ফিকহ মাযহাব ও তাকলীদ

মুকাল্লিদগণ হাদীসের পরিবর্তে ইমামগণের রায়ের ওপর আমল করে ”—এ অভিযোগের

মুকাল্লিদগণ হাদীসের পরিবর্তে ইমামগণের রায়ের ওপর আমল করে এ অভিযোগের জবাব


শায়খ আশরাফ আলী থানভী রহ.


ইমামগণের তাকলীদের ব্যাপারে কোন কোন মুকাল্লিদ এত গোঁড়ামিতে লিপ্ত যে, ইমামের উক্তির বিপরীত সহীহ হাদীসকে সে নির্ভয়ে রদ করে দেয়। এ কথা চিন্তা করলে আমার তো শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। এ ধরনের এক ব্যক্তির মন্তব্য হলো :

قال قال یسیار است

مرا قال ابو حنیفہ درکار ست

অর্থাৎ কালা কালা তথা রাসূলুল্লাহ (সা) -এর হাদীস তো কতই আছে, কিন্তু আমার প্রয়োজন কেবল আবূ হানীফার উক্তি। এ বাক্যের অন্তরালে রাসূল (সা) -এর হাদীসের প্রতি চরম ধৃষ্টতা ও বে - আদবী প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহ এ জাতীয় গোঁড়ামি থেকে রক্ষা করুন। এদের ভাব - ভঙ্গি দ্বারা প্রমাণ হয় ইমাম আবূ হানীফাই যেন তাদের মূল অনুসরণীয়। তাহলে এ তাকলীদকে কেউ যদি নবুয়তের শরীক " বলে আখ্যায়িত করে তাতে তার অন্যায়টা কি হবে ?

কিন্তু দু-চারজন মূর্খের অবস্থা ভিত্তি করে সমস্ত মুকাল্লিদকে নবুয়তের শিরকে লিপ্ত বলে অভিযুক্ত করাটাও চরম ভুল কথা। আল্লাহ্ না করুন সমস্ত মুকাল্লিদ এরূপ কেন হবেন। আমার অন্তরে তাকলীদের অর্থ হলো আমরা ইমাম আবূ হানীফার ব্যাখ্যা অনুসারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) -এর হাদীসের ওপর আমল করে থাকি। কেননা আমাদের মতে প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ আসনে আসীন, এটা সর্বজন স্বীকৃত কথা। তাঁর ফকীহুল উম্মত হওয়াটা গোটা উম্মত কর্তৃক স্বীকৃত, তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ জ্ঞানই এর প্রমাণ।

এখন বলুন এ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তাকলীদের মধ্যে

নবুয়তের শিরকের" অর্থ কোত্থেকে ঢুকল ? বস্তুত তাকলীদের এ অর্থে বিশ্বাসী ব্যক্তির মূল উদ্দেশ্য হাদীসের ওপর আমল করা আর ইমাম আবূ হানীফা হাদীসের সঠিক মর্ম বোঝার উসীলা বা মাধ্যম মাত্র । যে ব্যক্তি কোন মাধ্যম ছাড়াই হাদীসের ওপর আমল করার দাবিদার আসলে সে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে হাদীসের আনুগত্য করার অনুশীলন করে । এটা নিশ্চিত যে, সালফে সালেহীন তথা আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দের জ্ঞান - বুদ্ধি, তাকওয়া পরহেযগারী, খোদাভীতি,আমানতদারী ও সতর্কতা ছিল আমাদের এবং আপনাদের অপেক্ষা অনেক গভীর,তীব্র সংবেদনশীল। তাহলে বলুন, হাদীসের ওপর পূর্ণাঙ্গ আমল কার হচ্ছে, নিজ জ্ঞানে হাদীসের ওপর আমলকারী আপনার, না - কি ' সালাফের ' (পূর্ববর্তীগণের) মাধ্যমে হাদীসের অনুসারী মুকাল্লিদের ? এর ফয়সালার ভার ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিবর্গের বিবেকের ওপর ন্যস্ত রইল।

যাহোক,তাকলীদের যে ব্যাখ্যা আমি ব্যক্ত করেছি সে এক প্রজ্ঞাপূর্ণ জ্ঞান যা স্মরণ রাখার মত। আহলে হাদীসগণ আমাদের প্রতি অপর এক প্রশ্নের অবতারণা করে যে , আপনাদের সামনে কোন হাদীস পেশ করা হলে সে অনুপাতে আমল করতে আপনারা কেবল এ কারণে অস্বীকার করে থাকেন যে, আপনাদের ইমামের রায় এর বিপরীত । এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে,হাদীসের অনুসরণ আপনাদের মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং ইমামের তাকলীদ করাটাই এ ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয়।

এর জবাব হলো বিরোধপূর্ণ বিষয়ের মূলে একাধিক হাদীস বর্ণিত থাকে। আপনাদের উদ্ধৃত হাদীসের ওপর যদিও আমাদের আমল নেই , কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের আমল অন্য হাদীসের ওপর যা আপনাদের নিকট স্বীকৃত নয়। তাহলে অভিযোগ কেবল আমাদের একার ওপর নয় আপনাদের ওপরও বর্তায়। বাকি রইল আপনাদের অপর দাবি যে, আমাদের পক্ষের হাদীস প্রাধান্যের অধিকারী ( راجح ) আর আপনাদের হাদীসের প্রাধান্য স্বীকৃত নয় ( مرجوح )জবাবে বলবো প্রাধান্য দেয়ার পদ্ধতি মূলত রুচিনির্ভর বিষয় । আপনাদের অভিরুচি অনুযায়ী একটি হাদীস হয় তো প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য কিন্তু ইমাম আবূ হানীফার অনুসন্ধান মতে হয় তো প্রাধান্য রয়েছে অপর হাদীসের। আর আমাদের দৃষ্টিতে ইমাম সাহেবের অনুসন্ধান ও প্রজ্ঞা আপনাদের রুচি ও প্রজ্ঞা অপেক্ষা অধিকতর গ্রহণযোগ্য । এর পরও নিজেদেরকে তোমরা হাদীসের ওপর আমলকারী বলে দাবি করা আর তাকলীদপন্থীদের হাদীসের ওপর আমলকারী স্বীকার না করাটা নিতান্ত গোঁড়ামি।

এ কথাটাকেই ভিন্নতর ভঙ্গিতে আমি ব্যক্ত করতে চাই যে ,

আমল বিল - হাদীস " তথা হাদীসের ওপর আমল করার অর্থ কি ? এর দ্বারা কি সমস্ত হাদীসের ওপর আমল বোঝায়, না কি কোন কোন হাদীসের উপর ? যদি বল এর অর্থ সমস্ত হাদীস, তাহলে এটা তোমাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

কেননা বিপরীত অর্থবোধক হাদীসের সবগুলির ওপর আমল করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই কোন একটি হাদীসের ওপর আমল করে অপরগুলিকে বর্জন করতেই হবে। আর যদি এর অর্থ হয় কোন কোন হাদীসের ওপর আমল করা, তাহলে এ অর্থে আমরাও আহলে হাদীস বা হাদীসের ওপর আমলকারী। সুতরাং এ যুক্তি বলে তোমরাই কেবল আহলে হাদীস হওয়ার দাবি করা অসার ও ভিত্তিহীন প্রতিপন্ন হয়।

দ্বিতীয়ত, মানসূস (সরাসরি কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত) মাসআলা সংখ্যায় অতি নগণ্য, অধিকাংশ মাসআলাই ইজতিহাদী। সেগুলোতে আহলে হাদীসগণও হানাফী কিতাব থেকে ফতোয়া দেয়, আমল করে অথবা অন্য কোন ইমামের রায়ের ভিত্তিতে আমল করে। অতএব বেশির ভাগ মাসআলায় তোমরাও মুকাল্লিদের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে বলতে হয় তাকলীদ করাতো হারাম নয় তাকলীদের নাম নেয়াটাই কেবল নাজায়েয ও শিরক। কথাটা কেমন যেন হাস্যকর শোনায়। কেউ যদি দাবি করে যে, সকল মাসআলাতেই সে মানসূস হাদীসের ওপরই আমল করে ও ফতোয়া দেয়, তবে পরস্পর লেনদেন , মুআমালা,বেচা - কেনা, চুক্তি করা, বাতিল করা, শোফআ, রেহন ইত্যাদি বিষয়ে আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন রাখার অনুমতি দেয়া হোক আর সে সহীহ্ হাদীস দ্বারা এর জবাব দেবে। কিয়ামত পর্যন্ত হাদীস দ্বারা জবাব দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এখন সে হয় কোন ইমামের কওল বা উক্তি দ্বারা জবাব দিবে, তবে তো সে তাকলীদই হলো । অথবা বলবে শরীয়তে এ মাসআলার কোন হুকুম বর্ণিত নেই , তাহলে এটা হবে -

اليوم اکملت لكم دينكم -

(আজ তোমাদের দীনকে আমি পূর্ণতা দান করলাম) আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধিতা। বস্তুত এর দ্বারাই কিয়াস বা উদ্ভাবন - শাস্ত্রের বৈধতা প্রমাণ হয়। কেননা দীনকে আমি পূর্ণতা দান করেছি খোদায়ী বাণীর প্রেক্ষিতে শরীয়তে হুকুম বর্ণিত হয়নি এমন কোন মাসআলার অস্তিত্ব না থাকা অনিবার্য। বলা বাহুল্য, মানসূস হুকুমের সংখ্যা অতি নগণ্য।

অতএব এমতাবস্থায় দীনের পূর্ণতার একমাত্র উপায় এই যে, কিয়াস ও ইস্তিম্বাতের (উদ্ভাবন) বৈধতা স্বীকার করে নেয়া। অর্থাৎ গায়রে মানসূস " মাসআলাসমূহ মানসূস মাসআলার সাথে তুলনা করে হুকুমের পরিচয় লাভ করা। এর দ্বারা কিয়াস ও ইস্তিম্বাতের বৈধতা পুরোপুরি অস্বীকার করে কেবল হাদীসের ওপর আমলের দাবিদারদের ভ্রান্তিও স্পষ্টত প্রমাণ হয় । অবশ্য কোন কোন হাদীসে কিয়াসের নিন্দাও করা হয়েছে , কিন্তু সেটা শরীয়তের নীতিমালা ভিত্তিক কিয়াস নয় বরং এ হুকুম ইসলামী নীতি পাশ কাটিয়ে বানোয়াট নীতিকেন্দ্রিক কিয়াসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । নতুবা দীনের মধ্যে ত্রুটি আসা অনিবার্য হয়ে পড়ে ।

ইরযাউল হক , ১ ম খণ্ড , পৃষ্ঠা ১২

আশরাফুল জওয়াব ১৬৬


সংকলনে

মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

মুফতিমাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল


০৪ জানুয়ারী ২০২৬