এদেশে ফিকহে হানাফীকে যেভাবে ভুল বোঝা হয়
আমাদের দেশে ফিকহে হানাফীকে বুঝতে মোটাদাগে কয়েকটা জায়গায় ভুল করা হয়। প্রথমত সমাজের অনেক প্রচলনকে ফিকহে হানাফীর বিষয় বলে মনে করা হয়। কারণ কাজগুলো যারা করছে তারা পৈতৃকসূত্রে হানাফী। যেমন মাজার পূজা, মিলাদ-কেয়াম ইত্যাদি। অথচ এগুলোর সঙ্গে ফিকহে হানাফীর কোন সম্পর্ক নেই। এটা সম্পূর্ণ একটি আঞ্চলিক বিষয়।
দ্বিতীয় বিষয়টি হল, হানাফী মাযহাব ইমাম আবু হানিফার দিকে সম্বন্ধিত হওয়ার কারণে ধারণা করা হয় এই মাযহাব কেবলমাত্র ইমাম আবু হানিফার সিদ্ধান্তের সংকলন। অথচ বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। বরং তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণে তাঁর দিকে সম্বন্ধিত করে বলা হয় হানাফি মাযহাব বা ফিকহে হানাফী। অন্যথায় এতে প্রচুর পরিমাণে ইমাম মোহাম্মদ, ইমাম আবু ইউসুফের বহু সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী অনেক ফকীহদের উদ্ভাবিত মাসআলা পাওয়া যায়।
ফিকহে হানাফীকে 'ফিকহুশ শুরা'-ও বলা হয়। কারণ মশোয়ারার বা পারস্পরিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে এই ফিকহের অধিকাংশ মাসআলার আগমন। আবু হানীফা রাহিমাহুমাল্লাহর ফিকহী বোর্ডের বিষয়টি তো বিখ্যাত। পরবর্তীতেও এতে প্রতিটি মাসআলা নিয়ে প্রচুর পর্যালোচনা ও মতামতপ্রদান হয়েছে। এই বিষয়ের আধিক্যতা আপনি অন্য কোন ফিকহে এর মতো এতোটা দেখবেন না। সেখানে প্রধান ব্যক্তি যা বলেছেন তার বাইরে তার শিষ্যরাসহ পরবর্তীদের মতামত কমই পাওয়া যায়। এদিক থেকে চিন্তা-বুদ্ধির চর্চাটা যে এই ফিকহে সবসময়ই বহাল ছিলো তা নির্ধিদ্বায় বলা যায়।
ফিকহে হানাফীর মাসায়েলের কয়েকটি স্তর আছে। যে কোন একটা মত থাকলেই সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তাই সেটাকে উল্লেখ করে এই ফিকহকে দোষারোপ করার কোন সুযোগ নেই। মোট তিনটা স্তর আছে এতে।
ক. মাসায়েলুল উসুল তথা ইমাম মুহাম্মদ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত তাঁর লেখা ছয়টি গ্রন্থে উল্লেখিত মাসায়েল। এতে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত মাসায়েল পাওয়া যায়। এগুলো হলো প্রথম স্তরের। এগুলোকে যাহিরুর রিওয়াহ-ও বলা হয়।
খ. মাসায়েলুন নাওয়াদের তথা ইমাম মুহাম্মাদ বা আবু ইউসুফের লিখিত সেসব গ্রন্থের মাসায়েল, যেগুলো আগেরগুলোর মতো অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং প্রসিদ্ধ নয়। যেমন- কায়সানিয়াত, হারুনিয়াত, জুরজানিয়াত ইত্যাদি। এগুলো দ্বিতীয় স্তরের।
গ. আলফাতাওয়া ওয়াল ওয়াকিআত। এগুলো হলো সেসব মাসআলা, যেগুলো পূর্ববর্তী ফকীহদের উদ্ভিবত মাসআলাতে না থাকায় পরবর্তী ফকীহরা উদ্ভাবন করেছেন।
সুতরাং ফিকহে হানাফীর কোন একজন ফকীহর কিতাবে একটা মাসআলা লেখা থাকলেই সেটাকে এই ফিকহের মত বলে দেবার কোন সুযোগ নাই। অথচ অনেকেই ভুলটা করে থাকেন। যেমন কয়েক বছর আগে একটা বই পড়েছিলাম 'হেদায়া কিতাবের একি হেদায়াত' নামে। সেখানে হেদায়া কিতাব থেকে বিভিন্ন রকমের 'গায়রে মুফতা বিহী' অর্থাৎ যেসব মাসআলার উপর ফতোয়া দেওয়া হয় না, বরং তা অগ্রহণযোগ্য মত সেগুলো তুলে এনে ফিকহে হানাফীর বদনাম করার চেষ্টা করা হয়। অথচ হেদায়া হল ফিকহে মুকারান বা তুলনামূলক ফিকহের একটি কিতাব। যেখানে বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হয়। ফলে বিভিন্ন মত তাতে উল্লেখ করা হয়। এটি ফতোয়ার কোন কিতাব নয়। ফতোয়ার কিতাব হলেও তো সেখানে গায়রে মুফতা বিহী অনেক মত থাকে অনেক সময়, যার উপর ফতোয়া দেওয়া হয় না। সুতরাং এই বিষয়গুলো যারা বুঝে না তারা তালগোল পাকিয়ে ফেলে।
এরপর আবার হানাফী ফকীহদেরও কয়েক ধরনের প্রকার আছে। যাদের মধ্যে আসহাবুত তাখরীজ হলো অন্যতম। তাদের মূল কাজ হলো যেসব মাসআলায় একাধিক মত বর্ণিত সেগুলোকে নীরিক্ষণ করে দলীলের আলোকে সবচে বিশুদ্ধ ও সঠিক যেটা সেটাকে তারজীহ বা প্রাধান্য দেওয়া। সোজা কথায় অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা আর যাচাই-বাছাইর ধাপ পাড়ি দিয়ে তারপর একটা মাসআলা ফতোয়াযোগ্য ও গ্রহণীয় বলে স্বীকৃতি পায়। এমন না যে পাইলাম আর লইলাম।
এই বিষয়গুলো অনেক বিস্তৃত বিষয়। এখানে বিক্ষিপ্তভাবে অল্প কিছু কথা বললাম।
লেখক
আব্দুল্লাহ আল মাসউদ
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক