কাবিননামার ১৮নং ধারা না বুঝে সই: এতে কি স্ত্রী তাফবীজে তালাকের অধিকার পেয়ে যান?
মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমরা গত ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ সালে একটি কাজী অফিসে দুইজন (ছেলে প্রাপ্ত বয়স্ক) স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে পরিবার ছাড়া নিজেরা বিয়ে করি। বিয়ের পর আমরা একসাথে হয় নাই যে যার মতো নিজের বাসায় আছি। সহবাস হয়নি (কিন্তু আমরা স্পর্শকাতর, অত্যন্ত কাছাকাছি হয়েছি এমনকি আমার লজ্জাস্থান স্পর্শ এবং স্ত্রীর স্তন স্পর্শ হয়েছে)
প্রথম পয়েন্ট: (এটা ছিলো একরকম মজা)
একদিন আমার স্ত্রী এর উপর রাগ করি, এরপর বলি তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো এভাবে মজা করতে করতে ও আমাকে বলে আমি একজন কে ভালোবাসি। আমি বল্লাম ভালোবাসলে আমাকে তালাক দিয়ে তার কাছে চলে যাও। এরপর আমি ওরে কল দি, কল দেওয়ার পর স্ত্রী আমাকে বলে আমি যাকে ভালোবাসি সেটা তুমি। এটা ছিলো দুষ্টুমি। এখানে ও আমাকে কোন তালাক দেয় নাই। এটা ওই দিন শেষ দুষ্টুমি হিসেবে।
মূল পয়েন্ট: গত ২৩ নভেম্বর আমার স্ত্রী ওর একটা ছবি ফেসবুকে স্টোরি দিয়েছে! আমি প্রথমে সুন্দরভাবে ডিলিট করতে বলেছি সে করে নাই। পরবর্তীতে আমি ওরে বলেছি যে, তুই ছবি ডিলিট কর, না হয় আমাকে তালাক দে, তখন সে ছবি ডিলিট করে নাই, এবং সেদিন আমাকে তালাক দেয় নাই। ২৪ ঘন্টা পর ছবি অটোমেটিক চলে গিয়েছে। ছবি নিয়ে আমি ওরে অনেক খারাপ ব্যবহার দি, গালাগালির মতোই। এরপর সে আমার কাছে অনেক বার অনুমতি চেয়েছে যাতে তাকে অনুমতি দেই আমাকে তালাক দিতে কিন্তু আমি দি নাই। এরপর গত ৭ ডিসেম্বর সে আমাকে বলে আমি তাকে অনুমতি দিতাম তালাক দিতে। আমি দি নাই।
তখন সে আমাকে আগের ২৩ নভেম্বর এর কথা তুই ছবি ডিলিট কর, না হয় আমাকে তালাক দে, এই মেসেজ এর স্কিনশর্ট দিয়ে বলে সে এটার ভিত্তিতে আমাকে তালাক দিবে। তখন আমি বলছি যে না এটা শুধুমাত্র ওই দিনের ছিলো এটা আগের অতীত। আমি এখন তোমাকে কোন অনুমতি দি নাই।
আমি অনুমতি দি নাই এটা ওরে ৭ ডিসেম্বর ১২/১৩ বার বলেছি এরপর সে আমাকে ২৩ নভেম্বর এর ভিত্তিতে একটা টেক্সট পাঠায়, টেক্সট টি হলো আমি আমার উপর অর্পিত তালাক দেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিচ্ছি। আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ। আমি দেনমোহর চাইছি না। যেহেতু আমরা একসাথে সংসার করিনি, আমার ইদ্দত প্রযোজ্য নয়। আজ থেকে আমাদের মাঝে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকবে না যদি না আমার পরিবার চায়। এটার রিপ্লে ও আমি বলি আমি অনুমতি দি নাই।
উল্লেখ, আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের বিয়ের দিন কাবিননামা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক এর অধিকার দেওয়া আছে সেটা কাজি পড়ে শুনাই নাই এবং এই পয়েন্ট টা সর্ম্পকে আমি আগেও জানিনা। এবং আমরা দুই জনের কেউ কাবিননামা পড়ে স্বাক্ষর করি নাই। কাজি আমাদের শুধু স্বাক্ষর এর ঘর দেখিয়ে দিয়েছেন সেই জায়গায় কিছু না পড়ে স্বাক্ষর করেছি। আমি প্রমাণ হিসেবে বিয়ের দিনের কল রেকর্ড দিচ্ছি কাজি আমাদের কাবিননামা থেকে যা যা পড়ে শুনিয়েছে তার মধ্যে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এটা বলা হয় নাই এবং কাজী এটা লিখে দেয় নিজ থেকে সেটাও আমি জানি না। বিয়ের আগে ও জানতাম না।
বিঃ দ্রঃ প্রথমে আমরা কবুল বলার আগে কাজীর দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় কাবিননামা না পড়ে স্বাক্ষর করেছি। হুজুর এখন আমাদের জন্য একটা ইসলাম, হাদিস এবং চার মাহজাব থেকে ফতোয়া দিন।
নিবেদক,
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাকের ক্ষমতা একমাত্র স্বামীর। তবে স্ত্রীকে স্বামী কর্তৃক তালাক গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হলেই স্ত্রী নিজ নফসের উপর তালাক গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু যদি এধরনের ক্ষমতা না দেওয়া হয় তাহলে স্ত্রী নিজের উপর তালাক কার্যকর করতে পারবে না। স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা তখনই দিতে পারবে যখন তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। তাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে কোনো পাত্র পাত্রীকে তালাক গ্রহণের অনুমতি দিলেও তা ধর্তব্য হবে না। কারণ, বিয়ের আগে পাত্র নিজেই তালাক প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং সে অন্যকে কীভাবে অধিকার দিবে?
সুতরাং শরীয়তের উপরোক্ত নীতির আলোকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেল যে, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে যেহেতু কাবিননামাটি পূরণ এবং তাতে স্বাক্ষর হওয়ার কাজ বিবাহের আকদের পূর্বেই সংগঠিত হয়েছে তাই বিবাহের আগে কাবিননামার ১৮ নং ধারায় আপনার স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিধায় প্রশ্নের বর্ণনা মতে সত্যই যদি কাবিননামাটি বিয়ের আগেই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষমতাবলে আপনার স্ত্রী নিজে তালাক গ্রহণ করতে পারবে না, যদি করে তবে দেশীয় আইনে তা কার্যকর ধরা হলেও শরীয়তে সেই তালাক ধর্তব্য নয়। এতে আপনাদের বিবাহবিচ্ছেদ হবে না এবং আপনার প্রথমোক্ত বিবরণ অনুপাতে মনে হচ্ছে, আপনার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার ২৩ নভেম্বরের শুধু ঐ দিনের জন্যই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু আপনার স্ত্রী ২৩ নভেম্বর গ্রহণ না করে ৭ ডিসেম্বর গ্রহণ করেছে যেদিনে আপনি তাকে তালাক গ্রহণের অনুমতি দেননি। তালাকের অধিকার প্রদান করা ছাড়া স্ত্রী নিজের উপর তালাকে তাফয়ীজ গ্রহণ করতে পারে না। তাই আপনি যেহেতু স্ত্রীকে নিজের উপর তালাক পতিত করার অধিকার প্রদান করেননি, তাই নিজে নিজে স্ত্রী তালাকে তাফয়ীজ গ্রহণ করায় তা তালাক হিসেবে গণ্য হবেনা।
الادلة الشرعية
(مصنف عبد الرزاق-7/236، رقم-12951)
عن ابن المسيب رض قال: الطلاق بالرجال والعدة بالنساء
(المعجم الكبير للطبرانى-9/337، رقم-9697)
عن عبد الله بن مسعود رض قال: الطلاق بالرجال والعدة بالنساء
(مرقاة المفاتيح، -6/396، تحت رقم الحديث-3289)
الطلاق بالرجال والعدة بالنساء... وقوله فإنه حينئذ أنسب من أن يراد به الإيقاع بالرجال، ولأنه معلوم من قوله تعالى فطلقوهن. الآية.
(الفقه الأسلامى وأدلته-7/347، 355)
جعل الطلاق بيد الزوج لا بيد الزوجة إن الذى يملك الطلاق إنما هو الزوج.... ولا تلملكه الزوجة إلا بتوكيل من الزوج أو تفويض منه
(الدر المختار مع رد المحتار-4/431، مجمع الانهر-2/4، النهر الفائق-2/310)
ومحله المنكوحة واهله زوج عاقل بالغ مستيقظ
(رد المحتار-4/361)
لأن الطلاق لا يكون من النساء
و الله اعلم بالصواب
كتبه
المجلس المشترك للإفتاء
بمعهد الفقه الاسلامي داكا. بنغلاديش