বিকাশ/রকেট/নগদ রিচার্জ ক্যাশব্যাক - ডিসকাউন্ট অফার : মোবাইল ব্যাংকিং
একটি দালিলিক পর্যালোচনা
আজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। এটা এমন একটি বিষয়ে যেখানে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সকলেই জড়িত প্রায় বলা যায়।
এখানে একটা কথা শুরুতে বলে রাখা ভালো : এই মাসআলাটি একদমই নতুন বলা যায়। যা নিয়ে এখনো গবেষণা বিস্তারিতভাবে হয়নি। তবে আলহামদুলিল্লাহ দীর্ঘ এক মাস এই মাসআলার পিছনে সময় ব্যায় করেছি, দলিল যোগাড় করার চেস্টা করেছি। প্রতিটি আরবি দলিলের অনুবাদ করা হয়েছে। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পোস্ট অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এই মাসআলাটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় নিয়ে মনযোগ দিয়ে বারবার পড়তে হবে। এখানে শাস্ত্রীয় পরিভাষা ব্যাবহার করা হয়েছে। যা সাধারণ পাবলিকের জন্য সহজে বোধগম্য হবার নয়। এটা আলেমদের জন্য উপকারি।
তাই বুঝে বুঝে ২/৩ বার পড়ার অনুরোধ থাকবে।
আলোচ্য বিষয় সেটা হলো : মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন। সহজ ভাষায় যেটাকে বর্তমানে আমরা বিকাশ রকেট নগদ ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি লেনদেন বুঝে থাকি।
এখন এই লেনদেনগুলোর শরয়ী বিধান কি?? মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি কি শরীয়ত সম্মত নাকি কোন অবৈধ পন্থা আমরা অজান্তেই অবলম্বন করছি!! লম্বা -চওড়া আলোচনা।
আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো : বিকাশের মাধ্যমে আমাদের দৈনিক লেনদেন। এর শরয়ী বিধান নিয়ে আমরা আলোচনা করব।
এটা অনস্বীকার্য যে মোবাইল ব্যাংকিং কিন্তু ব্যাংকিং পদ্ধতিরই আরেকটি নতুন রুপরেখা এবং লেনদেন সহজকরণের আধুনিক নবযাত্রা! ব্যাংকিং লেনদেন, পদ্ধতি সম্পুর্ণ পলিসি প্রয়োগ করা হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মধ্যে! তাই এদুভয়ের মধ্যে কোনরকম পার্থক্য নেই। মুল ব্যাংকিংয়েরই একটি প্রশাখা হল মোবাইল ব্যাংকিং!
এবং এ কথা স্বরণযোগ্য যে : প্রতিটি ব্যাংকিং সিস্টেমই সুদি লেনদেনের সঙ্গে ওতপ্রেতভাবে সম্পৃক্ত! যারা নিজেদেরকে ইসলামি ব্যাংক বলে পরিচয় দেয় তাদের লেনদেনও সুদমুক্ত নয়। আর বাকি ব্যাংকিং সিস্টেমের পুরোটা না হলেও তার কিঞ্চিত বাদ দিলে বাকিটা সবই সুদি লেনদেন ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে!!
আর এ কথা প্রায় সকলেরই জানা যে : বিকাশ এটি ব্রাক ব্যাংকের একটি অন্যতম অঙ্গসংগঠন বা প্রশাখা। এই বিকাশই ব্রাকের অন্যতম অর্থ সঞ্চালক। আর ব্রাক ব্যাংক পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুদি ব্যাংক তা কারোরই অজানা নয়। ব্রাক ব্যাংক খৃষ্ঠানদের অর্থ সঞ্চালক হিসেবে যথেষ্ঠ সুনাম কুড়িয়েছে।
তো বোঝা গেলো ব্রাক ব্যাংকের সঙ্গে বিকাশ ব্যাংকিংয়ের আর্থিক লেনদেনের দিক দিয়ে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত!
তো এখন এই বিকাশ লেনদেনের শরয়ী হুকুম কি হতে পারে সেটাই আমাদের মুল আলোচ্য বিষয়। বিকাশ লেনদেনের মধ্যে মোটাদাগে কয়েকটি লেনদেন পরিলক্ষিত হয় :
(১) ক্যাশইন (২) ক্যাশআউট (৩) মোবাইল ফ্লেক্সিলোড (৪) বিকাশ মোবাইল রিচার্জ +ক্যাশব্যাক (৫) বিকাশ পেমেন্ট+ ডিসকাউন্ট!!
আমরা পয়েন্টগুলো নিয়ে আলোচনার চেস্টা করব ইনশাআল্লাহ। উপরোক্ত পয়েন্টগুলোর মধ্যে আসলে মৌলিকভাবে ১, ২ এবং ৩ নাম্বার পয়েন্টের মধ্যে শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে কেন সমস্যা নেই। বিকাশ থেকে এ কাজগুলো করলে কোন প্রকার সুদি কারবার বা অবৈধ পন্থা অবলম্বন হয় না!!
এখানে আমাদের মুল যে আলোচ্য বিষয় তা হলো : রিচার্জ ক্যাশব্যাক!! কারণ এটি এমন একটি বিষয় যেখানে সবরকম মানুষই জড়িত প্রায়। অর্থাৎ যাদেরই বিকাশ একাউন্ট আছে : প্রায় প্রতিদিনই তাদের কাছে বিভিন্ন ম্যাসেজ আসে বিকাশ থেকে। যার মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ একটি ম্যাসেজ হলো : আজকে যদি ৫০ টাকা রিচার্জ করেন তাহলে ১০০% ক্যাশব্যাক পাবেন, অথবা আজ ১১ টাকা রিচার্জে ১৬ টাকা ক্যাশব্যাক অথবা ১০ টাকা রিচার্জে ৫০ টাকা ক্যাশব্যাক ইত্যাদি!
মোটকথা নিদৃষ্ট মোবাইল রিচার্জের উপর বিকাশ গ্রাহকদেরকে ক্যাশব্যাক অফার দিয়ে থাকে। এবং ঐ নিদৃষ্ট টাকাই রিচার্জ করতে হবে। তারচেয়ে কমবেশি করলে অফার পাবে না!!
প্রশ্ন হলো : এই ক্যাশব্যাক গ্রহণ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধতা প্রদান করে!! এর শরয়ী রুপরেখা কি!! এটা গ্রহণ করা বৈধ হবে কিনা! যদি বৈধ হয় তাহলে কিসের ভিত্তিতে বৈধ?? এটা কি হাদিয়া হবে বিকাশ থেকে নাকি অন্যকিছু!!
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে তার আগে আমাদেরকে জানতে হবে যে : আমরা এইযে বিকাশে টাকা জমা রাখি এটাকে শরীয়তের দৃষ্টিতে কি বলা হবে?? এটা কি আমানতের অন্তর্ভুক্ত হবে নাকি এটা নাকি বন্ধক রাখার মত হলো নাকি এটা ঋণ হবে!!
যেহেতু মোবাইল ব্যাংকিং কিন্তু আসল ব্যাংকিং পদ্ধতিরই আরেকটি নতুন রুপরেখা এবং লেনদেন সহজকরণের আধুনিক নবযাত্রা! ব্যাংকিং লেনদেন, পদ্ধতি সম্পুর্ণ পলিসি প্রয়োগ করা হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মধ্যে! তাই এটার হুকুম ব্যাংকের মতই হুবহু!
প্রথম কথা হলো এটাকে বন্ধক বলা হবে না। কারণ বন্ধক বলা হয় ঐ লেনদেনকে যেখানে এক ব্যক্তি নিজের কোন মুল্যবান বস্তুকে অপর ব্যক্তির কাছে টাকার বিনিময়ে বন্ধক বা যামিন রাখে। আর ব্যাংকে এর কিছুই করা হয়নি। এখানে শুধুমাত্র নিজের টাকা জমা রেখে গেছে হেফাজতের জন্য। তাই এটা যে বন্ধক নয় তা সুস্পষ্ট।
বাকি রইল তাহলে এটা আমানত হতে পারবে কিনা :
ব্যাংকে যেই টাকা রাখা হয় সমাজে সেটাকে আমানত বলে পরিচয় দেয়া হয়। যেহেতু টাকা হেফাজতের জন্য ব্যাংকে সবাই টাকা রাখে তাই সবাই এটাকে আমানত হিসেবেই জানে। কিন্তু আসল কথা হলো : শরীয়ত এই টাকা গচ্ছিত রাখাকে আমানত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। কারণ আমানত বলা হয় : ঐ লেনদেন যেখানে আমানত রক্ষাকারী ব্যক্তি উক্ত সম্পদের মধ্যে কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না : এবং উক্ত মালামাল কোন দৈব কারণে ধ্বংস হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়!!
কিন্তু ব্যাংকিং সিস্টেম এ উভয় মুলনীতির বিপরীত! কারণ তারা গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই ব্যাংকের টাকা পয়সা দিয়ে ব্যাবসা করে হস্তক্ষেপ করে এবং কোন কারণে টাকা পয়সা নস্ট হয়ে গেলে তারা গ্রাহককে উক্ত টাকা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকে!! সুতরাং এ টাকা গচ্ছিত রাখার পদ্ধতি যে আমানত নয় সেটাও সুস্পষ্ট হয়ে গেলো।
বাকি রইল তাহলে এটা কি হবে?? এটা বন্ধক নয়, আবার আমানত ও নয় তাহলে কি!!
শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে এই গচ্ছিত টাকা তখন ঋণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ সঞ্চয়কারী একাউন্ট হোল্ডার যিনি তিনি হলেন ঋণদাতা। গ্রাহক তখন হয়ে যাবেন ঋণদাতা আর ব্যাংক হয়ে যাবে ঋণগ্রহীতা! "
ঋণ বলা ঐ লেনদেন কে : যেখানে যেই ব্যক্তির কাছে টাকা রাখা হয় সে ব্যক্তি ঐ টাকা নিজের প্রয়োজনে খরচ করতে পারে বরং নিজ প্রয়োজনে খরচের জন্যই নেয় এবং ঋণদাতা চাহিবামাত্র তাকে ফেরৎ দিতে সে বাধ্য থাকে!!
এটা স্বতশিদ্ধ বিষয় যে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের এসব টাকার উপর হস্তক্ষেপ করে, অর্থাৎ তারা এসব টাকা দিয়ে ব্যাবসা করে। তাই সেটাকে আমানত বললেও মুলত সেটা শরয়ী আমানত নয় বরং তা হলো ঋণের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে টাকা রাখা মানেই হলো ব্যাংকগুলোকে টাকা ব্যাবহার করতে দিতে হবে এমন চুক্তি মেনে নেয়ার নমান্তর! যদিও সে কথা তারা উল্লেখ করে না। কিন্তু তারা উল্লেখ না করলেও তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড এবং পলিসি লক্ষ করলে বিষয়টি বুঝে আসে। আর গ্রাহক সেটিকে মেনেও নিয়েছে। কারণ সে চাহিবামাত্র তার টাকা পেয়ে যাচ্ছে। তাই তারকাছে সমস্যা নয়!
হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়া গ্রন্থ ফতোয়ায়ে শামির চতুর্থ খণ্ডের ৩৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে : কোন ব্যক্তির কাছে যদি অপর কোন ব্যক্তি টাকা পয়সা রাখে অতঃপর সে তাকে বলে যে তুমি এই টাকা নিজের প্রয়োজনে খরচ করতে পারো : তাহলে সেটা ঋণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। যদিও এখানে ঋণ শব্দ ঐ মালদার ব্যক্তি উল্লেখ না করে।
رجل عنده دراهم لغيره فقال له صاحب الدراهم: اصرفها في حواءجك : كان قرضا ( فتاوي الهنديۃ ٣٩٦/٤) .
কারণ ফিক্বহে হানাফির একটি স্বতশিদ্ধ মৌলিক মুলনীতি হলো : চুক্তির মধ্যে উদ্দেশ্য এবং অর্থের ধর্তব্য করা হয় : সেখানে কোন শব্দ বলাটা জরুরি নয়!
العبرۃ في العقود للمقاصد والمعاني لا للالفاظ والمباني ( شرح القواعد الفقهيۃ لاحمد الزرقا ٥٥)
সুতরাং সমাজে যেহেতু এটাই প্রসিদ্ধ যে আমরা সবাই ব্যাংকগুলোকে আমাদের টাকা দিয়ে ব্যাবসা করার অনুমতি দিয়ে থাকি তো সেটা শরীয়তের দৃষ্টিতে করয বা ঋণ হিসেবে ধর্তব্য হবে। ঋণ শব্দ উল্লেখ না করলেও ব্যাংকিং রীতিনীতি থেকে এটা সুস্পষ্ট!
এজন্য শরীয়তের একটি মৌলিক মুলনীতি হলো : " সমাজে প্রসিদ্ধ বিষয় শর্তযুক্ত বিষয়ের মতই " ।
المعروف عرفا كالمشروط شرطا كذا في الاشباه والنظاءر و شرح الحموي ٢٨٧/٢ )
অর্থাৎ টাকা রাখলে ব্যাংক সেটার উপর হস্তক্ষেপ করে এটা প্রসিদ্ধ বিষয়। আর যেটা প্রসিদ্ধ বিষয় সেটা উল্লেখ না করলেও কেমন যেন সেটি শর্তযুক্ত! আর গ্রাহক সেটা মেনে নিয়েছে! সুতরাং প্রমাণিত হলো যে ব্যাংকে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন জমা টাকা " করয " তথা ঋণের অন্তর্ভুক্ত!!
সুতরাং ব্যাংকিং লেনদেনগুলোর সঙ্গে তাদের গ্রাহকদের মৌলিক ভিত্তি হলো ঋণদাতা আর ঋণগ্রহীতা হিসেবে। আর মোবাইল ব্যাংকিং ও তার অন্তর্ভুক্ত যেহেতু মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রমগুলো ও তাদের আসল ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে : মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাংকের সমস্ত হুকুম এবং ঋণের সমস্ত শরয়ী বিধান আরোপিত হবে।
এ দীর্ঘ লম্বা আলোচনার পর আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌছতে পারলাম যে ব্যাংকের কাছে আমাদের টাকা ঋণ হিসেবে আছে শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে, মোবাইল ব্যাংকিং কমিটি বা ব্যাংক তারা হলো ঋণী আর আমরা গ্রাহক একাউন্ট হোল্ডার হলাম ঋণদাতা!!
এবার মুল টপিকে ফেরা যেতে পারে : এমবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই রিচার্জ ক্যাশব্যাক অফার গ্রহণ করার কতটুকু বৈধতা শরীয়ত আমাদেরকে দিয়েছে!!
বিকাশ আমাদেরকে এই যে নিদৃষ্ট পরিমাণ রিচার্জের কারণে ক্যাশব্যাক রিটার্ন করছে এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন হুকুমের আওতাধীন!!
এই ক্যাশব্যাকের হুকুম সুস্পষ্ট। এখাসে লুকোচুরি বা অস্পষ্টতার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বিষয়টি নতুন সাথে সাথে জটিল এবং দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে কোন কোন আলেমে দ্বীন এটাকে বৈধ হবার স্বপক্ষীয় দলিল পেশ করার চেস্টা করেছেন। এবং যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেস্টা করেছেন যে এধরণের ক্যাশব্যাক বৈধ!!
উনারা এই ক্যাশব্যাক বৈধ প্রমাণ করার জন্য ৩ ধরণের যুক্তি পেশ করে থাকেন :-
(১) এই ক্যাশব্যাক যেহেতু কোম্পানি আমাদেরকে ফ্রি ফ্রি দিচ্ছে তাই এটা হাদিয়া হিসেবে পরিগণিত হবে অথবা তা হেবা তথা দান হিসেবে বিবেচিত হবে! হেবা সদক্বাহ বা হাদিয়ারই অপর আরেকটি প্রকার এবং তা নিঃসন্দেহে বৈধ!!
(২) দ্বিতীয় কথা তারা বলে থাকেন যে : কোম্পানি আমাদেরকে অফার দিয়েছে তাই অফার গ্রহণ করেছি। এখানে কোন বাধা দেখছি না!
(৩) সর্বশেষ কথা তারা যেটাকে জোরালো ভাবে উপস্থাপন করে থাকেন সেটা হল : বিকাশ বা রকেট/নগদ তাদের দেয়া এই ক্যাশব্যাক এর টাকাটা সন্দেহপূর্ণ। তাদের ইনকাম সোর্স বা তার ভ্যালিডিটি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় না। সুতরাং সেটা সুদ হতেও পারে নাও হতে পারে! হারাম মাল থেকেকে হতে পারে নাও হতে পারে। তো এধরণের সম্পদ থেকে হাদিয়া গ্রহণ শরীয়তের দৃষ্টিতে শিথিলযোগ্য! যদিও মাকরুহ হবে!!
এই ছিল ঐ সমস্ত আলেমদের বক্তব্য যারা ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট ঢালাওভাবে জায়েজ বলে থাকেন।
আমরা উনাদের কথা নিয়ে পর্যালোচনা করব এবং বিকাশের এই ক্যাশব্যাক নিয়ে বৈধ-অবৈধতার ডিস্কাশন করব ইনশাআল্লাহ।
সে হিসেবে আমরা আমাদের আলোচনাকে ৫ পয়েন্টে বিভক্ত করব : যেগুলোর দালিলিক বিশ্লেষণ দ্বারা তাদের বক্তব্যের খণ্ডন এবং ক্যাশব্যাক হারাম হওয়ার বিষয়টি সকলের সামনে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ!
(১) বিকাশের এ ক্যাশব্যাক শরীয়তের দৃষ্টিতে হাদিয়া অথবা হেবা হিসেবে গণ্য নয় তাই তা গ্রহণ করা যাবে না।
(২) বিকাশের এ ক্যাশব্যাক সুদ! সে জন্য তা নেয়া যাবে না।
(৩) বিকাশের ইনকাম সোর্স সুদের উপর স্থিতিশীল! তাদের আয়ের অধিকাংশই হারাম। তাই তাদের ক্যাশব্যাক বৈধ নয়।
(৪) ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার থেকে কোন উপকার নিতে পারে না!
(৫) তাক্বওয়ার দাবি এ ধরণের সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা!!
উপরোক্ত পাঁচটি বিষয়ের উপরই আমরা কিঞ্চিত আলোকপাত করার চেস্টা করব ইনশাআল্লাহ।
প্রথমেই আসি যে বিকাশ যে নিদৃষ্ট রিচার্জের উপর ক্যাশব্যাক দিচ্ছে হাদিয়া অথবা হেবা হতে পারবে কিনা যেমনটা স্বল্পসংখ্যক আলেমগণ দাবি করে ক্যাশব্যাক বৈধ প্রমাণের চেস্টা করেছেন!
সবার আগে বুঝতে হবে যে শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে কোন বিষয়কে হাদিয়া বলে আর কোন বিষয়কে হেবা বলে ?? হাদিয়া বা হেবা দেয়ার পদ্ধতি কি?? যেনতেনভাবে দিলেই কি সেটা হাদিয়া/ হেবা হিসেবে বিবেচিত হবে?
সুতরাং হাদিয়া/হেবা কাকে বলে সেটা সবার আগে জানতে হবে।
চার মাজহাবের সমন্বয়ে অনবদ্য সংকলন " আল মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যা " গ্রন্থের ৪২ তম খণ্ডের ২৫২ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে লেখা হয়েছে যে :
শাব্দিক অর্থে হাদিয়া বলা হয় এমন সম্পদ যা অন্যকে উপঢৌকন স্বরুপ অথবা সম্মান স্বরুপ হাদিয়া দেয়া হয়!!
পারিভাষিক অর্থে হাদিয়া বলা হয় : অন্যকে ফ্রি ফ্রি কোন সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়া ( যেখানে কোন প্রকার শর্ত বা কোনকিছুই থাকবে না। সম্পুর্ন বিনিময় ছাড়াই মালিক বানিয়ে দেয়া)
সুতরাং হাদিয়া অথবা হেবা অথবা সদক্বা এর প্রত্যেকটিই সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত যেখানে সামষ্টিকভাবে অন্যকে বিনিময় ব্যাতীত কোন শর্ত ব্যাতীত মালের মালিক বানিয়ে দেয়া হয়!!
(১) ذكر في " الموسوعۃ الفقهيۃ ٢٥٢/٤٢ "
الهديۃ لغۃ : هی المال الذي اتحف اوهدي لاحد اكرام
ا له .
اصطلاحا : عرفها النفيۃ : تمليك عين مجانا .
عند الشافعيۃ : تمليك عين بلا عوض مع النقل الي مكان الموهوب له اكراما .
الهبۃ : تمليك ين بلا عوض
فالهبۃ والهديۃ والصدقۃ انواع من البر يجمعها تمليك العين بلا عوض .
আর হেবা বলা হয় : অন্য ব্যক্তিকে তৎক্ষণাত কোন বিনিময় ব্যাতীত কোন শর্ত ব্যাতীত মালের মালিক বানিয়ে দেয়া!!
কেউ কেউ বলেছেন হেবা বলা হয় এমন দান যেটা কোন বিনিময় থেকে খালি হয় এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়! কখনো কখনো হেবার সঙ্গে এমন বিষয় সম্পৃক্ত হয় যার কারণে সেটা গ্রহণ করা হারাম হয়ে যায় : যখন সেটা দিয়ে কোন গোনাহের ইচ্ছা করা করা হয় অথবা তা দ্বারা কর্মচারীগণ এবং অভিভাবক/মালিকগণ সুদি কারবারের ইচ্ছা করেন!
(২) الهبۃ :تمليك المال بلا عوض في الحال .
وقد يطراء عليها ما يجعلها محرمۃ اذا قصد بها معصيۃ او قصد بها رشوۃ اصحاب الولايۃ والعمال . ( الموسوعۃ الفقهيۃ١٢۰/٤٢ )
(৩) الهبۃ : العطيۃ الخاليۃ من الاعواض والاغراض ( التجريد ٣٨۰٥/ ٨ )
উপরোক্ত সমস্ত সঙ্গার মধ্যে দেখতে পেলাম যে : হাদিয়া এবং হেবা ঐ বিষয়কে বলা হয় : যেখানে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে কোন বস্তু বা কোন টাকা পয়সা দান করবে বা যে কোন কিছু দিবে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া!! কোন প্রকার শর্ত বা কোন বিনিময় তারমধ্যে থাকতে পারবে না। যখন হাদিয়া বা হেবার মধ্যে কোন বিনিময়/শর্ত এসে যাবে তখন সেটা হাদিয়া/হেবা থাকবে না তখন সেটা ভিন্ন কোন হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
ফিক্বহি কিতাবে সমস্ত ইবারত দেখলে বুঝে আসে যে হাদিয়ার মধ্যে কখনো শর্ত হতে পারে না। শর্ত পূরণের ভিত্তিতে যদি কোন বস্তু কাউকে দেয়া হয় তাহলে সেটা হাদিয়া থাকে না সেটা বরং কর্মচারীর হুকুমে চলে যায়। আমাদের সমাজেই দেখুন : কেউ কাউকে হাদিয়া দিতে গেলে কখনো এটা বলে না যে : আমি আপনাকে এই জিনিস হাদিয়া দিব তবে শর্ত হলো আপনি আমাকে অমুক বস্তু দিবেন বা অমুক কাজ করে দিবেন!
যখনই এরকম চুক্তি বা শর্ত করা হবে দুজনের মধ্যে তখন সেটা হাদিয়া হিসেবে বাকি থাকবে না তখন সেটা হবে বিনিময় চুক্তি!!
এখন ক্যাশব্যাকের দিকে ফিরে আসুন!
সেখানে শর্ত দেয়া থাকে যে নিদৃষ্ট টাকা রিচার্জ করতে হবে, নিদৃষ্ট এ্যাপস দিয়ে! নিদৃষ্ট পরিমাণ টাকা নিদৃষ্ট এ্যাপস দিয়ে রিচার্জ না করলে আপনাকে তারা ক্যাশব্যাক দিবে না!! ক্যাশব্যাক পেতে হলে তাদের রুলস নিয়ম-নীতি আপনাকে মেনে নিতে হবে।
আর আমরা উপরে হাদিয়ার সঙ্গা থেকে জেনেছি যে হাদিয়ার মধ্যে কোন চুক্তি বিনিময় শর্ত এগুলা চলে না। বরং বিনিময়হীন নিঃশর্তভাবে বস্তুকে অন্যের মালিক বানিয়ে দেয়ার নামই হাদিয়া।
তাই বোঝা গেল যে ক্যাশব্যাক কে হাদিয়া বলার কোন সুযোগ নেই!
কোন কোন ভাই বলে থাকেন যে হেবার মধ্যে তো শর্ত করা যায়! যদিও শর্ত বাতিল হয়ে যাবে এবং হেবা শুদ্ধ হয়ে যাবে। সে হিসেবে এটাকে হেবা ধরলে সমস্যা কি? বিকাশ তার গ্রাহককে হেবা করতেছে!!
এর উত্তরে বলব : হেবার সঙ্গা উপরেই বলা হয়েছে। বিখ্যাত কিতাবাদির রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। সমস্ত ফিক্বহের কিতাবাদির কোথাও কেউ দেখাতে পারবে না যে হেবার মধ্যে শর্তযুক্ত চুক্তি করতে হয়!!
হ্যা একথা সঠিক যে হানাফি মাজহাবের কোন কোন ফক্বিহ বলেছেন যে হেবার মধ্যে কোন শর্ত দিলে শর্ত বাতিল হয়ে যাবে এবং হেবা সহিহ হয়ে যায়!!
উক্ত কথাটির আমরা দালিলিক বিশ্লেষণ করব।
হেবা করার মধ্যে যদি হেবাকারি শর্ত করে তাহলে সেই হেবা সহিহ হবে কিনা এবং তা গ্রহণ করা বৈধ কিনা :
হানাফি মাজহাবের মাজহাব সংক্রান্ত ফতোয়ার দালিলিক পর্যালোচনার এক কালজয়ী গ্রন্থ " বাদাইয়ুস সানাই " গ্রন্থ এর ৮ নাম্বার খণ্ডের ১১০ পৃষ্ঠায় লেখা আছে যে :
যদি হেবার মধ্যে কোন বিনিময়ের কোন কিছুর শর্ত করে তাহলে ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুমাল্লাহ এর নিকট ঐ হেবা জায়েজ হবে না!! আর ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতে যখন হেবাকৃত বস্তু অন্যকে মালিক বানিয়ে দেয়ার জন্য কোন শর্তারোপ করে তখন তা বিনিময় এর দ্বারা মালিকানা বানিয়ে দেয়া হয়। আর সেটা তখন ক্রয় বিক্রয় হুকুম এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। সেটাই ক্রয় বিক্রয় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা!
وان شرط العوض لا يجوز عند ابي حنيفۃ وابي يوسف وعند محمد اذا شرط فيها كانت تمليكا بعوض وهذا تفسير البيع ( بداءع الصناءع ١١۰/٨ وكذا في رد المحتار ٢٢٤/١٥ )
তাহলে আমরা স্পষ্টভাবে দুটি কথা এখান থেকে বুঝতে পারলাম যে : ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ রাহিমাহুমাল্লাহ এর নিকট ঐ হেবা জায়েজ হবে না!! আর ইমাম মুহাম্মাদের মতে কোনকিছুর শর্ত করলে তখন সেটা ক্রয় বিক্রয় চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে!!
সুস্পষ্ট হুকুম এখানে যে জায়েজ হবে না! ঐ হেবা তখন অবৈধ!
আচ্ছা যদি ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ এর কথা মেনেও নিই তবুও তো তখন সেটা আর হেবা থাকছে না বরং তখন ক্রয় বিক্রয় চুক্তির অন্তর্ভুক্ত !! তাহলে হেবা তো আর হলো না। এইটাকে তখন হেবা বলার কোন সুযোগ নেই। তখন সেটা ক্রয় বিক্রয় হুকুমের আওতাধিন!!
তাছাড়া আরো একটি বিষয় আছে : ইমাম মুহাস্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বা অন্যরা যারা শর্তযুক্ত হবার কথা বলেছেন তারা ঐ হেবার কথা বলেছেন যেখানে হেবাকারি এবং হেবাগ্রহণকারি উভয়ের কাছে ভিন্ন বিষয় থাকে। যেমন হেবাকারি শর্ত করলো যে আমি তোমাকে বাড়িটি হেবা করে দেব এই শর্তে যে তুমি আমাকে একটা ফ্রিজ দিবে বা এ জাতীয় কিছু!
কিন্তু ক্যাশব্যাকের ক্ষেত্রে যদি সর্বশেষ আপনার কথা মেনে নিই যে এটা হেবা ( যদিও সেটা হবার কোন সম্ভাবনা নেই তা আমরা স্পষ্ট করেছি) তাহলে এখন বিষয়টি দেখুন যে : বিকাশ আপনাকে শর্ত করতেছে ৫০ টাকা আপনাকে সে হেবা করবে বিনিময়ে ১০ টাকা আপনাকে ফ্লেক্সিলোড দিতে হবে!!
আর ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতে তখন এটা হেবা থাকবে না তখন এটা ক্রয় বিক্রয় এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে!!
এখন সে মত অনুযায়ী আমরা দেখতে পাচ্ছি : এখানে টাকার বিনিময়ে টাকা ক্রয় করা হচ্ছে!! এটা এভাবে যে : হয়ত গ্রাহক ১০ টাকা রিচার্জ করার মাধ্যমে ৫০ টাকা ক্রয় করছে অথবা বিকাশ তার গ্রাহকদের কাছে ৫০ টাকাকে ১০ টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করছে!!
আর শরীয়তের দৃষ্টিতে টাকার বিনিময়ে টাকা বিক্রয় করা বৈধ নয়। অর্থাৎ যদি একই জাতীয় টাকা হয় তাহলে তার মধ্যে কমবেশি করে ক্রয় বিক্রয় বৈধ নয়!! কমবেশি হলেই সেটা সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এটাকে শরয়ী পরিভাষায় " বাইয়ে সরফ " বলে।
যেমনটা এসেছে হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ আল হিদায়া কিতাবের তৃতীয় খন্ডে এবং আল বাহরুর রায়িক, ফতোয়ায়ে শামি ফাতহুল ক্বাদির সহ সমস্ত ফিক্বহের কিতাবাদিতে :
যখন একই জাতীয় মুল্যমান বস্তুর একটিকে অপরটির বিনিময়ে ক্রয় বিক্রয় করা হয়!! সেখানে কমবেশি হলে সুদ হবে!!
الصرف هو البيع اذا كان كل واحد من عوضيه من جنس الاثمان ( الهدايۃ١۰٤/٣ وللتفصيل في فتح القدير ١٢٦/٧ وكذا في المبسوط ٣/١٤ )
বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ মুফতি শাইখুল ইসলাম জাস্টিস আল্লামা তাক্বি উসমানি দাঃবাঃ তার সময়ের শ্রেষ্ঠ ফিক্বহি সংকলন " বুহুস ফি ক্বাযায়া ফিক্বহিয়্যা মুআসিরা" কিতাবের ২ য় খণ্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে চমৎকার কথা বলেছেন যে : একই জাতীয় কাগজী মুদ্রাকে একটির অপরটির বিনিময়ে কমবেশি করে বিক্রি করা জায়েজ নয়। চাই ঐ ক্রয় বিক্রয় বাকিতে হোক বা নগদে হাতেহাতে হোক!! সুতরাং উদাহরণ স্বরুপ সৌদি ১১ রিয়ালকে সৌদি ১০ রিয়ালের বিনিময়ে ক্রয় বিক্রয় বৈধ নয়, বরং তা সুদ হবে!!
لا يجوز بيع الجنس الواحد من العملۃ الورقيۃ بعضه ببعض متفاضلا سواء كان ذلك نسِيءۃ او يدا بيد فلا يجوز مثلا بيع شرۃ ريالات سعوديۃ ورقا باحد عشر ريالا سعوديا ورقا .( بحوث في قضايا فقهيۃ معاصرۃ ٢/ ١٥٨-١٦۰)
সুতরাং চুড়ান্তভাবে একথা আমাদের নিকট প্রমাণিত হলো যে ক্যাশব্যাকের এই টাকা না তো হাদিয়া হতে পারবে, না তো সেটা হেবা হতে পারবে আর না সেটা ক্রয় বিক্রয় বৈধ হতে পারবে!! কোন অবস্থাতেই এটাকে বৈধ বলার সুযোগ নেই!!
আমাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট ছিল : বিকাশের এ ক্যাশব্যাক সুদ! সে জন্য তা গ্রহণ করা যাবে না।
সুদ এভাবে যে : আপনি কোন ব্যক্তির কাছে টাকা পান : এখন টাকা ফেরৎ নেয়ার সময় যদি অতিরিক্ত আরো টাকা নেন আপনি যা আপনার আসল টাকার চেয়ে বেশি তাহলে সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
যেমন উদাহরণ স্বরুপ কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট তার ১ হাজার টাকা গচ্ছিত রাখল। তো কোন একসময় ঐ ব্যক্তি পাওনাদার ব্যক্তিকে বলল : যদি আজ আপনি ৫০০ টাকা ফেরৎ নেন তাহলে আপনাকে আমি ৫০০ টাকার সঙ্গে নিজের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আরো ৫০/১০০ টাকা দিব। এখন যদি পাওনাদার এই শর্ত মেনে ৫০০ টাকা ফেরত নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঐ অতিরিক্ত ১০০ টাকা গ্রহণ করে তাহলে সেটা সর্বসম্মতভাবে সুদ হবে যা কারোর নিকট অস্পষ্ট নয়। কারণ সুদ বলা হয় নিজের যা প্রাপ্য তার অতিরিক্ত গ্রহণ করা!!
الربا : فضل خال عن عوض بمعيار شرعي مشروط لاحد المتعاقدين في المعاوضۃ ( الموسوعۃ الفقهيۃ ٢٢/٥۰ . وكذا في الهدايۃ ٧٧/٣ , وكذا في فتح القدير ١/٧ )
আপনি বিকাশের কাছে আপনার টাকা রেখেছেন। তো এখন সেখান থেকে আপনি ১০ টাকা বা ১৬ টাকা ফেরৎ নিচ্ছেন ( মোবাইল রিচার্জ ) এখন বিকাশ আপনাকে অতিরিক্ত আরো ১৬ টাকা বা ১০০% ক্যাশব্যাক দিচ্ছে যেটা সুনিশ্চিতভাবেই সুদেরর অন্তর্ভুক্ত। তাই ক্যাশব্যাক গ্রহণ করা বৈধ নয়!
তৃতীয় পয়েন্ট ছিল আমাদের : বিকাশের ইনকাম সোর্স সুদের উপর স্থিতিশীল! তাদের আয়ের অধিকাংশই হারাম। তাই তাদের ক্যাশব্যাক বৈধ নয়।
এই পোস্টের শুরুতেই আমরা সুবিন্যস্ত আকারে আলোচনা করেছি যে বিকাশ একটি সুদ নির্ভর সংস্থা। যাদের মার্কেটিং কমোডিটি সুদের উপর নির্ভর করে। পুরো ব্যাংকিং জগতটাই সুদভিত্তিক। সেখানে বিকাশের সুদি কারবার এবং খৃষ্টান সংস্থা ব্রাকের অঙ্গসংগঠন হওয়ার কথা কারোরই অজানা নয়। ব্রাকের সঙ্গে তাদের লেনদেন স্পষ্ট। যেহেতু তারা মুল কমিটি আর শাখা প্রশাখা। তাই তাদের মধ্যে লেনদেন আছে এটা সুনিশ্চিত।
হ্যা তাদের হালাল ইনকামের সোর্স থাকতে পারে কিন্তু সেটা একেবারেই অপ্রতুল্য!! সিংহভাগ আয়ের সোর্স হলো সুদ। গ্রাহক না চাইলেও বিকাশ অটোমেটিক গ্রাহকদেরকে ২.৩৩% অথবা আরো উচ্চতর রেটে সুদ দিয়ে থাকে।
আর সুদি কারবারের সম্পদ এতটাই জঘণ্য এবং সুস্পষ্ট হারাম যে রকম অন্য কোন হারাম মাল সম্পর্কে হাদিসে ধমক এবং কঠোর শাস্তির কথা আসেনি!! আল্লাহ তাআল্লা এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সুদি কারবারে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।
অনেকে বলে থাকেন যে ব্রাক বা বিকাশের তো হালাল ইনকাম সোর্স থাকতে পারে!! হ্যা ভাই। থাকতেই পারে। অস্বীকার করার কারণ নেই। কিন্তু তাদের ইনকামের সিংহভাগ অংশ দেখুন ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে যার পুরোটাই সুদি লেনদেনের উপর নির্ভরশীল!!
আলোচ্য মাসআলা হলো যে হালাল হারাম সংমিশ্রিতত মাল থেকে হাদিয়া গ্রহণ করার বিধান!! মুলত তাদের হালাল ইনকামের সোর্স আছে বলে সেখান থেকে হাদিয়া নেয়ার অবকাশ আছে বলে অনেকে মত প্রকাশ করতে চান!
আমরা আমাদের ১ নং পয়েন্টে সুস্পষ্টভাবে ক্লিয়ার করেছি যে এটা হাদিয়া হওয়ার কোন সুযোগই নেই।
অগত্যা ধরেই নিলাম (!) যে তারা এটাকে হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করার প্রানন্তকর চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন! আমরা সেটাকে শরয়ী দলিলের আলোকে বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ!!
যেহেতু একদলের দাবি যে : হালাল হারাম মিশ্রিত মাল গ্রহণের সুযোগ আছে। তাই ক্যাশব্যাক নেয়া যাবে।
হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ফিক্বাহবিদ গবেষক আল্লামা ইবনে নুজাইম রাহিমাহুল্লাহ তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ " আল আশবাহ ওয়ান নাযাইর " কিতাবে হারাল হারাম সংমিশ্রিত মাল গ্রহণের ব্যাপারে মৌলিক একটি মুলনীতি উল্লেখ করেন। যেটাকে আল্লামা হামাওয়ি আল মিসরি ঐ কিতাবেরই ব্যাখ্যা গ্রন্থে উল্লেখ করে বলেন : যখন হালাল এবং হারাম সংমিশ্রণ হয়, একত্রিত হয় : তখন হারামকে প্রাধান্য দেয়া হয়!! অনুরুপভাবে শাইখুল ইসলাম জাস্টিস তাক্বি উসমানি দাঃবাঃ তার কিতাব " বুহুস ফি ক্বাযায়া " কিতাবে উল্লেখ করেন।
اذا اجتمع الحلال والحرام غلب الحرام
( شرح الحموي علي الاشباه ٣۰١/١ وكذا في فقه البيوع للشيخ تقي العثماني ٣٨٧/٢ وكذا في بحوث في قضايا فقهيۃ معاصرۃ ١٦۰/٢ )
শাইখুল ইসলাম জাস্টিস আল্লামা তাক্বি উসমানি দাঃবাঃ তার ফিক্বাহ গ্রন্থ " ফিক্বহুল বুয়ু " এর ২ য় খণ্ডের ১০০৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন যে :
" সমস্ত বাতিল চুক্তিকে আমি " অবৈধ চুক্তি " শিরোনামে ব্যক্ত করব সামনে এবং যে ব্যক্তি এই হারাম মাল ডাকাতি করেছে সেটাকেও" অবৈধ " মাল বলে ব্যক্ত করব সহজবোধ্য হওয়ার কারণে। আর এইভাবে ব্যক্ত করার কারণে সমস্ত হারাম মাল এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে যেই মালের মালিক শরয়ীভাবে কোন ব্যক্তি হতে পারে না। চাই সেই সম্পদ ছিনতাইকৃত হোক অথবা ঘুষ হোক অথবা ঋণের মধ্যে সুদভিত্তিক হোক অথবা অবৈধ পন্থায় গৃহিত কোন সম্পদ হোক!!
نعبر عن جميع العقود الباطلۃ فيما ياتي بالمغصوب , والذي يقبض هذا المال الحرام بالغصب . وذلك لسهولۃ التعبير . ويشمل هذا التعبير كل مال حرام لا يملكه المرء في الشرع , سواء كان غصبا او رشوۃ او ربا في القرض او ماخوذا ببيع باطل ( فقه البيوع ١۰۰٦/٢ )
অতঃপর তিনি আরো বলেন : ছিনতাইকৃত মাল এবং হুকুমের বিবেচনায় এরই অনুরুপ অন্যান্য মাল যা মানুষ গ্রহণ করেছে ঘুষ হিসেবে অথবা চুরি করে অথবা শরয়ীভাবে বাতিল চুক্তির দ্বারা ( সুদ ) সেসমস্ত মাল সম্পদ দ্বারা উপকার গ্রহণ করা বৈধ নয় এবং তা ক্রয় বিক্রয় করা এবং হেবা/ হাদিয়া দেয়াও বৈধ নয়! এবং সে এই মাল হারাম হওয়া সম্পর্কে জানার পরেও যদি হাদিয়া অথবা ক্রয়সূত্রে অথবা ওয়ারিস সূত্রে পেয়ে থাকে তবুও তার জন্য নেয়া বৈধ হবে না বরং তার উপর এই মাল মালিককে ফিরিয়ে দেয়া আবশ্যক হবে। যদি ফেরৎ দিতে অক্ষম হয় তাহলে ঐ মাল সওয়াবের নিয়ত ব্যাতীত সদক্বাহ করে দেয়া ওয়াজিব হবে। এতটুকু বিষয় সমস্ত উলামায়ে কেরামের নিকট ঐক্যপূর্ণ এবং সবাই একমত।
ثم قال بعد صفحات فف صفحۃ١۰٥٢ علي عنوان " خلاصۃ البحث " : فقال هناك : المال المغصوب وما في حكمه مثل ما قبضه الانسان رشوۃ او سرقۃ او بعقد باطل شرعا . لا يحل له الانتفاع به ولا بيعه وهبته ولا يجوز لاحد يعلم ذلك ان ياخذه منه شراء او هبۃ او ارثا . ويجب علیه ان يرده الي مالكه فان تعذر ذلك وجب عليه ان يتصدق به عنه . ثم قال : ۃهذا القدر متفق عليه بين الفقهاء. ( ١۰٥٢/٢ )
অতপর তিনি এসব হারাম মালের হুকুম বর্ণনা করে বলেন :
" যদি এই মাল অন্যকে হেবা স্বরুপ দেয়া হয় তার মুল্য আদায়ের পূর্বে তো যদি ঐ হেবাগ্রহণকারি ফকির মিসকিন হয় তাহলে সে গ্রহণ করতে পারবে আর যদি ফকির মিসকিন না হয় বরং মধ্যবিত্ত হয় তাহলে হানাফি মাজহাব এবং মালেকি মাজহাব অনুযায়ী ঐ মাল গ্রহণ করা বৈধ নয়!!
ثم بين حكم هديۃ الغاصب من المال المغصوب المخلوط وغيره : فقال : فان دفع شيا من هذا المخلوط الي اخر هبۃ قبل اداء بدله : فان كان الاخذ فقيرا جاز له الاخذ الانتفاع به .......... اما اذا كان الاخذ لا تحل له الصدقۃ فللفقهاء فيه اقوال والراجح من مذهب المالكيۃ والحنفيۃ انه لا يحل الانتفاع به ( فقه البيوع ١۰٢٦/٢ )
অতঃপর অন্যত্র হারাম হালাল সংমিশ্রিত মাল গ্রহণের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বলেন :
যে সমস্ত মাল সম্পদ হালাল হারামের সংমিশ্রণ থাকে তার হুকুম হলো : ছিনতাইকারি অথবা হারাম মাল উপার্জনকারীর নিকট তাদের হালাল মাল সম্পদ পৃথক থাকবে হারাম মাল থেকে : অতঃপর ঐ প্রত্যেক মালের উপর আলাদা আলাদা হুকুম আরোপিত হবে। যদি কোন ব্যক্তিকে মাল দেয়া হয় হালাল সম্পদ থেকে তাহলে তা অপরের জন্য গ্রহণ করা বৈধ। আর যদি হারাম মাল থেকে অপরকে দেয় তাহলে অপরের জন্য সেই হারাম মাল গ্রহণ করা অবৈধ!!
আর যদি সম্পদ গ্রহণকারী জানে যে তাকে যেই ব্যক্তি সম্পদ দিচ্ছে তার নিকটে হালাল সম্পদ এবং হারাম সম্পদ পৃথক পৃথক আছে : কিন্তু সে এটা জানে না যে সে যেই সম্পদ গ্রহণ করছে তা হালাল নাকি হারাম!! সুতরাং এক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবের নিকট " আধিক্যতা " প্রাধান্য পাবে। সুতরাং যদি দানকারি ব্যক্তির মালের অধিকাংশ সম্পদ হারাম মাল হয় তাহলে তা অপরের জন্য গ্রহণ করা বৈধ নয় আর যদি অধিকাংশ মাল হালাল হয় তাহলে তা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে!!
আর আমরা জানি যে বিকাশ ব্যাংকিং লেনদেনগুলোর সব ক্ষেত্র হল সুদের উপর নির্ভরশীল যা অকাট্য হারাম। তাদের অধিকাংশ উপার্জনই হারাম : সুতরাং তা গ্রহণ করা যাবে না।
وقال : ما كان مجموعا من الحلال والحرام : ان يكون الحلال عند الغاصب او كاسب الحرام متميزا من الحرام , فيجري عل كل واحد منهما احكامه. وان اعطي احدا من الحلال : حل للاخذ وان اعطي من الحرام حرم عليه . وان علم الاخذ ان الحلال والحرام متميزان عنده ولكن لم يعلم ان ما ياخذه من الحلال او من الحرام : فالعبرۃ عند الحنفيۃ للغبۃ . فان كان الغالب في مال المعطي الحرام لم يجز له . وان كان الغالب في ماله الحلال وسع له ذلك. ( فقه البيوع ١۰٢١/٢ )
হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব " ফতোয়ায়ে আলমগিরি" এর ৫ ম খণ্ডের ৩৯৭ পৃষ্ঠা এবং ফতোয়ায়ে বাযযাযিয়া ৩ য় খণ্ডের ২০৩ পৃষ্ঠা এবং ফতোয়ায়ে কাযিখান এর ৩ নং খণ্ডের ২৮৯ পৃষ্ঠায় আছে :
" সুদখোর এবং হারাম মাল উপার্জনকারি যখন অন্য কাউকে কোন সম্পদ হাদিয়া দেয় এবং তার অধিকাংশ মাল হারাম হয় তখন তার ঐ হাদিয়া গ্রহণ করবে না এবং তা থেকে খাবে ও না যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে এই সংবাদ না দিবে যে তোমাকে যে মাল দিয়েছি তা হালাল হয়ত মিরাস সূত্রে পেয়েছে অথবা অন্য কারোর থেকে ধার নিয়েছে! যদি ঐ সুদখোরের অধিকাংশ মাল হালাল হয় তাহলে তা গ্রহণ করতে এবং খেতে সমস্যা নেই!
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল