রজব মাসের করণীয় ও বর্জনীয়
রজব মাসের করণীয় ও বর্জনীয়
---------------------------------------------
মুফতি সাঈদ আহমদ হাফি.
কুরআনে কারীমে যে চারটি মাসকে আল্লাহ পাক বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন, তন্মধ্যে রজব মাস অন্যতম। (সূরা তাওবা ৩৬)
আয়াতটির ব্যাখ্যায় অনেক মুফাসসির বলেছেন, জুলুম ও গুনাহের কাজ সবসময় অপরাধ হলেও উক্ত চার মাস তথা রজব, জিলকাদ, জিলহজ ও মুহাররম এ তা আরো মস্তবড়। তদ্রূপ এ চার মাসে নেক-আমলের প্রতিদানও অনেক বেশি। (দেখুন আয়াতটির ব্যাখ্যায়, তাফসীরে কাবীর, কুরতুবী, ইবনে কাসীর, রুহুল মা’আনী এবং মোল্লা আলী কারী রাহ. রচিত আল-আদব ফী রজব, পৃ. ২৫)
প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. (মৃত্যু ৮৫২ হি.) ‘তাবয়ীনুল আজব’ রিসালায় লিখেন,
لم يرد في فضل شهر رجب، ولا في صيامه، ولا في صيام شيء منه معين، ولا في قيام ليلة مخصوصة فيه حديث صحيح يصلح للحجة.
‘রজব মাসের ফযীলত ও রোযা অথবা এ মাসের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখে রোযা কিংবা বিশেষ কোনো রাত্রি উদযাপন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন হাদীস বর্ণিত হয় নি।’ (তাবয়ীনুল আজব বিমা ওরাদা ফী ফাযলি রজব, পৃ. ১১)
সুতরাং নির্ভরযোগ্য হাদীসে রজব মাস অথবা এর কোনো দিন বা রাতের কোনো ফযীলত নেই। কাজেই ‘বার মাসের ফযীলত’ বা এ জাতীয় বই-পুস্তকে এ মাস সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়।
তবে কেউ কেউ صُمْ مِنَ الْحُرُمِ وَاتْرُكْ(আবু দাউদ ২৪২৮; ইবনে মাজা ১৭৪১) হাদীসটি থেকে উদ্ভাবন করে বলেছেন, এ মাসে অনির্দিষ্টভাবে কিছু দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব। (দ্র. ফাযায়েলে আওকাত, বায়হাকী পৃ. ৮৯ ও তাবয়ীনুল আজব, পৃ. ১২-১৪)
এছাড়া কিছু সাহাবা ও সালাফের মতে এ মাসে ওমরা পালন করা মুস্তাহাব। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩২)
রজব মাসের আমল সম্পর্কে একটি হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস রা. বলেন, রজব মাস আগত হলে রাসূল নিম্নোক্ত দু’আ পাঠ করতেন,
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبَ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ.
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দাও এবং রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ, ২৩৪৬; মুসনাদে বায্যার, ৬৪৯৬ ও ফাযায়েলে আওকাত, ১৪)
হাদীসটির সনদ দুর্বল, যেমনটি ইমাম বায়হাকী ‘ফাযায়েলে আওকাত’ গ্রন্থে পৃ. ১০৪, ইমাম নববী ‘আল-আযকার’ এ পৃ. ৩১৯, ইবনে রজব হাম্বলী ‘লাতায়িফুল মাআরিফ’ কিতাবে পৃ. ২৩৪ এবং হায়সামী রাহ. ‘মাজমাউয যাওয়াইদ’ গ্রন্থে ৩/১৪০ বলেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, হাদীসটি দুর্বল। (আল-ফুতূহাতুর রাব্বানিয়্যা, ইবনে আল্লান, ৪/৩৩৫) এভাবে হাফেজ সুয়ূতীও ‘আল-জামিউস সাগীর’ এ হা. ৬৬৭৮ দুর্বল বলেছেন।
ইবনুল আত্তার রাহ. (মৃ. ৭২৪ হি.) ‘হুকমু সওমি রজব’ নামক ছোট্র পুস্তিকায় ও আল্লামা তাহের পাটনী রাহ. (মৃ. ৯৮৬ হি.) ‘তাযকিরাতুল মওযূআত’ গ্রন্থে পৃ. ১১৭ হাদীসটির সূত্র দুর্বল উল্লেখ করার পর বলেন, ‘ফাযায়েলে আমলে দুর্বল হাদীস মতে আমল করা জায়েয।’ অর্থাৎ ইমামদ্বয় সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, এ হাদীসের সম্পর্ক যেহেতু আমলের ফযীলতের সাথে, কাজেই এটি দুর্বল হলেও আমলযোগ্য।
হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. (মৃ. ৭৯৫ হি.) হাদীসটিকে দুর্বল আখ্যায়িত করা সত্বেও এ থেকে প্রমাণ গ্রহণ করে বলেন, ‘বরকতময় সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য দু’আ করা মুস্তাহাব। যাতে তখন আমল করা যায়।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৪) ইমাম মুনাবী রাহ.ও (মৃ. ১০৩১ হি.) ‘ফয়যুল কাদীর’ ও ‘আত-তাইসীর’ গ্রন্থদ্বয়ে ইবনে রজবের উক্ত কথা উল্লেখ করে এর সমর্থন দিয়েছেন।
এ মাসের বিদআত ও বর্জনীয়
------------------------------------------
আমাদের দেশে এলাকা ভেদে এ মাসে বেশ কিছু রসম ও বিদআত শরিয়তের নামে চালু রয়েছে। যেমন সালাতুর রাগায়েব তথা রজবের প্রথম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ১২ রাকাআত নামায আদায় করা। আমি নিজ কানে শুনেছি, এক বক্তা উক্ত নামায পড়ার ওয়ায করছেন।
অথচ ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. বলেন, সালাতুর রাগায়েব ও এর ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস মিথ্যা ও জাল। অধিকাংশ ওলামার নিকট এ নামায বিদআত। যেমন আবু ইসমাইল আনসারী, আবু বকর সামআনী, আবুল ফযল ইবনে নাসির ও ইবনুল জাওযী রাহ. সহ অন্যরা এমনই মত ব্যক্ত করেছেন। আর এ নামাযের আবিস্কার যেহেতু চারশ হিজরীর পরে হয়েছে, তাই পূর্ববর্তীগণ থেকে এ সম্পর্কে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। (লাতায়িফুল মাআরিফ পৃ. ২২৮)
প্রখ্যাত ফকীহ ইবনে আবেদীন শামী রাহ. (মৃ. ১২৫২ হি.) বলেন, এ বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই জাল ও বানোয়াট। (ফাতাওয়া শামী, ২/৪৭০)
‘তাম্বীহুল গাফিলীন’ পৃ. ৪৯৬ গ্রন্থে রয়েছে,
وهي بدعة ، الحديث الوارد فيها موضوع باتفاق المحدثين.
উক্ত নামায বিদআত এবং এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মতিক্রমে জাল।
এভাবে শবে এস্তেফতাহ নামে ১৪ই রজব দিবাগত রাতে চার রাকাআত নামায বিশেষ নিয়মে পড়ার যে বর্ণনা রয়েছে, তাও বানোয়াট। ইবনে রজব রাহ. বলেন, রজবের বিশেষ পদ্ধতির নামাযের কোন বর্ণনাই প্রমাণিত নয়। (লাতায়িফ, পৃ. ২২৮)
ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. লিখেন,
وأما الصيام: فلم يصح في فضل صوم رجب بخصوصه شيء عن النبي صلى الله عليه وسلم ولا عن أصحابه.
‘রজব মাসের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখে রোযার ফযীলত সম্বলিত বিশুদ্ধ কোন হাদীস রাসূল ও সাহাবা থেকে বর্ণিত হয় নি।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ পৃ. ২২৮)
আর ইবনে হাজার রাহ.-এর মন্তব্য শুরুতেই উল্লেখ হয়েছে যে, ‘রজব মাসের ফযীলত ও রোযা অথবা এ মাসের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখে রোযা কিংবা বিশেষ কোনো রাত্রি উদযাপন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন হাদীস বর্ণিত হয় নি।’
সারকথা, রজব মাস কুরআনে বর্ণিত চার সম্মানিত মাসের একটি, সুতরাং এর পুরোটাই বরকতময়। তাই এ মাসের সবকটি দিন ও রাতেই ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাপারে যত্নবান হওয়া চাই এবং বর্ণিত দু’আটি পড়া যায়। আর কোন নির্দিষ্ট রাতে বা দিনে বিশেষ আমল বা নামায-রোযা এবং রসম-রেওয়াজ পরিত্যাগ করা অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রসম-রেওয়াজ ও বিদ'আতকে ইবাদত মনে করে আমল করা থেকে হেফাজত করুন।