রাসূল সা. কি উটের প্রস্রাব পান করতে বলেছেন?
ইসলামী শরীয়ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিমিতি, পবিত্রতা ও প্রজ্ঞার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রেও ইসলাম এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করেছে, যা দেহ, মন ও আত্মার নির্মলতা রক্ষা করে। এই প্রেক্ষাপটে “উটনীর দুধ ও প্রস্রাব” সংক্রান্ত হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা জানা জরুরি কেননা, বিদ্বেষী মহল এ বিষয়টি বিকৃতভাবে তুলে ধরে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য করার অপচেষ্টা চালায়, অথচ বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা ও চিকিৎসাগত প্রাসঙ্গিকতা।
উটনীর দুধ: হালাল ও উপকারী খাদ্য
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে উটনীর দুধ হালাল, পবিত্র এবং উপকারী। হাদীস শরীফে উটনীর দুধকে খাদ্য ও ওষুধ উভয় হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। আরব উপদ্বীপে এটি প্রাচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক শক্তিবর্ধক ও চিকিৎসার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সুতরাং উটনীর দুধ পান করা শরীয়তসম্মত এবং এতে কোনো ধরনের আপত্তি নেই।
উটনীর প্রস্রাব: অপবিত্র ও নাজায়েজ
অপরদিকে, উটনীর প্রস্রাব শরীয়ত অনুযায়ী অপবিত্র। হানাফি মাজহাবসহ অধিকাংশ ফকীহের সিদ্ধান্ত হলো উট সহ যেকোনো প্রাণীর প্রস্রাব পান করা জায়েয নয়। কারণ, শরীয়ত অপবিত্র পদার্থকে খাদ্য বা পানীয় হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছে। এটি ইসলামের সেই মহান নীতির প্রতিফলন, যেখানে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধাংশ।” (সহীহ মুসলিম ৪২৭)
হাদীসে উটনীর প্রস্রাব সংক্রান্ত নির্দেশ
কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, নবী করিম ﷺ একটি গোত্রের কিছু অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য উটনীর দুধ ও প্রস্রাব ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে হাদীস বিশারদগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন
১. ব্যবহার মানেই পান নয়
প্রথমত, নবী ﷺ আসলে পান করার নয়, বরং ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। “ইস্তিমাল” শব্দটি বহুমাত্রিক এটি বাহ্যিক প্রয়োগ, যেমন গায়ে লাগানো, ঘষা বা ওষুধে মিশিয়ে ব্যবহার করার অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
কিছু রাবি এই শব্দের অর্থকে পান করা ভেবে নিয়েছেন, ফলে কিছু বর্ণনায় “পান করার” কথা এসেছে। অথবা ঐ গোত্রের লোকেরা নিজেরা ভুলভাবে “ব্যবহার” বলতে “পান করা” বুঝে নিয়েছিল, এবং তাই তারা উটনীর প্রস্রাব পান করেছিল।
২. ওহির মাধ্যমে বিশেষ অনুমতি
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো নবী করিম ﷺ ওহির মাধ্যমে জানতেন যে, ঐ গোত্রের শারীরিক সমস্যা নিরাময়ের একমাত্র কার্যকর উপাদান তখন উটনীর প্রস্রাবই। অর্থাৎ এটি কোনো সাধারণ বিধান নয়, বরং নবুওয়াতি জ্ঞানের আলোকে প্রদত্ত বিশেষ চিকিৎসা নির্দেশনা।
ফিকহের নীতি অনুযায়ী, যদি কখনো এমন পরিস্থিতি দেখা দেয় যেখানে
কোনো হালাল ও বৈধ ওষুধ কার্যকর নয়, রোগ সহ্যের বাইরে চলে যায়, এবং কোনো পরহেজগার, অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসক নিশ্চিতভাবে বলেন যে, অমুক (নাজায়েজ বা নাপাক) পদার্থে শিফা রয়েছে, তাহলে একান্ত অবস্থার অনিবার্যতা (حالةالاضطرار)-এর কারণে সীমিত পরিমাণে তা ব্যবহার করার অনুমতি শরিয়তে বিদ্যমান।
যেমন, শরিয়ত মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে; কিন্তু যদি কারও প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দেয় এবং বিকল্প কিছু না থাকে, তবে জীবনরক্ষার প্রয়োজনে অল্প পরিমাণে তা খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। অনুরূপভাবে, যদি জীবননাশের ঝুঁকি থাকে এবং পান করার মতো কিছু না পাওয়া যায়, তবে প্রাণরক্ষার্থে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু মদ পান করা বৈধ কিন্তু তা কেবল অবস্থাগত ও সীমিত প্রয়োজনে।
৩. নির্দেশটি ছিল বিশেষ এক গোত্রের জন্য
তৃতীয় ব্যাখ্যা হলো নবী ﷺ-এর উক্ত নির্দেশ কোনো সার্বজনীন শরীয়তি হুকুম ছিল না; বরং এটি নির্দিষ্ট এক সময়, বিশেষ এক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রদত্ত ব্যতিক্রমী অনুমতি। এ নির্দেশ থেকে সাধারণ নিয়ম নির্ধারণ করা বা তা সর্বজনীনভাবে প্রয়োগ করা শরীয়তের নীতির পরিপন্থী।
[উমদাতুল কারী ৩/১৫৪,
জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচী, ফাতাওয়া নং ১৪৪৩০৭১০১২৯৪]