ফিকহ যাকাত

ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা দিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে কি?

ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা দিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে কি?

=============

আধুনিক অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকের প্রয়োজন, অবদান ও জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। পৃথিবীর বুকে প্রায় দুইশ কোটি মুসলমান থাকার পরেও তাদের স্বতন্ত্র সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক থাকবে না তা কী করে হয়! আলহামদুলিল্লাহ, বিগত কয়েক দশক ধরে মুসলিমবিশ্বের ইসলামী স্কলারগণ এর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এবং ইসলামী ব্যাংকের শরীয়তসম্মত প্রয়োগিক রূপরেখা তৈরি করে তা বাস্তবক্ষেত্রে পালন করার চেষ্টাও করছেন। যারা ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সাধুবাদ জানাই। আমরাও চাই, শতভাগ সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হোক।

তবে কথা হলো, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার স্বতন্ত্র শরয়ীনীতি থাকলেও প্রয়োগক্ষেত্রে এখনও শতভাগ শরয়ীনীতির ওপর আমল করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। এখনও বিভিন্ন বিনিয়োগ ক্ষেত্রে শতভাগ সুদমুক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে না। শক্ত নিয়মনীতি এবং শরীয়াহ অডিটের মাধ্যমে বিনিয়োগ থেকে আসা ব্যাংকের সাসপেসিয়াস ইনকাম (ঝঁংঢ়রপরড়ঁং ওহপড়সব) বা সন্দেহজনক আয় বাদ দেয়া হলেও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেক সুদযুক্ত লেনদেন হয়ে যাচ্ছে এবং কিছু লেনদেন শরীয়াহ অডিটের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে কিছু সুদী উপার্জনও ব্যাংক-আয়ে যুক্ত হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় সরেজমিন ঘুরার পর এবং ব্যাংকের ম্যানেজার ও কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার পর অধমের সামনেও কিছু আপত্তিকর বিষয় সামনে এসেছে।

প্রসিদ্ধ একটি ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা অধমকে বলেন- শুনেন হুজুর! শতভাগ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাংকের পাশাপাশি গ্রাহক ও বিনিয়োগ গ্রহণকারীদেরও ধর্মীয় বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে, সুদের প্রতি ঘৃণা জন্মাতে হবে; কিন্তু দীর্ঘদিন ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই আন্তরিকতা ও ঘৃণা অধিকাংশ গ্রাহকের মাঝেই নেই! ফলে আমাদের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষেত্রবিশেষ কিছু অবহেলা হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরাসরি নগদ টাকা ঋণ দেয়ার কোনো সিস্টেম না থাকায় অনেক গ্রাহক ঋণ নেয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মুরাবাহা ও মুশারাকা আড়ালে ঋণ নেয়ার ভুরি ভুরি রেকর্ড আছে। এ বিষয়গুলো উলামায়ে কেরামের সামনে রয়েছে। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফার ব্যাপারে  ফিলহাল উলামায়ে কেরামের ফতওয়া হলো-

যেহেতু ইসলামী ব্যাংকের কিছু আয়ের মধ্যে এখনও সরাসরি সুদের মিশ্রণ আছে কিংবা সুদের সন্দেহযুক্ত প্রফিট আছে, তাই ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহককে তার জমাকৃত আমানতের বিপরীতে যে প্রফিট দেয়া হয় তা গ্রহণ করে খাওয়া ও ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কারণ সুদ যেমন হারাম, তেমনি সুদের সন্দেহ আছে এমন উপার্জনও হারাম। তাই সুদি ব্যাংকের ইন্টারেস্টের মতো এই টাকাও সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে।

সে হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা দিয়েও যাকাত আদায় করা জায়েয হবে না এবং এই মুনাফার ওপরও যাকাত ওয়াজিব হবে না। কেউ যদি কোনো ইসলামী ব্যাংকে একাউন্ট খুলে থাকেন এবং তার একাউন্টে লাভ যোগ হয় তাহলে তিনি শুধু মূল টাকারই যাকাত দিবেন (যদি নেসাব পরিমাণ হয়), প্রাপ্ত লাভের যাকাত দেয়া লাগবে না; বরং ওই লাভ সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিবেন।

তথ্যসূত্র : মুসনাদে আহমাদে (হাদীস : ২৪২, ১/৩৬১) আছে-

عن سعيد بن المسيب قال : قال عمر رضي الله عنه : إن آخر ما نزل من القرآن آية الربا، وإن رسول الله صلى الله عليه وسلم قبض ولم يفسرها، فدعوا الربا والريبة. (قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله : حسن)

আল-হেদায়াতে (৩/৮৫ মাকতাবাতুল ফাতাহ) আছে-

.....لايجوز لاحتمال الربا، والشبهة فيه كالحقيقة.

আরও দেখুন- সুনানে নাসাঈ : ১৩৯, ২৫২৪; সুনানে আবু দাউদ : ৫৯।

.  আদ্দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার ৩/২১৮; ফাতাওয়া বাযাযিয়া ১/৮৬ রশীদিয়া; মাসিক আলকাউসার, অক্টোবর ২০২০ প্রশ্নোত্তর নং : ৫২১৭; রাহমানী পয়গাম ২০১৫



সংকলনে

মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

মুফতিমাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল



০৪ জানুয়ারী ২০২৬