ফিকহ কাফন-দাফন -জানাযা

"নারীদের জানাজায় অংশগ্রহণ: ইসলামী বিধান ও সভ্যতার সীমানা"


 

ইসলামী শরীয়াহ মতে জানাযার নামাজ আদায় করা ফরজে কেফায়া। ফরজে কেফায়া হলো দু-তিনজন আদায় করলে মহল্লার সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। আর কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হয়। জানাযার নামাজ শুধু পুরুষদের জন্য আবশ্যক। নারীদের জন্য এতে অংশগ্রহণ করার বিধান নেই। তাই নারীদের জন্য জানাযায় শামিল হওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা- তাবেঈন থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

 

হযরত উম্মে আতিয়্যাহ রাযি.-বর্ণনা করেন

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানাযায় বের হতে নিষেধ করেছেন। [মুজামুল কাবীর তবারানী ২৫/৪৫]

 

তাবেঈ যার ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. বলেন

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার সাথে ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন একজন বৃদ্ধ মহিলাও জানাযার সাথে সাথে আসছে। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রোধান্বিত হলেন এবং তার চেহেরায় ক্রোধের ছাপ ফুটে উঠল। তখন তার নির্দেশে ঐ বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দেয়া হল। এরপর খাটিয়া রাখা হল কিন্তু তিনি জানাযা শুরু করলেন না। যখন লোকেরা বলল,  ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে হক (সত্য)সহ প্রেরণ করেছেন ঐ মহিলা শহরের বাড়িঘরের আড়াল হয়ে গেছে, তখন তিনি জানাযার তাকবির বললেন। [মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস ৬২৯০]

 

হযরত আমর ইবনে কায়স রহ. বলেন

 

আমরা এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। আবু উমামাও সেখানে ছিলেন। তিনি দেখলেন জানাযায় কিছু মহিলাও এসেছে। তখন তিনি তাদের সরিয়ে দিলেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১১৪০৮]

 

মুহাম্মাদ ইবনুল মুনতাশির রহ. বলেন

 

মাসরূক রহ. ঐ জানাযা পড়তেন না, যে জানাযায় কোনো মহিলা উপস্থিত হতো। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-১১৪০৩]

 

বিখ্যাত ফকিহ ইমাম শাবি রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হল, নারীরা কি জানাযার নামায পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন নারীরা জানাযার নামায পড়বে না, চাই সে পবিত্র হোক কিংবা ঋতুমতি। [মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৬২৯৭]

 

দ্বিতীয়ত নারীদের ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা হল ইবাদত- বন্দেগী থেকে শুরু করে তাদের সকল কাজ পুরুষদের থেকে আলাদা হবে। তাদের অবয়ব ও চলাফেরা পুরুষদের দৃষ্টির আড়ালে থাকবে। পুরুষের জন্য যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে এসে জামাতের সাথে আদায় করা শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ হুকুম। সেখানে নারীদেরকে গৃহাভ্যন্তরে নামায আদায় করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। মসজিদে নববীতে যেখানে এক রাকাত নামাযের ফযীলত এক হাজার রাকাত সমান। এর সাথে আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত ইমামের পেছনে নামায পড়ার সৌভাগ্য তো রয়েছেই। তা সত্তে¡ও সে সময় নারী সাহাবীদেরকে তাদের গৃহাভ্যন্তরের সর্বাধিক নির্জন স্থানে নামায পড়াকে উত্তম বলা হয়েছে। এর উল্টো এমন একটি হাদিসও নেই, যাতে মহিলাদেরকে সম্বোধন করে মসজিদে এসে জামাতের সাথে নামায পড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বা এর দিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

 

উম্মে হুমাইদ রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার সাথে নামায পড়তে খুব পছন্দ করি। তিনি বললেন, আমি জানি তুমি আমার সাথে নামায পড়তে পছন্দ কর। কিন্তু জেনে রাখ, তোমার ঘরের ভেতরের নামায বাহিরের কামরার নামাযের চেয়ে উত্তম। বারান্দার নামায চৌহদ্দির ভেতরের নামাযের চেয়ে উত্তম। চৌহদ্দির ভেতরের নামায তোমার এলাকার মসজিদে নামাযের চেয়ে উত্তম এবং তোমার এলাকার মসজিদের নামায আমার মসজিদের নামাযের চেয়ে উত্তম। বর্ণনাকারী বলেন তখন উম্মে হুমাইদ রাযি.-এর নির্দেশে ঘরের সবচেয়ে নিভৃতে এবং অধিক আড়ালে তার জন্য নামাযের স্থান বানানো হয়। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই নামায আদায় করছেন। [মুসনাদে আহমাদ ২৭০৯০]

 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বর্ণনা করেন

 

নারীগণ আবরণীয়। কোনো নারী যখন নিজ ঘর থেকে বের হয় অথচ তার কোনো সমস্যা নেই; তখন শয়তান তার পিছু নেয় এবং বলতে থাকে, তুমি যার সম্মুখ দিয়ে যাবে তোমাকে তার ভালো লাগবে। আর কোনো মহিলা যখন কাপড় পরিধান করে তখন ঘরের লোকজন জিজ্ঞাসা করে তুমি কোথায় যাও? সে বলে যে, অমুক অসুস্থকে দেখতে যাই বা কারো জানাযা পড়তে যাই, অথবা বলে, মসজিদে নামাযে যাই। অথচ মহিলাদের কোনো ইবাদতই এর চেয়ে উত্তম নয়, যা সে নিজ গৃহে আদায় করে। [ মুজামুল কাবীর তাবারানী ৮৯১৪ মাজমাউয যাওয়াইদ ২১১৮]

 

অতএব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লেখিত হাদিস এবং সাহাবা-তাবেঈনের আছারগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, নারীদের জন্য জানাযার উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েয নয়। নারীরা ঘরে থেকেই মৃতের জন্য ঈসালে সওয়াব ও মাগফিরাতের দোয়া করবেন। এটাই ইসলামের নির্দেশ।

 

তবে যদি মৃত ব্যক্তি এমন কোনো এলাকায় মারা যায় যেখানে  জানাযা পড়ার মতো কোনো পুরুষ না থাকে, তখন কয়েকজন নারী যদি তার জানাযা পড়ে ফেলে তাহলে ফরজে কেফায়া আদায় হয়ে যাবে।

 

আর নারীরা তাওয়াফ বা হজ্ব-উমরা আদায়ের লক্ষে যদি আগে থেকেই হারাম শরীফে উপস্থিত থাকে এবং তখন জানাযার নামায দাড়িয়ে যায় তাহলে সেসকল নারীদের জন্য পর্দার সাথে বিশেষ কামরায় অবস্থান করে জামাতে শরীক হতে পারবে। কেননা মৌলিকভাবে জানাযার নামায নারীদের জন্য নিষিদ্ধ না। তবে পর্দা এবং ফিতনার ভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবা-তাবেঈগণ তাদেরকে ঘর থেকে বের হয়ে জানাযায় অংশ নিতে নিষেধ করেছেন।

 

[ফাতাওয়ায়ে শামী ১/৫৬৬, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি ৪/৪৫০ ও ১/১৬২, হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬০৭, শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৯৪ দুররে মুখতার ২/২৩২, বিন্নুরি ফাতাওয়া ১৪৩৯০৬২০০০২৭]





অনুবাদ

 

মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

ফাযেল ও মুতাখাস্সিস ফিল ফিকহ

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

মুফতি, মাহা'দুল ফিকহিল ইসলামি উত্তরা ঢাকা

মুফতি,ফাতাওয়া ও মাসায়েল





 



২০ ডিসেম্বর ২০২৫