ইসলামে দফ বাজানো জায়েজ না নাজায়েজ?
দফ বাজানোর শরয়ী বিধান
সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে। [সহীহ বুখারী হাদীস : ৫৫৯০]
দু’একটি ক্ষেত্রে শুধু দফ বাজানোর বিষয়টি ব্যতিক্রম থাকলেও যে কোনো বাদ্যযন্ত্রই হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস এবং সাহাবীদের বাস্তব আমল তা প্রমাণ করে।
গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে।[কুরতুবী ১৪/৫৫]
হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। [আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮]
ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত
ব্যক্তি হল আহমক। তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম
এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। [ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫]
ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে। [জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২]
মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়।-[ফাতহুল বারী ৯/২২৬]
দফ-এর পরিচয়
যারা সরাসরি আরবে দফ দেখেছেন, তাদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, দফ-এর এক পাশ খোলা। বাজালে ঢ্যাব ঢ্যাব আওয়াজ হয়। প্লাস্টিকের গামলা বাজালে যেমন আওয়াজ হবে তেমন। আসলে দফ কোনো বাদ্যযন্ত্রের পর্যায়ে পড়ে না।
লুগাতুল ফুকাহাতে এসেছে, ‘অর্থাৎ দফ বলা হয় ঐ বাদ্য যন্ত্রকে যার উপরের অংশ চালুনির মত, যাতে ঘন্টির মত আওয়াজ নেই, আর তার একাংশে থাকবে চামড়ার পর্দা।’ [লুগাতুল ফুকাহা ১/২৫১]
আওনুল বারী গ্রন্থে দফ-এর পরিচয় দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে যে, এর আওয়াজ স্পষ্ট ও চিকন নয় এবং সুরেলা ও আনন্দদায়কও নয়। কোনো দফ-এর আওয়াজ যদি চিকন ও আকর্ষণীয় হয় তখন তা আর দফ থাকবে না; বাদ্যযন্ত্রে পরিণত হবে। [আওনুল বারী ২/৩৫৭]
আর দফ-এর মধ্যে যখন বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এসে যাবে তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েয বলে পরিগণিত হবে।-[মিরকাত ৬/২১০]
মুফাসসিরীনে কেরামের মতে দফের বিধান
আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে
সূরায়ে মায়েদার ৯০ নাম্বার আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে তাওরাতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন “একই কথা তাওরাতে আল্লাহ তায়ালা এভাবে বলেছেন যে, নিশ্চয় আল্লাহ সত্য নাযিল করে এর দ্বারা বাতিলকে নির্মূল করেন।” আর বাতিলের অন্তর্ভূক্ত বিষয়ের মাঝে দফ বাজানোও শামিল। ঠিক একই তাফসীর আল্লামা সুয়ূতী রহ. প্রণীত আদ দুররুল মানসুর তাফসীর গ্রন্থেও দেখা যাচ্ছে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/১৮৭, আদ দুররুল মানসুর ৩/১৬৩ ]
সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে দফের বিধান
১. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: الدُّفُّ حَرَامٌ، وَالْكُوبَةُ حَرَامٌ، وَالْمِزْمَارُ حَرَامٌ
‘দফ হারাম। বাদ্যযন্ত্র হারাম। মদের পেয়ালা হারাম। বাঁশী হারাম।’ [সুনানে সুগরা লিলবায়হাকী, হাদিস: ৩৩৫৯; সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী, হাদিস: ২১০০০]
২. হযরত ইবনে মাসউদ ও আলি রাযি. রেওয়ায়েত
عن ابن مسعود رضى الله تعالى قال نهى عن ضرب الدف ولعب الصنج وضرب الزمارة، لست من دد “১ ولا الدد مني.”خد، هق عن أنس؛ طب عن معاوية”.)كنز العمال فى سنن الاقوال والافعال [باب التغنى المحظور ১৫/২১৯] ।। عن مطر بن سالم عن على قال : نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم ু عن ضرب الدف ولعب الصنج وصوت الزماره (الخطيب قال فى المغنى عن مطر بن سالم عن على مجهول)أخرجه الخطيب (১৩/৩০০) . [جامع الاحاديث ুقسم الأفعال- مسند علي ابن ابي طالب ু৩২/১৪২]
উল্লেখিত হাদিস সমূহ যথাক্রমে হযরত ইবনে মাসউদ
রাযি. ও হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। তাতে সাহাবায়ে কেরামকে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে “দফ” বাজাতে নিষেধ করেছেন।
৩. বুরাইদাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোন এক যুদ্ধাভিযানে যান। তিনি ফিরে এলে এক কৃষ্ণবর্ণা মেয়ে এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মানৎ করেছিলাম যে, আপনাকে আল্লাহ তা’আলা হিফাযাতে (সুস্থাবস্থায়) ফিরিয়ে আনলে আপনার সম্মুখে আমি দফ বাজাব এবং গান করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি সত্যিই যদি মানৎ করে থাক তবে দফ বাজাও, তা না হলে বাজিও না। সে দফ (এক মুখ খোলা ঢোল) বাজাতে লাগল। এই অবস্থায় সেখানে আবূ বকর (রাযিঃ) এলেন এবং সে দফ বাজাতে থাকে, তারপর ’আলী (রাযিঃ) এলেন এবং সে ওটা বাজাতে থাকে। তারপর উসমান (রাযিঃ) এলেন, সে সময়ও সে তা বাজাতে থাকে।
তারপর উমর (রাযিঃ) এসে প্রবেশ করলে সে দফটি তার নিতম্বের নীচে রেখে তার উপর অবস্থান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে উমার! তোমাকে দেখলে শাইতানও ভয় পায়। আমি উপবিষ্ট ছিলাম আর ঐ মেয়েটি দফ বাজাচ্ছিল। পরে আবূ বকর এসে প্রবেশ করলে সে সময়ও সে তা বাজাতে থাকে। তারপর ’আলী প্রবেশ করলে সে সময়ও সে তা বাজাতে থাকে। এরপর উসমান এসে প্রবেশ করলে তখনও সে তা বাজাতে থাকে। অবশেষে তুমি এসে যখন প্রবেশ করলে, হে উমার! সে সময় সে দফটি ফেলে দিল। [সুনান আত তিরমিজী ৩৬৯০]
বিজ্ঞ পাঠক! হযরত ওমর (রা.) কে দেখে মহিলাটির দফ বাজানো বন্ধ করাকে নবীজি সা. বলেছেন ‘শয়তান ওমর রাযি. থেকে ভয়ে দূরে থাকে বলে মহিলাটি দফ বাজানো বন্ধ করে দিয়েছে।’ সুতরাং দফ বাজানো শয়তানী কাজ একথা কী প্রমাণিত হচ্ছেনা এ হাদিস থেকে?
وفي كتاب سعيد بن منصور: حدثنا أبو داود وسليمان بن سالم البصري حدثنا حسان بن سنان عن رجل عن أبي هريرة يرفعه: يمسخ قوم من أمتي آخر الزمان قردة وخنازير، قالوا: يا رسول الله! ويشهدون أنك رسول الله وأن لا إله إلا الله؟ قال: نعم، ويصلون ويصومون ويحجون. قالوا: فما بالهم يا رسول الله؟ قال: اتخذوا المعازف والقينات والدفوف ويشربون هذه الأشربة فباتوا على لهوهم وشرابهم فأصبحوا قردة وخنازير، ولما رواه الترمذي قال: هذا حديث غريب لا نعرفه إلا من هذا الوجه، (عمدة القاري شرح صحيح البخاری كتاب الأشربة باب الأنتباذ في الأوعية والتور ) ( ৩১ / ১৬৭)
৪. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের মাঝে এক দল লোকের শেষ জমানায় বানর ও শূকরের সুরতে চেহারা বিকৃতি ঘটবে”।সাহাবা রা.নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলেন , ইয়া রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! অথচ তারা স্বাক্ষ্য দিবে নিশ্চয় আপনি আল্লাহর মনোনিত রাসূল আর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন মাবুদ নেই ? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হ্যাঁ এবং তারা নামায ও পড়বে আবার রোজাও রাখবে, এবং হজ্ব ও করবে, সাহাবারা বললেন, তবে তাদের অপরাধটা কী? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা বাদ্য ও গায়িকা আর “দফ” বাজানোকে গ্রহণ করবে। আর মদ খেয়ে প্রমোদ করে মাতাল হয়ে রাত কাটিয়ে সকালে বানর ও শুকরে পরিণত হবে। [উমদাতুল কারী ৩১/১৬৭]
ফুকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে দফের বিধান
আহনাফের মতে পুরুষদের জন্য ‘দফ’ বাজানো হারাম। এটাই মালেকি মাযহাবের ইমাম আসবাগ রহ. এর মত। ইমাম হালিমি, ইমাম বায়হাকি, ইমাম ইবনে কাসীর এবং শাফেঈ মাযহাবের অন্যতম ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এর মত। আর ইবনে রজব হাম্বলি রহ. বলেন, জমহুর উলামায়ে কেরামতেই ‘দফ’ হারাম। এটাই ইবনে তাইমিয়ার সুস্পষ্ট অভিমত। ইমাম ইবনে বাজ, ইবনে উসাইমিন, আলবানীর মতও অনুরূপ। আর এটাই সৌদির বিখ্যাত ফতোয়া বোর্ড ‘লাজনাতুদ দায়িমার’ ফতোয়া।
ইমাম আবু হানিফার রহিমাহুল্লাহর মতে,
وأبو حنيفة أشد الأئمة قولا فيه ومذهبه فيه أغلظ المذاهب وقد صرح أصحابه بتحريم سماع الملاهي كلها المزمار والدف حتى الضرب بالقضيب وأنه معصية يوجب الفسق وترد به الشهادة بل قالوا التلذذ به كفر (عون المعبود ুكتاب الأدبু باب كراهية الغناء والزمر ১৩/১৮৬
অর্থাৎ আর আবু হানিফা রাহ. এ ব্যাপারে সবচে’ কঠোর। তার মাযহাব হলো সবচে’ কঠিন, তার সঙ্গীরা একথা সুস্পষ্ট করেছেন যে, সকল প্রমোদ সামগ্রি হারাম , সর্ব প্রকার বাঁশি এবং “দফ”ও। এমন কি লাঠি দিয়ে বাড়ি মারাও, আর এটা গোনাহ যা ফাসেক হওয়াকে ওয়াজিব করে, যার ফলে তার স্বাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য নয়, বরং ফুকাহারা বলেন-এসব দ্বারা আনন্দ নেয়া কুফরী। [আউনুল মাবুদ-১৩/১৮৬]
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী রহ.এর মতে
وقال ابن عابدين: (جوازُ ضَربِ الدُّفِّ فيه خاصٌّ بالنساءِ؛ لِما في البحر عن المعراجِ بعد ذِكْرِه أنه مباحٌ في النِّكاح وما في معناه مِن حادثِ سرورٍ، قال: وهو مكروهٌ للرجالِ على كلِّ حالٍ؛ للتشَبُّهِ بالنساءِ). ((حاشية ابن عابدين)) (৫/৪৮২).
ইবনে আবেদীন শামী রহ. বলেন, ‘দফ’ বাজানোর বৈধতা কেবল নারীদের সাথে বিশেষায়িত। কেননা বাহরুর রায়েকে রয়েছে, যে এটা শুধুমাত্র বিবাহের সময় নারীদের জন্য বৈধ এবং তাও শুধু কম বয়সী নাবালিকা মেয়েদের জন্য। তিনি আরো বলেন, সর্বাবস্থায় পুরুষদের জন্য ‘দফ’ বাজানো মাকরুহ। নারীদের সাথে সাদৃশ্যতার কারণে। [হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন ৫/৪৮২]
ইবনে নুজাইম রহ. বলেন, সর্বাবস্থায় পুরুষদের জন্য ‘দফ’ বাজানো মাকরুহ। নারীদের সাথে সাদৃশ্যতার কারণে। [বাহরুর রায়েক ৭/৮৮]
والحَنَفيَّةُ يعنون بالكراهةِ إذا ذُكِرَت مطلقةً كراهةَ التحريم. قال ابن عابدين: (الكراهةُ حيث أُطلِقَت فالمرادُ منها التحريمُ، قال في البحر: واعلَمْ أنَّ المكروهَ إذا أطلِقَ في كلامهم فالمرادُ منه التحريمُ إلَّا أن يُنَصَّ على كراهةِ التنزيه؛ فقد قال المصنف في المصفَّى: لفظُ الكراهةِ عند الإطلاقِ يرادُ بها التحريمُ. قال أبو يوسف: قلتُ لأبي حنيفة: إذا قلتَ في شيءٍ: أكرَهُه، فما رأيكُ فيه؟ قال: التحريمُ). ((حاشية ابن عابدين)) (১/২২৪).
আর মুতলাকভাবে যেখানে ‘কারাহাত’ শব্দ উল্লেখ করা হয় সেখানে হানাফি স্কলারগণ হারাম উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন। অর্থাৎ শুধু ‘মাকরুহ’ বললে এর দ্বারা মাকরুহে তাহরীমি বা হারাম উদ্দেশ্য। এমনটাই ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এবং ইবনে আবেদীন শামি রহ. এর মতামত। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাস করলাম, কোনো বিষয়ে যখন আপনি বলেন, ‘‘যে এটাকে আমি মাকরুহ মনে করি’’, এর দ্বারা আপনার উদ্দেশ্য কী? তখন তিনি বললেন, তাহরিমী বা হারাম বুঝানো উদ্দেশ্য। [হাশিয়াতু ইবনে আবেদীন ১/২২৪]
ইমাম তাহতাভি রহ. বলেন, ‘মাকরুহ শব্দ যখন মুতলাকভাবে উল্লেখ করা হয় তখন এর দ্বারা ‘তাহরিমী বা হারাম উদ্দেশ্য হয়।’ [মারাকিল ফালাহ]
قال الحليمي: (ضربُ الدُّفِّ لا يحِلُّ إلا للنساءِ؛ لأنَّه في الأصلِ مِن أعمالِهنَّ، و[قد] لعَنَ رَسولُ الله صلَّى اللهُ عليه وسلَّم المتشَبِّهين من الرِّجالِ بالنِّساءِ). ((المنهاج في شعب الإيمان)) (৩/১৯).
ইমাম হালিমি রহ. বলেন, ‘দফ’ বাজানো কেবল নারীদের জন্য বৈধ। কেননা ‘দফ’ মূলত নারীদের বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। আর রাসুল সা. লানত করেছেন ওই সকল পুরুষদেরকে যারা নারীদের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করে। [আল মিনহাজ ফি শুআবিল ঈমান ৩/১৯]
قال ابن حجر الهيتمي: (حكى الإمامُ البيهقي عن شيخِه الإمام الحليمي ولم يخاِلْفه: أنَّا إذا أبَحْنا الدُّفَّ فإنما نُبِيحه للنِّساءِ خاصَّةً). ((كف الرعاع)) (ص: ৮২). ويُنظر: ((تحفة المحتاج)) لابن حجر الهيتمي (১০/২২০)،
ইবনে হাজার হায়তামি রহ. বলেন, ইমাম বায়হাকী রহ. তার শায়খ থেকে বর্ণানা করেন, ‘আমরা কেবল নারীদের জন্য দফের ব্যবহার বৈধ মনে করি।’ [তুহফাতুল মুহতাজ ১০/২২০]
قال ابن حجر: (واستُدِلَّ بقولِه: ্রواضرِبواগ্ধ على أنَّ ذلك لا يختَصُّ بالنِّساءِ، لكنَّه ضعيفٌ، والأحاديثُ القويَّةُ فيها الإذنُ في ذلك للنِّساءِ، فلا يلتحِقُ بهنَّ الرِّجالُ؛ لعُمومِ النَّهيِ عن التشبُّهِ بهنَّ). ((فتح الباري)) (৯/১৮৫).
ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেন: “মজবুত হাদিসগুলোতে দফ বাজানোর যে অনুমতি এসেছে সেটা নারীদের জন্য খাস। এ অনুমোদনের মধ্যে পুরুষেরা অন্তর্ভুক্ত হবে না। যেহেতু সাধারণভাবে পুরষদেরকে নারীদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।” [ফাতহুল বারী ৯/১৮৫]
قال ابن تيمية: (رُخِّصَ للنساءِ أن يَضْرِبْنَ بالدُّفِّ في الأعراسِ والأفراحِ، وأمَّا الرِّجالُ على عَهدِه فلم يَكُنْ أحدٌ منهم يَضرِبُ بدُفٍّ، ولا يُصَفِّق بكَفٍّ). ((مجموع الفتاوى)) (১১/৫৬৫).
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, বিবাহ এবং উৎসবে নারীদের জন্য ‘দফ’ বাজানোর অনুমতি রয়েছে। আর নবীজির যুগে কোনো পুরুষ ‘দফ’ বাজাতেন না। এবং হাতে তালি দিতেন না। [মাজমুউল ফাতাওয়া ১১/৫৬৫]
قال ابن باز: (يُستحَبُّ ضَربُ الدُّفِّ في النِّكاح للنِّساءِ خاصَّةً؛ لإعلانِه والتمييزِ بينه وبين السِّفاحِ، ولا بأس بأغاني النِّساءِ فيما بينهنَّ مع الدُّفِّ إذا كانت تلك الأغاني ليس فيها تشجيعٌ على مُنكَرٍ ولا تثبيطٌ عن واجبٍ، ويُشتَرَطُ أن يكون ذلك فيما بينهنَّ مِن غير مخالطةٍ للرِّجالِ... أمَّا الرجالُ فلا يجوزُ لهم استعمالُ شيءٍ من ذلك لا في الأعراس ولا في غيرِها). ((مجموع فتاوى ابن باز)) (৩/৪২৫).
ইবনে বায রহ. বলেন, বিশেষভাবে নারীদের জন্য ‘দফ’ বাজানো মুস্তাহাব, বিবাহের ঘোষনা দেওয়ার জন্য।....... আর এটা হতে হবে, কেবল নারীদের মজলিসে, যেখানে পুরুষদের কোনো সংমিশ্রণ থাকবে না। আর পুরুষদের জন্য বিবাহ বা কোনো অনুষ্ঠানেই ‘দফ’ ইত্যাদি বাজানো বৈধ নয়। [মাজমু ফাতাওয়া ইবনে বায ৩/৪২৫]
ইবনে উসাইমিন রহ. বলেন,
قال ابن عثيمين: (وأمَّا الرِّجالُ فإنَّ الرِّجالَ لا نُفتيهم بالجوازِ، وإن كان بعضُ العلماء أجاز ذلك، لكنَّنا لا نُفتي به؛ لأنَّنا نخشى من أن يتوسَّعَ الأمرُ ويحصُلَ فيه ضررٌ على الرِّجالِ والنساء. والناقِلُ عنا بأنَّنا أفتينا بجوازِه للرِّجالِ غيرُ صَحيحٍ، لكِنْ لعَلَّه سَمِعَ منَّا أنَّنا قلنا: إنَّ بعض العلماء أجازه، فظَنَّ أنَّ هذا من بابِ الإقرارِ). ((اللقاء الشهري)) رقم اللقاء (৩৭).
আলবানী রহ. বলেন,
قال الألباني: (ضربُ الدُّفِّ لا يحِلُّ إلَّا للنِّساءِ؛ لأنَّه في الأصلِ مِن أعمالهنَّ، وقد لعن رسولُ الله صلَّى اللهُ عليه وسلَّم المتشَبِّهين من الرِّجالِ بالنِّساءِ). ((تحريم آلات الطرب)) (ص: ১০).
‘ফাতাওয়াল লাজনাতুদ দায়েমা’ র ফতোয়ায় এসেছে,
جاء في فتاوى اللجنةِ الدَّائمةِ: (ضَربُ الدُّفِّ إنما يجوزُ للنِّساءِ في حَفلِ الزواج، إعلانًا للنِّكاح، بشَرطِ أن يكونَ ذلك في محيطِ النِّساءِ، أمَّا الرِّجالُ فلا يجوزُ لهم ضَربُ الدُّفوفِ ولا غيرها من أنواعِ اللَّهوِ). ((فتاوى اللجنة الدائمة - المجموعة الأولى)) (২৬/২৫৮).
বিবাহের অনুষ্টানে কেবল নারীদের জন্য ‘দফ’ বাজানো বৈধ বিবাহের প্রচারের জন্য। তবে শর্ত হল তা হতে হবে নারীদের ঘরোয়া মজলিসে। আর পুরুষদের জন্য ‘দফ’ ইত্যাদি বাদ্য যন্ত্র বাজানো বৈধ নয়। [লাজনাতুদ দায়েমা ২৬/২৫৮]
তাবেয়ীদের ফতোয়া
وأما الضرب بالدف فقد كان جماعة من التابعين يكسرون الدفوف .........وكان الحسن البصري يقول ليس الدف من سنة المرسلين في شيء )تلبيس إبليس باب في ذكر الشبه التي تعلق بها من اجاز سماع الغناء- (ج ১ / ص ২৯৩)
অর্থাৎ “দফ বাজানো” তাবেয়ীনদের এক জামাত দফ ভেঙ্গে ফেলতেন, আর হাসান বসরী রাহ. বলতেন-দফ বাজানো কোন দিক দিয়েই নবীদের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত নয়। [তালবীছে ইবলীস-১/২৯৩]
جواز الدف للنساء في المناسباتلا يجوز للرجال استعمال الدف على الصحيح) فتاوى الشبكة الإسلامية ু (ج ১০ / ص ৪২৮৮) المفتي: مركز الفتوى بإشراف د.عبدالله الفقيه
শাবাকাতুল ইসলামিয়ার ফতোয়ায় ও পূর্বে উদ্বৃত ফতোয়ার বক্তব্যই ধ্বনিত হচ্ছে যে, সহীহ বক্তব্য অনুযায়ী পুরুষের জন্য দফ বাজানো জায়েজ নেই। [ফাতাওয়া শাবাকাতুল ইসলামিয়া-১০/৪২৮৮]
হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর “বিয়ে শাদিতে বাজনা বাজনোর একটি বিরল তাহকীক” নামে লিখিত প্রবন্ধে (যা মুফতী শফী রহ. এর ফতোয়া সংকলন জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডের ২০৮ নং পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত করা হয়েছে) বুস্তানুল আরেফীন ও নিসাবুল ইহতিসাব এবং শরহে নুকায়া গ্রন্থের উদ্বৃতি দেন, ‘‘অর্থাৎ আল্লামা তুরে পেশতী রহ. বলেন, অধিকাংশ মাশায়েখে কেরামের মতে দফ বাজানো হারাম, তবে বিয়েতে দফ বাজানোর ক্ষেত্রে যেসব বর্ণনা এসেছে এর দ্বারা উদ্যেশ্য হচ্ছে প্রচারণা করা।’’
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর তাহকীক ও ফতোয়া প্রণিদান যোগ্য, যা জাওয়াহিরুল ফিক্বহ এর চতুর্থ খন্ডে বিবৃত হয়েছে, যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন ‘দফ’ বাজানো জায়েজ নেই। আর এক্ষেত্রে বিভিন্ন হানাফী ফিক্বহের কিতাবে ভুল বর্ণনা (যে দফ বাজানো হানাফীদের কাছে বিয়ে বা আনন্দ অনুষ্ঠানে জায়েজ) একজন থেকে আরেকজন করে গেছেন তাহকীক ছাড়াই, এমনটা বলেছেন পরিস্কার হাকিমুল উম্মত রহ.। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ৪/২১২)
সারকথা, বিবাহের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র অন্দরমহলে নাবালিকা শিশুরা ঝুনঝুনিমুক্ত সাধারণ ‘দফ’ ব্যবহার করতে পারে। অন্য কোথাও দফ ব্যবহারের সুযোগ নেই। বিশেষত, বর্তমানে ইসলামী সঙ্গীতে যেভাবে দফের নামে বাদ্যকে বৈধ করা হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে না জায়েজ। এবং এর পক্ষে যে শরঈ বিশ্লেষণের তোরজোড় দেখা যায় তা সুনিশ্চিতভাবেই ভুল বিকৃত ব্যাখ্যা। আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের সদস্যদেরকে অনাকাঙ্খিতভাবে এ ধরণের বিচ্যুতির শিকার হওয়া থেকে হেফাযত করুন।
সংকলনে
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা
মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা
মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল