এগুলো তাঁর সিফাত হওয়াকে তারা অস্বীকার করে না। তবে তিনি যেহেতু দৈহিক বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও কাইফিয়াত বা ধরন থেকে চিরপবিত্র, তাই তারা শব্দগুলোর শাব্দিক ও বাহ্যিক অর্থ থেকে তাঁকে চিরপবিত্র মনে করে।
বুনিয়াদি আকাইদ ৬৯, ৭০,৭১
মোটকথা মোটকথা আস-সিফাতুল খাবারিয়া অথবা যে-সকল শব্দ আল্লাহ তাআলার জন্য দৈহিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সৃষ্টির মতো হওয়া বোঝায়, যেমন হাত-পা-চোখ, হাসি-ক্রোধ ইত্যাদি, শব্দগুলোকে কোনো ধরন ছাড়াই তাঁর সিফাত হিসাবে স্বীকার করতে হবে এবং শব্দগুলোর শাব্দিক ও বাহ্যিক অর্থ থেকে তাঁকে চিরপবিত্র বিশ্বাস করতে হবে। তবে দেহবাদী ও মুশাব্বিহা ফেরকার আবির্ভাবের পর আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাতের পরবর্তী ইমামদের কেউ কেউ সাধারণ মানুষদেরকে দেহবাদী আকিদা থেকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে এই প্রকারের কিছু শব্দকে শর্তসাপেক্ষে তাবিল ও ব্যাখ্যা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তাবিল অধ্যায়ে আলোচনা আসবে, ইনশাআল্লাহ। বুনিয়াদি আকাঈদ ৭৩
(১৫)
কীসের তৈরি নবি আলাহি সসালাম
হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তাগতভাবে মাটির তৈরি ছিলেন। তবে গুণগতভাবে তিনি 'নুর' ছিলেন। অর্থাৎ নিজেও আলোকিত ছিলেন এবং অন্যকেও আলোকিত করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা রাখতেন। সুতরাং যে-সকল জায়গায় তাঁকে বাশার বা রজুল )بشر/ رجل( বলা হয়েছে, সেখানে তাঁর সত্তাগত দিক উদ্দেশ্য। আর যে-সকল জায়গায় তাঁকে নুর বলা হয়েছে, সেখানে তাঁর গুণগত দিক উদ্দেশ্য।
. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রওজা মুবারকে জীবিত। সেখানে কেউ দরুদ পাঠ করলে তিনি তা নিজেই শুনতে পান। আর দূর থেকে কেউ দরুদ পড়লে তা ফেরেশতার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবী আলাইহিসালাম এর মা বাবা কি মুসলমান হয়ছিলেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা সম্পর্কে ইমাম ইবনু আবিদিন শামি রহ. বলেন,
ألا ترى أن نبينا صلى الله عليه وسلم قد أكرمه الله تعالى بحياة أبويه له حتى آمنا به ، كما في حديث صححه القرطبي وابن ناصر الدين حافظ الشام وغيرهما، فانتفعا بالإيمان بعد الموت على خلاف القاعدة إكراما -النبيه صلى الله عليه وسلم ، كما أحيى قتيل بني إسرائيل ليخبر بقاتله . وكان عيسى عليه السلام يحيي الموتى .
তুমি কি দেখছ না, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেছেন তাঁর পিতামাতাকে জীবন দানের মাধ্যমে,অতঃপর তারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন। যেমনটা এক হাদিসে এসেছে, হাদিসটিকে ইমাম কুরতুবি, ইবনু নাসিরিদ্দিনসহ অন্যান ইমাম সহিহ বলেছেন। ফলে তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে মৃত্যুর পর ঈমান আনার মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। (এটা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) তাঁর নবিকে সম্মান দেওয়া। যেমন তিনি জীবিত করেন বনি ইসরাইলের নিহত ব্যক্তিকে, যাতে সে তার হত্যাকারী সম্পর্কে বলে দেয়। ঈসা আ.-ও মৃতদের জীবিত করতেন।
মোল্লা আলি কারি রহ. বলেন,
أما إسلام أبويه ففيه أقوال ، والأصح إسلامهما على ما اتفق عليه الأجلة من الأمة.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে কয়েকটি মত রয়েছে। তবে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। উম্মাহর বড় বড় ইমাম এ কথাতে একমত।
উল্লিখিত বক্তব্য মুসলিমে বর্ণিত হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতাকে জান্নাতি বলেন, তারা মুসলিমের হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন, যে, তা ছিল তাদেরকে জীবিত করার পূর্বের ঘটনা। আবার কতক ইমামের মত হলো, তারা আহলে ফাতরা (নবিহীন যুগ)-এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে এই বিষয়টার সাথে যেহেতু আমল ও আকিদার কোনো সম্পর্ক নেই এবং মৃত্যুর পরও এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, সেহেতু এ বিষয়ে চুপ থাকাটাই উত্তম ও নিরাপদ।
হযরত খিজির কি নবী ছিলেন?
হজরত খিজির আ. একজন বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ নেক বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষ রহমত দ্বারা ধন্য করেছেন এবং সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কিত জ্ঞানের একটা বড় অংশ দান করেছিলেন। তবে তিনি এখনো জীবিত আছেন কি না, এমন কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না।
তাঁর নবি হওয়ার বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মতানৈক্য রয়েছে। কারও কারও মতে তিনি নবি ছিলেন। ইমাম আইনি রহ. বলেন,
والصحيح أنه نبي.
আর বিশুদ্ধ মত হলো, তিনি নবি ছিলেন।
হযরত লুকমান কি নবী ছিলেন?
অধিকাংশ আলেমের মতে হজরত লুকমান নবি ছিলেন না। হ্যাঁ, তিনি একজন মুত্তাকি-পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন। যাকে আল্লাহ তাআলা উচ্চমানের জ্ঞানবুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও গাম্ভীর্য দান করেছিলেন।
জুলকারনাইন কি নবী ছিলেন?
জুলকারনাইন একজন সৎ ও নেককার ব্যক্তি ছিলেন। তবে তাঁর নবি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না। ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন,
والصحيح أنه كان ملكا من الملوك العادلين.
বিশুদ্ধ মত হলো, তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। ১১৬
সকল নবি-রাসুল মানুষ ও পুরুষ ছিলেন। নারীদের মধ্য থেকে কেউ নবি হননি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ
আপনার পূর্বে আমি বহু পুরুষকে (রাসুলরূপে) প্রেরণ করেছি, যাদের প্রতি আমি ওহি পাঠাতাম।
বুনিয়াদি আকাইদ। ৮৬, ৮৭,৮৮,৮৯
(১৬)
জান কবজের ফেরেশতা একজন, না একাধিক?
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
ولو ترى اذ يتوفى الَّذِينَ كَفَرُوا - المَلائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارهُمْ وَذُوقُواعذاب الحريق
কাফেরগণ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন যদি আপনি দেখেন যে,ফেরেশতাগণ তাদের মুখে-পিঠে আঘাত করছে ও (বলছে যে.) তোমরা জ্বলন্ত অগ্নির শান্তি আস্বাদন করো (তখন আপনি বড় করুণ দৃশ্য দেখতে পারতেন)।
উল্লিখিত আয়াতের (الملائكة) শব্দ থেকে বোঝা যায় যে, 'জান কবজ'-এর ফেরেশতা একাধিক। অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন,
قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وَمَلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ)
আপনি বলুন, তোমাদের জান কবজ করবে মৃত্যুর ফেরেশতা। যাকে তোমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। তারপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে তোমাদের রবের কাছে।
উল্লিখিত আয়াতের )ملك الموت( শব্দ থেকে বোঝা যায় জান কবজের ফেরেশতা একজন। উভয় আয়াতের মাঝে সমন্বয় হলো, প্রাণ হরণ কার্যক্রম আঞ্জাম দেওয়ার জন্য ফেরেশতাদের একটি জামাত ও দল আছে, যাদের প্রধান হলেন একজন। কাজেই প্রথম আয়াতটি পুরো দলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। আর দ্বিতীয় আয়াতটি শুধু প্রধানকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।
এমনিভাবে কাফেরের নিকট মৃত্যুর ফেরেশতা এক ভয়ংকর আকৃতিতে উপস্থিত হয়। অতঃপর ভীষণ কষ্ট দিয়ে তার জান কবজ করে। পক্ষান্তরে মুমিনের কাছে উপস্থিত হয় বড় সুন্দর আকৃতিতে এবং তার জানও কবজ করে বেশ কোমলভাবে।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ৯৮)
(১৭)
কেয়ামতের ছোট আলামতগুলো হলো-
১. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন ও মৃত্যুবরণ।
২. সন্তানরা বাবা-মায়ের নাফরমানি করবে। বন্ধুর সাথে ভালো ব্যবহার করবে, কিন্তু পিতার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে।
৩. পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে এবং মায়ের অবাধ্য হবে।
৪. দ্বীনি ইলম উঠে যাবে এবং অজ্ঞতা বিস্তার লাভ করবে। আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে।
৫. অযোগ্যরা আমির ও বিচারক হবে এবং সর্বপ্রকার লেনদেন ও বিচারকার্য অযোগ্যদের দ্বারা সম্পন্ন হবে।
৬. সৎলোকের পরিবর্তে অসৎ ও খারাপ লোক হবে তার সম্প্রদায়ের নেতা।
৭. জালেম ও অসৎলোকদের অনিষ্ট ও জুলুম থেকে বাঁচার জন্য তাদের সম্মান করা হবে।
৮. মিথ্যা, মদ্যপান ও মাদকের বিস্তার ঘটবে এবং জিনা-ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ান।
৯. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বেড়ে যাবে এবং সত্য সাক্ষ্য লোপ পাবে।
১০. গানবাজনা ও গায়িকার সংখ্যা বেড়ে যাবে। সেইসাথে নর্তকী ও গায়িকাদের প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং বাদ্যযন্ত্রসমূহের কদর করা হবে।
১১. দুনিয়ায় মুসিবত ও বিপদ-আপদ এত বেড়ে যাবে যে, মানুষ মৃত্যু কামনা করতে থাকবে।
১২. এই উম্মতের শেষ জামানার লোকেরা তাদের পূর্বযুগের লোকদের অভিসম্পাত করবে।
১৩. শাসকরা দেশকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করবে।
১৪. প্রচুর ধনসম্পদ হবে এবং জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত লোক থাকবে না।
১৫. মানুষহত্যা বেড়ে যাবে।
১৬. সুদ-ঘুষ বেড়ে যাবে।
১৭. দ্বীনকে দুনিয়ার কাছে বিক্রি করে দেবে।
১৮. মসজিদে শোরগোল করা হবে।
১৯. অধিকহারে ভূমিকম্প হবে।
২০. মানুষের আকৃতি রূপান্তর, ভূমিধস ও আকাশ থেকে পাথর পড়বে।
২১. কাপড় পরিহিতাসত্ত্বেও উলঙ্গ নারীদের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।
২২. আরব ভূখণ্ড আগের মতো তৃণভূমি ও নদনদীতে ভরে যাবে।
২৩. আমানতের খেয়ানত শুরু হবে এবং আমানত লুটের মালে পরিণত হবে। গনিমতের মাল ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হবে এবং জাকাত জরিমানারূপে গণ্য হবে।
২৪. হিংস্র জীবজন্তু ও জড় পদার্থ মানুষের সাথে কথা বলবে।
২৫. রোমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং মুসলমানদের সাথে তাদের যুদ্ধ হবে।
২৬. কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে।
২৭. লজ্জা-শরম উঠে যাবে।
২৮. সর্বত্র জুলুম-অবিচার ছড়িয়ে পড়বে।
২৯. পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং নারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। একজন পুরুষের ৫০ জন নারীকে দেখাশোনা করতে হবে।
৩০. মুসলিমরা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
৩১. মুসলিমদের কেউ কেউ মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত হবে। এমনকি অনেকে আবার মূর্তিপূজায়ও লিপ্ত হবে।
৩২. ফুরাত তার গর্ভস্থিত স্বর্ণ বের করে দেবে, যার পরিমাণ হবে পাহাড়সমান।
৩৩. ৩০ জন মিথ্যুকের আবির্ভাব হবে, যারা প্রত্যেকেই নিজেকে নবি বলে দাবি করবে।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ১০২,১০৩,১০৪)
(১৮)
কবর
১. প্রকৃত অর্থে কবর বলা হয় মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার গর্তকে। তবে রূপক অর্থে কবর বলা হয়, মৃত্যুর পর থেকে হাশরের ময়দানে পুনর্জীবিত হওয়ার মধ্যবর্তী কালকে। এ সময়টাকে বলা হয় কবরজগৎ।
২. বরজখ শব্দের অর্থ পর্দা বা অন্তরায়। মৃত্যুপরবর্তী জগৎ সম্পর্কে মানুষ সরাসরি কিছু জানতে পারে না। তাই একে আলমে বরজখ বলা হয়। মৃত্যুর পর হতে পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি যে জগতে থাকে, তাকে আলমে বরজখও বলা হয়, আবার কবরজগৎও বলা হয়। মানুষ মৃত্যুর পরই আলমে বরজখে পৌছে যায়, চাই তাকে কবর দেওয়া হোক বা না হোক।
( বুনিয়াদি আকাঈদ ১০৫)
(১৯)
৫. সবকিছু আল্লাহ তাআলার ইলম, কাজা, ইচ্ছা ও তাকদির অনুযায়ী হয়।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলার ইলম তথা জ্ঞান দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়াতে যা-কিছু হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে, সবকিছু সম্পর্কে তিনি পূর্ব থেকেই পূর্ব অবগত।
আল্লাহ তাআলার কাজা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, বান্দার সকল কর্মের স্রষ্টা হলেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই। চাই কাজটি ভালো হোক বা মন্দ। বান্দা যখন নিজ ইখতেয়ারে ভালো বা মন্দ কিছু করার ইচ্ছা করে, তিনি তখন সে কাজটি হওয়ার ফয়সালা দিয়ে দেন।
আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দা যখন নিজ ইখতেয়ারে কোনো কাজ করার ইচ্ছা করে, তখন আল্লাহও ইচ্ছা করেন, অর্থাৎ জিনিসটা কখন অস্তিত্বে আসবে এবং কখন চলে যাবে, কোথায় কখন কী হবে এবং কীভাবে হবে, কতক্ষণ যাবৎ থাকবে এবং তার আকার ও পরিমাপ কতটুকু হবে, এ সবকিছু তাঁর ইচ্ছার মাধ্যমে নির্দিষ্ট হয়।
তাকদির অনুযায়ী হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দা কখন কী করবে, তা সম্পর্কে তিনি পূর্ব থেকেই পূর্ণ অবগত এবং তাঁর অবগতি অনুযায়ী সবকিছু লিপিবদ্ধ। আর সবকিছু সে অনুযায়ী হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। ( বুনিয়াদি আকাঈদ ১৪৬)
(২০)
. তাকদির কি পরিবর্তন হয়? তাকদিরকে দুটি ভাগে ভাগ করা হত-
ক. আত-তাকদিরুল মুবরাম )التقدير المجرم(
'আত-তাকদিরুল মুবরাম' বলা হয় চূড়ান্ত তাকদিরকে। অর্থাৎ যাতে আর কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন হবে না।
কতক ইমামের মতে তাকদির হলো মুবরাম। অর্থাৎ তাতে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্মন হয় না। কারণ তাকদিরের সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার ইলম তথা আনের সাথে, আর তাঁর আন অনুযায়ীই তাকদির লিপিবদ্ধ। কাজেই তাকদির পরিবর্তন হওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার আনের মাঝে পরিবর্তন হওয়া।
খ. আত-তাকদিরুল মুআল্লাক )التقدير المعلق(
'আত-তাকদিরুল মুআল্লাক' বলা হয়, কোনো একটা শর্তের সাথে কোনো ফলাফল যুক্ত থাকা। শর্তটি পাওয়া গেলে ফলাফলও পাওয়া যাবে।
কতক ইমামের মতে তাকদির হলো মুআল্লাক, তথা যার মাঝে পরিবর্তন-পরিবর্ষন হয়। তাদের এ মতের ভিত্তি হলো, বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, সদকা বিপদ দূর করে। দোয়া ভাগ্য পরিবর্তন করে। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে হায়াত বৃদ্ধি পায় ইত্যাদি। এ সকল বর্ণনার প্রেক্ষিতে তারা বলেন, তাকদির পরিবর্তন হয়। তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের
সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার সাথে নয়, বরং বান্দার সাথে। কারণ সর্বশেষ বান্দা কী করবে তা তিনি পূর্ব থেকেই পূর্ণ অবগত।
যেমন এক ব্যক্তি ২৫ বছর কাফের ছিল, তারপর সে ইসলাম গ্রহণ করল।
এখানে আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইলমে পরিবর্তন হয়নি। কেননা তিনি পূর্ব থেকেই জানেন, অমুক ব্যক্তি ২৫ বছর কাফের থাকবে, তারপর ইসলাম গ্রহণ করবে। বুনিয়াদি আকাঈদ ১৫০।
(২১)
তাকদিদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাসের কিছু উপকারিতা
১. ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। কেননা তাকদিরের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ছাড়া ঈমান শুদ্ধ না।
২. আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব এবং কর্তৃত্বে পূর্ণ বিশ্বাস অর্জন হয়।
৩. যত বড় বিপদ ও মুসিবতই আসুক না কেন, খুব সহজেই সবর ও মেনে নেওয়া সম্ভব হয়।
৪. হালাল পন্থা ও হালাল উপার্জন গ্রহণ করা সহজ হয়। হারাম পন্থা ও হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকা সম্ভব ও সহজ হয়। কারণ পূর্ণ বিশ্বাস হলো, তাকদিরে যা আছে, তা আসবেই। আর তাকদিরে যা নেই, তা কখনো আসবে না। কাজেই হারাম পন্থা ও হারাম উপার্জন গ্রহণ করে কোনো লাভ নেই।
৫. নিজেকে নিয়ে অহংকার করবে না। কারণ আজ যে সম্পদ ও নেয়ামত আছে, তা কাল থাকবে কি না, এটা কেউ জানে না। কীসের ওপর তবে অহংকার!
৬. দুনিয়াতে চলার জন্য যা-কিছু প্রয়োজন, তা জমা করা হবে ঠিক, কিন্তু তার ওপর কখনো ভরসা করবে না, বরং ভরসা করবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর। বুনিয়াদি আকাঈদ ১৫১
(২২)
সাহাবা সম্পর্কে আমাদের আকিদা
/৪. সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা দ্বীন ও ঈমানের অংশ। তাদের গালমন্দ করা বা তাদের প্রতি মন্দ ধারণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নেফাক, গোমরাহি ও কুফর। ইমাম তাহাবি রহ. বলেন,
ونحب أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ولا نفرط في حب أحد منهم ، ولا نتبرأ من أحد منهم ، ونبغض من يبغضهم ، وبغير الخير يذكرهم ، ولا نذكرهم إلا بخير وحبهم دين وإيمان وإحسان وبغضهم كفر ونفاق وطغيان.
আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিগণকে ভালোবাসি। তাদের কারও প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমরা বাড়াবাড়ি যেমন করি না, তেমনই তাদের কারও সঙ্গে
সম্পর্কহীনতার দাবিও করি না। যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে এবং অন্যায়ভাবে তাদেরকে স্মরণ করে, আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি। আমরা তাদেরকে শুধু কল্যাণের সাথেই স্মরণ করি। তাদের ভালোবাসা হচ্ছে দ্বীন, ঈমান ও ইহসানের অংশ। আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কুফর, নেফাক ও সীমালঙ্ঘন।
ইবনে আবিদিন শামি ইমাম মোল্লা আলি কারি রহ. থেকে নকল করেন,
أما من سب أحدا من الصحابة فهو فاسق ومبتدع بالإجماع ، إلا إذا اعتقد أنه مباح أو يترتب عليه ثواب كما عليه بعض الشيعة ، أو اعتقد كفر الصحابة فإنه كافر بالإجماع.
আর কেউ যদি কোনো সাহাবিকে গালি দেয় তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে সে ফাসেক ও বিদআতি। তবে কেউ যদি গালি দেওয়াকে বৈধ ও সওয়াবের কাজ মনে করে, যেমনটা কতক শিয়াদের বিশ্বাস অথবা সাহাবিরা কুফর করেছেন এমন বিশ্বাস রাখে, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে সে কাফের।
. সকল সাহাবায়ে কেরামের ওপর আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট ছিলেন এবং সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারা সকলে জান্নাতি। আশারায়ে মুবাশশারা বা ১০ জন সাহাবিকে জান্নাতি বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, এক মজলিসে ১০ জনকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার ইবনে হাজাম থেকে নকল করেন,
وقال أبو محمد بن حزم : الصحابة كلهم من أهل الجنة قطعا؛ قال الله تعالى : لَا يَسْتَوِي مِنكُم مِّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ - أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن بَعْدُ وَقَاتَلُوا - وَكُلًّا وَعْدَ اللهُ الْحُسْنَى . وقال تعالى : إِنَّ الَّذِينَ سَبَقَتْ لَهُم مِّنَّا الْحُسْنَى أُولَيكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ . فثبت أن الجميع من اهل الجنة وانه لا يدخل احد منهم النار لانهم المخاطبون بالاية السابقة
السابقة
ইবনে হাজাম বলেন, অবশ্যই সকল সাহাবি জান্নাতি। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও লড়াই করেছে, তারা (ও পরবর্তীরা) সমান নয়। এরূপ লোকেরা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যারা পরবর্তী সময়ে ব্যয় করেছে ও লড়াই করেছে। আর প্রত্যেককে (অর্থাৎ প্রত্যেত সাহাবিকে) আল্লাহ কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০১
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, যাদের জন্য পূর্ব থেকে আমার পক্ষ হতে কল্যাণ নির্ধারিত হয়ে আছে, তাদের তা (অর্থাৎ জাহান্নাম) থেকে দূরে রাখা হবে।
এ থেকে সাব্যস্ত হয় সকল সাহাবি জান্নাতি। একজন সাহাবিও জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, কেননা উল্লিখিত আয়াতে সাহাবিদের সম্বোধন করা হয়েছে।
. সাহাবায়ে কেরামের মধ্যকার ইখতেলাফ হক-বাতিলের ইখতেলাফ নয়, " বরং ভুল ও সঠিকের ইখতেলাফ।
যেসব ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে দ্বিমত ও বাহ্যিক বিরোধ দেখা দিয়েছে, বিশ্বাস করতে হবে যে, সেসব ক্ষেত্রে প্রত্যেক সাহাবি হকের ওপর ছিলেন। কারণ তারা কেউ হিংসা-বিদ্বেষ বা ব্যক্তিস্বার্থে কোনো বিরোধে জড়াননি, বরং যা-কিছু করেছেন, ইখলাসের সাথে দ্বীনের জন্যই করেছেন। কাজেই তাদের পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং সংঘর্ষের ক্ষেত্রে মানবীয় দোষ-গুণের জায়গা থেকে কোনো পক্ষের হয়তো ভুল হতে পারে, তবে সেটা হলো ইজতেহাদি ভুল।
সাহাবায়ে কেরাম 'মাসুম আনিল খাতা' )معصوم عن الخطأ(তথা ভুল থেকে নিষ্পাপ নন, বরং তারা 'মাহফুজ আনিল খাতা' )محفوظ عن الخطأ(তথা ভুল থেকে নিরাপদ ছিলেন।
ব্যাখ্যা: নবি-রাসুলগণ 'মাসুম আনিল খাতা' ছিলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাই কোনো নবি থেকে কোনোরূপ গুনাহ হতে দেননি। আর 'মাহফুজ আনিল খাতা' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাহাবিদের ভুল ও গুনাহ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে ভুল ও গুনাহ সাহাবির আমলনামায় রাখেননি, বরং তিনি সকল সাহাবির প্রতি সন্তুষ্ট।
পুরো উন্মতের জন্য সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সত্য ও বিশ্বস্ততার মাপকাঠি।
ব্যাখ্যা: যে আকিদা ও আমল সাহাবিদের আকিদা-আমল অনুযায়ী হবে, তা সত্য ও সুন্নত। আর যে আকিদা ও আমল সাহাবিদের আকিদা-আমলের বিপরীত হবে, তা বাতিল ও গোমরাহি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
نان آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا
আর তারা যদি সেরূপ ঈমান আনে যেরূপ ঈমান এনেছ তোমরা, তবে তারাও হেদায়েত পেয়ে যাবে।
-জামাতের অবস্থান হলো, সাহাবায়ে কেরামের / পারস্পরিক ইখতেলাফ ও বিবাদের বিষয়ে উম্মত সম্পূর্ণ চুপ থাকবে। বিশেষ কোনো দ্বীনি জরুরত ছাড়া এসব ইখতেলাফ ও বিবাদ নিয়ে আলোচনা করা জায়েজ নেই। ইমাম ইবনে আবদিল বার রহ. বর্ণনা করেন,
سمعت أحمد في ذلك المجلس يقول : لا ننظر بين أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فيما شجر بينهم ونكل أمرهم إلى الله
(আনবারি বলেন,) আমি ওই মজলিসে ইমাম আহমাদকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের মাঝে পারস্পরিক যে ইখতেলাফ ও বিবাদ হয়েছে, আমরা তা নিয়ে বাহাস ও আলোচনা করব না। বরং আমরা তাদের বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করব। (বুনিয়াদি আকাইদ। ১৫৭-১৬২)
(২৩)
জিন সম্পর্কে আকিদা
জিন' একটা আম বা ব্যাপক শব্দ, আগুন থেকে সৃষ্ট সকলেই এ শব্দের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু শয়তান দ্বারা জিনজাতির সকল সদস্য উদ্দেশ্য নয়, বরং
তাদের মধ্য থেকে অসৎ, অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারীদের বলা হয় শয়তান। আর ইবলিশ বলা হয় হজরত আদম আ.-কে সেজদা না করার কারণে আল্লাহ তাআলার রহমত এবং জান্নাত থেকে বিতাড়িত শয়তানকে।
ইবলিশ প্রথমে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করত এবং ফেরেশতাদের সাথেই থাকত। তারপর যখন আল্লাহ তাআলা তাকে আদেশ করলেন হজরত আদম আ.-কে সেজদা করার জন্য, তখন সে অহংকারবশত আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হলো। ফলে তিনি তাকে জান্নাত থেকে বের করে দেন।
কতক ইমামের মত হলো, ইবলিশ জিনজাতির সদস্য। আবার কতকের মত, ইবলিশ ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম মতটিকেই অনেকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُو الآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كان من الحن)
আর যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সেজদা করো। ইবলিশ ছাড়া বাকি সবাই তখন তাকে সেজদা করল। (বস্তুত) সে ছিল জিনদের একজন। (বুনিয়াদি আকাঈদ ১৬৫)
২৪
আহলে কিবলার পরিচয় এবং কখন আলে কেবলাকে তাকফির করা যাবে।
. আহলে কিবলা দ্বারা এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যারা কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায় করে। এ অর্থ অনুসারে ইসলামের নামে সৃষ্টি হওয়া সকল দলই আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আহলে কিবলার মধ্যে মুসলিম ও মুমিন তাদেরকে বলা হয়, যারা কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায়ের সাথে সাথে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ে আসা সকলকিছুকে স্বীকার ও সত্যায়ন করেন। আহলে কিবলার কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত কাফের বলা হবে না, যতক্ষণ
না সে জরুরিয়াতে দ্বীন ও উম্মতের ঐকমত্যের কোনো একটিকে অস্বীকার করে বা বিকৃত করে। আল্লামা কাশ্মীরি রহ. বলেন,
أهل القبلة في اصطلاح المتكلمين من يصدق بضروريات الدين أي الأمور التي علم ثبوتها في الشرع واشتهر ، فمن أنكر شيئا من الضروريات كحدوث العالم وحشر الأجساد ، وعلم الله سبحانه بالجزئيات ، وفرضية الصلاة والصوم لم يكن من أهل القبلة ولو كان مجاهدا بالطاعات وكذلك من باشر شيئا من أمارات التكذيب كسجود لصنم والإهانة بأمر شرعي والاستهزاء عليه، فليس من أهل القبلة ومعنى : عدم تكفير أهل القبلة أن لا يكفر بارتكاب المعاصي ولا بإنكار الأمور الخفية غير المشهورة
আকিদাবিশেষজ্ঞদের পরিভাষায় আহলে কিবলা বলা হয়, জরুরিয়াতে দ্বীন বা শরিয়তে যে-সকল বিষয় মজবুতভাবে প্রমাণিত ও প্রসিদ্ধ, এমন সকল বিষয়কে সত্যায়ন করা। যেমন বিশ্বজগৎ সৃষ্ট, হাশর, আল্লাহ তাআলা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কেও জ্ঞান রাখেন, নামাজ-রোজা ফরজ। জরুরিয়াতে দ্বীনের এমন কোনো একটি বিষয়কে অস্বীকার করলে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। যদিও সে ইবাদতে নিমগ্ন। অনুরূপ কারও মাঝে মিথ্যা বা অস্বীকারের আলামত পাওয়া গেলে (সেও আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়), যেমন মূর্তিকে সেজদা করা, শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হাসি-ঠাট্টা করা, এমন ব্যক্তি আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়। আহলে কিবলাকে কাফের না বলার অর্থ হচ্ছে, কবিরা গুনাহে লিপ্ত হলে বা জরুরিয়াতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন ছোটখাটো বিষয়কে অস্বীকার করলে কাফের না বলা।(বুনিয়াদি আকাইদ১৭১)
মুফতি মুঈনুল ইসলাম
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল
মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মা’হাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা