নারীদের ঈদের নামাজ: জামাতের নিয়ম ও ইসলামের নির্দেশনা
শরীয়তের স্বভাব চাহিদা হল, মহিলাদের ইবাদত বন্দেগী থেকে শুরু করে তাদের সকল কর্মকাণ্ড পুরুষদের থেকে আলাদা ও অতি গোপনীয় হবে। পুরুষের জন্য যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে এসে জামাতের সাথে আদায় করা শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ হুকুম সেখানে তাদেরকে গৃহাভ্যন্তরে নামায আদায় করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
মসজিদে নববীতে যেখানে এক রাকাত নামায এক হাজার রাকাত সমান, এক বর্ণনামতে পঞ্চাশ হাজার রাকাত সমান, এর সাথে আবার আল্লাহর রাসূলের মত ইমামের পেছনে নামায পড়ার সৌভাগ্য তো রয়েছেই। তা সত্বেও সে সময় নারী সাহাবীদেরকে তাদের গৃহাভ্যন্তরের সর্বাধিক নির্জন স্থানে নামায পড়াকে উত্তম বলা হয়েছে।
তবে মহিলাদের মসজিদ এবং ঈদগাহে গমন করার বিষয়টি ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনুমোদিত থাকলেও পরবর্তীতে সেটাকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহিলাদের ঈদগাহ বা মসজিদে আসার যে অনুমতি দেয়া হয়েছিলো, তার ভিত্তি ছিলো তিন’টি জিনিসের উপর। এক. ইসলামের সূচনালগ্ন হওয়ায় দ্বীনি ইলমের ব্যাপক প্রচার প্রসারের স্বার্থে পুরুষ মহিলাসহ সকলের জন্য মসজিদে এসে সরাসরি নবীজীর কাছ থেকে হুকুম-আহকাম জানার প্রয়োজন। দুই.সংখ্যাধিক্যতার উদ্দেশ্যে নারীদের ঈদগাহে আসার জন্য বলা হতো, শুত্রুদের ভীতিগ্রস্ত করার জন্য।তিন.ফিতনার আশঙ্কা না থাকা।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে নারীদের মসজিদে এসে নামাজ পড়ার নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও তাদের মসজিদে আসার জন্য কিছু শর্ত ছিল। যেমন ১. সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে। ২.সেজেগুজে খুশবু লাগিয়ে বের না হওয়া। ৩.বাজনাদার অলংকার, চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না। ৪. অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না। ৫. পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে। ৬. অপ্রয়োজনে কোনো বেগানা পুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া ফেতনার কারণ হবে না। (সুনানে আবু দাউদ: ৫৬৫, আহকামুল কোরআন, থানভি: ৩/৪৭১, বাজলুল মাজহুদ: ৪/১৬১)
কিন্তু পরবর্তীতে একদিকে যখন দ্বীনি ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়ে গেলো অপরদিকে ‘খাইরুল কুরুন’ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেই মহিলারা রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে খুশবু ব্যবহার করে, সেজে-গুজে মসজিদে আসতে শুরু করলো, তখন ফিতনা ফাঁসাদের প্রবল আশঙ্কায় হযরত আয়েশা রাযি., উমর রাযি., ইবনে মাসঊদ রাযি.-সহ অনেক সাহাবায়ে কেরাম কঠোরভাবে মহিলাদের মসজিদে গমনকে নিষেধ করলেন। তাঁরা নিজেদের এ নিষেধাজ্ঞার সমর্থনে এ কথাও ঘোষণা করলেন যে, ‘নবীজী যদি জীবিত থাকতেন, তবে তিনিও অবশ্যই এ পরিস্থিতিতে মহিলাদেরকে মসজিদে গমন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন’। (সহিহ বুখারি: ৮৬৯)
অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও মৌনভাবে তাদের এ নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করলেন। কেননা, এ নিষেধাজ্ঞা ছিলো, শরীআতের রুচিবোধ এবং নবীজীর মানশা ও ইচ্ছার সঠিক বাস্তবায়ন। সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে পরবর্তী উলামায়ে আহনাফ সহ অধিকাংশ আলেমগণ মহিলাদের ঈদগাহে বা মসজিদে গমন করাকে মাকরুহ মনে করেন। তাই তাঁরা নারীদেরকে ঈদগাহে আসতে অনুৎসাহিত করে থাকেন।
এখন আমরা মহিলাদের ঈদগাহে গমন করা মাকরুহ হওয়া প্রসঙ্গে কুরআন, হাদীস, সাহাবাদের আমল ও ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করবো।
ইসলামী শরীয়ত মতে মহিলাদের উপর ঈদের নামায ওয়াজিব নয়। তারা ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহে যাবে না। তেমনিভাবে নিজ গৃহে নিজেরা জামাত করেও পড়বে না।
ক্স আবু আমর শায়বানি (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে দেখেছি, তিনি জুমার দিন নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন, আপনারা বের হয়ে যান। আপনাদের ঘরই আপনাদের জন্য উত্তম। (আল মুজামুল কাবির: ৯৪৭৫) আল্লামা হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য (সেকা)। (মাজমাউজ জাওয়াইদ: ২/৩৫)
ক্স নাফে’রহ.বলেন, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা. তাঁর নারীদেরকে দুই ঈদে ঈদগাহে যেতে দিতেন না। (প্রমাণ;-অল মু’জামুল অওসাত ৪/৩০১) উরওয়া তার পিতা যুবাইর রা. থেকে বর্ননা করেন যে, তিনি নিজ পরিবারের নারীদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাতে যেতে দিতেন না। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা (হাদীস নং-৫৮৪৬)
ইয়াহইয়া বিন সাইদ আল অনসারী রহ. (১৪৩হি) বলেন, আমাদের সময় দুই ঈদের জন্য নারীদের বের হওয়ার প্রচলন ছিলোনা। (প্রমাণ;- অল অওসাত ৪/৩০২; বুখারী শরীফের শরা উমদাতুল কারী ৩/৩০৫)
ইবরাহীম নাখায়ী রহ. বলেন, ঊভয় ঈদে মহিলাদের (নামাযের জন্য) বাইরে যাওয়া মাকরূহ। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ৪/২৩৪)
ক্স সুনানে তিরমিযীতে রয়েছে,
উম্মু আতিয়্যা রাঃ থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ঈদুল ফিতর ও ‘ঈদুল আযহার দিন কুমারী, তরুণী, প্রাপ্তবয়স্কা, পর্দানশিন এবং ঋতুবতী সব মহিলাদের (নামাযের জন্য) বের হওয়ার (‘ঈদের মাঠে যাওয়ার) হুকুম করতেন। ঋতুবতী মহিলারা নামাযের জামা’আত হতে এক পাশে সরে থাকতো কিন্তু তারা মুসলমানদের দু’আয় শারীক হত। এক মহিলা বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! যদি কোন নারীর নিকট (শরীর ঢাকার মত) চাদর না থাকে? তিনি বললেনঃ তার (মুসলিম) বোন তার অতিরিক্ত চাদর তাকে ধার দিবে। জামে তিরমিযী - ৫৩৯ । ইবনু মাজাহ- ১৩০৭
ক্স কতক ওলামায়ে কেরাম এ হাদিসের ভিত্তিতে উভয় ঈদে মহিলাদের উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিয়ে থাকেন।
ক্স তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে মাকরুহ ও নাজায়েয মনে করেন। তাই মাকরূহ হওয়াটাই আসল।
ক্স ইমাম ইবনে মুবারক রহ. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, বর্তমানে নারীদের জন্য উভয় ঈদে বের হওয়াকে অপছন্দ করি। তবে যদি কোনো নারী নিষেধ না মানে তাহলে তার স্বামী যেন তাকে বের হওয়ার অনুমতি প্রদান করে। এভাবে যে, সে বের হবে ছেড়াঁ কাপড় পরিধান করে এবং সৌন্দর্য ও সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারবে না। আর এভাবে বের হতে যদি অস্বীকার করে তাহলে স্বামীর জন্য অধিকার রয়েছে তাকে বাধা দেওয়ার।
ক্স হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের এ অবস্থা দেখতেন, তবে অবশ্যই তিনিও তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল’। (সহিহ বুখারি: ৮৬৯)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর এই মন্তব্য তো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর দুনিয়া থেকে বিদায়ের কিছুদিন পরের নারীদের সম্পর্কে। অথচ আজকের যুগের নারীদের উগ্রতা আর বেহায়াপনার হাজার ভাগের এক ভাগও সে যুগে ছিল না। তাহলে এ অবস্থা দেখে তিনি কী মন্তব্য করতেন?’ (উমদাতুল কারি: ৬/১৫৮)
এখানে কিছু দ্বীনি ভাইয়েরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন যে, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নতকে ডিঙিয়ে কারো কথা মানা উচিত হবে না। নাউজুবিল্লাহ। এই চিন্তা তাদের অজ্ঞতার প্রতিফলন। সাহাবিদের সুন্নত কখনো হাদিসের বিরুদ্ধে যায় না, বরং আল্লাহ ও রাসুলের (স.) হক আদায়ে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ।
তাছাড়া মনে রাখতে হবে- হাদিস শরিফের পাশাপাশি সাহাবিদের আমলও দলিলরূপে গণ্য। কেননা তাঁরা ছিলেন সত্যের মাপকাঠি। রাসুল (স.) সুস্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা আমার পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেমন মাড়ির দাঁত দিয়ে কোনো জিনিস মজবুতভাবে ধরা হয়।’ (আবু দাউদ: ৪৬০৭)
আর আয়েশা রাযি. একথা যখন বলেছেন, তখন ছিলো ‘খাইরুল কুরুন’ তথা ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগের সময়কাল। তাবেয়ীগণের সাথে সাথে অনেক সাহাবীও তখন জীবিত ছিলেন। লক্ষণীয় হলো, যে বিষয়টি ‘খাইরুল কুরুন’ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেও নবীজীর অনুমোদন প্রাপ্তির যোগ্যতা রাখে না, চৌদ্দশ বছর পরে নৈতিক অবক্ষয়ের এ চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে তা কীভাবে অনুমোদিত হতে পারে?
ক্স আওসাত ফিস সুনানে রয়েছে,
নারীরা ঈদগাহে যাওয়ার ব্যাপারে আহলে ইলমগণ মতভেদ করেন। হযরত আবু বকর রা. ও আলী রা. থেকে বর্ণিত, তারা উভয়ে বলেন, অধিকার রয়েছে প্রত্যেক বন্ধনী ওয়ালী নারীর উভয় ঈদের নামাযে বের হওয়ার। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ঈদের জন্য বের হওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সুন্নত। ইবনে উমর রা. বের হতে দিতেন তার পরিবারের থেকে যাদের সামর্থ্য আছে তাদেরকে। (আওসাত ফিস সুনান ৪/২৬২)
ক্স ফী মুখতাসারি ইখতিলাফিল উলামা গ্রন্থে আছে,
‘ইমাম আবু জাফর আত তাহাভী রহ.বলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ ছিল হয়তো একারণে যে তখন মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল। ফলে সংখ্যাধিক্যতার উদ্দেশ্যে নারীদের ঈদগাহে আসার জন্য বলা হতো, শুত্রুদের ভীতিগ্রস্ত করার জন্য। কিন্তু বর্তমানে সেটার আর প্রয়োজন নেই। (ফী মুখতাসারি ইখতিলাফিল উলামা ১/২৩২)
ক্স শারহুস সুন্নাহ আল বগভীতে রয়েছে,ওলামায়ে কেরাম বর্তমানে মহিলাগণ ঈদগাহে যাওয়ার ব্যাপারে মতভেদ করেন। কতক আহলে ইলম তাদের কে অনুমোদন দেন আবার কতকে মাকরুহ করেন। (শারহুস সুন্নাহ ৪/৩২০)
ক্স ইকমালিল মু'লিম বি শারহে সহীহিল মুসলিমে রয়েছে,
দুই ঈদের নামাযে নারীদের বের হওয়ার ব্যাপারে সালাফগণ মতভেদ করেন : একটি দল একে তাদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন। যার মধ্যে রয়েছেন,আবু বকর, আলী, ইবনে উমর রাদিয়াআল্লাহ আনহুম এবং অন্যান্যরা।
তাদের মধ্যেই আরেক দল পুরোপুরি ভাবে নিষেধ করেন। তারা হলেন, আয়েশা রাযি.উমর রাযি. ইবনে মাসঊদ রাযি.
উরওয়াহ, কাসেম রাদিয়াআল্লাহ আনহুম। তাদের মধ্যেই কেউ কেউ আবার যুবতীদের নিষেধাজ্ঞা আওতাভুক্ত মনে করেন,অন্যদের নয়। আর অতিবৃদ্ধা নারীদের অনুমতি প্রদান করেন। তারা হলেন, উরওয়া, কাসিম এবং ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ এবং এটাই ইমাম মালিক ও আবু ইউসুফ রহ. এর মত। আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ থেকে এ ব্যাপারে ভিন্ন মত বর্ণিত হয়েছে, তিনি দুই ঈদে উপস্হিত হওয়ার ব্যাপারে একবার অনুমতি দিয়েছেন, আবার অন্যবার নিষেধ করেছেন। (ইকমালিল মু'লিম বি শারহে সহীহিল মুসলিম ৩/২৯৮)
ক্স শাফেঈ মাযহাবের প্রখ্যাত ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারীদের মত হচ্ছে, সুন্দরী নারী ব্যতীত অন্যদের (তথা ফিতনার আশঙ্কা মুক্ত নারীদের) জন্য উভয় ঈদের নামাজে যাওয়া মুস্তাহাব।
আর রাসুলের যুগে যুবতী মহিলারা বের হতে পারার কারণ হচ্ছে, তখন ফেতনার আশংকা ছিল না। এ কারণেই হযরত আয়েশা বলেন,‘যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের এ অবস্থা দেখতেন, তবে অবশ্যই তিনিও তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল’। (মিনহাজ ৬/১৭৯)
ক্স ইমাম বদরুদ্দিন আইনী হানাফী রহ. ‘ফী শারহে সুনানে আবী দাউদে বলেন,গ্রহণযোগ্য ফাতাওয়া হলো নিষেধের উপর এবং নারীদের বের হওয়া হারাম। বিশেষ করে মিশরে। আর তিনি উমদাতুল কারী তে বলেন, বর্তমান ফাতাওয়া হল সাধারনভাবে নিষেধ। বিশেষ করে মিশর কান্ট্রিতে।’ (ফী শারহে সুনানে আবী ৪/৪৮০)
ক্স আল-মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাতে রয়েছে, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের মত হচ্ছে , যুবতী ও সুন্দরী নারীদের জন্য উভয় ঈদের নামাজে যাওয়া মাকরুহ। কেননা এতে ফেতনার আশংকা রয়েছে। তবে অতিবৃদ্ধা নারীদের জন্যে বের হওয়া এবং নামাযে পুরুষদের সাথে শরীক হওয়া মুস্তাহাব মনে করেন। (মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ ২৭/২৪২)
ক্স হানাফীদের নিকট মতভেদ রয়েছে মহিলাদের উভয় ঈদের জন্য বের হওয়ার বৈধতার ব্যাপারে, মহিলা যুবতী ও বৃদ্ধা হওয়ার ভিত্তিতে। অতঃপর নারীদের মধ্য থেকে যারা যুবতী এবং সুন্দরী তাদের জন্য ঈদের নামায অথবা জুমআর নামায বা অন্যান্য নামাযে বের হওয়ার অনুমতি নেই। আর বৃদ্ধা নারীদের বেলায় সর্বসম্মতিক্রমে ঈদ বা অন্যান্য নামাযে বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে সর্বাবস্থায় উত্তম হল সব মহিলাদের ঘরে নামায পড়া।
বাদায়ুস সানায়ে ১/২৭৫, মাবসুত সারাখসী ২/৪১
ক্স কিতাবুল আসারে রয়েছে, ইমাম মুহাম্মদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা তাদের জন্য বাইরে যাওয়া পছন্দ করি না, কেবল অতি বৃদ্ধা ছাড়া। এটা আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্য। (কিতাবুল আসর ২০৪)
ক্স হিদায়া গ্রন্থে রয়েছে, নারীদের জন্য জামাতে উপস্থিত হওয়া মাকরুহ অর্থাৎ নারীদের থেকে যারা যুবতী তাদের জন্য। কেননা তাদের ক্ষেত্রে ফিতনার আশংকা রয়েছে। আর বৃদ্ধা নারীদের জন্য অনুমতি রয়েছে যে, তারা ফজর, মাগরিব এবং ইশার নামাযে উপস্থিত হতে পারবে। এটা ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এর মত। আর ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, বৃদ্ধা নারীরা সকল নামাযেই বের হতে পারবে। কেননা তাদের বেলায় ফেতনার আশংকা নেই তাদের প্রতি পুরুষদের আকর্ষন না থাকার কারণে। ফলে তাদের বেলায় বের হওয়া মাকরুহ হবে না।যেমন ঈদের নামাযের বেলায়। হিদায়া ১/ ৫৭)
ক্স বাদায়ুস সানায়েতে রয়েছে, অতঃপর মহিলাদের উভয় ঈদে বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে কি?
এব্যাপারে সবাই একমত যে যুবতী নারীদের জন্য জুমা, ঈদ এবং অন্যান্য নামাযেও বের হওয়ার অনুমতি নেই। কারণ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন ‘তোমরা ঘরে অবস্থান করো’। ঘরে স্থির থাকার নির্দেশ ঘর হতে স্থানান্তরিত হওয়াকে নিষেধ করে। তাছাড়া তাদের বের হওয়াটা নিঃসন্দেহে ফিতনার কারণ। আর ফিতনা ছাড়ানো হারাম, আর যা হারামের দিকে নিয়ে যায় সেটাও হারাম।
আর অতিবৃদ্ধা নারীরা সর্বসম্মতিক্রমে ফজর,মাগরিব এবং ইশা ও উভয় ঈদের নামাযে বের হতে পারবে।
বাকী যোহর এবং আসরের ওয়াক্তে বের হওয়ার ব্যাপারে ফকীহগণ মতভেদ করেন। ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক্ষেত্রে তাদেরও বের হওয়ার অনুমতি নেই। আর ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহিমাহুল্লাহ বলেন বের হতে পারবে।
সাহাবাইনের যুক্তি হল, নিষেধ করা হয়েছে তাদের বের হওয়ার দরুন ফিতনার আশংকার কারণে। আর এটা বৃদ্ধা নারীদের বেলায় পাওয়া যাচ্ছে না। একারণেই আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ তাদের কে যোহর, আসর ছাড়া অন্যান্য নামাযে বের হওয়ার অনুমতি প্রদান করেছেন।
ইমাম আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ এর যুক্তি হল যোহর এবং আসরের সময়টা এমন এক সময় যখন পথে এবং সব জায়গায় ফাসেকরা ছড়িয়ে থাকে,ফলে নারীদের প্রতি যার আকর্ষন রয়েছে সে ফিতনায় জড়িয়ে যাবে তাদের কারণে অথবা নারীরা ফিতনায় পড়ে যাবে পুরুষদের প্রতি তাদের আগ্রহ বাকী থাকার কারণে, যদিও তারা বৃদ্ধা হোক না কেন। আর ফজর, মাগরিব, ইশার সময় প্রকৃতি যেহুতু অন্ধকার থাকে আর অন্ধকার তাদের মাঝে ও পুরুষদের নজরের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াই।
এমনিভাবে এই সময়গুলোতে লম্পটদের কেও রাস্তাঘাটে পাওয়া যায় না। ফলে সেই সময় বের হওয়া দ্বারা ফেতনায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর ঈদে যদিও অনেক লম্পটরা উপস্থিত থাকে তবে নেককার ব্যক্তিবর্গদের সংখ্যাও অনেক থাকে। ফলে ধার্মিক বা আলেমদের ভয় তাদেরকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে। অতঃপর ঈদের নামায যেহুতু মাঠে খোলা ময়দানে আদায় করা হয় তখন সম্ভব হবে নারীদের কে পুরুষদের থেকে আলাদা করে এক প্রান্তে পৃথকভাবে দাড় করানো। যাতে ধাক্কাধাক্কি না হয়। তাই ঈদে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
অতঃপর এই মতভেদ হল বৈধতা ও অনুমতির ব্যাপারে।
আর উত্তমতার ক্ষেত্রে সর্বসম্মত মত হল,কোনো নামাযের জন্যই নারীরা বাহিরে বের হবে না। কারণ রাসুল সা. বলেছেন ‘নারীদের ঘরে নামাজ পড়া মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।’ আর ঘরের নির্জন কোণে নামাজ ক্ষুদ্র কক্ষের নামাজের তুলনায় উত্তম।’
অতঃপর যখন ঈদের নামাযে বের হওয়ার অনুমতি
দেওয়া হয়েছে তাহলে কি তারা সালাত আদায় করবে?
হাসান রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ এর সুত্রে, যে তারা নামায পড়বে। কেননা বের হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হল নামায। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর বান্দীদেরকে আল্লাহর মসজিদে যেতে বাধা দিও না, তারা যেন বের হয়, যখন বের হয় তখন সুসজ্জিত ও সুগন্ধি ব্যবহার করে যাতে বের না হয়।
আর ইমাম মুআল্লা ইমাম আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ এর সুত্রে ইমাম আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণানা করেন, তারা ইমামের সাথে ঈদের নামায পড়বে না। কেননা তাদের বের হওয়ার কারণ হল মুসলমানদের দল বৃদ্ধি করার জন্য। কারণ উম্মে আতিয়্যা রা. এর হাদিসে রয়েছে, নারীরা রাসুল সা. এর সাথে বের হতো, এমনকি যুবতী ও ঋতুবতী নারীরাও বের হতো। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে ঋতুবতী নারী নামায পড়ে না। তাই এর দ্বারা জানা গেল নারীদের বের হওয়াটা ছিল মুসলমানদের দলবৃদ্ধি করার জন্য। এরকমভাবে বর্তমানেও তাই হবে। বাদায়েস সানায়ে ১/২৭৫
ক্স হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাদায়েউস সানায়েতে বলা হয়েছে—‘যুবতী নারীদের মসজিদে যাওয়া ফেতনা।’ (বাদায়েউস সানায়ে: ১/১৫৬)
ক্স আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি ও আল্লামা হাসকাফি
(রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফেতনার ব্যাপক প্রচলন হওয়ায় ফতোয়া হলো-সব নারীর জন্যই সব নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি এবং নাজায়েয। এর উপরই মুতাআখখেরিন (পরবর্তী) ফুকাহায়ে কেরামের ফাতাওয়া। (আল বাহরুর রায়েক: ১/৬২৭-৬২৮, আদ্দুররুল মুখতার: ১/৩৮০,তাতারখানিয়া ১/৬২৮)
ক্স ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়া সংক্রান্ত হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা যদি দেখি তাহলে বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এক. হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেন, ‘আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৪২; আবু দাউদ: ৫৬৬)
উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করা হতো না। ওই নির্দেশ সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে ও শর্ত না পাওয়ার কারণে এখন নিষেধ করাটাই সুন্নত। কারণ রাসুল (স.)-এর যুগ ওহি নাজিলের যুগ ছিল। তাই নারীরা যাতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ আয়াত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সরাসরি রাসুল (স.) থেকে ভালোভাবে শিখে নিতে পারেন, সেজন্য নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।
আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) বলেন, এ হাদিসে যদিও স্বামীকে নিষেধ করতে বারণ করা হয়েছে, এ বারণ কঠোর নিষেধ নয়, বরং তা হলো সাধারণ নিষেধ। এজন্যই স্বামী অনুমতি দিলেও ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধান ফেতনার আশঙ্কায় নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ করতে পারবেন। (মিরকাতুল মাফাতিহ: ৩/৮৩৬)
দুই. নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে দ্বিতীয় হাদিস হলো, উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমাদের আদেশ করা হয়েছে যে আমরা যেন ঋতুমতী পর্দানশিন নারীদেরও ঈদের ময়দানে নিয়ে যাই। যাতে তাঁরা মুসলমানদের জামাত ও দোয়ায় শরিক থাকতে পারেন। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের জায়গা থেকে আলাদা থাকবে। জনৈকা সাহাবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অনেকের তো চাদরও নেই। রাসুল (স.) বললেন, তাকে যেন তার বান্ধবী নিজ চাদর দিয়ে সাহায্য করে। (সহিহ বুখারি: ৯৭৪)
ব্যাখ্যা: এখানেও আগের উত্তরটি প্রযোজ্য। আর তা হলো, নারীরা যাতে ঈদের দিনের যাবতীয় শরয়ি বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ও রাসুলের ঈদের খুতবায় যাবতীয় ওয়াজ-নসিহত ও মাসয়ালা-মাসায়েল ভালোভাবে শিখে নিতে পারে, সে জন্য রাসুল (সা.)-এর যুগে ঈদগাহে আসার অনুমতি ছিল। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।
ইমাম তাহাবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ছিল, যাতে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য দেখে ইসলামের দুশমনদের যেন চক্ষুশূল হয়। কিন্তু আজ যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই এবং সংখ্যাধিক্য দেখানোর জন্য পুরুষরাই যথেষ্ট, তাই ওই বিধানও প্রযোজ্য হবে না। (ফাতহুল বারি: ২/৪৭০)
আল্লামা ইবনুল হাজ মালেকি (রহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিধানটি রাসুল (সা.)-এর যুগের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী যুগের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। (আল মাদখাল: ২/২৮৮)
আরো দলীল দেখুন: কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা ১/২০১; কিতাবুল আছার ২৪৭; হেদায়া ১/১২৬; বাদায়েউস্ সানায়ে ১/৬১৭; আদ্দুররুল মুখতার ১/৫৬৬; মাসাইলুল ইমাম আহমদ ১১৫; আল মুদাওওনা ১/১৫৫; শরহুল মুহায্যাব ৫/১৩)
সংকলনে
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল