শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক জরিমানা আরোপ: ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে বৈধতা ও সীমাবদ্ধতা
মানুষের একটি জন্মগত স্বভাব হল সীমালঙ্ঘন করা, যার উপর ভিত্তি করে তার শাস্তিও হয়ে থাকে। সীমালঙ্ঘনের(ভুলের) ভিত্তিতে শরীয়তে যে শাস্তি রয়েছে তা দুই প্রকার :
এক.সেই শাস্তি যা শরীয়তে নির্দিষ্ট,যেমন: রোজা এবং শপথ ভঙ্গের কাফফারা ইত্যাদি।
দুই.এমন শাস্তি শরীয়তে নির্দিষ্ট নয়,সরকার সুবিধার বিবেচনায় এই ধরনের লঙ্ঘনের জন্য যে কোনও শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে। আর তাকে ফিকহের কিতাবে
’তাযীর‘ নামে অভিহিত করা হয়। তাযীর এমন শাস্তিকে বলা হয়,যা সরকার অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নির্ধারণ করে থাকে,যার জন্য শরীয়তে কোনো কাফফারা বা হদ নেই।
আল-মাবসুত সারাখসিতে এসেছে,
’’ألتعزیر ہو عقوبۃ غیر مقدرۃ شرعاً، تجب فی کل معصیۃ لیس فیہا حد ولا کفارۃ ‘‘۔ (المبسوط للسرخسی : ۹؍۴۵)
তাযীর হল,এমন একটি শাস্তি যা শরীয়তে অনির্দিষ্ট, যা প্রত্যেক এমন অপরাধের জন্য আবশ্যক হয়ে থাকে,
যার জন্য শরীয়তে কোনো হদ এবং কাফফারা নেই।
এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শাস্তি হিসেবে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া যেতে পারে? এ প্রসঙ্গে, বাস্তবতা হল যে, শাসক,সেই সময়ের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, তিনি যে ধরনের শাস্তি উপযুক্ত মনে করবেন তা প্রদান করবেন :
والتعزیر لا یختص بالسوط والید والحبس، وإنما ذلک موکول إلی إجتہاد الحاکم۔
তাযীর কেবল বেত্রাঘাত, চাবুক মারা এবং কারা বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটা শাসকের ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে।” (তাবসিরাতুল হুক্কাম ২/২০১)
তাই শাসক মার ধর করতে পারে, বেত্রাঘাত করতে পারে, কারারুদ্ধ করতে পারে এবং শুধুমাত্র তিরস্কারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে পারে। অর্থাৎ যেভাবে মানানসই মনে হয় সেভাবে কাজ করা উচিত।
আজকাল অনেক নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকার নিজে এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়। এখন প্রশ্ন হল এটা কি শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক? আসুন জেনে নিই এ বিষয়ে ফিকহে হানাফীর গ্রহনযোগ্য মতামত।
ইসলামী শরীয়তে অনুপস্থিত ছাত্রদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা জায়েয নয়,যাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে তাদেরকেই উল্লিখিত অর্থ ফেরত দিতে হবে, ফেরত দেওয়া আবশ্যক।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে আর্থিক জরিমানা আদায়ের প্রথা চালু থাকে তাহলে তা অবিলম্বে নির্মুল করা উচিত।
শরীয়তে যা বৈধ নয় এমন কিছুর মাধ্যমে উপার্জন কখনো বরকত হতে পারে না। ইহার পরিবর্তে,এমন একটি বৈধ পদ্ধিতি গ্রহণ করা উচিত যাতে শিশুরা ক্লাসে পাবন্দির সাথে উপস্থিত হয়।
যদি অজ্ঞতা বা ধর্মীয় পরিবেশের অভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে জরিমানার টাকা-পয়সা জমা হয়ে থাকে, তবে এর বিধান হল যে, যদি এর মালিকরা পরিচিত এবং নির্ধারিত হয়, তবে তা তাদের ফেরত দিতে হবে, তারপর তারা যেখানে খুশি ব্যয় করতে পারে। তাদের উপর কোনো নৈতিক চাপ বা জবরদস্তি করা উচিত নয়। অতঃপর অর্থের মালিক যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রের অভিভাবক হন এবং তিনি এই টাকা স্বাচ্ছন্দ্য মনে প্রতিষ্ঠানের খরচের জন্য দান করে দেন তাহলে তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
আর যদি কোনোভাবেই প্রকৃত হকদার জানা না যায়, তাহলে এ টাকা প্রতিষ্টানের ব্যয়ে লাগানোর পরিবর্তে সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই সাদকাহ করা আবশ্যক।
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ট ফাতাওয়া গ্রন্থ 'ফাতাওয়ায়ে শামীতে'এসেছে
والحاصل أن المذهب عدم التعزیر بأخذ المال .... لا یجوز لأحد من المسلمین أخذ مال أحد بغیر سبب شرعي". (شامي، باب التعزیر، مطلب في التعزیر بأخذ المال،ج: ۴، ص: ۶۱)
সারকথা হলো,গ্রহনযোগ্য মাযহাব মতে সম্পদের মাধ্যমে কাউকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়... তিনি আরও লিখেছেন: কোনো মুসলমানের জন্য কোনো শরয়ী কারণ ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
মাজমাউল আনহুরে এসেছে
"ولایکون التعزیر بأخذ المال من الجاني في المذهب". (مجمع الأنهر، کتاب الحدود / باب التعزیر ۱؍۶۰۹ بیروت)
গ্রহনযোগ্য মতামত অনুযায়ী অপরাধীর কাছ থেকে টাকা গ্রহণের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
শারহুল আসারে এসেছে
"وفي شرح الآثار: التعزیر بأخذ المال کانت في ابتداء الإسلام ثم نسخ". (البحر الرائق /باب التعزیر৪১/৫ )
টাকা নেওয়ার শাস্তি ইসলামের শুরুতে ছিল,পরবর্তী তা রহিত হয়ে গেছে।
-আল-বাহরুর রায়েক ৪/৪১; হাওয়াশি আশশারওয়ানী ১১/৫৩৯; আলমুগনী ১২/৫২৬; আদ্দুররুল মুখতার ৪/৬১; শারহুল আসার ৫/৪
الادلةالشرعية
’’ألتعزیر ہو عقوبۃ غیر مقدرۃ شرعاً، تجب فی کل معصیۃ لیس فیہا حد ولا کفارۃ ‘‘۔ (المبسوط للسرخسی : ۹؍۴۵)
والتعزیر لا یختص بالسوط والید والحبس، وإنما ذلک موکول إلی إجتہاد الحاکم۔
والحاصل أن المذهب عدم التعزیر بأخذ المال .... لا یجوز لأحد من المسلمین أخذ مال أحد بغیر سبب شرعي". (شامي، باب التعزیر، مطلب في التعزیر بأخذ المال،ج: ۴، ص: ۶۱
"ولایکون التعزیر بأخذ المال من الجاني في المذهب". (مجمع الأنهر، کتاب الحدود / باب التعزیر ۱؍۶۰۹ بیروت)
"وفي شرح الآثار: التعزیر بأخذ المال کانت في ابتداء الإسلام ثم نسخ". (البحر الرائق /باب التعزیر৪১/৫ )
মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল